লিকুইড এয়ার এনার্জি স্টোরেজ কী? পেট্রোল–ডিজেলের বিকল্প কি এটি হবে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
পেট্রোল–ডিজেলের বিকল্প কি লিকুইড এয়ার এনার্জি স্টোরেজ?
ক্যারিংটনের এই প্ল্যান্টটি ৩০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা (MWh) বিদ্যুৎ সঞ্চয় করতে সক্ষম। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎশক্তির ব্যবহার বাড়ছে। তবে একটি প্রধান সমস্যা হলো অনিয়মিত বিদ্যুৎ উৎপাদন। সূর্য যখন থাকে না বা বাতাস প্রবাহিত হয় না, তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ থাকে। আবার, খুব বেশি বাতাস বা রোদ থাকলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতে পারে, যা গ্রিডের ক্ষতি করতে পারে।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয় করা জরুরি। যার ফলে প্রয়োজনের সময় বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। দীর্ঘদিন ধরে, পাম্পড হাইড্রো বা পাম্প-চালিত জলবিদ্যুৎই ছিল প্রধান সঞ্চয় ব্যবস্থা। ফলে বাড়তি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পানিকে পাহাড়ের উপরে পাম্প করে একটি বাধের পিছনে জমা করা হয়। প্রয়োজন হলে, সেই পানি ছেড়ে দিয়ে টারবাইন ঘোরানোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরি করা হয়।

লিকুইড এয়ার এনার্জি স্টোরেজ নামক একটি প্রযুক্তি, যা প্রায় ৫০ বছর ধরে উপেক্ষিত ছিল; আগামী বছর থেকৈ বাণিজ্যিকভাবে চালু হতে চলেছে। এর লক্ষ্য হলো গ্রিড-স্কেল লিথিয়াম ব্যাটারি এবং জলবিদ্যুতকে নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর করা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানো। ব্রিটিশ সংবাদ-সংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে বিষটি তুলে ধরা হয়।

ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমের ক্যারিংটন গ্রামের পাশে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক-স্কেল তরল বায়ু শক্তি সঞ্চয় কেন্দ্রটি তৈরি হচ্ছে। হাইভিউ পাওয়ার নামের একটি সংস্থা ২০ বছর ধরে এই প্রযুক্তির উন্নয়ন করছে।

প্রযুক্তিটিতে আশপাশের বাতাস নেওয়া হয় এবং পরিষ্কার করা হয়। এরপর বাতাসকে বারবার সংকোচন করা হয়, যতক্ষণ না এটি খুব উচ্চ চাপে পৌছায়। এরপর মাল্টি-স্ট্রিম হিট এক্সচেঞ্জারের মাধ্যমে বাতাসকে এত বেশি ঠান্ডা করা হয় যে এটি তরল হয়ে যায়। এই পুরো প্রক্রিয়ার শক্তি গ্রিড থেকে নেওয়া হয়। যখন গ্রিডে অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হয়, তখন এই তরল বাতাসকে স্টোরেজ ট্যাঙ্ক থেকে পাম্প করে বের করা হয় এবং বাষ্পীভূত করে আবার গ্যাসে পরিণত করা হয়। এই গ্যাস তখন টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে, যা গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। এরপর বাতাসকে বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এই প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য কিছু শক্তি-সাশ্রয়ী কৌশল ব্যবহার করা হয়। যেমন, বাতাসকে সংকুচিত করার সময় যে তাপ উৎপন্ন হয়, তা তরল বাতাসকে পুনরায় গ্যাসে পরিণত করার কাজে ব্যবহার করা হয়। তাপ পুনরুদ্ধারের এই চক্রগুলির মাধ্যমে প্রক্রিয়াটির কার্যকারিতা ৫০% থেকে বাড়িয়ে ৬০%-৭০% এর কাছাকাছি নিয়ে আসা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ক্যারিংটনের এই প্ল্যান্টটি ৩০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সঞ্চয় করতে সক্ষম হবে, যা প্রায় চার লাখ ৮০ হাজার বাড়ির জন্য স্বল্প সময়ের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পারে। এটি ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে গ্রিডকে স্থিতিশীল করতে কাজ শুরু করবে এবং ২০২৭ সালে সম্পূর্ণ সঞ্চয় ব্যবস্থা চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (এমআইটি) রাসায়নিক প্রকৌশলী শাইলিন সেটেজেন একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার কম থাকলে লায়েস এর জন্য অর্থনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। প্রথম বছরগুলিতে স্টোরেজ সুবিধাগুলি পর্যাপ্ত অর্থ উপার্জন করতে পারে না, কারণ বিদ্যুৎ মূল্যের অস্থিরতা যথেষ্ট থাকে না। তবে, তিনি জোর দিয়ে বলেন, এর মানে এই নয় যে প্রযুক্তিটি খারাপ। বরং, সরকার যদি শুরুর মূলধন খরচে ভর্তুকি দেয়, তাহলে স্বল্প মেয়াদে এটিকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করা সম্ভব।

হাইভিউ পাওয়ার অবশ্য তাদের সাফল্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। সংস্থাটি জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের আরও দুটি প্ল্যান্টে তাদের ‘ক্যাপ অ্যান্ড ফ্লোর’ নামক একটি সরকারি নীতি সহায়তা করছে, যা সংস্থাটিকে মূলধনের উপর একটি ন্যূনতম রিটার্নের নিশ্চয়তা দিয়েছিল। এতে বিনিয়োগকারীরা আশ্বস্ত হন।

লায়েস-এর একটি বড় সুবিধা হলো কম খরচ। প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা সঞ্চিত শক্তির জন্য এর ‘লেভেলাইজড কস্ট অফ স্টোরেজ’ প্রায় ৪৫ ডলার, যেখানে পাম্পড হাইড্রোর জন্য এটি ১২০ ডলার এবং লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির জন্য ১৭৫ ডলার।

অবশেষে, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে ভবিষ্যতের বিদ্যুতের গ্রিড বিভিন্ন সঞ্চয় প্রযুক্তির মিশ্রণের উপর নির্ভর করবে। পাম্পড হাইড্রো দীর্ঘস্থায়ী হলেও স্থান-নির্ভরশীল, ব্যাটারি অত্যন্ত কার্যকর হলেও ১০ বছর পর প্রতিস্থাপন প্রয়োজন। অন্যদিকে, তরল বায়ু ব্যাটারির চেয়ে বেশি সময় ধরে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে এবং এর ক্ষতিও কম।

সম্পর্কিত