Advertisement Banner

কারওয়ান বাজারে পুলিশ ক্যাম্পের কাজ কী?

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
কারওয়ান বাজারে পুলিশ ক্যাম্পের কাজ কী?
কারওয়ান বাজারে নতুন ক্যাম্প। ছবি: চরচা

রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র কারওয়ান বাজার দীর্ঘদিন ধরেই চাঁদাবাজি, দখলদারি, মাদক কারবার ও সহিংসতার কারণে আলোচনায়। সরকারি জায়গা দখলকে কেন্দ্র করে এখানে প্রতিদিন কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়, যা নিয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে প্রভাবশালী মহলের মধ্যে চলে আধিপত্য বিস্তার ও ভাগ-বাটোয়ারার দ্বন্দ্ব।

এবার এই এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে স্থানীয়ভাবে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনা করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।

কারওয়ান বাজারে গত দেড় বছরে অন্তত অর্ধশতাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এসব সংঘর্ষের বড় অংশই দখল ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা (বহিষ্কৃত) আজিজুল রহমান মোছাব্বির। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনেও বাজারকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির দ্বন্দ্ব জড়িত।

এ ছাড়া বাজারসংলগ্ন রেললাইন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, যা পুরো এলাকাকে দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তেজগাঁও থানার অধীনে কারওয়ান বাজার এলাকায় একটি স্থানীয় পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। গত ২ মে ডিএমপি কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যাম্পটির উদ্বোধন করেন।

উদ্বোধনকালে মো. সরওয়ার বলেন, চাঁদাবাজি, মাদক ও সন্ত্রাস দমনে এই ক্যাম্প সার্বক্ষণিক কাজ করবে। পাশাপাশি ডিবি, সিটিটিসি ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা গোপনে এলাকায় কাজ করছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ লাইন্স থেকে অতিরিক্ত ফোর্স এনে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো, বড় ধরনের ঘটনা ঘটলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযানে সহায়তা প্রদান করাও এই ক্যাম্পের দায়িত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

ক্যাম্পের মূল কার্যক্রম: নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ক্যাম্পটি মূলত একটি মনিটরিং ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াভিত্তিক ইউনিট হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে ক্যাম্পে একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার সঙ্গে রয়েছেন চারজন সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) এবং প্রায় ২০ জন কনস্টেবল, যারা পালাক্রমে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।

ক্যাম্পটির প্রধান কাজ হলো এলাকায় নিয়মিত টহল ও নজরদারি জোরদার করা, সন্দেহভাজন কার্যক্রম শনাক্ত করা এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো, বড় ধরনের ঘটনা ঘটলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযানে সহায়তা প্রদান করাও এই ক্যাম্পের দায়িত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

এই ক্যাম্পে সরাসরি কোনো লিখিত অভিযোগ বা জিডি নেওয়া হয় না। অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠানো হয়। তবে মৌখিক অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ বলছে, এটি মূলত একটি ‘প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কেন্দ্র’, যেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে দ্রুত ‘অ্যাকশনে’ যাওয়া সম্ভব।

ব্যবসায়ীদের জন্য ‘নিরাপত্তা পয়েন্ট’

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য এই ক্যাম্প একটি তাৎক্ষণিক যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করেন ডিএমপি কমিশনার। তিনি বলেছেন, ব্যবসায়ীরা চাইলে গোপনে বা প্রকাশ্যে অভিযোগ জানাতে পারেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়।

ডিএমপি কর্মকর্তাদের মতে, গোয়েন্দা তথ্য দ্রুত সংগ্রহ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া–এই দুই বিষয়ই ক্যাম্পের কার্যকারিতার মূল শক্তি।

জানা যায়, কারওয়ান বাজারে ২০২১ সালে প্রথম অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প চালু করা হয়। ডিআইডি ১ নম্বর মার্কেট সংলগ্ন সিটি করপোরেশনের একটি ভবনে এটি স্থাপন করা হয়। ২০১৮-১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের আগে ভবনটিতে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালিত হতো। অভিযান শেষে ভবনটি খালি হলে সেখানে পুলিশ ক্যাম্প চালু করা হয়।

এলাকায় যেকোনো অপরাধ ঘটলে আমরা দ্রুত থানার ওসি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নিই। নিয়মিত মনিটরিং ও অভিযানের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি।

বর্তমানে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পকেই সংস্কার করে স্থায়ী ক্যাম্পে রূপ দেওয়া হয়েছে।

কারওয়ান বাজার সূত্রে জানা গেছে, এলাকার প্রধান সমস্যা সরকারি জায়গা দখল করে বাণিজ্য পরিচালনা। এই দখলকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়। নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রভাবশালীদের মধ্যে সংঘর্ষ প্রায় নিয়মিত।

এছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। রেললাইন এলাকাকে ঘিরে মাদক ও ছিনতাইকারীদের আস্তানাও গড়ে উঠেছে।

ক্যাম্পের কার্যক্রম বিষয়ে জানতে চাইলে কারওয়ান বাজার পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই মো. হিরন মোল্লা বলেন, “এলাকায় যেকোনো অপরাধ ঘটলে আমরা দ্রুত থানার ওসি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নিই। নিয়মিত মনিটরিং ও অভিযানের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি।”

হিরন মোল্লা আরও বলেন, “ক্যাম্পে সরাসরি লিখিত অভিযোগ নেওয়া হয় না, তবে মৌখিক অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”

কারওয়ান বাজারের এক পাইকারি সবজি ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, “এখানে বহুদিন ধরেই চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসীদের নৈরাজ্য চলে আসছে। এসব ঘটনা নিয়ে সংঘর্ষও হয়েছে। পুলিশ ক্যাম্প বসানোয় অন্তত আমরা কিছুটা সাহস পাচ্ছি। যদি নিয়মিত নজরদারি থাকে, তাহলে চাঁদাবাজি অনেকটাই কমবে বলে আশা করি।)

মাছ ব্যবসায়ী মোকছেদ বলেন, “রাতের দিকে ছিনতাই আর মাদকের ঝামেলা বেশি হয়। বিশেষ করে ভোররাতে মাছ কিনতে পাইকাররা আসেন। অনেক সময় ছিনতাইয়ের ভয়ে থাকেন। পুলিশ ক্যাম্প থাকলে দ্রুত সহায়তা পাওয়া যাবে, এই বিশ্বাসটা তৈরি হয়েছে। তবে শুধু ক্যাম্প বসালেই হবে না, নিয়মিত অভিযান আর কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, তাহলেই বাস্তব পরিবর্তন আসবে।”

সম্পর্কিত