Advertisement Banner

রয়টার্সের প্রতিবেদন

ইরান যুদ্ধই কি ঠিক করে দেবে ট্রাম্পের উত্তরসূরি কে হবেন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরান যুদ্ধই কি ঠিক করে দেবে ট্রাম্পের উত্তরসূরি কে হবেন?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ইরান যুদ্ধ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করার হুমকি সৃষ্টি করায় তার দুই শীর্ষ সহযোগী ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর রাজনৈতিক ভাগ্যও এখন ঝুঁকির মুখে।

ট্রাম্পের উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত এই দুজনকে এমন এক সময়ে যুদ্ধ বন্ধের প্রাথমিক আলোচনায় নিযুক্ত করা হয়েছে, যখন রিপাবলিকান পার্টি ইতোমধ্যেই ট্রাম্প-পরবর্তী ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছে। ভ্যান্স কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন, যা দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততার প্রতি তার অনীহাকেই প্রকাশ করে। অন্যদিকে, রুবিও নিজেকে ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক অবস্থানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছেন এবং এই অভিযানের অন্যতম সমর্থক হিসেবে আছেন।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি বন্ধ করতে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলের পথ উন্মুক্ত রাখতে ইরানকে মার্কিন শর্ত মানতে বাধ্য করার প্রচেষ্টায় তারা উভয়ই যুক্ত।

২০২৮ সালের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ও উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগতভাবে প্রশ্ন করছেন, ‘জেডি নাকি মার্কো?’ এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুজন ব্যক্তি এ তথ্য জানিয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং রিপাবলিকান কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে পঞ্চম সপ্তাহে ইরান-আমেরিকা সামরিক অভিযানের ফলাফল, ২০২৮ সালের নির্বাচনী দৌড়ে এই দুই ব্যক্তির অবস্থান নির্ধারণ করে দিতে পারে। যদি যুদ্ধটি আমেরিকার অনুকূলে দ্রুত শেষ হয়, তবে তা রুবিওর অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। রুবিও বর্তমানে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করছেন এবং তাকে সঙ্কটের সময়ে একজন দক্ষ নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখা হতে পারে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ভ্যান্স যুক্তি দেওয়ার সুযোগ পাবেন, তিনি ট্রাম্পের মূল সমর্থকদের যুদ্ধবিরোধী মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।

স্বয়ং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও এখন পরীক্ষার মুখে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধের প্রতি ব্যাপক অসন্তোষের কারণে গত সপ্তাহে সম্পন্ন হওয়া একটি রয়টার্স/ইপসোস জরিপে দেখা গেছে, হোয়াইট হাউসে ফেরার পর তার জনসমর্থন সর্বনিম্ন ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

কিছু রিপাবলিকান নেতা লক্ষ্য করছেন, ইরান সংকট চলাকালীন ট্রাম্প এই দুই জ্যেষ্ঠ সহকারীর মধ্যে কাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। অনেকে মনে করছেন ট্রাম্প রুবিওর দিকে ঝুঁকে আছেন, তবে তারা এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে ট্রাম্প দ্রুত তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন।

হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ এক রিপাবলিকান বলেন, “সবাই রুবিওর প্রতি ট্রাম্পের ইতিবাচক অঙ্গভঙ্গি লক্ষ্য করছে, যা ভ্যান্সের ক্ষেত্রে তেমন দেখা যাচ্ছে না।”

তবে হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের কোনো বিশেষ পছন্দের বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী

৪১ বছর বয়সী ভ্যান্স একজন সাবেক মেরিন সেনা। তিনি ইরাকে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি যুদ্ধে আমেরিকার জড়ানোর বিরুদ্ধে কথা বলে আসছেন। ইরানের বিষয়ে তার জনসম্মুখের মন্তব্যগুলো ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন যে এই যুদ্ধের বিষয়ে তাদের মধ্যে ‘দার্শনিক মতপার্থক্য’ রয়েছে।

এক সময় নিজেকে ট্রাম্প-বিরোধী দাবি করা ভ্যান্স ২০২৩ সালে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের (২০১৭-২০২১) সেরা পররাষ্ট্রনীতি ছিল কোনো নতুন যুদ্ধ শুরু না করা।

হোয়াইট হাউস প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের মধ্যে কোনো ধরনের ফাটলের কথা অস্বীকার করেছে। চলতি মাসের শুরুতে ওভাল অফিসে ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে ভ্যান্স বলেছিলেন, তিনি ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতিকে সমর্থন করেন এবং ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয় বলে একমত পোষণ করেন।

ভ্যান্সের ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের মতে, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার যদি আলোচনায় যথেষ্ট অগ্রগতি করতে পারেন, তবে ভ্যান্স সেখানে আরও সরাসরি ভূমিকা পালন করতে পারেন।

ভ্যান্সের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আমেরিকাকে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করার এই কার্যকর দলের অংশ হতে পেরে গর্বিত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জ্যেষ্ঠ হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প তার সহকর্মীদের আদর্শিক ভিন্নতা মেনে নেন যতক্ষণ তারা অনুগত থাকেন। তিনি আরও জানান, ভ্যান্সের সংশয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি ট্রাম্পকে তার ভোটারদের একটি বড় অংশের মনোভাব বুঝতে সাহায্য করেছে।

রয়টার্সকে এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ভ্যান্স ২০২৮ সালে নির্বাচন করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন।

অন্যদিকে ৫৪ বছর বয়সী রুবিও জানিয়েছেন, ভ্যান্স যদি নির্বাচনে দাঁড়ান তবে তিনি লড়বেন না। রুবিওর ঘনিষ্ঠরা বলছেন, তিনি ভ্যান্সের রানিং মেট (ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী) হতেও আগ্রহী।

তবে ভ্যান্সের জনপ্রিয়তায় কোনো ঘাটতি দেখা দিলে রুবিও বা অন্য রিপাবলিকানরা মাঠে নামার সুযোগ পাবেন। রিপাবলিকান কৌশলী রন বনজিয়ান বলেন, “ট্রাম্পের স্মৃতিশক্তি প্রখর। আনুগত্যের অভাবের জন্য তিনি ভ্যান্সকে দায়ী করতে পারেন। যদি ট্রাম্প ম্যাগাস সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয় থাকেন, তবে তার সমর্থন না পাওয়াটা ভ্যান্সের জন্য ক্ষতির কারণ হবে।”

ট্রাম্প নিজেও ভ্যান্স এবং রুবিওর একসাথে নির্বাচন করার ধারণাটি সামনে এনেছেন এবং বলেছেন এই জুটি অপরাজিত হতে পারে।

মার্চের এক রয়টার্স/ইপসোস জরিপ অনুযায়ী, ৭৯ শতাংশ রিপাবলিকান ভ্যান্সের প্রতি ইতিবাচক এবং রুবিওর প্রতি ৭১ শতাংশ ইতিবাচক মনোভাব রাখেন।

মতপার্থক্য যখন প্রকাশ্যে

এর আগে গত বৃহস্পতিবারের এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে রুবিও এবং ভ্যান্সের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রুবিও ইরানের ওপর ট্রাম্পের হামলার জোরালো সমর্থন দিয়ে বলেন, “প্রেসিডেন্ট এ ধরনের বিপদ বজায় থাকতে দেবেন না।”

অন্যদিকে ভ্যান্স ছিলেন অনেক বেশি পরিমিত। তিনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে দূরে রাখার বিকল্প উপায়গুলোর ওপর জোর দেন এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নিয়োজিত মার্কিন সেনাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তার বক্তব্য শেষ করেন।

সম্পর্কিত