২৭ বছর বয়সী মোহাইমিনুল রাফি বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার মতে এটিই হচ্ছে একটি নিরাপদ জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ। অর্থাৎ, একটি প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরি।
সারা দেশে নির্বাচনী প্রচার শুরুর পর থেকে তিনি এখন তার মতো মানুষদের লক্ষ্য করে দেওয়া নানা প্রতিশ্রুতি শুনতে পাচ্ছেন। বেকারদের জন্য নগদ অর্থ সহায়তা বা সুদমুক্ত ঋণ এবং ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে রাজনৈতিক নেতারা।
বেকার স্নাতকদের জন্য নগদ অর্থ সহায়তা বা সুদমুক্ত ঋণের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রাফি হেসে ফেললেন। তিনি বললেন, “অবশ্যই এটি সাহায্য করবে।” তারপর কিছুক্ষণ থেমে যোগ করলেন, “কিন্তু সত্যি বলতে, যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো–কর্মসংস্থানের একটি স্থিতিশীল বাজার এবং মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ।”
রাফি সেই সব তরুণদের একজন যারা শেখ হাসিনাবিরোধী ২০২৪ সালের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতিকে অন্যায্য মনে করে ওই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। পরে তা দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ওই আন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়।
এখন বাংলাদেশ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
ব্যালট পেপারে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়ায় এই লড়াই মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি ব্লকের মধ্যে হবে বলে আশা করা হচ্ছে। জামায়াত ইতোমধ্যেই উদারপন্থী মিত্রদের সঙ্গে জোট করেছে, যার মধ্যে অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টিও রয়েছে।
উভয় দলের শীর্ষ নেতারা এখন সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে এসে জনসভা ও পথসভায় বক্তব্য দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে দলগুলোর প্রার্থী ও কর্মীরা মানুষের চিরচেনা উদ্বেগের বিষয়গুলোকেই তুলে ধরছেন। চাকরি, দ্রব্যমূল্য কমানো, কর ছাড় এবং দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসানের কথা বলছেন তারা।
তবে বিশ্লেষক ও ভোটাররা বলছেন যে, এই প্রতিশ্রুতিগুলোর বেশির ভাগই মানুষের অনিশ্চয়তার মূল জায়গাকে শনাক্ত করতে পারছে। তবে তা এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ একাধিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে লড়াই করছে। ফলে প্রতিশ্রুতিতে থাকা এই বিশাল সুযোগ-সুবিধাগুলো বাস্তবে প্রদান করা যেকোনো সরকারের জন্যই কঠিন হতে পারে।
রাফি বলেন, “সবাই এমনভাবে চাকরি আর সামাজিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যেন এটা কোনো সুইচ। টিপলেই রাতারাতি সব বদলে যাবে।”
সিলেটে জনসমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহময়ান। ছবি: চরচাএই প্রতিশ্রুতিগুলো এমন এক সময়ে আসছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ মন্থর। ২০১৯ সালে করোনাভাইরাস মহামারির আগে প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ওপরে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা ৪-৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে খাদ্যদ্রব্যসহ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে (প্রায় ৯ শতাংশের আশপাশে) আটকে আছে। এই পরিস্থিতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২২-২৩ শতাংশের মধ্যেই স্থবির হয়ে আছে। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও ৭ শতাংশের নিচে। যেখানে ভারতে এই হার প্রায় ১২ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১০ শতাংশ। অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক চাপ ছাড়া মৌলিক পরিষেবাগুলোতে টেকসই অর্থায়নের জন্য একটি রাষ্ট্রের এই অনুপাত অন্তত ১৫ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন।
ঢাকার অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের ( পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “হাসিনা সরকার পতনের পর নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসন সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোতে কিছুটা তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতা আনতে পেরেছে।‘’
তবে তিনি আরও যোগ করেন যে, “ইউনূস প্রশাসন তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্দশা মেটাতে এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করতে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সাথে সম্পৃক্ত হতে চরম উদাসীনতা দেখিয়েছে।”
