কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে বিগত কয়েক বছর ধরে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যে কাদা-ছোড়াছুঁড়ি চলছিল, তা চলতি বছরের জুনে এসে এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে। এতদিন যে আমেরিকাকে এই মহামারির উৎস খোঁজার প্রধান ‘তদন্তকারী’ মনে করা হচ্ছিল, সেই আমেরিকার দিকেই এবার আঙুল তোলার মতো অকাট্য কিছু তথ্য খোদ মার্কিন গোয়েন্দা নথিতেই উন্মোচিত হলো।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) মার্কিন সরকারের ‘অফিস অব দ্য ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স’ প্রধান তুলসী গ্যাবার্ডের নির্দেশে অবমুক্ত ও ‘ডিক্লাসিফায়েড’ করা বিস্ফোরক গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও গোপন ইমেইল চালাচালির নথিপত্র বিশ্ব রাজনীতি ও বৈজ্ঞানিক মহলকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
দীর্ঘদিন গোপন রাখার পর মার্কিন ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কর্তৃক প্রকাশিত ‘ডিক্লাসিফায়েড’ ফাইলগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ ও গোপন যোগাযোগের অবিশ্বাস্য কিছু তথ্য সামনে এসেছে। তাদের ওয়েবসাইটেই সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
নথিতে দাবি করা হচ্ছে, করোনা মহামারি শুরুর ঠিক পূর্ববর্তী বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস’ (এনআইএআইডি)-এর তৎকালীন প্রধান ড. অ্যান্থনি ফাউসির অধীনে মার্কিন করদাতাদের মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার চীনের উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজিতে পাঠানো হয়েছিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্টের বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই ফাউসিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের অন্যতম কুশীলব হিসেবেই আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।
ফাউসির হাত হয়ে যাওয়া এই অর্থ দিয়ে উহানে ‘গেইন-অব-ফাংশন’ নামক অত্যন্ত বিপজ্জনক ভাইরোলজিক্যাল গবেষণা চালানো হচ্ছিল। ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্যই ছিল বাদুড়ের করোনাভাইরাসকে ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে রূপান্তর করে মানুষের জন্য আরও বেশি মারাত্মক ও সংক্রামক করে তোলা।
‘ডিক্লাসিফায়েড’ করা ইমেইল ও অভ্যন্তরীণ নথিতে স্পষ্ট দেখা যায়, মার্কিন অর্থায়নে চীনা গবেষকরা করোনাভাইরাসের ‘স্পাইক প্রোটিন’ পরিবর্তনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছিলেন, যাতে এটি অতি দ্রুত মানবদেহে আক্রমণ করতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বর্তমানে এটিকে করোনা মহামারির মূল উৎস বা ‘স্মোকিং গান’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এই প্রথম আমেরিকা নিজেই নিজের দিকে আঙুল তুলল।
সত্যটা আসলে কী
করোনাভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয়েছিল চীনের উহানে, এটি সত্য। কিন্তু ১৮ জুনের গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে, সেই উহানের ল্যাবে যে প্রাণঘাতী ভাইরাসটি তৈরি হচ্ছিল, তার মূল ‘ডিজাইন’ ও ‘আর্থিক জোগান’ এসেছিল খোদ আমেরিকার সরকারি তহবিল থেকে। ফলে প্রযুক্তিগত ও আদর্শগতভাবে এই ভাইরাসের উৎপত্তির দায় সরাসরি মার্কিন প্রশাসনের ওপর বর্তায়।
মিলিটারি ডটকম বলছে, তুলসী গ্যাবার্ডের এই প্রকাশনায় আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো স্বীকার করেছে যে, বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশে মার্কিন সরকারের সরাসরি অর্থায়নে ১২০টিরও বেশি গোপন ‘বায়োল্যাব’ সচল রয়েছে (যার মধ্যে ইউক্রেনের ল্যাবগুলোও রয়েছে)। এই ল্যাবগুলোতে অত্যন্ত বিপজ্জনক প্যাথোজেন বা জীবাণু মজুত রাখা হয়েছে, যা যেকোনো সময় লিক হয়ে বিশ্বজুড়ে মহামারি ছড়াতে পারে। এই নেটওয়ার্কের প্রকাশ পাওয়ায় বিশ্বব্যাপী এই ধারণাই জোরালো হচ্ছে যে, জৈব-গবেষণার আড়ালে আমেরিকাই এই জীবাণু ছড়ানোর বৈশ্বিক ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এই প্রতিবেদনে ফাউসির বিরুদ্ধে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার অভিযোগও আনা হয়েছে।

চীন নাকি আমেরিকা, দায় কার?
চীন এতদিন দাবি করে আসছিল, ২০১৯ সালের অক্টোবরের দিকে মার্কিন সামরিক অ্যাথলেটদের মাধ্যমে উহানে ভাইরাসটি প্রবেশ করে কিংবা মেরিল্যান্ডের ‘ফোর্ট ডিট্রিক’ ল্যাব থেকে এটি ছড়িয়েছিল। চীনের সেই সুনির্দিষ্ট দাবি পুরোপুরি প্রমাণিত না হলেও এবারের মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্ট প্রমাণ করে দিয়েছে যে, আমেরিকা চীনের ওপর দোষ চাপালেও পর্দার আড়ালে তারা নিজেরাই এই ভাইরাসের যৌথ অংশীদার ছিল।
১৮ জুনের এই নথির পর এটি স্পষ্ট যে, করোনা কোনো প্রাকৃতিক মহামারি ছিল না। এটি ছিল মার্কিন অর্থায়নে এবং চীনের মাটিতে যৌথভাবে পরিচালিত একটি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফল, যা ল্যাব থেকে অসাবধানতাবশত ছড়িয়ে পড়েছিল।
সুতরাং, আমেরিকা হয়তো সরাসরি নিজ দেশে এটি ছড়ায়নি; কিন্তু যে মারণাত্মক উপাদানের কারণে করোনা বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, সেই ‘দানবটিকে’ ল্যাবরেটরিতে তৈরি করার মূল কারিগর ও অর্থদাতা ছিল স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৬ সালের জুনে এসে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার এই স্বীকারোক্তি বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বড় বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক জালিয়াতিকে উন্মোচিত করল।