মার্কিন প্রশাসনের চারজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে ইরানের হাতে যে অস্ত্র ছিল, তার প্রায় ৭৫ শতাংশ মোবাইল লঞ্চার এবং ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র এখনো অক্ষত রয়েছে।
চরচা ডেস্ক
সিআইএ-র প্রতিবেদন: ইরানের সামরিক সক্ষমতা অটুট
চরচা ডেস্ক
প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬, ১৮: ১৮
ইরানের পতাকা। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হোয়াইট হাউজকে সতর্ক করে জানিয়েছে, ইরানের ওপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত নৌ-অবরোধের আরও কয়েক মাস অনায়াসেই মোকাবিলা করতে পারবে দেশটি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এ গত ৭ মে প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির যে বড়াই করা হচ্ছে, বাস্তবে ইরানের চিত্রটি তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র একটি অতি গোপনীয় বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর চলমান কঠোর নৌ-অবরোধ সত্ত্বেও দেশটি অন্তত তিন থেকে চার মাস কোনো বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ছাড়াই টিকে থাকতে সক্ষম। এই তথ্যটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জনসমক্ষে দাবি করছেন যে, ইরান প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে।
তবে গোয়েন্দা তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ইরানের হাতে এখনো বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত রয়েছে, যা মার্কিন স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এই প্রতিবেদনটি মূলত সিআইএ এবং অন্য আরেকটি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার একটি অভ্যন্তরীণ নথির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদিও হোয়াইট হাউজ মনে করছে তাদের ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ ইরানের শ্বাসরোধ করে ফেলছে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। মার্কিন গোয়েন্দারা মনে করছেন, ইরান এই অবরোধের মুখে আরও দীর্ঘ সময় টিকে থাকার সক্ষমতা রাখে।
মার্কিন প্রশাসনের চারজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে ইরানের হাতে যে অস্ত্র ছিল, তার প্রায় ৭৫ শতাংশ মোবাইল লঞ্চার এবং ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র এখনো অক্ষত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মাত্র ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ অবশিষ্ট আছে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বলছে, এই হিসাবটি ভুল।
এমনকি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক সপ্তাহের তীব্র বিমান হামলার পরও ইরান তাদের ভূগর্ভস্থ মিসাইল স্টোরেজ সুবিধাগুলো মেরামত করতে সক্ষম হয়েছে। এবং যুদ্ধের মধ্যে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজও চালিয়ে যাচ্ছে। এটি নির্দেশ করে যে, ইরানের সামরিক কাঠামো এবং উৎপাদন ক্ষমতা মার্কিন প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল।
অর্থনৈতিক দিক থেকে ইরানের পরিস্থিতি সম্পর্কে সিআইএ-র বিশ্লেষণ বলছে যে, দেশটি ৯০ থেকে ১২০ দিন বা তার বেশি সময় এই অবরোধ সহ্য করতে পারবে। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে যে, নৌ-অবরোধের কারণে ইরান প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ডলার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং তাদের মুদ্রা মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান অত্যন্ত চতুরতার সাথে তাদের তেল সম্পদ রক্ষা করছে। তারা খালি তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোতে তেল মজুত করে রাখছে এবং উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে তেলের খনিগুলোকে সচল রাখছে। এ ছাড়া স্থলপথ দিয়ে বিশেষ করে মধ্য এশিয়ার মাধ্যমে রেলপথে তেল পাঠানোর চেষ্টাও চালাচ্ছে তেহরান।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান আগে থেকেই এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল এবং দশকের পর দশক ধরে চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের মধ্যে একটি বিশেষ ধরনের অর্থনৈতিক সহনশীলতা তৈরি হয়েছে, যা কেবল নৌ-অবরোধ দিয়ে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের আভাসও পাওয়া গেছে। একদিকে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা এই যুদ্ধকে একটি ‘অপ্রতিরোধ্য সামরিক বিজয়’ হিসেবে প্রচার করছেন। অন্যদিকে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আরও অনেক বেশি বাস্তবধর্মী ও সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি অবরোধকে ‘লোহার প্রাচীর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, কোনো জাহাজই এটি ভেদ করতে পারবে না। কিন্তু সিআইএ-র মতে, ইরান যদি এই প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে তার প্রভাব হবে ভয়াবহ।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার শিকার হওয়ার পর থেকে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে, যা বিশ্ব বাজারে তেলের সরবরাহকে ব্যাহত করছে। ট্রাম্প সম্প্রতি ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি মিশন চালু করেছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল মার্কিন নৌবাহিনীর প্রহরায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার করা। কিন্তু শান্তি আলোচনার দোহাই দিয়ে পরে তা স্থগিত করা হয়।