জিল্লুর রহমান বলেন, “এই মুহূর্তের অর্থনৈতিক বাস্তবতা হলো–দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্যের হার ফের বৃদ্ধি পাওয়া, কর্মসংস্থান খাতে জরুরি অবস্থা এবং স্থবির মজুরি। সরকার ব্যবসায়িক আস্থা তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে, যে কারণে বিনিয়োগের হার থমকে আছে।”
এই প্রেক্ষাপটে এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি বর্তমান অনিশ্চয়তা দূর করতে পারে, যা অনেক সিদ্ধান্তকে আটকে রেখেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জরুরি ভিত্তিতে একটি 'রিস্টার্ট' বা নতুন শুরু প্রয়োজন। নির্বাচন সেই সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে এর মাধ্যমে খুব নাটকীয় কোনো উন্নতির আশা করা কঠিন।
অর্থনীতির এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী–উভয় দলই একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি সামনে আনছে। দলগুলো এখনো তাদের পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেনি। তবে উভয় দলের নেতারা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, সম্প্রতি ঢাকায় পৃথক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে তারা যে নীতিগুলো উন্মোচন করেছেন, সেগুলোই প্রচারে প্রাধান্য পাবে।
বিএনপির প্রধান প্রতিশ্রুতি হলো প্রতিটি পরিবারের একজন নারীর নামে ইস্যু করা একটি ফ্যামিলি কার্ড। দলটির দাবি, প্রাথমিকভাবে ৪০ লাখ পরিবারকে এর আওতায় আনা হবে। এর মাধ্যমে হয় মাসে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা নগদ দেওয়া হবে অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য; যেমন–চাল, ডাল, তেল ও লবণ দেওয়া হবে।
বিএনপি নেতা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “নির্বাচিত হলে বিএনপি মানুষের পেছনে বিনিয়োগ করবে; বিশেষ করে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে। এ ছাড়া তারা কারুশিল্পী, তাঁতি ও ক্ষুদ্র শিল্পকে ঋণের মাধ্যমে সহায়তা করবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের পণ্যের ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণে সাহায্য করবে।”
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই পরিকল্পনার মূল চ্যালেঞ্জ হলো এর ব্যাপকতা ও বাস্তবায়ন। বাংলাদেশে বর্তমানে ১৩০টিরও বেশি কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষায় বছরে প্রায় ১.১৬ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির প্রায় ২%) ব্যয় হয়। বিএনপির ফ্যামিলি কার্ডের প্রতিশ্রুতি সারা দেশে কার্যকর করতে হলে বছরে আরও প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন টাকার প্রয়োজন হবে (প্রতি কার্ডে আড়াই হাজার টাকা হিসেবে)। অর্থাৎ, এই পরিকল্পনা সফল করতে সামাজিক সুরক্ষা খাতের বর্তমান বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন
বিএনপির শিক্ষা বিষয়ক প্রস্তাবগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘এক শিক্ষক, এক ট্যাব’ উদ্যোগ। এর আওতায় দলটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের পাঠদান ও প্রশিক্ষণে সহায়তার জন্য ট্যাবলেট কম্পিউটার দেওয়ার কথা বলেছে। এ ছাড়া মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের প্রসার, মাধ্যমিক স্তরে বাধ্যতামূলক কারিগরি শিক্ষা চালু এবং সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও দক্ষতা-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।
বিএনপি শিক্ষার্থীদের জন্য মিড-ডে মিল বা দুপুরের খাবার কর্মসূচি সম্প্রসারণের অঙ্গীকার করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরের কিছু অংশে স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম চালু থাকলেও এর পরিধি সীমিত এবং অসমান। মাধ্যমিক পর্যায়ে এখনো কোনো দেশব্যাপী স্কিম নেই।
দলটি আরও বলেছে, তারা খেলাধুলা, শিল্প ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা সম্প্রসারণ করবে। মাধ্যমিক স্তর থেকে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা হিসেবে আরবি, চীনা, কোরিয়ান, জাপানি ও জার্মান ভাষা শিক্ষা চালু করবে। দলটির নেতাদের মতে, এটি দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে দেবে।
বিএনপির নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ছবি: বাসসবিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের উচ্চতর ডিগ্রির দিকে বেশি ঠেলে দেয়, যা আসলে বেকারের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। বিএনপি চায় সারা দেশে কারিগরি স্কুল গড়ে তুলতে, যাতে হাই স্কুলের পর শিক্ষার্থীরা সরাসরি কর্মমুখী হতে পারে।” তিনি চীনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে, যা তাদের দেশে ও বিদেশে কাজ পেতে সাহায্য করে।
