ads

আসিম মুনির ও ইমরান খানের লড়াই কি শেষ হবে?

একদিকে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির নিজেকে রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকায় তুলে ধরছেন, অন্যদিকে একটি ছোট, সাত ফুট বাই আট ফুটের কারাকক্ষে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন ইমরান খান।

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
আসিম মুনির ও ইমরান খানের লড়াই কি শেষ হবে?
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ফাইল ছবি

পাকিস্তানের রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দুই প্রভাবশালী ব্যক্তি। রাজনৈতিক অবস্থান, আদর্শ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিক থেকে তারা একে অপরের কট্টর প্রতিদ্বন্দ্বী।

দীর্ঘদিন পরস্পরের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা ও রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে এলেও দেশটির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের ভাগ্য যেন অদৃশ্য এক সুতোয় বাঁধা পড়ে গেছে। ফলে একজনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই অন্যজনের অবস্থান ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে পাকিস্তানের রাজনীতির টানাপোড়েন ও এই দুই চরিত্রের ভূমিকা উঠে এসেছে।

যাদের নিয়ে কথা হচ্ছে, তাদের একজন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ক্রিকেটার হিসেবে পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ জেতানোর পর তিনি ২০১৮ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। ক্ষমতায় আসতে তিনি সেনাবাহিনীর সমর্থন পেয়েছিলেন। সে সময় পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারিয়েছিল সেনাবাহিনী।

তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান খানকে অনেকেই অস্থির ও খামখেয়ালি নেতা মনে করতেন। তার নানা সিদ্ধান্তে সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক মহল অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। পরে দুর্নীতির একটি মামলায় তাকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যদিও তার সমর্থকদের দাবি, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কারাগারে থাকলেও ইমরান খানের জনপ্রিয়তা বরং আরও বেড়েছে।

অপর চরিত্রটি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ২০১৯ সালে ইমরান খান তাকে গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। সে সময় গুঞ্জন ছিল, ইমরান খানের স্ত্রীর কর-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে তদন্ত করছিলেন মুনির। পরে ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আসিম মুনির সেনাপ্রধান হন এবং ধীরে ধীরে সেনাবাহিনীর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেন। পরে তিনি ফিল্ড মার্শাল পদও পান। তার নেতৃত্বে সরকারে সেনাবাহিনীর প্রভাব আরও বেড়েছে।

একই সঙ্গে ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফকে (পিটিআই) নানা চাপে রাখা হয়েছে। দলটি নিষিদ্ধ না হলেও এর অনেক শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং নির্বাচনে সমান সুযোগ পায়নি।

একসময় পর্দার আড়ালে কাজ করা আসিম মুনির এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ সক্রিয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে ভূমিকা রাখার কারণে তিনি আলোচনায় আসেন।

জুন মাসে সুইজারল্যান্ডে এক সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে নিজের জীবনের দুই ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ’ মানুষের একজন বলে উল্লেখ করেন। অন্যজন ছিলেন তার স্ত্রী।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, একদিকে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির নিজেকে রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকায় তুলে ধরছেন, অন্যদিকে একটি ছোট, সাত ফুট বাই আট ফুটের কারাকক্ষে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন ইমরান খান। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কারাগারে তার এক হাজার দিন পূর্ণ হয়েছে।

গত আট মাস ধরে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে তার যোগাযোগ খুবই সীমিত। সময় কাটানোর জন্য তার কাছে রয়েছে শুধু একটি ব্যায়ামের সাইকেল এবং কয়েকটি বই।

ইমরান খানের বোন আলিমা খান অভিযোগ করেন, কর্তৃপক্ষ তার ভাইয়ের মনোবল ভেঙে দিতে চাইছে। পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও ফোনে কথা বলার সুযোগও সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে নিয়মিত তার পছন্দের অ্যাভোকাডো পাঠানো হয়।

