চরচা ডেস্ক

প্রতিদিন রাত ৮টার পর ফয়সাল খান তুরাগের নিশাত নগরের ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজে তার হোস্টেলের ছোট ঘরটিতে নিজেকে বন্দী করে ফেলেন। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলে তিনি খোলার আগে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়ান এবং পরিচিত কণ্ঠস্বর কি না তা বোঝার জন্য সাবধানে শোনার চেষ্টা করেন।
ক্যাম্পাসের বাইরে তিনি একটু ভিড় বেশি চায়ের দোকান বা বাজার এড়িয়ে চলেন। তিনি সাবলীলভাবে বাংলা বলতে পারেন না, আর তিনি জানেন তার বাচনভঙ্গি তাকে ভারতীয় হিসেবে চিনিয়ে দিতে পারে। ভারতীয় এই পরিচয় তিনি ইদানিং আড়াল করতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।
২০২৪ সালের এপ্রিলে ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের নুহে নিজ বাড়ি থেকে বাংলাদেশে আসেন ফয়সাল। কারণ তিনি ভারতে সরকারি মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পাননি। সেসময় ঢাকা তাকে বেশ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। তিনি সহপাঠীদের সঙ্গে বাইরে যেতেন, রেস্তোরাঁয় খেতেন এবং ছুটির দিনে কলেজের বাইরে ঘুরতে যেতেন।
ফয়সাল বলেন, ‘‘ওই ঘোরাঘুরিগুলো পড়াশোনার চাপ কমাতে সাহায্য করত।’’ কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়, তখন তার রুটিন বদলে যায়। বাইরের পরিবেশ আর নিরাপদ নয়—এমন আশঙ্কায় তিনি নিজেকে ছোট কামরায় বন্দী করে ফেলেন।
কলেজ কর্তৃপক্ষও তাকে এবং অন্যান্য ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসের ভেতরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিল। সেই থেকে পরিস্থিতি একই রকম রয়ে গেছে। ফয়সাল জানান, তিনি এখন এক প্রকার বন্দী বোধ করছেন। যে শহরটিকে একসময় তার দ্বিতীয় বাড়ি মনে হতো, সেটি আর তাকে নিরাপদ বোধ দিচ্ছে না।
শেখ হাসিনা দিল্লিতে নির্বাসিত হওয়ার ১৬ মাস পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব তুঙ্গে। দেশটির বিভিন্ন কলেজে অধ্যয়নরত ৯ হাজারেরও বেশি ভারতীয় মেডিকেল শিক্ষার্থীর একজন এই ফয়সাল।
আল জাজিজার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ঢাকার একটি ট্রাইব্যুনাল জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। এ বিচারকার্যে অনুপস্থিত ছিলেন শেখ হাসিনা। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত এখন পর্যন্ত হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে রাজি হয়নি, যা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে দিল্লি-বিরোধী মনোভাব আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ভারতীয় শিক্ষার্থীদের মতে, এই জনরোষ তাদের নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার পর যা তাদের পুরো সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ১৯ ডিসেম্বর ঢাকার ১৬ কিলোমিটার দূরে ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের এক ভারতীয় শিক্ষার্থীর ওপর দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়। আক্রমণকারীরা ওই শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন এবং মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। এই ঘটনাটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে এবং ভিডিওটি দ্রুত শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এটি ভারতীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি করে। ফলে অনেকে ভিড় এড়িয়ে চলতে শুরু করেন এবং নিরাপত্তার খাতিরে বাইরে যাওয়া কমিয়ে দেন।

বৈভব নামে এক ভারতীয় শিক্ষার্থী বলেন, ‘‘পুরো শিক্ষার্থী সমাজ আতঙ্কিত।’’ বৈভব ২০১৯ সালে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন এবং বর্তমানে সেখানে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করছেন। তিনি নিরাপত্তার খাতিরে তার পুরো নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘আমরা প্রতিদিন আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকি।’’
বৈভব জানান, আগে তিনি এবং তার বন্ধুরা কোনো দ্বিধা বা ভয় ছাড়াই ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী শহরগুলোর প্রায় প্রতিটি এলাকা ঘুরে দেখতেন। এখন সেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ আর নেই।
