ভূরাজনীতির খেল: পর্ব ৩
ফজলুল কবির

১৮২৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো যে অবস্থানটি ঘোষণা করেছিলেন, সেই ‘মনরো ডকট্রিন’-এ যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ইউরোপের উপনিবেশবাদী দেশগুলোর হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষার চেষ্টা করেছিল। পশ্চিম গোলার্ধে নতুন করে ইউরোপের উপনিবেশ সম্প্রসারণের প্রবণতা তাকে ভীত করেছিল। কারণ, ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তাদের স্বাধীনতার তখনো ৫০ বছরও পূর্তি হয়নি। ফলে সিঁদুরে মেঘ দেখে তারা ভয় পেয়েছিল। আজ দুই শতক পর সেই মনরো ডকট্রিনই ফিরে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশবাদী উলঙ্গ রূপ নিয়ে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকা’ হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা বড় তীব্র হয়ে প্রকাশ পাচ্ছে।
কী একটু কেমন লাগছে শুনতে তাই না? কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও আমেরিকার মধ্যে তফাৎটা কী? সবাই তো আমেরিকাই বলে। হ্যাঁ, সবাই বলে। এটা সত্য। এটা এক ধরনের নির্দোষ বলাও বটে। কিন্তু এর সঙ্গে আছে এক গভীর রাজনীতি। এরই প্রকাশ পাচ্ছে এখন এই সময়ে এসে।
খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে, বিশ্বে যে সাত মহাদেশের কথা বলা হয়, তার একটি উত্তর আমেরিকা, আরেকটি দক্ষিণ আমেরিকা। এই উত্তর আমেরিকার একটি দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র। বাকি রয়েছে কানাডা, মেক্সিকো। শুধু তাই নয়, ছোট ছোট আরও দেশ রয়ে গেছে, যা আমেরিকা নামের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। মধ্য আমেরিকার সেই দেশগুলো অস্তিত্বশীল হলেও পরিচয় সংকটে ভুগছে। বাকি ছিল দক্ষিণ আমরিকা। বক্তব্য, ভাষ্য ইত্যাদির মধ্য দিয়ে অনেক আগেই, তাদের আমেরিকা পরিচয়টি খসে গেছে। ফুটবল না থাকলে এবং বিশ্বজনীন সে খেলায় মহাদেশটির একাধিক দেশ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব হাজির করতে না পারলে আমেরিকা নামের দাবিদার হিসেবে তাদের সলীল সমাধি হতো সেই কবেই।
অথচ আমেরিকা নামটি কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার জন্যই প্রযুক্ত হয়েছিল শুরুতে। খটকা লাগছে কি? একটু ইতিহাসে চোখ রাখা যাক। ‘হাউ টু হাইড অ্যান এম্পায়ার: আ হিস্টোরি অব দ্য গ্রেটার আমেরিকা’ বইয়ের লেখক ড্যানিয়েল ইমারওয়ার বলছেন, থিওডর রুজভেল্টের আগে এই আমেরিকা শব্দের প্রয়োগ প্রেসিডেন্ট হিসেবে কেউ করেননি। তার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা আমেরিকা শব্দের প্রয়োগ করতে শুরু করেন।

মনে রাখা জরুরি যে, ইউরোপীয়দের কাছ থেকে রক্ষাকবচ হিসেবে যে মনরো ডকট্রিন, তার আক্রমণাত্মক ভঙ্গিটিও কিন্তু এসেছিল রুজভেল্টের সময়েই ১৯০৪ সালে। টেডি রুজভেল্ট ক্ষমতায় ছিলেন ১৯০১ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত।
