জাপানের সবচেয়ে পশ্চিমের দ্বীপ ইয়োনাগুনি এখন বিশ্ব রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ছোট্ট এই দ্বীপটি তাইওয়ানের মাত্র ১১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আর এই অবস্থানগত গুরুত্বের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান এখানেই গড়ে তুলছে একটি অঘোষিত সামরিক প্রস্তুতির ঘাঁটি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীন–তাইওয়ান উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে এই দ্বীপটিকেই সামনে রেখে তৈরি হচ্ছে সম্ভাব্য যুদ্ধের পরিকল্পনা।
হংকংভিত্তিক ইংরেজি সংবাদ মাধ্যম এশিয়া টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব বলা হয়েছে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই ইয়োনাগুনিতেিআমেরিকান মেরিন বাহিনীর উপস্থিতি দৃশ্যমান। একের পর এক সামরিক জাহাজ ভিড়েছে কুবুরা বন্দরে। নামানো হয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জাম, জরুরি উদ্ধার উপকরণ, কন্টেইনার ভর্তি যন্ত্রাংশ এবং সামরিক সরঞ্জাম ।
আমেরিকার দাবি, এগুলো কেবল মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দ্বীপের রানওয়ে, বন্দর এবং অন্যান্য অবকাঠামো যুদ্ধকালীন সরবরাহের জন্য দ্রুত উপযোগী করে তোলা হচ্ছে ।
অক্টোবর মাসে ইয়োনাগুনিতে প্রথমবারের মতো স্থাপন করা হয় ফরোয়ার্ড আর্মিং অ্যান্ড রিফুয়েলিং পয়েন্ট (এফএআরপি)। যার মাধ্যমে হেলিকপ্টার ও সামরিক বিমানে দ্রুত জ্বালানি ও অস্ত্র সরবরাহ সম্ভব। এই সময় আমেরিকান সিএইচ–৫৩ই ভারী পরিবহন হেলিকপ্টার দ্বীপটিতে নামে-যা জাপানের এত দক্ষিণ-পশ্চিমে এই প্রথম। এ বিষয়টি পরিষ্কার করে দেয় যে, এখানে কেবল প্রশিক্ষণ নয়, যুদ্ধ প্রস্তুতির কাঠামো গড়ে উঠছে।
ইয়োনাগুনির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এখানেই শেষ নয়। এটি চীনের তথাকথিত ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’ এর একেবারে সামনে অবস্থিত। চীনের যুদ্ধজাহাজগুলো প্রশান্ত মহাসাগরে যেতে গেলে এই এলাকার মধ্য দিয়েই যায়। ফলে এখানে আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র বসানো হলে চীনের নৌবাহিনী বড় চাপে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইয়োনাগুনিতে মোতায়েন করা হতে পারে এনএমইএসআইএস নামের একটি আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। এই ক্ষেপণাস্ত্র ১৮৫ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এবং সমুদ্রপথে যুদ্ধজাহাজ ধ্বংসে কার্যকর। যদি এটি স্থাপন করা হয়, তাহলে চীনের যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের চলাচল কার্যত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসবে।
তবে সামরিক এই শক্ত অবস্থানের বিপরীত পাশে রয়েছে বড় দুর্বলতা। ইয়োনাগুনি দ্বীপের আয়তন মাত্র ২৮ বর্গকিলোমিটার। ভারী ট্যাংক, বড় সেনাঘাঁটি কিংবা বিস্তৃত রাডার নেটওয়ার্ক বসানোর জন্য এই দ্বীপ আদর্শ নয়। এখানে মাত্র একটি বিমানবন্দর রয়েছে, যা সহজেই চীনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ধরনের হামলা হলে বিমান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে কয়েক সপ্তাহের জন্য।
চীনের সাবমেরিন বহর ইয়োনাগুনির জন্য বড় হুমকিগুলোর অন্যতম একটি। আমেরিকার প্রতিরক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী, চীনের কাছে বর্তমানে অন্তত ৪৮টি প্রচলিত সাবমেরিন রয়েছে এবং নতুন সাবমেরিন উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। যদি যুদ্ধ বাঁধে, তাহলে চীন পানির নিচ থেকে বড় ধরনের হামলা চালিয়ে এই দ্বীপ অকার্যকর করে দিতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে দ্বীপটি যেমন আমেরিকা–জাপানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি, তেমনি সম্ভাব্য যুদ্ধে সবচেয়ে আগে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার ঝুঁকি বহন করছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে এটি টিকে থাকতে পারবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-ইয়োনাগুনি এখন আর শুধু একটি দ্বীপ নয়, এটি পরিণত হয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় শক্তির লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান এটিকে প্রতিরক্ষা বলয় হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে চীন এটিকে স্পষ্ট উসকানি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইয়োনাগুনি এখন একদিকে তাইওয়ান রক্ষার জন্য আমেরিকা–জাপানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি, অন্যদিকে চীনের হামলার প্রথম নিশানা হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। এই দ্বীপকে ঘিরে যে সামরিক শক্তি প্রদর্শন শুরু হয়েছে, তা এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে যুদ্ধের আশঙ্কাকে আরও দৃশ্যমান করে তুলছে।