বৈভব এখন খুব কমই বাইরে বের হন, স্থানীয় বাজার এবং ভিড় এড়িয়ে চলেন। এমনকি হাসপাতালের ভেতরে রোগীদের সাথে কথা বলার সময়ও তিনি বেশ সতর্ক থাকেন।
বৈভব নিজের ভারতীয় পরিচয় গোপন রাখেন। তিনি বলেন, ‘‘এখন জনসম্মুখে কিছু বলার আগে আমি দুবার ভাবি, কারণ একটি ভুল শব্দ আপনাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে।’’
রাজনীতিতে কখনোই বৈভবের আগ্রহ ছিল না, কিন্তু এখন পরিস্থিতি বুঝতে তিনি প্রতিনিয়ত সংবাদের দিকে নজর রাখেন। তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘প্রতি রাতে আমরা অনিশ্চয়তা নিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করি যে, পরের দিনটি আমাদের জন্য কী নিয়ে আসবে।’’
বৈভবের চাওয়া ইন্টার্নশিপ যেন কোনরকমে শেষ হয়, কারণ তিনি এখন শুধু বাড়ি ফেরার মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করছেন।
ভারতে প্রতি বছর অন্তত ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী সরকারি মেডিকেল কলেজে পড়ার জন্য আবেদন করেন। দেশটিতে সরকারি মেডিকেলে আসন সংখ্যা ৬০ হাজারেরও কম। ভারতে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ গুলোতেও রয়েছে ৫০ হাজার আসন। এর অর্থ, প্রতি ২০ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৯ জনই মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পান না। আর ভারতের বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর সমস্যা উচ্চ ফি। পুরো কোর্সের জন্য ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৬ হাজার ডলারের মতো খরচ করতে হয়। এটি ফয়সাল খানের মতো শিক্ষার্থীদের নাগালের বাইরে। কারণ তার বাবা একজন সরকারি কর্মচারী।
এর পরিবর্তে পরিবারটি বাংলাদেশের পথ বেছে নিয়েছিল, যেখানে বেসরকারি মেডিকেল প্রোগ্রামগুলো তুলনামূলক সাশ্রয়ী এবং পুরো কোর্সের খরচ ৩৮ হাজার থেকে ৫৫ হাজার ডলারের মধ্যে। এটি নিশ্চিত করতে ফয়সাল খানকেও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। তার বাবা ছেলেকে কলেজে ভর্তি করাতে তার জীবনের প্রায় সব সঞ্চয় ব্যয় করেছেন।
ফয়সাল খানের মতে, ২০২৪ সালের শুরুতে যখন তিনি আসেন তখন বাংলাদেশে জীবন স্থিতিশীল ছিল। তবে হাসিনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘‘তখন আমি আমরা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করতে শুরু করলাম। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম বাড়ি ফিরে যেতে।’’
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে বাংলাদেশ নিরাপত্তা বাহিনী যখন বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেয় এবং ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন ফয়সাল খান ব্যক্তিগতভাবে টিকিট কাটতে ঢাকা বিমানবন্দরে যান। তিনি বলেন, ‘‘আমি বিমানবন্দরে দুই রাত কাটিয়েছি। সব ফ্লাইট পূর্ণ ছিল।’’ দুই দিন পর অবশেষে তিনি কলকাতায় যেতে সক্ষম হন।
ভারতে কয়েক মাস থাকার পর অক্টোবরে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ততদিনে সব কিছু বদলে গেছে বলে তিনি জানান; ক্লাস ব্যাহত হচ্ছিল, পরীক্ষা পিছিয়ে যাচ্ছিল এবং নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছিল। তিনি বলেন, ‘‘মনে হচ্ছিল, সব কিছু পুরোপুরি বদলে গেছে।’’
বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার ফয়সাল মাহমুদ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তার দেশের সরকার নজরদারি বাড়িয়েছে। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘‘জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং নাগরিক ও বিদেশি উভয়ের সুরক্ষায় সর্বোচ্চ সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর কাছে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।’’

ভারতীয় শিক্ষার্থীরা আরেকটি ধাক্কা খায় গত ১৫ ডিসেম্বর। সেদিন ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম পরিচিত নেতা শরিফ ওসমান হাদিকে একদল মোটরসাইকেল আরোহী হত্যা করে। হাদি ভারতবিরোধী অবস্থান নেওয়ার জন্য পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, হাদির হত্যাকারীরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে।