প্রসঙ্গে ফেরা যাক। কথা হলো আগে যদি আমেরিকা না বলত, তবে বলতটা কী? সোজা উত্তর-যুক্তরাষ্ট্র। আরেকটি ডাকও ছিল-কলাম্বিয়া। ২০ শতকের আগে কোনো সরকারি ভাষ্যেই আমেরিকা বলতে যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাত না। আরও ভালো করে বললে এর চলটি মূলত শুরু হয় রুজভেল্টের জমানায়, দেশটির উপনিবেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষার সময়টাতে। এই প্রয়োগের ক্ষেত্রে চিলি, কানাডা বিভিন্ন তরফ থেকেই আপত্তি এসেছে। কিন্তু ক্রমে বিশ্বমোড়লে রূপান্তরিত হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকা হয়ে ওঠা ঠেকানো ছিল অসম্ভব।
দেশটির নাম নিয়ে প্রশ্ন একদম শুরু থেকেই ছিল। দেশটির সরকারি নাম ছিল ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা’, যা সহজে মুখে আসে না। ড্যানিয়েল ইমারওয়ার জানাচ্ছেন, উনিশ শতকে মার্কিন রাজনীতিক ও চিকিৎসক স্যামুয়েল মিচিল এ সংকট কাটাতে দেশটির নাম প্রস্তাব করেন ‘ফ্রিডোনিয়া’ (Fredonia)। তারও আগে অবশ্য মার্কিন বিপ্লবের কবি হিসেবে পরিচিত ফিলিপ ফ্রেনো অনেকটা একই রকম চিন্তা থেকে ‘কলাম্বিয়া’ নামটির প্রস্তাব করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম স্থপতি জর্জ ওয়াশিংটন অভিষেক ও বিদায় উভয় ভাষণেই দেশটিকে ইউনাইটেড স্টেটস অথবা দ্য ইউনিয়ন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ড্যানিয়েল ইমারওয়ার লিখেছেন, ওয়াশিংটন সুনির্দিষ্ট কারণেই এমনটি করেছিলেন। ওয়াশিংটনের প্রজন্মের লোকেরা ভালোভাবেই জানতেন যে, ইউনাইটেড স্টেটস সমগ্র আমেরিকা মহাদেশকে নির্দেশ করে না। সেই কারণেই তারা অন্যান্য নাম ব্যবহার করতেন। যেমন ‘ইউনাইটেড স্টেটস’, ‘দ্য রিপাবলিক’ বা ‘দ্য ইউনিয়ন’।
প্রচলিত ছিল ফ্রেনোর দেওয়া নাম ‘কলাম্বিয়া’। ইতিহাসবিদ ক্যাটলিন ফিটজ লিখেছেন, প্রাথমিক পর্যায়ের প্রজাতন্ত্রটি ব্রিটেনের কাছ থেকে তাদের প্রতীকী স্বাধীনতা ঘোষণার সময় ‘কলাম্বিয়া’ নামটি ব্যবহার করেছিল। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের ব্রিটিশ নয়, কলম্বাসের সাথে যুক্ত করতে চেয়েছিল। অবশ্য কলম্বাস উত্তর আমেরিকায় কোনোদিন পা রাখেননি। সে অন্য আলোচনা।
কলাম্বিয়া নামটি এতটাই প্রচলিত ছিল যে, ১৭৮৪ সালে নিউইয়র্ক সিটির কিংস কলেজের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘কলাম্বিয়া কলেজ’ এবং ১৮০০ সাল নাগাদ নতুন রাজধানীর নাম হয় ‘ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া’। এখনো যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি কিন্তু এই ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়াতেই। উনিশ শতকের সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গানগুলোর মধ্যে ছিল ‘কলাম্বিয়া’, ‘হেইল, কলাম্বিয়া’ ও ‘কলাম্বিয়া, জেম অব দ্য ওশান’।
‘কলাম্বিয়া’ নামটি কেবল ব্রিটেনের সাথে সম্পর্কই ছিন্ন করেনি, এটি যুক্তরাষ্ট্রকে লাতিন আমেরিকার নব্য স্বাধীন প্রজাতন্ত্রগুলোর সঙ্গেও এক কাতারে নিয়ে এসেছিল। এর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ ছিল স্বল্পস্থায়ী স্বাধীন দেশ গ্রান কলাম্বিয়া (বর্তমান কলম্বিয়া, পানামা, ভেনেজুয়েলা ও ইকুয়েডর নিয়ে গঠিত এ ইউনিয়নের অস্তিত্ব ছিল ১৮১৯ থেকে ১৮৩১ সাল পর্যন্ত), যা দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের এক বিশাল অংশজুড়ে বিস্তৃত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ শুরুতে লাতিন আমেরিকার এই স্বাধীনতা সংগ্রামকে অত্যন্ত উদ্দীপনার সাথে গ্রহণ করে। এমনকি ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, পেরু ও গ্রান কলাম্বিয়ার বিভিন্ন সময়ের প্রেসিডেন্ট সিমোন বলিভারের নামানুসারে তারা কিছু শহরের নামও রেখেছিল। আজও ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ওহাইও, পেনসিলভানিয়া ও নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে ‘বলিভার’ নামে শহর রয়েছে।
