লড়াই যখন বিরল খনিজে, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া তখন সুবিধার খোঁজে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
লড়াই যখন বিরল খনিজে, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া তখন সুবিধার খোঁজে
পিট হেগসেথ জানান,চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাথে তার ফোন কলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

স্মার্টফোন থেকে শুরু করে আধুনিক সমরাস্ত্র-সব জায়গাতেই এখন অন্যতম প্রধান উপাদান হয়ে উঠেছে বিরল খনিজ। এতদিন মনে করা হয়েছিল ইউক্রেন যুদ্ধে এই বিরল খনিজকেই প্রধান ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ নিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সমঝোতা করতে চাইছেন তিনি।

সেই বিরল খনিজ ইস্যুতে আলোচনায় ট্রাম্পের দক্ষিণপূর্ব এশিয়া সফর এবং এই অঞ্চল নিয়ে বিশ্বনেতাদের নাড়াচাড়া।

হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট বলছে, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সামরিক সরঞ্জামের মতো আধুনিক প্রযুক্তির অপরিহার্য উপাদান বিরল মৃত্তিকা খনিজ নিয়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এখন ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যদিও চীন এখনো বৈশ্বিক পরিশোধন প্রযুক্তিতে একক আধিপত্য ধরে রেখেছে। তবে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো আসিয়ান দেশগুলো তাদের বিশাল অব্যবহৃত মজুতকে কাজে লাগিয়ে এ প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তপোক্ত করতে চাইছে।

বিরল মৃত্তিকার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক উত্তোলন ও সরবরাহে এখন পর্যন্ত চীনই নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই খনিজকে কৌশলগত সম্পদে রূপান্তরের উন্নত পরিশোধন প্রযুক্তির প্রায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বেইজিংয়ের হাতে।

কারা কী করছে

মালয়েশিয়ার মাটির নিচে খনিজ উপাদান থাকলেও সেটিকে কৌশলগত সম্পদে পরিণত করার জ্ঞান ও সক্ষমতা এখনো প্রধানত চীনা কোম্পানিগুলোর কাছেই রয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রায় ১৬ মিলিয়ন টনের বেশি বিরল মৃত্তিকা মজুত নিয়ে মালয়েশিয়া দেশীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চুম্বক উৎপাদন সক্ষমতা বিরাট অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করেছে। তারা বিদেশি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় অংশীদারত্বের মাধ্যমে এর মুনাফাও নিজেদের হাতে রাখতে চাইছে।

এই সময়ে বিরল খনিজ ও তা ব্যবহারে তৈরি নানা পণ্য মানুষের জীবনের সঙ্গে একেবারে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
এই সময়ে বিরল খনিজ ও তা ব্যবহারে তৈরি নানা পণ্য মানুষের জীবনের সঙ্গে একেবারে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

এদিকে বৈদ্যুতিক মোটর ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিওডিমিয়াম ও প্র‍্যাসিওডিমিয়াম সমৃদ্ধ মনাজাইট খনিজ ধারণকারী ইন্দোনেশিয়াও পিছিয়ে না পড়ার নীতি অনুসরণ করছে। তবে তাদের এই প্রযুক্তির অভাব চীনের সঙ্গে অংশীদারত্বের পথ খুলে দিতে পারে।

একই চিত্র ভিয়েতনামেরও। দেশটির লাই চৌ প্রদেশের মতো স্থানে বড় মজুত থাকলেও পরিশোধন প্রযুক্তিতে চীনের আধিপত্যের কারণে তারাও এখনো অঙ্কুরেই রয়েছে।

ট্রাম্পের খেলায় কে খেলবে

বিরল মৃত্তিকা সরবরাহে চীনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে আসিয়ানকে বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে দেখছে আমেরিকা। থাইল্যান্ডের সঙ্গে বিরল মৃত্তিকা নিয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হলেও স্থানীয় পরিশোধন বা প্রযুক্তি হস্তান্তরে ওয়াশিংটনের কার্যকর বিনিয়োগের অভাব রয়েছে। এর ফলে আমেরিকা এখনও চীনা-নিয়ন্ত্রিত সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল থেকে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, চীন এই অঞ্চল থেকে কাঁচামাল নিশ্চিত করে এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে দ্বিগুণ সুবিধা পাচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এখন কেবল সম্পদ সরবরাহকারী নয় বরং উচ্চ-বাণিজ্যের এই ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ, পরিবেশগত ও সুশাসনের মান বজায় রেখে বিদেশি পুঁজি আকর্ষণ করা এবং একই সঙ্গে কৌশলগত সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো থেকে নিজেদের রক্ষা করা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও আর্থিক ক্ষমতার কারণে আপাতত এই খেলায় চীনই স্পষ্ট বিজয়ী। তবে আমেরিকা ও তার মিত্ররা যদি আসিয়ানের পরিশোধন শিল্পে বাস্তবসম্মত বিনিয়োগ করে, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে পারে।

এখন তাহলে কী হবে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের বুসানে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বৈঠকই বলে দিচ্ছে, কেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিরল মৃত্তিকা একটি কৌশলগত যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবেই থাকবে। আমেরিকা ও চীন যথাক্রমে বিরল মৃত্তিকা এবং সেমিকন্ডাক্টরের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ স্থগিত করতে সম্মত হয়েছে, যে পদক্ষেপটিকে ট্রাম্প বিশ্বের জন্য একটি জয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

ল্যানথেনাইড সিরিজের ১৫টি মৌল এবং স্ক্যান্ডিয়াম ও ইত্রিয়াম মিলিয়ে ১৭টি ধাতুকে একসঙ্গে বিরল খনিজ বলা হয়।
ল্যানথেনাইড সিরিজের ১৫টি মৌল এবং স্ক্যান্ডিয়াম ও ইত্রিয়াম মিলিয়ে ১৭টি ধাতুকে একসঙ্গে বিরল খনিজ বলা হয়।

তবে, বিরল মৃত্তিকা সম্পর্কিত এই চুক্তিটি অস্থায়ী এবং এটি বার্ষিকভাবে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, বিরল মৃত্তিকার বনাম উন্নত মাইক্রো চিপের ওপর এই অচলাবস্থা সম্ভবত বহু বছর ধরে চলতে থাকবে, যা বিরল মৃত্তিকাকে চীনের জন্য একটি শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করবে।

ভবিষ্যতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোকে কেবল গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলোর নিষ্ক্রিয় উৎস হিসেবে থাকলে চলবে না। পরিবর্তে, তাদের একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হয়ে উঠতে হবে, যেখানে সম্পদ কূটনীতি প্রযুক্তিগত সুবিধা, সরবরাহ শৃঙ্খলের সুরক্ষা এবং বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার ভারসাম্যকে আকার দেবে।

সম্পর্কিত