ইয়াসির আরাফাত

ফরাসি বিপ্লব বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। ১৭৮৯ সালে সংগঠিত এই বিপ্লব আকস্মিক কোনো কারণে ঘটেনি। সেই সময় ফ্রান্সের অর্থনীতি যেভাবে পরিচালিত হচ্ছিল, তার সঙ্গে দেশের জনগণের কোনো যোগ ছিল না। সরকার ছিল গভীর ঋণে জর্জরিত এবং করের হার ছিল অত্যন্ত বেশি। ফ্রান্সের অর্থনীতির এই দুরবস্থার পেছনে ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকের একটি ঘটনা।
ঘটনার শুরু ১৭১৫ সালে। রাজা চতুর্দশ লুইয়ের মৃত্যু হলে সিংহাসনে বসেন পঞ্চদশ লুই। কিন্তু পঞ্চদশ লুই তখন ছিলেন মাত্র পাঁচ বছরের শিশু। তখন কার্যত দেশ পরিচালনা করত কয়েকজন রাজপ্রতিনিধি, যাদের বলা হতো রিজেন্ট। এই রিজেন্টদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন ডিউক অব অরলিয়েন্স, যিনি ছিলেন রাজা চতুর্দশ লুইয়ের ভ্রাতুষ্পুত্র। এই ডিউক অব অরলিয়েন্সের সঙ্গে সদ্ভাবের কারণে ফ্রান্সের কন্ট্রোলার জেনারেল অব ফিন্যান্স পদে নিয়োগ পান জন ল, যিনি ‘মিসিসিপি বাবল’ কাণ্ডের জন্য কুখ্যাত হয়ে আছেন।
জন ল (১৬৭১–১৭২৯) একজন স্কটিশ অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক উদ্যোক্তা। এডিনবরায় জন্ম হলেও পড়াশোনা করেছেন লন্ডনে। লন্ডনে থাকাকালে নারী ও জুয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। একটি মামলায় জড়িয়ে পড়লে তিনি ১৭১৪ সালে পালিয়ে ফ্রান্সে চলে যান। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ায় তিনি ১৭১৬ সালে ফরাসি সরকারকে রাজি করান একটি ব্যাংক খোলার অনুমতি দিতে। জন ল এই ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নেন। এই ব্যাংক ফরাসি জনগণের সামনে নিয়ে আসে নতুন একটি ধারণা–কাগুজে মুদ্রা। এর আগে ফরাসিরা স্বর্ণ ও রৌপ্যের মাধ্যমে বিনিময় করত। ল মনে করেছিলেন, কাগজের মুদ্রা বাজারে অর্থের পরিমাণ বাড়াবে এবং এর ফলে বাণিজ্যে জোয়ার আসবে।

১৭১৭ সালের আগস্ট মাসে জন ল অক্সিডেন্ট কোম্পানি (Company of the West) প্রতিষ্ঠা করেন। এই কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি উপত্যকার নিম্নাংশে উপনিবেশ স্থাপনের লক্ষ্যে নিউ অরলিয়েন্স নামের শহর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। এই অঞ্চলের বিস্তৃতি তখন ব্যাপক ছিল। এখনকার লুইজিয়ানা প্রদেশ থেকে শুরু করে কানাডা পর্যন্ত প্রায় ৩০০০ মাইল। এর মধ্যে বর্তমানের লুইজিয়ানা, মিসিসিপি, আরকানসাস, মিসৌরি, ইলিনয়, আইওয়া, উইসকনসিন ও মিনেসোটা অঙ্গরাজ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। মিসিসিপি নদীর মোহনায় এই উপনিবেশ স্থাপিত হওয়ায় লোকমুখে এই কোম্পানির নাম ছড়িয়ে পড়ে মিসিসিপি কোম্পানি।
ফরাসি সরকার মিসিসিপি কোম্পানিকে অবাধ স্বাধীনতা প্রদান করে। ২৫ বছরের জন্য এই কোম্পানিকে এই অঞ্চলে বাণিজ্যের অধিকার দেওয়া হয়। মিসিসিপি কোম্পানির প্রাথমিক কার্যক্রম ছিল খুব সহজ। জন ল নগদ অর্থ ও সরকারি বন্ডের বিনিময়ে কোম্পানির শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা করেন। কিন্তু প্রথমদিকে তেমন কেউ এই কোম্পানির শেয়ার কিনতে আগ্রহী ছিলেন না। আসলে ডোবা ও অ্যালিগেটর প্রজাতির কুমির বাদে সেই সময় মিসিসিপি উপত্যকার নিম্নাংশে তেমন আকর্ষণীয় কিছুই ছিল না। তখন কোম্পানি একটি চতুর সিদ্ধান্ত নেয়। মিসিসিপি কোম্পানি সেখানকার আশ্চর্যজনক ধনসম্পদ এবং অফুরন্ত সম্ভাবনার গুজব ছড়ায়। যেমন: কয়লা, মূল্যবান ধাতু–সোনা, রুপা, মূল্যবান পশুপাখির চামড়া ইত্যাদি পাওয়া সম্ভব।
