আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্ত আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গতকাল শনিবার দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। কয়েক দিন আগেই আফগান রাজধানী কাবুলে বিমান হামলার পর থেকেই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এনায়েতুল্লাহ খোয়ারিজমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, পাকিস্তানের বারবার নিয়ম লঙ্ঘন ও আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলার জবাবে তালেবান বাহিনী সফল পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি আল-জাজিরাকে বলেন, পাকিস্তান প্রতি ইটের জবাবে পাথর দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, বেসামরিক এলাকায় আফগান বাহিনীর হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, এবং পাকিস্তান তার তাৎক্ষণিক ও কার্যকর জবাব দিয়েছে।
আল-জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের অন্তত ছয়টি স্থানে আফগান বাহিনী হামলা চালায়, যার জবাবে পাকিস্তানি সেনারা কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। তালেবান সরকার ওই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করলেও ইসলামাবাদ তা অস্বীকার করেছে। বরং পাকিস্তান উল্টো অভিযোগ তুলেছে, আফগানিস্তান তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স্টপোস্ট জানিয়েছে, টিটিপি আফগান সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। ৯ অক্টোবরের বিমান হামলাটি কাবুল, খোস্ত, জালালাবাদ ও পাকতিকা অঞ্চলে চালানো হয় টিটিপি নেতা নূর ওয়ালি মেহসুদকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে। যদিও তিনি রক্ষা পান, হামলায় বহু বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান।
পাকিস্তান দাবি করছে, টিটিপি ভারতের সমর্থনে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে—যা ভারত স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, তালেবান প্রশাসন জানিয়েছে, তারা কখনোই অন্য দেশের বিরুদ্ধে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেয় না।
বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই বিবাদপূর্ণ। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর থেকে শুরু, সম্পর্কের টানাপোড়ন চলছে এখনও।
এর মূলে রয়েছে ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ নির্ধারিত আফগানিস্তানের ‘ডুরান্ড লাইন’ সীমানা। ওই বছর ব্রিটিশ ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের ব্রিটিশ কূটনৈতিক মার্টিমার ডুরান্ড ও আফগান রাজা আমীর আবদুর রহমান খান তাদের নিজ নিজ দেশের সীমা নির্ধারণের জন্য ব্রিটিশ-ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসাবে ডুরান্ড লাইন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১৯ সালের অ্যাংলো-আফগান চুক্তির মাধ্যমে লাইনটি সামান্য পরিবর্তিত হয়। পরে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হলে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ডুরান্ড লাইনকেই নির্ধারিত করা হয়। যা দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েনের সূত্রপাত করে।
চলমান এই সীমান্ত বিরোধ, শরণার্থী সংকট, উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর কার্যক্রম এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন-সবমিলিয়ে পাকিস্তানের জন্মের পর থেকেই জ্বলছে প্রতিবেশী দুই দেশ। ১৯৭০-এর দশক থেকে সোভিয়েত আগ্রাসন, গৃহযুদ্ধ, তালেবান উত্থান ও সন্ত্রাসবাদ এই দ্বিপাক্ষিংকি সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
পাকিস্তান এটিকে সীমান্ত হিসাবে মানলেও আফগানরা কখনো ডুরান্ড লাইনকে স্বীকার করেননি। এ নিয়ে কয়েকবার সংঘর্ষেও জড়িয়েছে দুই দেশ। এই সীমান্ত বিতর্ক আজও দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে। এই টানাপোড়েনের প্রভাব বহুমাত্রিক।
এদিকে ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্ক ক্রমশ অবনতির দিকে। ইসলামাবাদের দাবি, সন্ত্রাসী সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আফগানিস্তানের ভূমি ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালায়। তবে বরাবরই এই দাবি অস্বীকার করেছে আফগানিস্তান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের এই সীমান্ত সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে তুলছে। দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসি রিপোর্ট অনুযায়ী, সীমান্তে সহিংসতা অব্যাহত থাকলে শরণার্থী সংকট ও জঙ্গি কার্যকলাপ আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশের পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং টিটিপি ইস্যু সমাধান না হলে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে।