চরচা ডেস্ক

‘রফিক পছন্দ’ আমের নাম শুনেছেন বা খেয়েছেন কখনো? কিংবা ‘বদরুদ্দোজা’ আমের স্বাদ নিয়েছেন কখনো? এমন বাহারি নাম ও স্বাদের আম রয়েছে বাংলাদেশে। জাতীয় ফল না হলেও আমাদের দেশে আমের জনপ্রিয়তা অনেক। গ্রীষ্মকালীন এই ফলটি যেমন মিষ্টি, তেমন রসালো।
বাংলাদেশের মোটামুটি সব এলাকাতেই আমগাছ জন্মায়। সাধারণত বসতবাড়ির আঙিনায় এই গাছ রোপণ করা হয়।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, বাংলাদেশের আম মূলত দুই ধরনের— উন্নত বা অভিজাত জাত এবং স্থানীয় জাত। উন্নত জাতের আম সাধারণত জোড়কলমসহ বিভিন্ন অঙ্গজ পদ্ধতিতে বংশবিস্তার করা হয়, অন্যদিকে স্থানীয় জাতের আম বীজ থেকে উৎপন্ন চারা দিয়ে বিস্তার লাভ করে। স্থানীয় এসব আম ‘দেশি’ বা ‘গুটি আম’ নামে পরিচিত। এদের নির্দিষ্ট কোনো নাম থাকে না এবং স্বাদের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা দেখা যায়।
নিচে বাংলাদেশের কয়েকটি বাহারি আমের জাতের পরিচয় দেওয়া হলো-
গোপালভোগ
প্রচলিত ভালো জাতের আমের মধ্যে বাজারে প্রথম যে আম পাওয়া যায়, তা হল গোপালভোগ। অত্যন্ত সুস্বাদু হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় এই জাতের আম।
আম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুনের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে গোপালভোগ আম পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সব জেলাতেই এর চাষ হলেও বৃহত্তর রাজশাহী এলাকা গোপালভোগ আমের জন্য বেশি প্রসিদ্ধ।
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আব্দুল আলীম বিবিসিকে বলেন, “আমের জন্য যেমন আবহাওয়া উপযুক্ত, তা রাজশাহীতে বিদ্যমান। পুষ্পায়নের জন্য শুষ্ক ও ঠাণ্ডা আবহাওয়া লাগে। আর পরিপক্কতার জন্য শুষ্ক ও গরম আবহাওয়া লাগে। এটা এই এলাকায় আছে। তাই এখানকার আম বেশি সুস্বাদু।”
খিরসাপাত
খিরসাপাত আম উৎপাদনের জন্য রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চল বিশেষভাবে পরিচিত। আম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, এই জাতের আম সাধারণত মে মাসের শেষ দিকে কিংবা জুনের প্রথম সপ্তাহে বাজারে আসে।
আকারে তুলনামূলক বড় ও গোলাকৃতির এই আমের গায়ে হালকা দাগ দেখা যায়। পাকার পর বোঁটার চারপাশে হলুদ আভা ফুটে ওঠে, যা এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

মিষ্টি স্বাদ ও মনোমুগ্ধকর সুবাসের কারণে খিরসাপাত আমপ্রেমীদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত খিরসাপাত।
বিবিসি বলছে, এই খিরসাপাত আমকেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘হিমসাগর’ নামে বাজারজাত করা হয়।
এ প্রসঙ্গে ড. আলীমের ভাষ্য, হিমসাগর আসলে একটি পৃথক জাতের আম। রাজশাহীতে আসলে হিমসাগর আমের চাষ হয় না, বাজারেও এটি মূলত পাওয়া যায় না।
রফিক পছন্দ
আমের জাতগুলোর মধ্যে বেশ বৈচিত্রপূর্ণ এই নাম। সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এটি একটি দেশীয় গুটি জাতের আম। ব্যক্তি বিশেষের পছন্দ অনুযায়ী এর নামকরণ করা হয়েছে। সাধারণত চাঁপাইনবাবগঞ্জে এই জাতের আম চাষ করতে দেখা যায়। তবে এটি সারাদেশেই চাষযোগ্য।
