ফ্যাসিবাদ আসলে কী

ফ্যাসিবাদ আসলে কী
ফ্যাসিজম একটি রাজনৈতিক আদর্শ। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

মতবাদ হিসেবে ফ্যাসিজম বা কে ফ্যাসিস্ট—এই বিষয়টি বর্তমানে আমাদের দেশের অত্যন্ত আলোচিত বিষয়। সাম্প্রতিক বছরে এই আলোচনার প্রাবল্য বাড়লেও, গত কয়েক বছর ধরেই এই ফ্যাসিজম নিয়ে এ দেশের রাজনৈতিক মহলে নানা কড়চা শোনা যাচ্ছে। কেউ কাউকে ফ্যাসিস্ট বলে অভিধা দিচ্ছে, তো কাউকে বলা হচ্ছে ফ্যাসিস্টের দোসর। কিন্তু ফ্যাসিজম আসলে কী?

ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিস্ট শব্দ দুটি উচ্চারিত হলেই মূলত দুটি ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একটি হচ্ছে নাৎসি জার্মানির বা হিটলারের জার্মানির। অন্যটি হচ্ছে বেনিতো মুসোলিনির ইতালি। এই দুটি হলো প্রমাণিত সত্যের মতো ফ্যাসিজমের উদাহরণ। সাধারণত বিশেষজ্ঞদের বেশির ভাগ এ দুটিকে ফ্যাসিজমের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে ধরে থাকেন। তবে হ্যাঁ, এ নিয়েও বিতর্ক আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার এই দুই উদাহরণের পর মূলত বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ব্যবস্থা বা আন্দোলন ‘ফ্যাসিজম’ বা ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে উপাধি পেয়েছে। তবে সেগুলোকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। তুমুল বিতর্ক চলেছে সেসব দাবি নিয়ে। কারণ ফ্যাসিজম নামক রাজনৈতিক আদর্শের ধারণাটিকেই নানা সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা যায়। এর বৈশিষ্ট্যও হরেক। বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীতে এসব বৈশিষ্ট্য আরও নানামুখী হয়েছে। ফলে ফ্যাসিস্ট উপাধিটি রাজনৈতিকভাবে যে কাউকে দেওয়া গেলেও, সেটি প্রমাণ করা কঠিন।

ফ্যাসিজম একটি রাজনৈতিক আদর্শ। ল্যাটিন শব্দ ‘ফ্যাসেস’ থেকে নিজের রাজনৈতিক দলের নামকরণ করেছিলেন ইতালির বেনিতো মুসোলিনি। এ দিয়ে মূলত গাছের ডাল বা কাঠ দিয়ে শক্ত করে বাঁধা কুঠারকে বোঝানো হয়। ব্রিটানিকা বলছে, প্রাচীন রোমে দণ্ডপ্রদানকারী কর্তৃপক্ষের প্রতীক হিসেবে এই ফ্যাসেস’কে বোঝানো হতো। আশা করি, এখন শব্দগতভাবে কিছুটা হলেও ফ্যাসিজমের একটি অবয়ব চোখের সামনে আবির্ভূত হচ্ছে। তবে মুসোলিনি যে ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দল তৈরি করেছিলেন, সেটির সঙ্গে ফ্যাসিস্ট আন্দোলনের গুণগত পার্থক্য আছে। অর্থাৎ, ফ্যাসিস্ট মতাদর্শের হলেও এই দুটির কর্মপ্রক্রিয়ায় ভিন্নতা আছে। আবার এদের মধ্যে অনেক বৈশিষ্ট্যে মিলও আছে। যেমন: দুই ক্ষেত্রেই উগ্র জাতীয়তাবাদের সামরিকায়ন চোখে পড়বে। ভোটের মাধ্যমে সৃষ্ট নির্বাচনী ব্যবস্থাভিত্তিক গণতন্ত্রের প্রতি সুস্পষ্ট অবজ্ঞা পরিলক্ষিত হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উদারবাদের পরিসর সংকুচিত করার চেষ্টা দেখা যাবে। এগুলো একেবারে মোটা দাগের কিছু বৈশিষ্ট্য। তবে এসব নিয়েও ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য আছে। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন যে, ফ্যাসিজমে রক্ষণশীলতার চরম রূপ প্রবল হয়ে উঠতে পারে। হঠাৎ করেই সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে যে, তাকে যেন জোর করে পেছনের দিকে হাঁটতে বাধ্য করা হচ্ছে!

রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ফ্যাসিবাদ অত্যন্ত জটিল। একই সঙ্গে এটি নিয়ত পরিবর্তনশীলও। ১৯২০ থেকে ১৯৩০–এর দশকে ইউরোপে এর প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ভব ও বিস্তার ঘটে। এবং তার প্রতিভূই মূলত হিটলার ও মুসোলিনি। মুসোলিনি এক্ষেত্রে ছিলেন অগ্রগামী সৈনিক। হিটলার তাঁর কাছ থেকে অনেক শিক্ষাই নিয়েছিলেন এবং নিজের স্বার্থে সেসব কাজেও লাগিয়েছিলেন। বিশেষ করে প্রোপাগান্ডা ও সহিংসতার বহুমুখী ব্যবহারের বিষয়টি মুসোলিনির কাছ থেকেই হিটলার আত্তীকরণ করেছিলেন বলে ধারণা করেন অনেক বিশ্লেষক। জার্মানি ও ইতালির পর ফ্যাসিবাদী আদর্শের ভিত্তিতে ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন গঠিত হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে ব্রিটিশ ইউনিয়ন অব ফ্যাসিস্টস, পর্তুগালের ন্যাশনাল ইউনিয়ন, যুগোস্লাভিয়ার যুগোস্লাভ র‍্যাডিক্যাল ইউনিয়ন, অস্ট্রিয়ার ফাদারল্যান্ড ফ্রন্ট ইত্যাদি। আবার ইউরোপীয় ফ্যাসিস্টদের দেখাদেখি লাতিন আমেরিকাতেও এই আদর্শের প্রসার পরিলক্ষিত হয়েছিল। বিশেষ করে বলিভিয়া ও আর্জেন্টিনায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে স্পেন ও পর্তুগালে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত থাকলেও, বিশেষজ্ঞদের কারও কারও মতে সেগুলো ছিল ফ্যাসিবাদী ও সংরক্ষণবাদী দলের মিশ্রণে গঠিত সরকার।

কিছু বিশেষজ্ঞ ফ্যাসিবাদ বলতে একগুচ্ছ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, একটি রাজনৈতিক দর্শন বা একটি গণআন্দোলনকে বুঝিয়ে থাকেন। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
কিছু বিশেষজ্ঞ ফ্যাসিবাদ বলতে একগুচ্ছ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, একটি রাজনৈতিক দর্শন বা একটি গণআন্দোলনকে বুঝিয়ে থাকেন। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা আসলে অনেক। যেহেতু আগেই বলা হয়েছে যে, এই রাজনৈতিক আদর্শটি নিয়ত পরিবর্তনশীল এবং স্থান–কাল–পাত্রভেদে এর হরেক বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, তাই ফ্যাসিবাদকে একদম নিখুঁতভাবে সংজ্ঞায়িত করা এবং এর মান সংজ্ঞা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন। কিছু বিশেষজ্ঞ ফ্যাসিবাদ বলতে একগুচ্ছ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, একটি রাজনৈতিক দর্শন বা একটি গণআন্দোলনকে বুঝিয়ে থাকেন। আবার অনেকে বলেন ফ্যাসিবাদ এমন একটি রাজনৈতিক আন্দোলন যেটি উগ্রজাতীয়তাবাদ, সামরিকবাদ এবং ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের সর্বাধিক ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তবে বেশির ভাগ সংজ্ঞাতেই ফ্যাসিবাদকে একনায়কতন্ত্রেরই আরেক রূপ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে। এটিও মেনে নেওয়া হয়েছে যে, ফ্যাসিবাদে উগ্র জাতীয়তাবাদের চর্চা আবশ্যিক এবং যেকোনো মূল্যেই একে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।