সবকিছু বদলাতে শুরু করে ১৮৯৮ সাল থেকে। সে সময় স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত আজকের যুক্তরাষ্ট্র। সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কেবল স্প্যানিশ উপনিবেশ ফিলিপাইন, পুয়ের্তো রিকো ও গুয়ামই দখল করেনি, বরং স্পেনের অংশ নয়–এমন হাওয়াই ও আমেরিকান সামোয়াকেও নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।
সেই থেকে এক সময়ের ‘ফ্রিডোনিয়া’, যা স্বাধীন সত্তাকে মূল্য দিত, তা অন্যকে পরাধীন করার, নিজের পদানত করার এক নতুন যাত্রায় নামল। এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের ক্লাবে তাদের গর্বিত প্রবেশ। সেই সময় থেকেই ‘দ্য রিপাবলিক’, ‘দ্য ইউনিয়ন’, ‘দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’–এই পুরোনো নামগুলো তাদের কাছে আর যুৎসই লাগল না। রুজভেল্ট এলেন, এবং মনরো ডকট্রিনকে দিলেন নতুন আদল, যার মধ্য দিয়ে গোটা আমেরিকার রক্ষাকর্তা হিসেবে নিজেকে হাজির করতে চাইলেন। ভাষণেও উঠে এল ‘আমেরিকা’ নামটি।
যে বছর মনরো ডকট্রিনে রুজভেল্ট করোলারি যুক্ত হয়, ঠিক সেই বছরই শুরু হয়, পানামা খাল খননের কাজ। অবাক লাগছে কি? সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর মতো যুক্তরাষ্ট্রও সে সময় চেয়েছিল নৌশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে। আজও কি তা তার চাওয়ার অংশ নয়? ফলে সে বাণিজ্য রুটকে নিজের জন্য অবারিত করতে পানামা খাল খনন শুরু করে, যা সম্পন্ন হয় ১৯১৩ সালে। ক্যারিবিয়ানের মধ্য দিয়ে যুক্ত হয় প্রশান্ত ও আটলান্টিক।

খেয়াল করুন ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর কী বলছেন? ১৯৭৭ সালে চুক্তির মাধ্যমে যে খালের মালিকানা যুক্তরাষ্ট্র পানামাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, তার মালিকানা ফের চেয়ে বসেছে ওয়াশিংটন। এমনিতে তার নির্বাচনী প্রচারে এটা ছিল না। কিন্তু নির্বাচনের পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে হঠাৎ করেই ট্রাম্প বলতে শুরু করেন যে, পানামা খালে ব্যবহারের সময় বাড়তি পয়সা দিতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। ভেনেজুয়েলা থেকে মাদুরোকে অপহরণের পর তিনি যে কয়েকটি দেশ ও অঞ্চলের নাম উচ্চারণ করেছেন, তার মধ্যে পানামা খাল একটি। তার ভাষ্য ওই একই, চীনারা সব নিয়ে যাচ্ছে।