ইরানের সামরিক সক্ষমতার বিষয়ে প্রতিবেদনে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। যুদ্ধের আগে ইরানের কাছে প্রায় আড়াই হাজার ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং হাজার হাজার ড্রোন ছিল। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের একটি ভিজ্যুয়াল তদন্তে উঠে এসেছে যে, ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর অন্তত ২২৮টি স্থাপনা বা সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা ট্রাম্প সরকার প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশেষভাবে ড্রোন ব্যবহারের দিকে আঙুল তুলেছে। ব্যালিস্টিক মিসাইলের চেয়েও ড্রোনগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কারণ, এগুলো ছোট ছোট গুদাম বা সাধারণ কারখানায় তৈরি করা যায় এবং সহজে লুকিয়ে রাখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে ইরানের বিশাল মিসাইল বাহিনীর প্রয়োজন নেই; সামান্য একটি ড্রোন দিয়ে কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোই যথেষ্ট হবে–যাতে বীমা কোম্পানিগুলো সেই পথে জাহাজ পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে পুরো অঞ্চলটি একটি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার দিকে চলে যেতে পারে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রতিবেদনে তেল আবিবভিত্তিক ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’-এর সিনিয়র গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। তিনি ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের ইরান শাখার প্রাক্তন প্রধান ছিলেন।
সিট্রিনোভিচ সতর্ক করেছেন যে, এই যুদ্ধের ফলাফল শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘কৌশলগত ব্যর্থতা’ হতে পারে। তার মতে, ওয়াশিংটন যে লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল–অর্থাৎ, ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা বা তাদের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা–তা হয়তো পূরণ হবে না। বরং এই যুদ্ধের শেষে ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি উগ্র ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং তারা বিশ্বাস করে যে, তারা মার্কিন রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তিকে পরাজিত করতে পারবে। সিট্রিনোভিচ মনে করেন, ইরান এই অবরোধের মুখেও মাথা নত করবে না এবং শেষ পর্যন্ত তারা পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ ও প্রক্সি গোষ্ঠীদের সমর্থন বজায় রেখেই আলোচনায় ফিরবে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এই প্রতিবেদনটি বলছে যে, মার্কিন প্রশাসনের অত্যধিক আশাবাদ এবং গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি যদিও দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতেই সব কার্ড রয়েছে এবং ইরান আলোচনায় আসতে বাধ্য হবে। কিন্তু সিআইএ-র গোপনীয় নথিটি বলছে ভিন্ন কথা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের পরও দেশটির প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি। বরং তারা স্থলপথে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার এবং বিকল্প উপায়ে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৬ সালের এই মে মাসে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি এমন এক মোড়ে পৌঁছেছে, যেখানে কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে দমানো সম্ভব হচ্ছে না, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের আশঙ্কাই প্রবল হচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের এই মূল্যায়ন যদি সঠিক হয়, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘ইকোনমিক ফিউরি’ বা অর্থনৈতিক ক্রোধ ইরানকে সংলাপে বসানোর বদলে দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংঘাতের দিকেই ঠেলে দিতে পারে।
ইরানের পতাকা। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হোয়াইট হাউজকে সতর্ক করে জানিয়েছে, ইরানের ওপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত নৌ-অবরোধের আরও কয়েক মাস অনায়াসেই মোকাবিলা করতে পারবে দেশটি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এ গত ৭ মে প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির যে বড়াই করা হচ্ছে, বাস্তবে ইরানের চিত্রটি তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র একটি অতি গোপনীয় বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর চলমান কঠোর নৌ-অবরোধ সত্ত্বেও দেশটি অন্তত তিন থেকে চার মাস কোনো বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ছাড়াই টিকে থাকতে সক্ষম। এই তথ্যটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জনসমক্ষে দাবি করছেন যে, ইরান প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে।
তবে গোয়েন্দা তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ইরানের হাতে এখনো বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত রয়েছে, যা মার্কিন স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এই প্রতিবেদনটি মূলত সিআইএ এবং অন্য আরেকটি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার একটি অভ্যন্তরীণ নথির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদিও হোয়াইট হাউজ মনে করছে তাদের ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ ইরানের শ্বাসরোধ করে ফেলছে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। মার্কিন গোয়েন্দারা মনে করছেন, ইরান এই অবরোধের মুখে আরও দীর্ঘ সময় টিকে থাকার সক্ষমতা রাখে।
মার্কিন প্রশাসনের চারজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে ইরানের হাতে যে অস্ত্র ছিল, তার প্রায় ৭৫ শতাংশ মোবাইল লঞ্চার এবং ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র এখনো অক্ষত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মাত্র ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ অবশিষ্ট আছে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বলছে, এই হিসাবটি ভুল।
এমনকি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক সপ্তাহের তীব্র বিমান হামলার পরও ইরান তাদের ভূগর্ভস্থ মিসাইল স্টোরেজ সুবিধাগুলো মেরামত করতে সক্ষম হয়েছে। এবং যুদ্ধের মধ্যে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজও চালিয়ে যাচ্ছে। এটি নির্দেশ করে যে, ইরানের সামরিক কাঠামো এবং উৎপাদন ক্ষমতা মার্কিন প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল।