ইয়েল ইউনিভার্সিটির দর্শনের অধ্যাপক জেসন স্ট্যানলি। তিনি ‘হাউ ফ্যাসিজম ওয়ার্কস’ নামে একটি বই লিখেছিলেন যা ২০২০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। ওই বইয়ে এই অধ্যাপক ফ্যাসিবাদের একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘ফ্যাসিজমের ভিত্তি হলো ‘আমরা’ ও ‘তারা’—এর মধ্যে একটি নৃতাত্ত্বিক বিভেদ তৈরি করা। একটি উগ্র নৃতাত্ত্বিকগত জাতীয়তাবাদ ফ্যাসিবাদের মূল ভিত হিসেবে কাজ করে। মিথজাত অতীতের নস্টালজিয়া তৈরি করে ফ্যাসিবাদ, সেটিকে ভিত হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্যদের একটি সাম্রাজ্য ছিল—এবং বর্তমানকে এটি সেই সাম্রাজ্য হারানোর ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করে। মিথের মতো করে ব্যবহার করা ওই অতীত সাম্রাজ্যে এই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীরই প্রবল প্রতাপের উপস্থিতি দেখা যায়, সেটি যেমন সামরিকভাবে, তেমনি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবেও।’ অর্থাৎ, একটি আশা মানুষের সামনে রাখা হয়। সেটি হলো কোনো এক কালের কথিত সুবর্ণ অতীতকে বর্তমানে হাজির করার আশা। আর এর ভিত্তিতেই একটি রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা হয়।

ইউরোপে মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিবাদের উত্থান হয় এবং তা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। ১৯১৯ সালে মুসোলিনি সর্বপ্রথম ‘ফ্যাসিজম’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে এই মতবাদে বিশ্বাসীদের প্রাতিষ্ঠানিক বিদায়ও ঘটে। তবে এর পরই যে ফ্যাসিবাদ দুনিয়া থেকে উঠে গেছে, তেমনটা কোনোভাবেই নয়। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্রশক্তি তেমনটা ভাবতেই ভালোবাসে!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নানাভাবে পরিবর্তিত ও বিবর্তিত হয়েছে ও হচ্ছে ফ্যাসিবাদ। বিংশ ও একবিংশ—দুই শতাব্দীতেই এই ধারা অব্যাহত ছিল এবং আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেডেলিন অলব্রাইট তাঁর লেখা বই ‘ফ্যাসিজম: আ ওয়ার্নিং’–এ এই বিষয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। ২০১৯ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘হিটলার ও মুসোলিনি যে ধারার ফ্যাসিবাদী আদর্শের পত্তন ঘটিয়েছিলেন, সেটি আজকের দিনের জনতুষ্টিবাদী সংগঠনগুলোতেও দেখা যায় এবং এটি পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন দেশের ফ্যাসিস্ট আন্দোলনগুলোকে জ্বালানি জুগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সেইসব নেতাদের ক্ষেত্রে এই আদর্শ পুরোপুরি কার্যকর, যারা পুরো গোষ্ঠী বা জাতির পক্ষে কথা বলার অধিকার দাবি করে থাকে, অন্যদের অধিকারকে উপেক্ষা করে পুরোপুরি এবং নিজের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য–উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সহিংসতা সৃষ্টিসহ যেকোনো প্রয়োজনীয় উপায় অবলবম্বনের জন্য ইচ্ছুক থাকে।’

নিউইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক রবার্ট প্যাক্সটন মনে করেন, ফ্যাসিবাদ হলো রাজনৈতিক চর্চার এমন একটি ধরণ, যেটি জনপ্রিয় উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলতে উৎসাহ দেয় এবং এ কাজে খুবই সূক্ষ্ম প্রোপাগান্ডা কৌশল ব্যবহার করে থাকে।