এই হত্যাকাণ্ডের পর এক হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে এবং ভারতের কিছু কূটনৈতিক মিশনের বাইরে ব্যাপক বিক্ষোভের কারণে দেশটিকে সাময়িকভাবে ভিসা পরিষেবাও বন্ধ করে দিতে হয়েছে। একজন ভারতীয় হিন্দু হিসেবে বৈভব জানান, তিনি বাংলাদেশের অনিরাপদ বোধ করছেন।
হাসিনার পতন পরবর্তী সময়ের একটি ভাইভা পরীক্ষার কথা উল্লেখ করে বৈভব জানান, যখন পরীক্ষক জানতে পারলেন তিনি কোথা থেকে এসেছেন এবং তার ধর্ম কী, তখন তার সুর পুরোপুরি বদলে যায় এবং তিনি অত্যন্ত রূঢ় আচরণ শুরু করেন।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষা গোষ্ঠীগুলো বলছে, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুদের ওপর হামলা বেড়েছে। গত ১২ বছরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কিছু নীতি, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে মুসলিম বিদ্বেষী হিসেবে সমালোচিত হয়েছে। এগুলো নিয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তবে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার জোর দিয়ে বলছে যে, হিন্দুদের ওপর এসব হামলা ধর্মীয় কারণে নয় বরং রাজনৈতিক কারণে ঘটেছে; কারণ ঐতিহ্যগতভাবে অনেক বাংলাদেশি হিন্দু আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে থাকেন।
তবুও খান এবং বৈভবের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাদেশে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া কোনো বিকল্প নয়। বৈভব বলেন, ‘‘আমরা অনেক বেশি টাকা এবং সময় ব্যয় করে ফেলেছি।’’ তিনি উভয় সরকারকে হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘‘আমরা প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে বাস করছি। রাতগুলো নির্ঘুম কাটছে। এটি একটি দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।’’
বাংলাদেশ হাইকমিশনার ফয়সাল মাহমুদ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে অবনতি হয়নি যা মানুষের জীবন, বিশেষ করে বিদেশি নাগরিকদের জন্য হুমকি হতে পারে। তিনি যোগ করেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং অপরাধের মাত্রা ২০১৪ সালের আগের সময়ের মতোই স্বাভাবিক। নির্বাচনের আগে অতিরিক্ত কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে অল ইন্ডিয়া মেডিকেল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএমএস) সভাপতি জিতেন্দ্র সিং জানান, তাদের সংস্থা বাংলাদেশে অধ্যয়নরত ভারতীয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শত শত ই-মেইল পেয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আতঙ্কিত ও ভীত।
এআইএমএস এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে চিঠি লিখেছে এবং ভারতীয় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছে। তারা সরকারকে অনুরোধ করেছে, নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে প্রয়োজনে যেন শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
জম্মু-কাশ্মীরের বাসিন্দা এবং ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জানান, তিনি ২০১৮ সালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং ২০২৪ সালের মধ্যে তার স্নাতক শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনের কারণে তা থমকে গেছে।
মোহাম্মদ বলেন, ‘‘আমরা এখনও এখানে আটকে আছি, যদিও এতদিনে আমাদের ডিগ্রি শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।’’ বৈভবের মতো মোহাম্মদও তার পুরো নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন, কারণ তিনি কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রতিহিংসার ভয় পাচ্ছেন।

প্রতিদিন রাত ৮টার পর ফয়সাল খান তুরাগের নিশাত নগরের ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজে তার হোস্টেলের ছোট ঘরটিতে নিজেকে বন্দী করে ফেলেন। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলে তিনি খোলার আগে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়ান এবং পরিচিত কণ্ঠস্বর কি না তা বোঝার জন্য সাবধানে শোনার চেষ্টা করেন।
