ট্রাম্পের চাপ কি চীনকে আরও শক্তিশালী করছে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ট্রাম্পের চাপ কি চীনকে আরও শক্তিশালী করছে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একে অপরের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে এবং নতুন শুল্কের হুমকি দিয়েছে, অন্যদিকে চীন পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে নিষেধাজ্ঞা ও বিরল খনিজ উপাদানের ওপর রপ্তানি সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে।

দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। হোয়াইট হাউস মনে করছে, এই অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধে আমেরিকারই প্রাধান্য রয়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের ভাষায়, চীন “দুর্বল।” কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তবে এমনটি মনে করছে না ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট। চীন আসলে এই বাণিজ্যযুদ্ধে এগিয়ে রয়েছে। দেশটি এখন আমেরিকার মতোই দক্ষভাবে চাপের জবাব দিতে এবং প্রতিশোধ নিতে সক্ষম। পাশাপাশি, চীন নতুন বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামো গঠনের চেষ্টা করছে, যা ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ পরিবর্তন করছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ওভাল অফিসে ফিরে আসার পর চীনবিষয়ক তার নীতি আরও কঠোর হয়েছে। যদিও তাইওয়ান বা মিত্রদের রক্ষায় তিনি কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। তবে বাণিজ্যে তার অবস্থান একেবারেই স্পষ্ট। তিনি প্রথম মেয়াদে শুরু করা চাপ প্রয়োগের নীতিকে আরও তীব্র করেছেন। নতুন শুল্ক, প্রযুক্তি রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ, আর নিষেধাজ্ঞার ব্যাপক প্রয়োগই এখন তার হাতিয়ার। মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য চীনের শিল্পক্ষমতাকে দুর্বল করা, অর্থনৈতিক ছাড় আদায় করা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি শ্লথ করা।

কিন্তু ছয় মাস পর দেখা যাচ্ছে, চীন তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি স্বস্তিতে আছে। এর পেছনে তিনটি বড় কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

প্রথমত, চীন আমেরিকার চাপ সহ্য করতে এবং প্রতিশোধ নিতে সক্ষমতা দেখিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক শুল্ক সিদ্ধান্ত ওয়াল স্ট্রিটে অস্থিরতা তৈরি করলে তা প্রত্যাহার করতে হয়েছে। চীনের বিরল খনিজ রপ্তানি সীমিত করার পদক্ষেপের জবাবে ট্রাম্প শতভাগ শুল্কের হুমকি দিলেও শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর করতে পারেননি। চীনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বাজারে আত্মবিশ্বাস এরই প্রমাণ। এ বছর ডলারের হিসেবে চীনের শেয়ারবাজার বেড়েছে ৩৪ শতাংশ।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

দ্বিতীয়ত, চীন প্রতিশোধের কৌশলে পারদর্শিতা দেখিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে, চীনও আমেরিকান পণ্যের ওপর পাল্টা কর আরোপ করে। ডুপন্ট, গুগল, এনভিডিয়া ও কোয়ালকমের মতো মার্কিন কোম্পানির বিরুদ্ধে অ্যান্টিট্রাস্ট তদন্তের হুমকিও দেয় তারা। একই সঙ্গে আমেরিকান সয়াবিন কেনা বন্ধ করে দেয় চীন। এটি যা মধ্য-পশ্চিমের আমেরিকার কৃষকদের জন্য ১২ বিলিয়ন ডলারের বাজার। এর মাধ্যমে চীন সরাসরি ট্রাম্পের ভোটভিত্তিতে আঘাত হানে।

তৃতীয়ত, চীন বিশ্ব বাণিজ্যের নতুন নিয়মকানুন গঠনের পথে হাঁটছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র যেখানে পুরনো উদার বাণিজ্যনীতিকে ধ্বংস করছে, অন্যদিকে চীন তার নেতৃত্বে নতুন কাঠামো দাঁড় করাচ্ছে। চলত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে চীনের মোট রপ্তানি বেড়েছে আট শতাংশের বেশি, যদিও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমেছে ২৭ শতাংশ। চীনের বিরল খনিজ রপ্তানিতে সীমা আরোপ কেবল প্রতিশোধ নয়, বরং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব বিস্তারেরও কৌশল। উৎপাদন খাতে প্রভাবশালী অবস্থান ও প্রায় ৭০টি দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে চীন এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ম নতুন করে লিখছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এই বাণিজ্যযুদ্ধ চীনের নেতা সি চিনপিং ও কমিউনিস্ট পার্টিকে দুর্বল না করে বরং আরও শক্তিশালী করেছে। অনেক চীনা মনে করে ট্রাম্পের চাপই চীনের উন্নতিকে ত্বরান্বিত করেছে।

অবশ্য চীনের এসব নীতিতে ঝুঁকিও কম নয়। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন বাজার খোঁজার চেষ্টায় চীন আরও অনেক দেশের প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে। বৈশ্বিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থার জটিলতা নিজেদের জন্যও সমস্যা তৈরি করতে পারে। অর্থনৈতিক শক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা শেষ পর্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এতে অন্য দেশগুলো বিকল্প পথ ও উদ্ভাবনের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, এবার দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও সি চিনপিংয়ের সাক্ষাৎ হয়তো সাময়িকভাবে উত্তেজনা কমানোর নাটক মঞ্চস্থ করবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো দুই দেশের কেউই বিরোধ কমাতে আগ্রহী নয়। উভয়ই এখন অর্থনৈতিক শক্তিকে রাজনৈতিক অস্ত্রে রূপ দিচ্ছে।

চীন আপাতত ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধে এগিয়ে আছে, কিন্তু এই সংঘাতের শেষ বিশ্লেষণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবাই। কারণ উন্মুক্ত বাণিজ্য থেকে পিছু হটা মানে বিশ্ব অর্থনীতির পরাজয়।

সম্পর্কিত