অথচ এ বিষয়ে হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের গ্রোথ ল্যাবের পরিচালক ও ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির অধ্যাপক রিকার্ডো হোসম্যান এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “পানামার কাছে সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার পর থেকে খালটি পানামা পরিচালনা করছে, চীনারা নয়। যখন দুটি নতুন বন্দরের নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তখন হংকংয়ের কোম্পানি ‘সি কে হাচিসন’ দরপত্র দিয়ে কাজ পায়। সে সময় কেউ তাদের চীনা কোম্পানি হিসেবে বিবেচনা করেনি। আমি আশা করি, সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী মার্কিন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘ব্ল্যাকরক’ যখন হাচিসনের স্থলাভিষিক্ত হবে এবং বন্দর পরিচালনাকারী কোম্পানির মালিকানা পাবে, তখন এই বিতর্কের অবসান ঘটবে।
তবে অধ্যাপক রিকার্ডোর মতো এতটা আশাবাদী হওয়াটা কঠিন। কারণ, শুধু বাণিজ্য নয়, এর সাথে পুরো অঞ্চলকে আমেরিকা নামের ছাতার নিচে এনে উত্তর ও দিক্ষণের ভেদরেখা মুছে দিয়ে নয়া বিশ্বব্যবস্থার ধ্বজা ফের ওড়ানোর আকাঙ্ক্ষাটি ক্রমে দৃশ্যমান হচ্ছে।
মানচিত্রে ভালো করে তাকালে পানামা খাল, ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, কিউবা ইত্যাদির অবস্থান ও তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণ আইঢাই করার কারণটি স্পষ্ট হয়। যুক্তরাষ্ট্র এই দখিনা দরজাটি খোলা রাখতে চায়। আর উত্তরে দিতে চায় জোর হাওয়া, যাতে গ্রিনল্যান্ড তার অঙ্গীভূত হয়। ফলে কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে নিজের সাথে জুড়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা গালফ অব মেক্সিকোকে গালফ অব আমেরিকা বলাটা নিতান্তই মুখ ফসকে বেরিয়ে আসা নিছক ট্রাম্পীয় বচন নয়। (চলবে)

১৮২৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো যে অবস্থানটি ঘোষণা করেছিলেন, সেই ‘মনরো ডকট্রিন’-এ যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ইউরোপের উপনিবেশবাদী দেশগুলোর হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষার চেষ্টা করেছিল। পশ্চিম গোলার্ধে নতুন করে ইউরোপের উপনিবেশ সম্প্রসারণের প্রবণতা তাকে ভীত করেছিল। কারণ, ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তাদের স্বাধীনতার তখনো ৫০ বছরও পূর্তি হয়নি। ফলে সিঁদুরে মেঘ দেখে তারা ভয় পেয়েছিল। আজ দুই শতক পর সেই মনরো ডকট্রিনই ফিরে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশবাদী উলঙ্গ রূপ নিয়ে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকা’ হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা বড় তীব্র হয়ে প্রকাশ পাচ্ছে।
কী একটু কেমন লাগছে শুনতে তাই না? কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও আমেরিকার মধ্যে তফাৎটা কী? সবাই তো আমেরিকাই বলে। হ্যাঁ, সবাই বলে। এটা সত্য। এটা এক ধরনের নির্দোষ বলাও বটে। কিন্তু এর সঙ্গে আছে এক গভীর রাজনীতি। এরই প্রকাশ পাচ্ছে এখন এই সময়ে এসে।
খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে, বিশ্বে যে সাত মহাদেশের কথা বলা হয়, তার একটি উত্তর আমেরিকা, আরেকটি দক্ষিণ আমেরিকা। এই উত্তর আমেরিকার একটি দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র। বাকি রয়েছে কানাডা, মেক্সিকো। শুধু তাই নয়, ছোট ছোট আরও দেশ রয়ে গেছে, যা আমেরিকা নামের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। মধ্য আমেরিকার সেই দেশগুলো অস্তিত্বশীল হলেও পরিচয় সংকটে ভুগছে। বাকি ছিল দক্ষিণ আমরিকা। বক্তব্য, ভাষ্য ইত্যাদির মধ্য দিয়ে অনেক আগেই, তাদের আমেরিকা পরিচয়টি খসে গেছে। ফুটবল না থাকলে এবং বিশ্বজনীন সে খেলায় মহাদেশটির একাধিক দেশ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব হাজির করতে না পারলে আমেরিকা নামের দাবিদার হিসেবে তাদের সলীল সমাধি হতো সেই কবেই।