প্যাক্সটন মনে করেন, ফ্যাসিবাদ কিছু নির্দিষ্ট ঘরানার প্রোপাগান্ডাকে উসকে দিতে চায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে উদারবাদবিরোধিতা, ব্যক্তির ব্যক্তিগত অধিকারের প্রয়োগ বাতিল করা ও গণতন্ত্রের বিরোধিতা। আবার ফ্যাসিবাদ সমাজতন্ত্রবিরোধী প্রোপাগান্ডা চালায়। সমাজতন্ত্রের মূলনীতির ভিত্তিতে নেওয়া অর্থনৈতিক পদক্ষেপকেও বাতিল করতে চায়। ফ্যাসিবাদ সহিংসতার মাধ্যমে বা অন্য প্রক্রিয়ায় কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা চালায় এবং এমন জাতীয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে, যা জাতির প্রভাব ও শক্তিমত্তার আওতা বাড়ায়।

ঐতিহাসিকভাবে ফ্যাসিস্টরা আধুনিকতার বিরোধিতা করে থাকে। ছবি: পেক্সেলস
ঐতিহাসিকভাবে ফ্যাসিস্টরা আধুনিকতার বিরোধিতা করে থাকে। ছবি: পেক্সেলস

ঐতিহাসিকভাবে ফ্যাসিস্টরা আধুনিকতার বিরোধিতা করে থাকে। এ বিষয়ে নিউইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ক্রিস রাইট ‘রিফ্লেকশনস অন ফ্যাসিজম’ নামের একটি নিবন্ধে কিছু আলোচনা করেছেন। ২০২০ সালে রিসার্চগেটে প্রকাশিত এই নিবন্ধে তিনি বলেন, ‘যদি আধুনিকতা বলতে উদারবাদ, গণতন্ত্র, মার্ক্সবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ ও নারীবাদকে বোঝানো হয়, তবেই তার বিরোধিতায় নামে ফ্যাসিস্টরা।’ তবে এই আধুনিকতা বলতে যদি প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন বা যন্ত্রের গতিশীলতা বোঝানো হয়, তবেই আবার ফ্যাসিস্টদের অন্য রূপ দেখা যায়। ক্রিস রাইটের মতে, ফ্যাসিস্টরা এ ধরনের আধুনিকতার পক্ষে থাকে সব সময়।

অন্যদিকে সাংবাদিক শেন বারলে মনে করেন, ফ্যাসিবাদ মানুষে মানুষে বিদ্যমান সহজাত বৈষম্যকে উসকে দিতে চায়। তিনি বলেছেন, ‘বর্তমান বিশ্ব মানুষে মানুষে সাম্য প্রতিষ্ঠার একটি মিথের ওপর নির্মিত। যদি কখনও সেই সাম্য অর্জন করা সম্ভব নাও হয় এবং মানুষের তা অর্জনের কোনো ইচ্ছা নাও থাকে, তবুও আধুনিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি হলো এই ধারণা—সব মানুষই সমান।’ শেন বারলের মতে, ফ্যাসিবাদ মানুষে মানুষে বিদ্যমান কিছু জন্মগত বা প্রকৃতিপ্রদত্ত বৈষম্য, নৃতাত্ত্বিক পার্থক্য, জেন্ডারের পার্থক্য বা সামাজিক উঁচু–নিচুর শ্রেণিবিন্যাসকে জিইয়ে রাখতে চায়। এই বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় ফ্যাসিবাদ।

এতক্ষণ ফ্যাসিবাদের নানামাত্রিক সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা হলো। এর মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের একটি বিস্তৃত পরিসর আশা করি মূর্ত হয়ে উঠেছে। তবে হ্যাঁ, ফ্যাসিবাদের কোনো বাঁধাধরা বা মান সংজ্ঞা নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ, দেশে দেশে বা অঞ্চলভেদে ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ভিন্ন হয়। আবার শাসনামল ভেদেও ফ্যাসিজমের প্রকাশ ভিন্ন ভিন্ন হয়। ফলে এর প্রকাশকে কোনো নির্দিষ্ট ধরণের সঙ্গে খাপে খাপ মিলিয়ে এক বাক্যে বলে দেওয়া যায় না যে, এটিই ফ্যাসিবাদ বা এটিকেই ফ্যাসিবাদ বলা উচিত।