স্বর্ণ ও রৌপ্যের লোভ ফরাসি অভিজাত, বুর্জোয়া, ব্যবসায়ী ও বহু বিনিয়োগকারীকে আকৃষ্ট করে। এরপর মিসিসিপি কোম্পানির শেয়ারের মূল্য দ্রুত বেড়ে যায়। তখন ফরাসি মুদ্রার নাম ছিল লিভ। ১৭১৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারিত হয় ৫০০ লিভ। ১ আগস্ট শেয়ার বেচাকেনা হয় ২৭৫০ লিভ করে। ৩০ আগস্ট দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৪১০০ লিভ এবং ৪ সেপ্টেম্বর দাম ৫০০০ লিভে উঠে যায়। ডিসেম্বর মাসে মিসিসিপি কোম্পানির একেকটি শেয়ারের দাম ১০ হাজার লিভের কোটা ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ, এক বছরের মধ্যে শেয়ারের দাম প্রায় ১৯০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
ফ্রান্স তো বটেই, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে বিনিয়োগকারীরা এই নতুন বাজারে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গোটা প্যারিসজুড়ে যেন উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ তাদের সহায়সম্পত্তি বিক্রি করে অথবা বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে মিসিসিপির শেয়ার কিনতে শুরু করে। সবাই মনে করছিল, তারা বুঝি খুব সহজেই বড়লোক হয়ে যাবে। প্যারিসের কিছু অঞ্চল এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, শৃঙ্খলা বজায় রাখতে মাঝে মাঝে সেইসব অঞ্চলে সৈন্য পাঠাতে হতো।

১৭২০ সালে শেয়ারের দাম পড়তে শুরু করে। কয়েকজন বিনিয়োগকারী তাদের লভ্যাংশ স্বর্ণমুদ্রায় রূপান্তর করতে চাইলে এই সমস্যা শুরু হয়। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পারছিলেন, শেয়ারের দাম পুরোপুরি অস্থিতিশীল। অনেকে শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ থাকতে থাকতে বিক্রি করে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ বলে বিবেচনা করলেন। শেয়ারের দাম হুহু করে কমতে কমতে একদম ধ্বসে পড়ে। ১৭২০ সালের শেষে মিসিসিপি শেয়ারের দাম ১০০০ লিভে নেমে যায়। ১৭২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে দাম দাঁড়ায় ৫০০ লিভ।
দামের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জন ল-এর পরামর্শে মিসিসিপি কোম্পানির শেয়ার কিনতে শুরু করে। কিন্তু একসময় খোদ ব্যাংকের অর্থ ফুরিয়ে আসে। এ অবস্থায় ব্যাংকের গভর্নর জন ল আরও ব্যাংক নোট ছাপানোর পরামর্শ দেন, যাতে আরও অতিরিক্ত পরিমাণে শেয়ার কেনা যায়। অর্থের জোগান হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতিও বাড়ে। বাজারে তরল অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ১৮৬ শতাংশ। ১৭২০ সালের জানুয়ারিতে ফ্রান্সের মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ২৩ শতাংশ, যা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। এভাবে দেশটির পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে একটা বুদ্বুদের ভেতরে বন্দী করে ফেলা হয়। রাষ্ট্রীয় কোষাগার