অন্যদিকে, জামায়াতের শিক্ষা পরিকল্পনায় রয়েছে মেধা ও অভাবের ভিত্তিতে নির্বাচিত ১ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত শিক্ষা ঋণ প্রদান। এ ছাড়া প্রতি বছর ১০০ শিক্ষার্থীকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার জন্য বার্ষিক সহায়তা এবং বড় কলেজগুলোকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
অধ্যাপক মোকাররম হোসেন বলেন, “জামায়াতের উচ্চশিক্ষার এই প্রস্তাব সুনির্দিষ্ট। এমআইটি, হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজের মতো শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীরা পুরো অর্থ সহায়তা পাবে। অন্যদের ক্ষেত্রে প্রথম দুই সেমিস্টারের জন্য সহায়তা দেওয়া হবে এবং বাকিটা সুদমুক্ত ঋণ হিসেবে শোধ করতে হবে।”
তবে হোসেন জিল্লুর রহমান এই ধরনের শিক্ষা ঋণ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থী ঋণের বিষয়টি খুব সতর্কতার সাথে ভাবা দরকার। উন্নত বিশ্বের অনেক তরুণের ওপর এই ঋণের বোঝা একটি অভিশাপের মতো চেপে বসে আছে।” তার মতে, কঠোর শর্ত ও সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণের মাধ্যমে বৃত্তির পরিধি বাড়ানো একটি নিরাপদ পদ্ধতি হতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “জিডিপির মাত্র ২% দিয়ে গুণগত সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।”
অর্থনীতিবিদ জিল্লুর রহমানের মতে, সামাজিক সুরক্ষার এই প্রতিশ্রুতিগুলো দলগুলোর জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। তিনি বলেন, “এখানে মূল চ্যালেঞ্জ শুধু অতিরিক্ত বাজেট নয়, বরং দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা বেরিয়ে যাওয়া বন্ধ করা এবং সঠিক টার্গেট গ্রুপের কাছে সুবিধা পৌঁছানো নিশ্চিত করা।”
বিএনপি এই সমস্যার সমাধানে আমলাতন্ত্র কমানো ও সেবা ডিজিটালাইজ করার কথা বলছে। আমীর খসরু বাংলাদেশকে একটি অত্যধিক নিয়ন্ত্রিত দেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এখানে স্তরে স্তরে অনুমতির প্রয়োজন হয়, যা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দেয়। তিনি বলেন, “সরকারি সেবা অনলাইনে নিয়ে এলে এবং কর্মকর্তাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে দিলে দুর্নীতির সুযোগ কমে আসবে।”
অন্যদিকে, জামায়াতের প্রধান কল্যাণমূলক প্রস্তাব হলো একটি স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড। দলটির মতে, এটি এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা যেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র, স্বাস্থ্যসেবা, কর এবং সামাজিক নিরাপত্তা সেবাগুলো যুক্ত থাকবে।
কুমিল্লায় জনসমাবেশে জামায়াতের আমির ডা.শফিকুর রহমান। ছবি: বাসসযুক্তরাজ্যের সোয়ানসি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মোকাররম হোসেন জামায়াতের এই পরিকল্পনা সমন্বয়ে সহায়তা করেছেন। তিনি বলেন, “তাদের দলের ফোকাস হলো সুশাসন, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং কার্যকারিতা বৃদ্ধি।” তিনি আরও বলেন, “জামায়াতের পরিকল্পনা শুধু নামমাত্র নগদ অর্থ বিলিয়ে দেওয়া নয়, বরং একটি একক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে মানুষ সেবা পাবে এবং সুবিধা বণ্টনে অনিয়ম কমবে।”
সিপিডির তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “যদি রাজস্ব আদায় বাড়ে, তবে এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাগুলো (উভয় জোটের) বাস্তবায়ন করা সম্ভব... এবং তা করা উচিতও।” তবে তিনি মনে করেন, এই মুহূর্তে বিএনপি ও জামায়াত উভয়কেই কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তাদের পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে যে, এই অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে, বাস্তবায়নে কত সময় লাগবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আসিফ শাহান বলেন, “এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবসম্মত হোক বা না হোক, ভোটারদের কাছে এগুলোর আবেদনের একটি বিশেষ কারণ রয়েছে।” তিনি বলেন, “মানুষ জটিল বার্তা পছন্দ করে না। আপনাকে মানুষের কাছে খুব সহজ বার্তা দিতে হবে।”
এই কারণেই বিস্তারিত নীতিমালার চেয়ে ফ্যামিলি কার্ড বা সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড-এর ধারণা বেশি কার্যকর হয়।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “সাধারণ ভোটাররা অসচেতন নন। ভোটাররা পর্যবেক্ষণ করছেন যে, কোনো দল ক্ষমতায় এসে সুবিধাগুলো কি সবার জন্য সমানভাবে দেবে, নাকি কেবল নিজেদের দলীয় সমর্থকদের দেবে।”