আম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, জুন মাসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে এই আম সংগ্রহ করা হয় এবং এর সংরক্ষণ ক্ষমতা বেশি। প্রায় ৭ থেকে ৯ দিন এই আম সংরক্ষণ করা যায়।
রাজভোগ
সরকারি তথ্যমতে, এটিও একটি দেশীয় গুটি জাতের আম। এই আম উচ্চ ফলনশীল ও অত্যন্ত সুস্বাদু। এটি মধ্য মৌসুমি জাতের আম। রাজশাহীতে এই আমের উৎপাদন হয়।
আম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত রাজভোগ আম সংগ্রহ করা হয়। প্রায় ৪ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত এটি সংরক্ষণ করা যায়।
ল্যাংড়া
ল্যাংড়া আম পছন্দ নয়, এমন কাউকে মনে হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না আমাদের দেশে। বিবিসি বলছে, কথিত আছে, বেনারসের ল্যাংড়া ফকিরের নামে এর এমন নামকরণ হয়েছে। সেজন্য ল্যাংড়া আমকে ভারতে ‘বানারসী আম’ হিসেবে ডাকা হয়।
আম ক্যালেন্ডার ২০২৪ অনুযায়ী, ১০ জুন থেকে এই আম সংগ্রহ করা শুরু হবে। অন্য জাতের আমের চেয়ে এই ল্যাংড়া আম চেনা অনেকটাই সহজ। কারণ এই আমে এক ধরনের ঝাঁঝ থাকে, যা এটিকে আলাদা করে। সেই সঙ্গে এটি দেখতে গোলাকার এবং এর খোসা পাতলা ও মসৃণ।
আম্রপালি
শিক্ষক বাতায়নের তথ্যমতে, আম্রপালি একটি হাইব্রিড জাতের আম। এটি মূলত দশেরী ও নিলম নামের দুটি আমের একটি হাইব্রিড নাবি জাতের আম। ১৯৭১ সালে ভারতীয় কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ড. পিযুষ কান্তি মজুমদার পরীক্ষাগারে তৈরি করেন আম্রপালি।

এই জাতের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। উন্নত জাতের আম এক গাছে এক বছর ফলে, পরের বছর ফলে না। কিন্তু আম্রপালি প্রতিবছর ফলে। এর মিষ্টতার পরিমাণ ল্যাংড়া বা হিমসাগরের চেয়ে বেশি। আম গাছটির গঠন ছোট। গাছে ছোট আকারের আমের গুচ্ছ ধরতে দেখা যায়। আমের রং কমলা-লাল এবং এই গাছের জীবনকাল সংক্ষিপ্ত।
রানী পছন্দ
বৈশিষ্ট্য ও আকারের দিক থেকে গোপালভোগের কাছাকাছি ধরনের আরেকটি আম হল রানী পছন্দ। এটির গায়েও হলুদ দাগ আছে। কিন্তু আকারের দিক থেকে এটি গোপালভোগ আমের চেয়েও ছোট ও গোলাকার।
ড. আলীম বিবিসিকে বলেন, “গোপালভোগ ও রানী পছন্দ একসাথে রাখলে চেনা কঠিন হয়ে যায়। তাই অনেকেই গোপালভোগের সাথে রানী পছন্দ মিশিয়ে বিক্রি করে।”
এই আম চেনার উপায় হল, এতেও কোনো আঁশ নেই, খোসা পাতলা, আমের বোঁটা শক্ত এবং খোসা গোপালভোগের চেয়ে তুলনামূলক মসৃণ।
হাড়িভাঙ্গা
শিক্ষক বাতায়নের তথ্যমতে, বিশ্ববিখ্যাত এ হাড়িভাঙ্গা আমের উৎপত্তি রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়ন থেকে। নফল উদ্দিন পাইকার ছিলেন একজন বৃক্ষবিলাসী মানুষ। তিনি তার মালদিয়া আমগাছের নিচে মাটির হাঁড়ির ফিল্টার বানিয়ে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। একদিন রাতে হঠাৎ এই ফিল্টারটি ভেঙে যায়। কে বা কারা করেছে, তার কোন হদিস মেলেনি।
গাছটির সুস্বাদু আমগুলো বিক্রির সময় বাজারে লোকেরা প্রায়ই আমগুলোর ব্যাপারে জানতে চাইতো। নফল উদ্দিন ঠিক এইভাবেই বলতেন যে, যে গাছের নিচের হাড়ি ভেঙেছে, এগুলো সেই গাছের আম। এই কথা লোকমুখে ছড়াতে ছড়াতে মালদিয়া আমের নাম হয়ে যায় হাড়িভাঙ্গা।
এই আমের গাছ লম্বায় বাড়ার চেয়ে পাশে বেশি বিস্তৃত হয়। তাই ঝড়েও গাছটি উপড়ে পড়েনা, আর আমও কম ঝরে। জুনের ২০ তারিখের পর থেকে গাছে পাকা হাড়িভাঙ্গা দেখা যেতে শুরু করে।
বদরুদ্দোজা
বাংলাদেশে পাওয়া যায় এমন আরেকটি বৈচিত্র্যপূর্ণ নামের আমের জাত হলো বদরুদ্দোজা। এটি একটি স্থানীয় গুটি জাতের আম। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলায় এই আম পাওয়া যায়। তবে বাণিজ্যিকভাবে এই আম তেমন চাষ করতে দেখা যায় না।
আম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে এই আম সংগ্রহ করা হয়। এই জাতের আমের সংরক্ষণ ক্ষমতা মধ্যম, ৪ থেকে ৫ দিন।
আশ্বিনা
মৌসুমের শেষ আম হল আশ্বিনা আম। জুলাইয়ের ১০ তারিখ থেকে এটি সংগ্রহ করা শুরু হবে এবং আগস্ট পর্যন্ত বাজারে এই আম পাওয়া যায়। তবে এই আম দেখে চিহ্নিত করা বেশ কঠিন। কারণ আশ্বিনা আম আকারে বেশ বড় হওয়ায় অনেকেই এটিকে ফজলি আমের সাথে মিলিয়ে ফেলেন।
শিক্ষক বাতায়নের তথ্যমতে, আশ্বিনা আম দেখতে একটু বেশি সবুজ। এটি সাধারণত হলুদ হয় না। এছাড়া, এই আম পেটের দিক থেকে একটু মোটা। এছাড়া, আশ্বিনা আমের খোসা অনেকটা মোটা এবং এর স্বাদ বেশ টক-মিষ্টি।

ফজলি
ফজলি আমের রঙ হলুদ হয় এবং আকারে লম্বা ধরনের হয়। ফজলি আম যখন বাজারে আসা শুরু করে, তখন আর অন্য আম খুব একটা বাজারে থাকে না।
আম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, এটি জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে আসে। এই আম আকারে বেশ বড় হলেও ল্যাংড়া বা গোপালভোগ আমের মতো মিষ্টি না। এর আকার এত বড় যে মাত্র একটি বা দুটি আমেও এক কেজি হয়।
শিক্ষক বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী, এই আমের আঁশ অনেক বেশি। কিন্তু স্বাদে এটি বেশ মিষ্টি।
কথিত আছে, ফজলি বিবি নামক এক বৃদ্ধার নাম অনুসারে এর নাম ফজলি রাখা হয়। কারণ এটিও ওই আঁটি আমের মতো। ফজলি বিবির বাড়িতে এই গাছ প্রথম দেখা যায়।
বারি আম-২ বা লক্ষণভোগ
এই আম চেনার একমাত্র উপায় হল, এটির গায়ে এক ধরনের নাক আছে। এই আম যখন পাকে, তখন এটি হলদে রঙ ধারণ করে। এই আমের মিষ্টতা অনেকটা কম হওয়ায় অনেকে এটি ডায়াবেটিস আমও বলে। লখনা আম নামেও পরিচিত এই আমের খোসা কিছুটা মোটা, তবে আঁটি পাতলা।
কাটিমন
কাটিমন আম আসলে থাইল্যান্ড থেকে আনা একটি বারোমাসি আমের প্রজাতি। একে সুইট কাটিমনও বলে। এই আম বছরে তিনবার ফলন দেয়। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে এই আমের চাষ বাড়ছে। এর স্বাদ ভালো, বেশ মিষ্টি হয় এবং এই আমে কোনো আঁশ থাকে না।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাটিমন আমগাছে ফেব্রুয়ারি, মে ও নভেম্বর মাসে মুকুল আসে এবং মার্চ-এপ্রিল, মে-জুন ও জুলাই-অগাস্ট মাসে আম পাকে। তবে মে থেকে জুন মাস পর্যন্ত দেশীয় নানা জাতের আম থাকার কারণে ফেব্রুয়ারি মাসে মুকুল ভেঙ্গে দেয়া হয়।
বাংলাদেশের নানা স্বাদের, বৈচিত্র্যময় নামের এবং ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের আমের এক সমৃদ্ধ ভান্ডার রয়েছে। সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিক চাহিদা, হাইব্রিড প্রযুক্তি ও নতুন জাতের আগমন যেমন বাড়ছে, তেমনি স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী আমের জাত সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সঠিক পরিচিতি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের আম দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

‘রফিক পছন্দ’ আমের নাম শুনেছেন বা খেয়েছেন কখনো? কিংবা ‘বদরুদ্দোজা’ আমের স্বাদ নিয়েছেন কখনো? এমন বাহারি নাম ও স্বাদের আম রয়েছে বাংলাদেশে। জাতীয় ফল না হলেও আমাদের দেশে আমের জনপ্রিয়তা অনেক। গ্রীষ্মকালীন এই ফলটি যেমন মিষ্টি, তেমন রসালো।
বাংলাদেশের মোটামুটি সব এলাকাতেই আমগাছ জন্মায়। সাধারণত বসতবাড়ির আঙিনায় এই গাছ রোপণ করা হয়।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, বাংলাদেশের আম মূলত দুই ধরনের— উন্নত বা অভিজাত জাত এবং স্থানীয় জাত। উন্নত জাতের আম সাধারণত জোড়কলমসহ বিভিন্ন অঙ্গজ পদ্ধতিতে বংশবিস্তার করা হয়, অন্যদিকে স্থানীয় জাতের আম বীজ থেকে উৎপন্ন চারা দিয়ে বিস্তার লাভ করে। স্থানীয় এসব আম ‘দেশি’ বা ‘গুটি আম’ নামে পরিচিত। এদের নির্দিষ্ট কোনো নাম থাকে না এবং স্বাদের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা দেখা যায়।
নিচে বাংলাদেশের কয়েকটি বাহারি আমের জাতের পরিচয় দেওয়া হলো-
গোপালভোগ
প্রচলিত ভালো জাতের আমের মধ্যে বাজারে প্রথম যে আম পাওয়া যায়, তা হল গোপালভোগ। অত্যন্ত সুস্বাদু হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় এই জাতের আম।
আম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুনের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে গোপালভোগ আম পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সব জেলাতেই এর চাষ হলেও বৃহত্তর রাজশাহী এলাকা গোপালভোগ আমের জন্য বেশি প্রসিদ্ধ।
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আব্দুল আলীম বিবিসিকে বলেন, “আমের জন্য যেমন আবহাওয়া উপযুক্ত, তা রাজশাহীতে বিদ্যমান। পুষ্পায়নের জন্য শুষ্ক ও ঠাণ্ডা আবহাওয়া লাগে। আর পরিপক্কতার জন্য শুষ্ক ও গরম আবহাওয়া লাগে। এটা এই এলাকায় আছে। তাই এখানকার আম বেশি সুস্বাদু।”
খিরসাপাত
খিরসাপাত আম উৎপাদনের জন্য রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চল বিশেষভাবে পরিচিত। আম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, এই জাতের আম সাধারণত মে মাসের শেষ দিকে কিংবা জুনের প্রথম সপ্তাহে বাজারে আসে।
আকারে তুলনামূলক বড় ও গোলাকৃতির এই আমের গায়ে হালকা দাগ দেখা যায়। পাকার পর বোঁটার চারপাশে হলুদ আভা ফুটে ওঠে, যা এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

মিষ্টি স্বাদ ও মনোমুগ্ধকর সুবাসের কারণে খিরসাপাত আমপ্রেমীদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত খিরসাপাত।
বিবিসি বলছে, এই খিরসাপাত আমকেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘হিমসাগর’ নামে বাজারজাত করা হয়।
এ প্রসঙ্গে ড. আলীমের ভাষ্য, হিমসাগর আসলে একটি পৃথক জাতের আম। রাজশাহীতে আসলে হিমসাগর আমের চাষ হয় না, বাজারেও এটি মূলত পাওয়া যায় না।
রফিক পছন্দ
আমের জাতগুলোর মধ্যে বেশ বৈচিত্রপূর্ণ এই নাম। সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এটি একটি দেশীয় গুটি জাতের আম। ব্যক্তি বিশেষের পছন্দ অনুযায়ী এর নামকরণ করা হয়েছে। সাধারণত চাঁপাইনবাবগঞ্জে এই জাতের আম চাষ করতে দেখা যায়। তবে এটি সারাদেশেই চাষযোগ্য।