একসময় শূন্য হয়ে পড়ে। ফলে জনগণের ভাগ্যে নেমে আসে দুর্ভোগ। বড় বড় ফাটকা খেলোয়াড়েরা সুযোগ বুঝে সময়মতো শেয়ারগুলো বেচে দিয়ে এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা তাদের সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসে পড়ে। অনেকে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। জন ল ফরাসি জনগণের শত্রুতে পরিণত হন এবং শেষ পর্যন্ত নারীর ছদ্মবেশে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
ফ্রান্সের অর্থনীতির এই উত্থান-পতন ইতিহাসে মিসিসিপি বাবল নামে পরিচিত। এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম অবিশ্বাস্য অর্থনৈতিক ধ্বস। ফরাসি রাজ্য কখনোই সেই আঘাত পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি। মিসিসিপি কোম্পানি যেভাবে এর রাজনৈতিক প্রভাবকে ব্যবহার করে শেয়ারের দামের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং এর মাধ্যমে জনগণের মধ্যে উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়েছিল, তাতে জনগণ ফ্রান্সের অর্থনীতি, আর একটু বৃহৎ অর্থে শাসন ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়। ঋণ সংগ্রহের চেষ্টায় রাজা পঞ্চদশ লুই নানাবিধ অসুবিধার সম্মুখীন হন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাগজের মুদ্রা বাতিল করে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যায়। ১৭৬৩ সালে ফ্রান্স মিসিসিপি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে মিসিসিপি নদীর পূর্ব দিকের লুইজিয়ানা ব্রিটেনকে এবং পশ্চিম দিকের নিউ অর্লিয়েন্স স্পেনকে দিয়ে দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন হওয়ার পর ১৮০৩ সালে প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন ফ্রান্সের কাছ থেকে লুইজিয়ানা প্রদেশ কিনে নেন।
১৭৮০ সালে ষোড়শ লুই সিংহাসনে আরোহণের পর টের পেলেন রাজ্যের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ এবং তিনি শীঘ্রই দেউলিয়া হওয়ার পথে। সমস্যার সমাধান খুঁজতে ষোড়শ লুই ফরাসি পার্লামেন্টের অধিবেশন আহ্বান করেন, যা ছিল তার আগের দেড় শ বছরের মধ্যে প্রথম। এই অধিবেশনের মাধ্যমেও কার্যকর সমাধান না আসায় সূচিত হয় ফরাসি বিপ্লবের।
‘মিসিসিপি বাবল’-এর সাথে ফরাসি বিপ্লবের সরাসরি সংযোগ না থাকলেও ফরাসি অর্থনীতির দুরবস্থা শুরু হয়েছিল এই সময় থেকে। অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপের এই আর্থিক কেলেঙ্কারির জন্য ফ্রান্সের রাজক্ষমতা বিশেষভাবে কুখ্যাত হয়ে আছে।
তথ্যসূত্র: ১. স্যাপিয়েন্স: মানবজাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, (২০১১), ইয়ুভাল নোয়াহ হারারি
২. John Law and the Mississippi Bubble: 1718-1720, October 2001, Jon Moen, Mississippi History Now

ফরাসি বিপ্লব বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। ১৭৮৯ সালে সংগঠিত এই বিপ্লব আকস্মিক কোনো কারণে ঘটেনি। সেই সময় ফ্রান্সের অর্থনীতি যেভাবে পরিচালিত হচ্ছিল, তার সঙ্গে দেশের জনগণের কোনো যোগ ছিল না। সরকার ছিল গভীর ঋণে জর্জরিত এবং করের হার ছিল অত্যন্ত বেশি। ফ্রান্সের অর্থনীতির এই দুরবস্থার পেছনে ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকের একটি ঘটনা।