কার্ডভিত্তিক কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতিগুলো প্রচারণার কেবল একদিকের চিত্র।
উভয় রাজনৈতিক ব্লকই বাংলাদেশের ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণকে আকৃষ্ট করতে কর্মসংস্থানের ব্যাপক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
কর ছাড় এবং রাজস্ব সংকট
বিএনপি করের হারের বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু না বলে ব্যবসাবান্ধব সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ কমানোর সাধারণ প্রতিশ্রুতি দিলেও জামায়াত করের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে। তারা করপোরেট ট্যাক্স কমিয়ে ১৯ শতাংশ ও ভ্যাট ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছে।
বর্তমানে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কিছু কোম্পানিকে ৫০ শতাংশের বেশি কর দিতে হয়, আর বিলাসবহুল বা অনুৎসাহিত পণ্যের ওপর কর ৭০০ থেকে ৮০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
অধ্যাপক মোকাররম হোসেন বলেন, “জামায়াতের ফিন্যান্স পলিসি টিমের হিসাব অনুযায়ী, কেবল কর আদায় প্রক্রিয়া জোরদার করা, আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ এবং কর প্রশাসনে দুর্নীতি রোধ করে তারা ১.০৫ থেকে ২ ট্রিলিয়ন টাকা উদ্ধার করতে পারবে। এটি বাজেট না বাড়িয়েই দলের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।”
তার মতে, জামায়াতের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে আনুমানিক ২.৩৭ ট্রিলিয়ন টাকা খরচ হবে। অন্যদিকে, কঠোর কর ব্যবস্থা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ঋণ পুনর্গঠন-এর মাধ্যমে তারা ২.২১ ট্রিলিয়ন থেকে ৩.১৬ ট্রিলিয়ন টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব উৎস দেখছে।
তবে সিপিডির তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, “বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।” তিনি বলেন, “সেবামুখী কর ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় রিটার্ন জমা ও মূল্যায়ন এবং দক্ষ কর রিফান্ড ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। এটি কর ফাঁকি ও প্রশাসনিক বিলম্ব কমিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি করবে।”
২০২৪ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কলেজ-শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার স্নাতক বেকার রয়েছেন। অন্যদিকে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ, যার সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ।
বিএনপি ১৮ মাসের মধ্যে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত শিক্ষিত বেকারদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার কথা বলেছে।
দলটি ডিজিটাল অর্থনীতিকে একটি বড় কর্মসংস্থান ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেছে। তারা ৮ লাখ তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতের চাকরি এবং ফ্রিল্যান্সারদের আন্তঃদেশীয় আয় সহজ করতে পেপ্যাল-এর মতো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পেমেন্ট সিস্টেমগুলো খুবই দুর্বল। একাধিক গেটওয়ে চালু করলে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং এটি অনলাইন কর্মীদের সহায়তার পাশাপাশি আন্তঃদেশীয় ব্যবসা সহজ করবে।”
অন্যদিকে, জামায়াতের কর্মসংস্থানের প্রস্তাবগুলো মূলত প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা পাঁচ বছরের মধ্যে ১ কোটি তরুণকে প্রশিক্ষিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দলটি প্রতিটি উপজেলায় ইউথ টেক ল্যাব এবং জেলা পর্যায়ে জব ব্যাংক স্থাপনের কথা বলেছে, যার মাধ্যমে একই সময়ে ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে।
এ ছাড়া তারা ৫ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি, ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার গড়ে তোলা এবং স্বল্প শিক্ষিত তরুণদের জন্য আলাদা দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির পরিকল্পনা করেছে।
তবে জামায়াত বেকার স্নাতকদের জন্য দুই বছর পর্যন্ত মাসিক ১০ হাজার টাকা (প্রায় ৮০ ডলার) সুদমুক্ত ঋণের প্রস্তাবও দিয়েছে।
সোয়ানসি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মোকাররম হোসেন জোর দিয়ে বলেন, এই অর্থ ফেরত দিতে হবে। তিনি বলেন, “আমরা টাকা উপহার দিচ্ছি না; আমরা ঋণ দিচ্ছি, তবে তা সুদমুক্ত।”