আম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, জুন মাসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে এই আম সংগ্রহ করা হয় এবং এর সংরক্ষণ ক্ষমতা বেশি। প্রায় ৭ থেকে ৯ দিন এই আম সংরক্ষণ করা যায়।
রাজভোগ
সরকারি তথ্যমতে, এটিও একটি দেশীয় গুটি জাতের আম। এই আম উচ্চ ফলনশীল ও অত্যন্ত সুস্বাদু। এটি মধ্য মৌসুমি জাতের আম। রাজশাহীতে এই আমের উৎপাদন হয়।
আম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত রাজভোগ আম সংগ্রহ করা হয়। প্রায় ৪ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত এটি সংরক্ষণ করা যায়।
ল্যাংড়া
ল্যাংড়া আম পছন্দ নয়, এমন কাউকে মনে হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না আমাদের দেশে। বিবিসি বলছে, কথিত আছে, বেনারসের ল্যাংড়া ফকিরের নামে এর এমন নামকরণ হয়েছে। সেজন্য ল্যাংড়া আমকে ভারতে ‘বানারসী আম’ হিসেবে ডাকা হয়।
আম ক্যালেন্ডার ২০২৪ অনুযায়ী, ১০ জুন থেকে এই আম সংগ্রহ করা শুরু হবে। অন্য জাতের আমের চেয়ে এই ল্যাংড়া আম চেনা অনেকটাই সহজ। কারণ এই আমে এক ধরনের ঝাঁঝ থাকে, যা এটিকে আলাদা করে। সেই সঙ্গে এটি দেখতে গোলাকার এবং এর খোসা পাতলা ও মসৃণ।
আম্রপালি
শিক্ষক বাতায়নের তথ্যমতে, আম্রপালি একটি হাইব্রিড জাতের আম। এটি মূলত দশেরী ও নিলম নামের দুটি আমের একটি হাইব্রিড নাবি জাতের আম। ১৯৭১ সালে ভারতীয় কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ড. পিযুষ কান্তি মজুমদার পরীক্ষাগারে তৈরি করেন আম্রপালি।

এই জাতের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। উন্নত জাতের আম এক গাছে এক বছর ফলে, পরের বছর ফলে না। কিন্তু আম্রপালি প্রতিবছর ফলে। এর মিষ্টতার পরিমাণ ল্যাংড়া বা হিমসাগরের চেয়ে বেশি। আম গাছটির গঠন ছোট। গাছে ছোট আকারের আমের গুচ্ছ ধরতে দেখা যায়। আমের রং কমলা-লাল এবং এই গাছের জীবনকাল সংক্ষিপ্ত।
রানী পছন্দ
বৈশিষ্ট্য ও আকারের দিক থেকে গোপালভোগের কাছাকাছি ধরনের আরেকটি আম হল রানী পছন্দ। এটির গায়েও হলুদ দাগ আছে। কিন্তু আকারের দিক থেকে এটি গোপালভোগ আমের চেয়েও ছোট ও গোলাকার।
ড. আলীম বিবিসিকে বলেন, “গোপালভোগ ও রানী পছন্দ একসাথে রাখলে চেনা কঠিন হয়ে যায়। তাই অনেকেই গোপালভোগের সাথে রানী পছন্দ মিশিয়ে বিক্রি করে।”
এই আম চেনার উপায় হল, এতেও কোনো আঁশ নেই, খোসা পাতলা, আমের বোঁটা শক্ত এবং খোসা গোপালভোগের চেয়ে তুলনামূলক মসৃণ।
হাড়িভাঙ্গা
শিক্ষক বাতায়নের তথ্যমতে, বিশ্ববিখ্যাত এ হাড়িভাঙ্গা আমের উৎপত্তি রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়ন থেকে। নফল উদ্দিন পাইকার ছিলেন একজন বৃক্ষবিলাসী মানুষ। তিনি তার মালদিয়া আমগাছের নিচে মাটির হাঁড়ির ফিল্টার বানিয়ে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। একদিন রাতে হঠাৎ এই ফিল্টারটি ভেঙে যায়। কে বা কারা করেছে, তার কোন হদিস মেলেনি।
গাছটির সুস্বাদু আমগুলো বিক্রির সময় বাজারে লোকেরা প্রায়ই আমগুলোর ব্যাপারে জানতে চাইতো। নফল উদ্দিন ঠিক এইভাবেই বলতেন যে, যে গাছের নিচের হাড়ি ভেঙেছে, এগুলো সেই গাছের আম। এই কথা লোকমুখে ছড়াতে ছড়াতে মালদিয়া আমের নাম হয়ে যায় হাড়িভাঙ্গা।
এই আমের গাছ লম্বায় বাড়ার চেয়ে পাশে বেশি বিস্তৃত হয়। তাই ঝড়েও গাছটি উপড়ে পড়েনা, আর আমও কম ঝরে। জুনের ২০ তারিখের পর থেকে গাছে পাকা হাড়িভাঙ্গা দেখা যেতে শুরু করে।
বদরুদ্দোজা