ক্যাম্পাসের বাইরে তিনি একটু ভিড় বেশি চায়ের দোকান বা বাজার এড়িয়ে চলেন। তিনি সাবলীলভাবে বাংলা বলতে পারেন না, আর তিনি জানেন তার বাচনভঙ্গি তাকে ভারতীয় হিসেবে চিনিয়ে দিতে পারে। ভারতীয় এই পরিচয় তিনি ইদানিং আড়াল করতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।
২০২৪ সালের এপ্রিলে ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের নুহে নিজ বাড়ি থেকে বাংলাদেশে আসেন ফয়সাল। কারণ তিনি ভারতে সরকারি মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পাননি। সেসময় ঢাকা তাকে বেশ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। তিনি সহপাঠীদের সঙ্গে বাইরে যেতেন, রেস্তোরাঁয় খেতেন এবং ছুটির দিনে কলেজের বাইরে ঘুরতে যেতেন।
ফয়সাল বলেন, ‘‘ওই ঘোরাঘুরিগুলো পড়াশোনার চাপ কমাতে সাহায্য করত।’’ কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়, তখন তার রুটিন বদলে যায়। বাইরের পরিবেশ আর নিরাপদ নয়—এমন আশঙ্কায় তিনি নিজেকে ছোট কামরায় বন্দী করে ফেলেন।
কলেজ কর্তৃপক্ষও তাকে এবং অন্যান্য ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসের ভেতরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিল। সেই থেকে পরিস্থিতি একই রকম রয়ে গেছে। ফয়সাল জানান, তিনি এখন এক প্রকার বন্দী বোধ করছেন। যে শহরটিকে একসময় তার দ্বিতীয় বাড়ি মনে হতো, সেটি আর তাকে নিরাপদ বোধ দিচ্ছে না।
শেখ হাসিনা দিল্লিতে নির্বাসিত হওয়ার ১৬ মাস পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব তুঙ্গে। দেশটির বিভিন্ন কলেজে অধ্যয়নরত ৯ হাজারেরও বেশি ভারতীয় মেডিকেল শিক্ষার্থীর একজন এই ফয়সাল।
আল জাজিজার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ঢাকার একটি ট্রাইব্যুনাল জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। এ বিচারকার্যে অনুপস্থিত ছিলেন শেখ হাসিনা। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত এখন পর্যন্ত হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে রাজি হয়নি, যা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে দিল্লি-বিরোধী মনোভাব আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ভারতীয় শিক্ষার্থীদের মতে, এই জনরোষ তাদের নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার পর যা তাদের পুরো সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ১৯ ডিসেম্বর ঢাকার ১৬ কিলোমিটার দূরে ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের এক ভারতীয় শিক্ষার্থীর ওপর দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়। আক্রমণকারীরা ওই শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন এবং মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। এই ঘটনাটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে এবং ভিডিওটি দ্রুত শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এটি ভারতীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি করে। ফলে অনেকে ভিড় এড়িয়ে চলতে শুরু করেন এবং নিরাপত্তার খাতিরে বাইরে যাওয়া কমিয়ে দেন।

বৈভব নামে এক ভারতীয় শিক্ষার্থী বলেন, ‘‘পুরো শিক্ষার্থী সমাজ আতঙ্কিত।’’ বৈভব ২০১৯ সালে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন এবং বর্তমানে সেখানে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করছেন। তিনি নিরাপত্তার খাতিরে তার পুরো নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘আমরা প্রতিদিন আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকি।’’
বৈভব জানান, আগে তিনি এবং তার বন্ধুরা কোনো দ্বিধা বা ভয় ছাড়াই ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী শহরগুলোর প্রায় প্রতিটি এলাকা ঘুরে দেখতেন। এখন সেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ আর নেই।
বৈভব এখন খুব কমই বাইরে বের হন, স্থানীয় বাজার এবং ভিড় এড়িয়ে চলেন। এমনকি হাসপাতালের ভেতরে রোগীদের সাথে কথা বলার সময়ও তিনি বেশ সতর্ক থাকেন।
বৈভব নিজের ভারতীয় পরিচয় গোপন রাখেন। তিনি বলেন, ‘‘এখন জনসম্মুখে কিছু বলার আগে আমি দুবার ভাবি, কারণ একটি ভুল শব্দ আপনাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে।’’