আলিমা খান আরও জানান, রক্ত জমাট বাঁধার একটি সমস্যার কারণে ইমরান খানের দৃষ্টিশক্তিও কমে যাচ্ছে। এ জন্য তিনি পাঁচ দফা চিকিৎসা নিয়েছেন। কঠোর নজরদারির মধ্যে তার চিকিৎসা করা হয়েছে। তার স্বাস্থ্য নিয়ে সরকারের দেওয়া তথ্য নিয়েও পরিবারের সন্দেহ রয়েছে। তারা বারবার তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর আবেদন জানালেও এখন পর্যন্ত অনুমতি মেলেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, আসিম মুনির যতদিন ক্ষমতায় থাকবেন, ততদিন ইমরান খানের কারাগারে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। সাম্প্রতিক সাংবিধানিক পরিবর্তনের কারণে সেনাপ্রধান চাইলে আরও এক দশক বা তারও বেশি সময় পদে থাকতে পারেন। তবে ইমরান খানের জনপ্রিয়তা এখনও সরকারের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, জনগণের পূর্ণ সমর্থন না থাকা সরকারের জন্য তার জনপ্রিয়তা অস্বস্তির কারণ। গভীর রাতে তাকে হাসপাতালে নিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর ঘটনাও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সরকার তার জনসমর্থন সম্পর্কে সচেতন। তাই আপাতত তাকে কারাগারে রাখাই সরকারের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ পথ বলে মনে হতে পারে। তবে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে বা জনগণের অসন্তোষ বাড়লে, এই কৌশল সরকারের জন্য ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

asim munir
asim munir

এখন সিদ্ধান্তের ভার কার হাতে?

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব পড়ার আগেই পাকিস্তান সরকার জনপ্রিয়তা হারাচ্ছিল। যুদ্ধের পর জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম আরও বেড়ে যায়। মে মাসে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি পৌঁছায় ১১ দশমিক ৭ শতাংশে। গত মাসে উত্তরাঞ্চলের গিলগিট-বালতিস্তানের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন পিএমএল-এন দলও আসন হারায়।

বিশ্লেষকদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব নতুন রাজনৈতিক মুখ খুঁজতে পারে। পিটিআইয়ের সিনেটর আলি জাফর বলেন, “পাকিস্তানের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, অজনপ্রিয় ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখা যায় না।”

ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের কিছু নেতা মনে করেন, ভবিষ্যতে আবার সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করার পথ তৈরি হতে পারে। তবে এ নিয়ে দলটির ভেতরেই মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ইমরান খানের পরিবার অভিযোগ করেছে, তার চলমান আইনি মামলাগুলো নিয়ে দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা প্রায় নীরব।

imran khan 2
imran khan 2

এ মুহূর্তে ইমরান খান ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা খুবই কম। শুধু পিটিআই নয়, প্রতিষ্ঠিত অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও বলছেন, সরকারের সমালোচনা করাও এখন কঠিন হয়ে উঠছে।

পাকিস্তানের সাবেক অর্থমন্ত্রী মিফতাহ ইসমাইল বলেন, “বিরোধী রাজনীতির পরিসর ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে।”

এদিকে, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির আপাতত কোনো সমঝোতার ইঙ্গিত দিচ্ছেন না। গত মাসেও আদালত পিটিআইয়ের চার নেতাসহ বেলুচিস্তানের এক আলোচিত অধিকারকর্মীকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেন। অন্যদিকে, ইমরান খান এখনো নিজের অবস্থানে অনড়। পরিবারের সদস্যদের তিনি বলেছেন, প্রতিদিন দুই ঘণ্টা ব্যায়াম করার কারণে তিনি আগের চেয়ে ভালো শারীরিক অবস্থায় আছেন।

গত ডিসেম্বরে এক দর্শনার্থীর মাধ্যমে দেওয়া সর্বশেষ বার্তায় তিনি আসিম মুনিরকে ‘মানসিকভাবে অস্থির’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। সেই সঙ্গে পাকিস্তানের জনগণকে ‘দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলতে’ আহ্বান জানান। এরপর থেকে তিনি আর কোনো প্রকাশ্য বার্তা দেননি। এতে অনেকের ধারণা, তার অবস্থান এখনও বদলায়নি।

ইমরান খানের বোন আলিমা খানের মতে, দুই পক্ষের মধ্যে এখন ‘ধৈর্যের লড়াই’ চলছে। আর ইমরান খানের বিশ্বাস, ‘স্বাধীনতা, নইলে মৃত্যু’।

সম্পর্কিত