বাংলাদেশে পাওয়া যায় এমন আরেকটি বৈচিত্র্যপূর্ণ নামের আমের জাত হলো বদরুদ্দোজা। এটি একটি স্থানীয় গুটি জাতের আম। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলায় এই আম পাওয়া যায়। তবে বাণিজ্যিকভাবে এই আম তেমন চাষ করতে দেখা যায় না।
আম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে এই আম সংগ্রহ করা হয়। এই জাতের আমের সংরক্ষণ ক্ষমতা মধ্যম, ৪ থেকে ৫ দিন।
আশ্বিনা
মৌসুমের শেষ আম হল আশ্বিনা আম। জুলাইয়ের ১০ তারিখ থেকে এটি সংগ্রহ করা শুরু হবে এবং আগস্ট পর্যন্ত বাজারে এই আম পাওয়া যায়। তবে এই আম দেখে চিহ্নিত করা বেশ কঠিন। কারণ আশ্বিনা আম আকারে বেশ বড় হওয়ায় অনেকেই এটিকে ফজলি আমের সাথে মিলিয়ে ফেলেন।
শিক্ষক বাতায়নের তথ্যমতে, আশ্বিনা আম দেখতে একটু বেশি সবুজ। এটি সাধারণত হলুদ হয় না। এছাড়া, এই আম পেটের দিক থেকে একটু মোটা। এছাড়া, আশ্বিনা আমের খোসা অনেকটা মোটা এবং এর স্বাদ বেশ টক-মিষ্টি।

ফজলি
ফজলি আমের রঙ হলুদ হয় এবং আকারে লম্বা ধরনের হয়। ফজলি আম যখন বাজারে আসা শুরু করে, তখন আর অন্য আম খুব একটা বাজারে থাকে না।
আম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, এটি জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে আসে। এই আম আকারে বেশ বড় হলেও ল্যাংড়া বা গোপালভোগ আমের মতো মিষ্টি না। এর আকার এত বড় যে মাত্র একটি বা দুটি আমেও এক কেজি হয়।
শিক্ষক বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী, এই আমের আঁশ অনেক বেশি। কিন্তু স্বাদে এটি বেশ মিষ্টি।
কথিত আছে, ফজলি বিবি নামক এক বৃদ্ধার নাম অনুসারে এর নাম ফজলি রাখা হয়। কারণ এটিও ওই আঁটি আমের মতো। ফজলি বিবির বাড়িতে এই গাছ প্রথম দেখা যায়।
বারি আম-২ বা লক্ষণভোগ
এই আম চেনার একমাত্র উপায় হল, এটির গায়ে এক ধরনের নাক আছে। এই আম যখন পাকে, তখন এটি হলদে রঙ ধারণ করে। এই আমের মিষ্টতা অনেকটা কম হওয়ায় অনেকে এটি ডায়াবেটিস আমও বলে। লখনা আম নামেও পরিচিত এই আমের খোসা কিছুটা মোটা, তবে আঁটি পাতলা।
কাটিমন
কাটিমন আম আসলে থাইল্যান্ড থেকে আনা একটি বারোমাসি আমের প্রজাতি। একে সুইট কাটিমনও বলে। এই আম বছরে তিনবার ফলন দেয়। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে এই আমের চাষ বাড়ছে। এর স্বাদ ভালো, বেশ মিষ্টি হয় এবং এই আমে কোনো আঁশ থাকে না।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাটিমন আমগাছে ফেব্রুয়ারি, মে ও নভেম্বর মাসে মুকুল আসে এবং মার্চ-এপ্রিল, মে-জুন ও জুলাই-অগাস্ট মাসে আম পাকে। তবে মে থেকে জুন মাস পর্যন্ত দেশীয় নানা জাতের আম থাকার কারণে ফেব্রুয়ারি মাসে মুকুল ভেঙ্গে দেয়া হয়।
বাংলাদেশের নানা স্বাদের, বৈচিত্র্যময় নামের এবং ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের আমের এক সমৃদ্ধ ভান্ডার রয়েছে। সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিক চাহিদা, হাইব্রিড প্রযুক্তি ও নতুন জাতের আগমন যেমন বাড়ছে, তেমনি স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী আমের জাত সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সঠিক পরিচিতি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের আম দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।