রাজনীতিতে কখনোই বৈভবের আগ্রহ ছিল না, কিন্তু এখন পরিস্থিতি বুঝতে তিনি প্রতিনিয়ত সংবাদের দিকে নজর রাখেন। তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘প্রতি রাতে আমরা অনিশ্চয়তা নিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করি যে, পরের দিনটি আমাদের জন্য কী নিয়ে আসবে।’’
বৈভবের চাওয়া ইন্টার্নশিপ যেন কোনরকমে শেষ হয়, কারণ তিনি এখন শুধু বাড়ি ফেরার মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করছেন।
ভারতে প্রতি বছর অন্তত ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী সরকারি মেডিকেল কলেজে পড়ার জন্য আবেদন করেন। দেশটিতে সরকারি মেডিকেলে আসন সংখ্যা ৬০ হাজারেরও কম। ভারতে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ গুলোতেও রয়েছে ৫০ হাজার আসন। এর অর্থ, প্রতি ২০ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৯ জনই মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পান না। আর ভারতের বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর সমস্যা উচ্চ ফি। পুরো কোর্সের জন্য ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৬ হাজার ডলারের মতো খরচ করতে হয়। এটি ফয়সাল খানের মতো শিক্ষার্থীদের নাগালের বাইরে। কারণ তার বাবা একজন সরকারি কর্মচারী।
এর পরিবর্তে পরিবারটি বাংলাদেশের পথ বেছে নিয়েছিল, যেখানে বেসরকারি মেডিকেল প্রোগ্রামগুলো তুলনামূলক সাশ্রয়ী এবং পুরো কোর্সের খরচ ৩৮ হাজার থেকে ৫৫ হাজার ডলারের মধ্যে। এটি নিশ্চিত করতে ফয়সাল খানকেও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। তার বাবা ছেলেকে কলেজে ভর্তি করাতে তার জীবনের প্রায় সব সঞ্চয় ব্যয় করেছেন।
ফয়সাল খানের মতে, ২০২৪ সালের শুরুতে যখন তিনি আসেন তখন বাংলাদেশে জীবন স্থিতিশীল ছিল। তবে হাসিনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘‘তখন আমি আমরা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করতে শুরু করলাম। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম বাড়ি ফিরে যেতে।’’
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে বাংলাদেশ নিরাপত্তা বাহিনী যখন বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেয় এবং ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন ফয়সাল খান ব্যক্তিগতভাবে টিকিট কাটতে ঢাকা বিমানবন্দরে যান। তিনি বলেন, ‘‘আমি বিমানবন্দরে দুই রাত কাটিয়েছি। সব ফ্লাইট পূর্ণ ছিল।’’ দুই দিন পর অবশেষে তিনি কলকাতায় যেতে সক্ষম হন।
ভারতে কয়েক মাস থাকার পর অক্টোবরে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ততদিনে সব কিছু বদলে গেছে বলে তিনি জানান; ক্লাস ব্যাহত হচ্ছিল, পরীক্ষা পিছিয়ে যাচ্ছিল এবং নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছিল। তিনি বলেন, ‘‘মনে হচ্ছিল, সব কিছু পুরোপুরি বদলে গেছে।’’
বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার ফয়সাল মাহমুদ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তার দেশের সরকার নজরদারি বাড়িয়েছে। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘‘জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং নাগরিক ও বিদেশি উভয়ের সুরক্ষায় সর্বোচ্চ সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর কাছে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।’’

ভারতীয় শিক্ষার্থীরা আরেকটি ধাক্কা খায় গত ১৫ ডিসেম্বর। সেদিন ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম পরিচিত নেতা শরিফ ওসমান হাদিকে একদল মোটরসাইকেল আরোহী হত্যা করে। হাদি ভারতবিরোধী অবস্থান নেওয়ার জন্য পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, হাদির হত্যাকারীরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে।
এই হত্যাকাণ্ডের পর এক হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে এবং ভারতের কিছু কূটনৈতিক মিশনের বাইরে ব্যাপক বিক্ষোভের কারণে দেশটিকে সাময়িকভাবে ভিসা পরিষেবাও বন্ধ করে দিতে হয়েছে। একজন ভারতীয় হিন্দু হিসেবে বৈভব জানান, তিনি বাংলাদেশের অনিরাপদ বোধ করছেন।