ঘটনার শুরু ১৭১৫ সালে। রাজা চতুর্দশ লুইয়ের মৃত্যু হলে সিংহাসনে বসেন পঞ্চদশ লুই। কিন্তু পঞ্চদশ লুই তখন ছিলেন মাত্র পাঁচ বছরের শিশু। তখন কার্যত দেশ পরিচালনা করত কয়েকজন রাজপ্রতিনিধি, যাদের বলা হতো রিজেন্ট। এই রিজেন্টদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন ডিউক অব অরলিয়েন্স, যিনি ছিলেন রাজা চতুর্দশ লুইয়ের ভ্রাতুষ্পুত্র। এই ডিউক অব অরলিয়েন্সের সঙ্গে সদ্ভাবের কারণে ফ্রান্সের কন্ট্রোলার জেনারেল অব ফিন্যান্স পদে নিয়োগ পান জন ল, যিনি ‘মিসিসিপি বাবল’ কাণ্ডের জন্য কুখ্যাত হয়ে আছেন।
জন ল (১৬৭১–১৭২৯) একজন স্কটিশ অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক উদ্যোক্তা। এডিনবরায় জন্ম হলেও পড়াশোনা করেছেন লন্ডনে। লন্ডনে থাকাকালে নারী ও জুয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। একটি মামলায় জড়িয়ে পড়লে তিনি ১৭১৪ সালে পালিয়ে ফ্রান্সে চলে যান। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ায় তিনি ১৭১৬ সালে ফরাসি সরকারকে রাজি করান একটি ব্যাংক খোলার অনুমতি দিতে। জন ল এই ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নেন। এই ব্যাংক ফরাসি জনগণের সামনে নিয়ে আসে নতুন একটি ধারণা–কাগুজে মুদ্রা। এর আগে ফরাসিরা স্বর্ণ ও রৌপ্যের মাধ্যমে বিনিময় করত। ল মনে করেছিলেন, কাগজের মুদ্রা বাজারে অর্থের পরিমাণ বাড়াবে এবং এর ফলে বাণিজ্যে জোয়ার আসবে।

১৭১৭ সালের আগস্ট মাসে জন ল অক্সিডেন্ট কোম্পানি (Company of the West) প্রতিষ্ঠা করেন। এই কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি উপত্যকার নিম্নাংশে উপনিবেশ স্থাপনের লক্ষ্যে নিউ অরলিয়েন্স নামের শহর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। এই অঞ্চলের বিস্তৃতি তখন ব্যাপক ছিল। এখনকার লুইজিয়ানা প্রদেশ থেকে শুরু করে কানাডা পর্যন্ত প্রায় ৩০০০ মাইল। এর মধ্যে বর্তমানের লুইজিয়ানা, মিসিসিপি, আরকানসাস, মিসৌরি, ইলিনয়, আইওয়া, উইসকনসিন ও মিনেসোটা অঙ্গরাজ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। মিসিসিপি নদীর মোহনায় এই উপনিবেশ স্থাপিত হওয়ায় লোকমুখে এই কোম্পানির নাম ছড়িয়ে পড়ে মিসিসিপি কোম্পানি।
ফরাসি সরকার মিসিসিপি কোম্পানিকে অবাধ স্বাধীনতা প্রদান করে। ২৫ বছরের জন্য এই কোম্পানিকে এই অঞ্চলে বাণিজ্যের অধিকার দেওয়া হয়। মিসিসিপি কোম্পানির প্রাথমিক কার্যক্রম ছিল খুব সহজ। জন ল নগদ অর্থ ও সরকারি বন্ডের বিনিময়ে কোম্পানির শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা করেন। কিন্তু প্রথমদিকে তেমন কেউ এই কোম্পানির শেয়ার কিনতে আগ্রহী ছিলেন না। আসলে ডোবা ও অ্যালিগেটর প্রজাতির কুমির বাদে সেই সময় মিসিসিপি উপত্যকার নিম্নাংশে তেমন আকর্ষণীয় কিছুই ছিল না। তখন কোম্পানি একটি চতুর সিদ্ধান্ত নেয়। মিসিসিপি কোম্পানি সেখানকার আশ্চর্যজনক ধনসম্পদ এবং অফুরন্ত সম্ভাবনার গুজব ছড়ায়। যেমন: কয়লা, মূল্যবান ধাতু–সোনা, রুপা, মূল্যবান পশুপাখির চামড়া ইত্যাদি পাওয়া সম্ভব।