অর্থনৈতিক দিক থেকে ইরানের পরিস্থিতি সম্পর্কে সিআইএ-র বিশ্লেষণ বলছে যে, দেশটি ৯০ থেকে ১২০ দিন বা তার বেশি সময় এই অবরোধ সহ্য করতে পারবে। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে যে, নৌ-অবরোধের কারণে ইরান প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ডলার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং তাদের মুদ্রা মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান অত্যন্ত চতুরতার সাথে তাদের তেল সম্পদ রক্ষা করছে। তারা খালি তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোতে তেল মজুত করে রাখছে এবং উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে তেলের খনিগুলোকে সচল রাখছে। এ ছাড়া স্থলপথ দিয়ে বিশেষ করে মধ্য এশিয়ার মাধ্যমে রেলপথে তেল পাঠানোর চেষ্টাও চালাচ্ছে তেহরান।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান আগে থেকেই এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল এবং দশকের পর দশক ধরে চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের মধ্যে একটি বিশেষ ধরনের অর্থনৈতিক সহনশীলতা তৈরি হয়েছে, যা কেবল নৌ-অবরোধ দিয়ে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের আভাসও পাওয়া গেছে। একদিকে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা এই যুদ্ধকে একটি ‘অপ্রতিরোধ্য সামরিক বিজয়’ হিসেবে প্রচার করছেন। অন্যদিকে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আরও অনেক বেশি বাস্তবধর্মী ও সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি অবরোধকে ‘লোহার প্রাচীর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, কোনো জাহাজই এটি ভেদ করতে পারবে না। কিন্তু সিআইএ-র মতে, ইরান যদি এই প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে তার প্রভাব হবে ভয়াবহ।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার শিকার হওয়ার পর থেকে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে, যা বিশ্ব বাজারে তেলের সরবরাহকে ব্যাহত করছে। ট্রাম্প সম্প্রতি ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি মিশন চালু করেছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল মার্কিন নৌবাহিনীর প্রহরায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার করা। কিন্তু শান্তি আলোচনার দোহাই দিয়ে পরে তা স্থগিত করা হয়।
ইরানের সামরিক সক্ষমতার বিষয়ে প্রতিবেদনে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। যুদ্ধের আগে ইরানের কাছে প্রায় আড়াই হাজার ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং হাজার হাজার ড্রোন ছিল। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের একটি ভিজ্যুয়াল তদন্তে উঠে এসেছে যে, ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর অন্তত ২২৮টি স্থাপনা বা সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা ট্রাম্প সরকার প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশেষভাবে ড্রোন ব্যবহারের দিকে আঙুল তুলেছে। ব্যালিস্টিক মিসাইলের চেয়েও ড্রোনগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কারণ, এগুলো ছোট ছোট গুদাম বা সাধারণ কারখানায় তৈরি করা যায় এবং সহজে লুকিয়ে রাখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে ইরানের বিশাল মিসাইল বাহিনীর প্রয়োজন নেই; সামান্য একটি ড্রোন দিয়ে কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোই যথেষ্ট হবে–যাতে বীমা কোম্পানিগুলো সেই পথে জাহাজ পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে পুরো অঞ্চলটি একটি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার দিকে চলে যেতে পারে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রতিবেদনে তেল আবিবভিত্তিক ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’-এর সিনিয়র গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। তিনি ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের ইরান শাখার প্রাক্তন প্রধান ছিলেন।
সিট্রিনোভিচ সতর্ক করেছেন যে, এই যুদ্ধের ফলাফল শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘কৌশলগত ব্যর্থতা’ হতে পারে। তার মতে, ওয়াশিংটন যে লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল–অর্থাৎ, ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা বা তাদের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা–তা হয়তো পূরণ হবে না। বরং এই যুদ্ধের শেষে ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি উগ্র ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং তারা বিশ্বাস করে যে, তারা মার্কিন রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তিকে পরাজিত করতে পারবে। সিট্রিনোভিচ মনে করেন, ইরান এই অবরোধের মুখেও মাথা নত করবে না এবং শেষ পর্যন্ত তারা পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ ও প্রক্সি গোষ্ঠীদের সমর্থন বজায় রেখেই আলোচনায় ফিরবে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এই প্রতিবেদনটি বলছে যে, মার্কিন প্রশাসনের অত্যধিক আশাবাদ এবং গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি যদিও দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতেই সব কার্ড রয়েছে এবং ইরান আলোচনায় আসতে বাধ্য হবে। কিন্তু সিআইএ-র গোপনীয় নথিটি বলছে ভিন্ন কথা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের পরও দেশটির প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি। বরং তারা স্থলপথে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার এবং বিকল্প উপায়ে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৬ সালের এই মে মাসে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি এমন এক মোড়ে পৌঁছেছে, যেখানে কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে দমানো সম্ভব হচ্ছে না, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের আশঙ্কাই প্রবল হচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের এই মূল্যায়ন যদি সঠিক হয়, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘ইকোনমিক ফিউরি’ বা অর্থনৈতিক ক্রোধ ইরানকে সংলাপে বসানোর বদলে দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংঘাতের দিকেই ঠেলে দিতে পারে।