হাসিনার পতন পরবর্তী সময়ের একটি ভাইভা পরীক্ষার কথা উল্লেখ করে বৈভব জানান, যখন পরীক্ষক জানতে পারলেন তিনি কোথা থেকে এসেছেন এবং তার ধর্ম কী, তখন তার সুর পুরোপুরি বদলে যায় এবং তিনি অত্যন্ত রূঢ় আচরণ শুরু করেন।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষা গোষ্ঠীগুলো বলছে, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুদের ওপর হামলা বেড়েছে। গত ১২ বছরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কিছু নীতি, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে মুসলিম বিদ্বেষী হিসেবে সমালোচিত হয়েছে। এগুলো নিয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তবে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার জোর দিয়ে বলছে যে, হিন্দুদের ওপর এসব হামলা ধর্মীয় কারণে নয় বরং রাজনৈতিক কারণে ঘটেছে; কারণ ঐতিহ্যগতভাবে অনেক বাংলাদেশি হিন্দু আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে থাকেন।
তবুও খান এবং বৈভবের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাদেশে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া কোনো বিকল্প নয়। বৈভব বলেন, ‘‘আমরা অনেক বেশি টাকা এবং সময় ব্যয় করে ফেলেছি।’’ তিনি উভয় সরকারকে হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘‘আমরা প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে বাস করছি। রাতগুলো নির্ঘুম কাটছে। এটি একটি দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।’’
বাংলাদেশ হাইকমিশনার ফয়সাল মাহমুদ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে অবনতি হয়নি যা মানুষের জীবন, বিশেষ করে বিদেশি নাগরিকদের জন্য হুমকি হতে পারে। তিনি যোগ করেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং অপরাধের মাত্রা ২০১৪ সালের আগের সময়ের মতোই স্বাভাবিক। নির্বাচনের আগে অতিরিক্ত কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে অল ইন্ডিয়া মেডিকেল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএমএস) সভাপতি জিতেন্দ্র সিং জানান, তাদের সংস্থা বাংলাদেশে অধ্যয়নরত ভারতীয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শত শত ই-মেইল পেয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আতঙ্কিত ও ভীত।
এআইএমএস এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে চিঠি লিখেছে এবং ভারতীয় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছে। তারা সরকারকে অনুরোধ করেছে, নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে প্রয়োজনে যেন শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
জম্মু-কাশ্মীরের বাসিন্দা এবং ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জানান, তিনি ২০১৮ সালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং ২০২৪ সালের মধ্যে তার স্নাতক শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনের কারণে তা থমকে গেছে।
মোহাম্মদ বলেন, ‘‘আমরা এখনও এখানে আটকে আছি, যদিও এতদিনে আমাদের ডিগ্রি শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।’’ বৈভবের মতো মোহাম্মদও তার পুরো নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন, কারণ তিনি কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রতিহিংসার ভয় পাচ্ছেন।

যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল কাল বাফুফে ভবনে আইসিসির নিরাপত্তা বিশ্লেষক দলের একটি চিঠির কথা উল্লেখ করে বলেছেন, টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের মাটিতে খেলতে যাওয়ার কোনো পরিবেশ নেই বাংলাদেশের জন্য। তিনি নির্দিষ্ট করেই বলেছেন, আইসিসির নিরাপত্তা বিশ্লেষক দল মোস্তাফিজুর রহমানের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলেছ

ফরাসি বিপ্লব বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। ১৭৮৯ সালে সংগঠিত এই বিপ্লব আকস্মিক কোনো কারণে ঘটেনি। সেই সময় ফ্রান্সের অর্থনীতি যেভাবে পরিচালিত হচ্ছিল, তার সঙ্গে দেশের জনগণের কোনো যোগ ছিল না। সরকার ছিল গভীর ঋণে জর্জরিত এবং করের হার ছিল অত্যন্ত বেশি। ফ্রান্সের অর্থনীতির এই দুরবস্থার পেছনে