স্বর্ণ ও রৌপ্যের লোভ ফরাসি অভিজাত, বুর্জোয়া, ব্যবসায়ী ও বহু বিনিয়োগকারীকে আকৃষ্ট করে। এরপর মিসিসিপি কোম্পানির শেয়ারের মূল্য দ্রুত বেড়ে যায়। তখন ফরাসি মুদ্রার নাম ছিল লিভ। ১৭১৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারিত হয় ৫০০ লিভ। ১ আগস্ট শেয়ার বেচাকেনা হয় ২৭৫০ লিভ করে। ৩০ আগস্ট দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৪১০০ লিভ এবং ৪ সেপ্টেম্বর দাম ৫০০০ লিভে উঠে যায়। ডিসেম্বর মাসে মিসিসিপি কোম্পানির একেকটি শেয়ারের দাম ১০ হাজার লিভের কোটা ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ, এক বছরের মধ্যে শেয়ারের দাম প্রায় ১৯০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
ফ্রান্স তো বটেই, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে বিনিয়োগকারীরা এই নতুন বাজারে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গোটা প্যারিসজুড়ে যেন উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ তাদের সহায়সম্পত্তি বিক্রি করে অথবা বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে মিসিসিপির শেয়ার কিনতে শুরু করে। সবাই মনে করছিল, তারা বুঝি খুব সহজেই বড়লোক হয়ে যাবে। প্যারিসের কিছু অঞ্চল এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, শৃঙ্খলা বজায় রাখতে মাঝে মাঝে সেইসব অঞ্চলে সৈন্য পাঠাতে হতো।

১৭২০ সালে শেয়ারের দাম পড়তে শুরু করে। কয়েকজন বিনিয়োগকারী তাদের লভ্যাংশ স্বর্ণমুদ্রায় রূপান্তর করতে চাইলে এই সমস্যা শুরু হয়। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পারছিলেন, শেয়ারের দাম পুরোপুরি অস্থিতিশীল। অনেকে শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ থাকতে থাকতে বিক্রি করে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ বলে বিবেচনা করলেন। শেয়ারের দাম হুহু করে কমতে কমতে একদম ধ্বসে পড়ে। ১৭২০ সালের শেষে মিসিসিপি শেয়ারের দাম ১০০০ লিভে নেমে যায়। ১৭২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে দাম দাঁড়ায় ৫০০ লিভ।
দামের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জন ল-এর পরামর্শে মিসিসিপি কোম্পানির শেয়ার কিনতে শুরু করে। কিন্তু একসময় খোদ ব্যাংকের অর্থ ফুরিয়ে আসে। এ অবস্থায় ব্যাংকের গভর্নর জন ল আরও ব্যাংক নোট ছাপানোর পরামর্শ দেন, যাতে আরও অতিরিক্ত পরিমাণে শেয়ার কেনা যায়। অর্থের জোগান হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতিও বাড়ে। বাজারে তরল অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ১৮৬ শতাংশ। ১৭২০ সালের জানুয়ারিতে ফ্রান্সের মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ২৩ শতাংশ, যা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। এভাবে দেশটির পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে একটা বুদ্বুদের ভেতরে বন্দী করে ফেলা হয়। রাষ্ট্রীয় কোষাগার একসময় শূন্য হয়ে পড়ে। ফলে জনগণের ভাগ্যে নেমে আসে দুর্ভোগ। বড় বড় ফাটকা খেলোয়াড়েরা সুযোগ বুঝে সময়মতো শেয়ারগুলো বেচে দিয়ে এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা তাদের সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসে পড়ে। অনেকে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। জন ল ফরাসি জনগণের শত্রুতে পরিণত হন এবং শেষ পর্যন্ত নারীর ছদ্মবেশে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