এনসিপির নির্বাচনী মিছিল। ছবি: চরচাকিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উভয় পক্ষ যে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে টানা ৮ থেকে ১০ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে ব্যাপক বৃদ্ধি প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান সুদমুক্ত ঋণকে সমাধানের পথ হিসেবে দেখতে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “সুদমুক্ত ঋণ সাধারণত জনতুষ্টিমূলক ব্যবস্থা হয়ে থাকে, যার প্রমাণিত প্রভাব খুব একটা নেই। বেকার স্নাতকদের জন্য আসল সমাধান হলো তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রকৃত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।”
এর পাশাপাশি শিক্ষাও এখন নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
শিল্প ব্যয়, কৃষক এবং স্বাস্থ্য
ব্যবসায়ীদের সহায়তা করতে জামায়াত তিন বছরের জন্য শিল্প খাতের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম (ইউটিলিটি ট্যারিফ) অপরিবর্তিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া তারা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে ১০ শতাংশ মালিকানা শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ থাকবে।
অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “জামায়াতের করা প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে শিল্প খাতের ইউটিলিটি ট্যারিফ তিন বছর স্থির রাখার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি কার্যকর হওয়ার যোগ্যতা রাখে।”
ব্যবসায়ীদের প্রতি বিএনপির প্রস্তাব মূলত কোনো একক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। আমীর খসরু একে রাজনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যবসায়ীদের সাথে যুক্ত অলিগার্কিক অর্থনীতি (মুষ্টিমেয় ব্যক্তির শাসন) থেকে বেরিয়ে এসে সবার জন্য সমান সুযোগসম্পন্ন অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কৃষি খাতে বিএনপি একটি কৃষক কার্ড চালুর প্রস্তাব দিয়েছে। এর মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতির সুবিধা, সহজ ঋণ, শস্য বিমা, ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি এবং মোবাইলের মাধ্যমে বাজার ও আবহাওয়ার তথ্য পাওয়ার সুবিধা দেওয়া হবে। অন্যদিকে জামায়াত ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদমুক্ত ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে কৃষি নীতি বর্তমানে বড় ধরনের ভর্তুকি ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। চলতি অর্থবছরে সরকার কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রায় ৪০০ বিলিয়ন টাকা বরাদ্দ করেছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন যে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব সীমাবদ্ধতার মধ্যে এই সহায়তা আরও বাড়ানো কঠিন হবে। হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “উভয় দলের কৃষিবান্ধব ফোকাস প্রশংসনীয়, তবে এখানেও অর্থের অপচয় এবং ভুল লোক নির্বাচন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।”
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে স্বাস্থ্য খাতও বেশ গুরুত্ব পেয়েছে।
বিএনপি ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের অঙ্গীকার করেছে, যার ৮০ শতাংশই হবে নারী। তারা দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেবে। এ ছাড়া দলটি বিনামূল্যে প্রাথমিক ওষুধ এবং পিপিপি-র মাধ্যমে জটিল রোগের স্বল্পমূল্যে চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
জামায়াতের স্বাস্থ্য নীতির মধ্যে রয়েছে ৬০ বছরের বেশি বয়সী এবং ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, প্রতি জেলায় একটি করে মোট ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ এবং মা ও শিশুর জন্য প্রথম এক হাজার দিন নামক একটি বিশেষ কর্মসূচি।
হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, লড়াইটি এখন শুধু বড় বড় প্রতিশ্রুতির নয়, বরং নতুন সরকার অর্থনীতিতে চাপ না বাড়িয়ে তা পূরণ করতে পারবে কি না–সেটিই বড় প্রশ্ন। তার মতে, এর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মপদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তার মতে এই সরকার ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সাথে সম্পৃক্ত হতে এবং হাসিনা সরকারের আমলের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
চাকরিপ্রত্যাশী রাফি বিষয়টি আরও সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, “প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ। কিন্তু ব্যবসা করতে গিয়ে যদি চাঁদাবাজি আর চাকরির জন্য ঘুষ দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ না হয়, তবে আমরা যেখানে ছিলাম, সেখানেই পড়ে থাকব।”
(নিবন্ধটি আল জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন ইয়াসিন আরাফাত)