১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার ভোটের মাঠে এসে ন্যাপের মোজাফফর আহমেদকে ৮৪০ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। এরপর টানা চারবার কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
গত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই এলাকায় তিনিই একমাত্র বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে এবারের নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হতে পারেননি। এর ফলে এই আসনে বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই। ৪০ বছর পর সংসদ নির্বাচনে নেই মুন্সী পরিবার (দেবীদ্বারের রাজনীতি মুন্সী পরিবার নিয়ন্ত্রণ করে)।
এ অবস্থায় এই আসনে বিএনপি গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী মো. আ. জসিম উদ্দিনকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমেছে। নির্বাচনে জসিমের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক ও জামায়াত সমর্থিত ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মো. আবুল হাসনাত ওরফে হাসনাত আবদুল্লাহ।
স্থানীয়রা বলছেন, নির্বাচনী মাঠে হাসনাতই একমাত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তার প্রচারণায় তরুণরা বেশি উপস্থিত থাকেন। তবে কেন্দ্রীয় বিএনপি এই আসনে গণঅধিকার পরিষদের জসিমকে বেছে নিয়েছে। দলীয় নেতা-কর্মীরা বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) থেকে ট্রাক প্রতীকের পক্ষে মাঠে নেমেছেন। এতে ভোটের লড়াই ক্রমে জমে উঠছে। এই আসনে ভোট হবে তরুণদের।
প্রার্থী কারা
কুমিল্লা-৪ আসনের পাঁচ সংসদ সদস্য প্রার্থী হলেন এনসিপির মো.আবুল হাসনাত (শাপলা কলি), গণঅধিকার পরিষদের মো. আ. জসিম উদ্দিন (ট্রাক), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আ. করিম (হাত পাখা), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের ইরফানুল হক সরকার (আপেল) ও খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ মজিবুর রহমান (দেওয়াল ঘড়ি)। এর মধ্যে ইরফানুল এনসিপির হাসনাতকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচনী কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন।
এ আসনে এবার ভোটার সংখ্যা চার লাখ ১০ হাজার ৫৫৯ জন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ১১৬টি ভোটকেন্দ্রে ভোট দেবেন তারা। এ আসনে একটি পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়ন আছে।
হাসনাত আবদুল্লাহর বাড়ি উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের গোপালনগর গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের ব্যাপারী বাড়ির বাসিন্দা। এক সময় হাসনাতের পরিবার দেবীদ্বার নিউ মার্কেট গোমতী আবাসিক এলাকায় থাকত। ২৪-এর জুলাই আন্দোলনের পর তাদের পুরো পরিবার ঢাকায় চলে যায়। হাসনাতের পক্ষে দেবীদ্বার উপজেলার তরুণরা কাজ করছেন। এছাড়া হাসনাতের পক্ষে আওয়ামী লীগের একটি অংশ ও কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতা কাজ করছেন বলে এলাকায় প্রচার আছে।
ধামতী এলাকার বাসিন্দা মো. বদরুল আলম বলেন, “হাসনাত দুর্নীতির বিরুদ্ধে বার্তা নিয়ে এসেছেন। এই তরুণকে এবার ভোট দেব।”
এনসিপির প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “আমি চাই নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হোক। প্রতিদ্বন্দ্বী থাকা দরকার। ভোটের অধিকারের জন্যই তো লড়াই করেছি। কে কাকে সমর্থন দিল, সেটা নিয়ে ভাবছি না। আমি আমার কাজ করছি।”
হাসনাতের নির্বাচনী সভায় কিছুক্ষণ
দেবীদ্বারের জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের খয়রাবাদ মাদ্রাসা মাঠে গত বৃহস্পতিবার শাপলা কলি প্রতীকের নির্বাচনী সভা ছিল। উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে বেশির ভাগই তরুণ।
ওই সভায় হাসনাত বলেন, “দেবীদ্বার থেকে টেন্ডারবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের দূর করা হবে। আমি রাজনীতিকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে চাই। কোনো অন্যায় কাজে আমাকে পাবেন না। আমি অন্যায় কাজ করতেও দেব না। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমার অবস্থান পরিষ্কার।”
জামায়াতের নেতাকর্মীরা এনসিপির পক্ষে প্রচারণায়