অধ্যাপক রবার্ট প্যাক্সটন বলছেন, ফ্যাসিবাদকে নির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা আরও কঠিন এই কারণে যে, অনেক দেশ বা অঞ্চলেই সরকারগুলো পুরোপুরি ফ্যাসিস্ট না হলে কিছু ফ্যাসিস্ট বৈশিষ্ট্যকে অনুকরণ করে থাকে। ফলে সেসব শাসন ব্যবস্থায় কিছু ফ্যাসিস্ট বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া গেলেও, সেগুলোকে পুরোপুরি ফ্যাসিস্ট বলে অভিহিত করা যায় না। এতে পুরো বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

কম্যুনিজম, পুঁজিবাদ, সংরক্ষণবাদ, উদারবাদ বা সমাজতন্ত্রের মতো ফ্যাসিবাদের কোনো সুনির্দিষ্ট ও ঘোষিত দর্শন নেই। ছবি: ফ্রিপিক
কম্যুনিজম, পুঁজিবাদ, সংরক্ষণবাদ, উদারবাদ বা সমাজতন্ত্রের মতো ফ্যাসিবাদের কোনো সুনির্দিষ্ট ও ঘোষিত দর্শন নেই। ছবি: ফ্রিপিক

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান দ্য লোয়ি ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফ্যাসিজম নামক অভিধাটির যেনতেন ব্যবহার হচ্ছে। এটি অনেকটা রাজনৈতিক অপমান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত উপাধি হিসেবে এর ব্যবহার হচ্ছে কম। ফলে হরেদরে ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমাটি শোনা গেলেও এর সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না।

এ বিষয়ে ইয়েল ইউনিভার্সিটির দর্শনের অধ্যাপক জেসন স্ট্যানলি বলেন, ‘একনায়কতন্ত্রের ক্ষেত্রে ফ্যাসিজম অভিধাটির ব্যবহারের সাধারণীকরণ একটি ভয়ংকর সমস্যার সৃষ্টি করছে। ফ্যাসিজম একটি সুনির্দিষ্ট ঘরানার একনায়কতন্ত্র। এটি খুবই সুনির্দিষ্ট একটি বিষয়। কোনো কর্তৃপক্ষ বা কর্তৃপক্ষীয় ব্যবস্থা ঠিকঠাক কাজ না করলেই গণহারে ব্যবহার করা যাবে, এমন কোনো অভিধা এটি নয়।’

আবার, কম্যুনিজম, পুঁজিবাদ, সংরক্ষণবাদ, উদারবাদ বা সমাজতন্ত্রের মতো ফ্যাসিবাদের কোনো সুনির্দিষ্ট ও ঘোষিত দর্শন নেই। রবার্ট প্যাক্সটনের ভাষায় বলতে গেলে, ‘কোনো নির্দিষ্ট ফ্যাসিস্ট ম্যানিফেস্টোর অস্তিত্ব নেই, নেই কোনো প্রতিষ্ঠাকারী ফ্যাসিস্ট চিন্তকও।’

‘হাউ ফ্যাসিজম ওয়ার্কস’ নামের বইয়ে তাই জেসন স্ট্যানলি লিখেছেন যে, ফ্যাসিজম কোনোভাবেই বিশ্বাস সম্পর্কিত নয়। এটি পুরোপুরি ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট বিষয়। এই মতবাদের অনুসারীরা সব কর্মকাণ্ডই চালান কেবলই ক্ষমতা দখলের বিষয়টিকে নিশ্চিত করার উপকরণ হিসেবে।

শেষ কথা এই যে, ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞায়ন কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভ্রম উৎপাদন করলেও, সব ফ্যাসিস্ট আন্দোলনেই কিছু সাধারণ বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ডের উদাহরণ দেখতে পাওয়া যায়।

সম্পর্কিত