ফ্রান্সের অর্থনীতির এই উত্থান-পতন ইতিহাসে মিসিসিপি বাবল নামে পরিচিত। এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম অবিশ্বাস্য অর্থনৈতিক ধ্বস। ফরাসি রাজ্য কখনোই সেই আঘাত পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি। মিসিসিপি কোম্পানি যেভাবে এর রাজনৈতিক প্রভাবকে ব্যবহার করে শেয়ারের দামের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং এর মাধ্যমে জনগণের মধ্যে উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়েছিল, তাতে জনগণ ফ্রান্সের অর্থনীতি, আর একটু বৃহৎ অর্থে শাসন ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়। ঋণ সংগ্রহের চেষ্টায় রাজা পঞ্চদশ লুই নানাবিধ অসুবিধার সম্মুখীন হন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাগজের মুদ্রা বাতিল করে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যায়। ১৭৬৩ সালে ফ্রান্স মিসিসিপি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে মিসিসিপি নদীর পূর্ব দিকের লুইজিয়ানা ব্রিটেনকে এবং পশ্চিম দিকের নিউ অর্লিয়েন্স স্পেনকে দিয়ে দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন হওয়ার পর ১৮০৩ সালে প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন ফ্রান্সের কাছ থেকে লুইজিয়ানা প্রদেশ কিনে নেন।
১৭৮০ সালে ষোড়শ লুই সিংহাসনে আরোহণের পর টের পেলেন রাজ্যের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ এবং তিনি শীঘ্রই দেউলিয়া হওয়ার পথে। সমস্যার সমাধান খুঁজতে ষোড়শ লুই ফরাসি পার্লামেন্টের অধিবেশন আহ্বান করেন, যা ছিল তার আগের দেড় শ বছরের মধ্যে প্রথম। এই অধিবেশনের মাধ্যমেও কার্যকর সমাধান না আসায় সূচিত হয় ফরাসি বিপ্লবের।
‘মিসিসিপি বাবল’-এর সাথে ফরাসি বিপ্লবের সরাসরি সংযোগ না থাকলেও ফরাসি অর্থনীতির দুরবস্থা শুরু হয়েছিল এই সময় থেকে। অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপের এই আর্থিক কেলেঙ্কারির জন্য ফ্রান্সের রাজক্ষমতা বিশেষভাবে কুখ্যাত হয়ে আছে।
তথ্যসূত্র: ১. স্যাপিয়েন্স: মানবজাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, (২০১১), ইয়ুভাল নোয়াহ হারারি
২. John Law and the Mississippi Bubble: 1718-1720, October 2001, Jon Moen, Mississippi History Now

যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল কাল বাফুফে ভবনে আইসিসির নিরাপত্তা বিশ্লেষক দলের একটি চিঠির কথা উল্লেখ করে বলেছেন, টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের মাটিতে খেলতে যাওয়ার কোনো পরিবেশ নেই বাংলাদেশের জন্য। তিনি নির্দিষ্ট করেই বলেছেন, আইসিসির নিরাপত্তা বিশ্লেষক দল মোস্তাফিজুর রহমানের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলেছ

ফরাসি বিপ্লব বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। ১৭৮৯ সালে সংগঠিত এই বিপ্লব আকস্মিক কোনো কারণে ঘটেনি। সেই সময় ফ্রান্সের অর্থনীতি যেভাবে পরিচালিত হচ্ছিল, তার সঙ্গে দেশের জনগণের কোনো যোগ ছিল না। সরকার ছিল গভীর ঋণে জর্জরিত এবং করের হার ছিল অত্যন্ত বেশি। ফ্রান্সের অর্থনীতির এই দুরবস্থার পেছনে