দেবীদ্বারে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা সবাই শাপলা কলি প্রতীকের পক্ষে কাজ করছেন। মূলত জামায়াতই সুসংগঠিতভাবে কাজ করছে। কুমিল্লা উত্তর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি কুমিল্লা-৪ আসনে জামায়াতের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। জোটের কারণে তিনি নির্বাচনে অংশ নেননি। তবে তিনি হাসনাতের পক্ষে প্রচারণায় আছেন। জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তির ওপর ভর করে হাসনাত আরও এগিয়ে গেছেন বলে মন্তব্য করেন সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, “আমরা শাপলা কলি প্রতীকের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।”
এদিকে ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী জসিম উদ্দিনের বাড়ি এলাহাবাদ গ্রামে। এই গ্রামের সবাই এককাট্টা জসিমের পক্ষে। এই গ্রাম ন্যাপের সাবেক প্রধান প্রয়াত মোজাফফর আহমেদের গ্রাম। গত বৃহস্পতিবার ওই গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে, সবাই ট্রাক প্রতীকের পক্ষে।
বিএনপির সমর্থন ট্রাক প্রতীকে
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টায় বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী দেবীদ্বারের গুনাইঘর গ্রামে জসিমের বাড়িতে আসেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বেলজিয়াম বিএনপির সভাপতি সাইদুর রহমান লিটন। তারা বিএনপির নেতা-কর্মীদের ট্রাক প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। দলের সবাইকে একযোগে কাজ করার নির্দেশ দেন।
মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী বলেন, দেবীদ্বারে ট্রাক প্রতীকই ধানের শীষ। ট্রাককে জেতাতে হবে। ট্রাক জিতলেই ধানের শীষের জেতা হলো।
বৃহস্পতিবার দুপুরে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ এফ এম তারেক মুন্সী নির্বাচনী এলাকায় এসে ট্রাক প্রতীকে কাজ করার জন্য দলের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়ে ঢাকায় চলে যান। তিনি বলেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্দেশনা দেবীদ্বারে ট্রাক প্রতীককে জেতাতে হবে।
গুলশান থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও তিতুমীর সরকারি কলেজ ছাত্রসংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জিএস) আবদুল আউয়াল খান বলেন, বিএনপির নেতা-কর্মীদের গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে হবে।
গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জসিম উদ্দিন বলেন, বিএনপির সমর্থন নিয়ে ট্রাক প্রতীক জিতবে। এই জয় হবে জোটের। বিএনপির। গণঅধিকার পরিষদের।
৪০ বছর পর ভোটে নেই মুন্সী পরিবার, স্বস্তিতে হাসনাত
কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় এনসিপির মো. আবুল হাসনাত ওরফে হাসনাত আবদুল্লাহ স্বস্তিতে আছেন। শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় তিনি জিততে পারেন বলে দেবীদ্বারের ভোটাররা মনে করছেন।
এই আসনে হাসনাতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য (১৯৯১, ৯৬, ৯৬ ও ২০০১) ও কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। ঋণখেলাপির কারণে তিনি এবার নির্বাচন করতে পারছেন না। এ অবস্থায় দেবীদ্বারের রাজনীতি নতুন মোড় নিল। ১৯৮৬ সালের পর এবারই মুন্সী পরিবার থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কেউ নির্বাচনে নেই।
দেবীদ্বারের বাসিন্দা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জসিম উদ্দিন বলেন, প্রায় ৪০ বছর পর দেবীদ্বারের নির্বাচনে মুন্সী পরিবার নেই। জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তিন দলেই মুন্সী পরিবার ছিল। এবার এই পরিবারের কেউ নেই।
কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ এফ এম তারেক মুন্সী বলেন, “দল উনাকে (মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী) মনোনয়ন দিয়েছে। ওই কারণে আমরা কেউ মনোনয়ন ফরম জমা দিইনি। এখন উনি ঋণখেলাপির কারণে বাদ পড়েছেন। এ অবস্থায় আমার দলেরও কেউ নেই। আমাদের পরিবারেরও কেউ নেই। তবে বিএনপি এখন গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে। মাঠে কাজ করছে।”
লেখক: সম্পাদক, আমার শহর, কুমিল্লা