অথচ আমেরিকা নামটি কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার জন্যই প্রযুক্ত হয়েছিল শুরুতে। খটকা লাগছে কি? একটু ইতিহাসে চোখ রাখা যাক। ‘হাউ টু হাইড অ্যান এম্পায়ার: আ হিস্টোরি অব দ্য গ্রেটার আমেরিকা’ বইয়ের লেখক ড্যানিয়েল ইমারওয়ার বলছেন, থিওডর রুজভেল্টের আগে এই আমেরিকা শব্দের প্রয়োগ প্রেসিডেন্ট হিসেবে কেউ করেননি। তার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা আমেরিকা শব্দের প্রয়োগ করতে শুরু করেন।

মনে রাখা জরুরি যে, ইউরোপীয়দের কাছ থেকে রক্ষাকবচ হিসেবে যে মনরো ডকট্রিন, তার আক্রমণাত্মক ভঙ্গিটিও কিন্তু এসেছিল রুজভেল্টের সময়েই ১৯০৪ সালে। টেডি রুজভেল্ট ক্ষমতায় ছিলেন ১৯০১ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত।
প্রসঙ্গে ফেরা যাক। কথা হলো আগে যদি আমেরিকা না বলত, তবে বলতটা কী? সোজা উত্তর-যুক্তরাষ্ট্র। আরেকটি ডাকও ছিল-কলাম্বিয়া। ২০ শতকের আগে কোনো সরকারি ভাষ্যেই আমেরিকা বলতে যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাত না। আরও ভালো করে বললে এর চলটি মূলত শুরু হয় রুজভেল্টের জমানায়, দেশটির উপনিবেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষার সময়টাতে। এই প্রয়োগের ক্ষেত্রে চিলি, কানাডা বিভিন্ন তরফ থেকেই আপত্তি এসেছে। কিন্তু ক্রমে বিশ্বমোড়লে রূপান্তরিত হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকা হয়ে ওঠা ঠেকানো ছিল অসম্ভব।
দেশটির নাম নিয়ে প্রশ্ন একদম শুরু থেকেই ছিল। দেশটির সরকারি নাম ছিল ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা’, যা সহজে মুখে আসে না। ড্যানিয়েল ইমারওয়ার জানাচ্ছেন, উনিশ শতকে মার্কিন রাজনীতিক ও চিকিৎসক স্যামুয়েল মিচিল এ সংকট কাটাতে দেশটির নাম প্রস্তাব করেন ‘ফ্রিডোনিয়া’ (Fredonia)। তারও আগে অবশ্য মার্কিন বিপ্লবের কবি হিসেবে পরিচিত ফিলিপ ফ্রেনো অনেকটা একই রকম চিন্তা থেকে ‘কলাম্বিয়া’ নামটির প্রস্তাব করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম স্থপতি জর্জ ওয়াশিংটন অভিষেক ও বিদায় উভয় ভাষণেই দেশটিকে ইউনাইটেড স্টেটস অথবা দ্য ইউনিয়ন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ড্যানিয়েল ইমারওয়ার লিখেছেন, ওয়াশিংটন সুনির্দিষ্ট কারণেই এমনটি করেছিলেন। ওয়াশিংটনের প্রজন্মের লোকেরা ভালোভাবেই জানতেন যে, ইউনাইটেড স্টেটস সমগ্র আমেরিকা মহাদেশকে নির্দেশ করে না। সেই কারণেই তারা অন্যান্য নাম ব্যবহার করতেন। যেমন ‘ইউনাইটেড স্টেটস’, ‘দ্য রিপাবলিক’ বা ‘দ্য ইউনিয়ন’।
প্রচলিত ছিল ফ্রেনোর দেওয়া নাম ‘কলাম্বিয়া’। ইতিহাসবিদ ক্যাটলিন ফিটজ লিখেছেন, প্রাথমিক পর্যায়ের প্রজাতন্ত্রটি ব্রিটেনের কাছ থেকে তাদের প্রতীকী স্বাধীনতা ঘোষণার সময় ‘কলাম্বিয়া’ নামটি ব্যবহার করেছিল। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের ব্রিটিশ নয়, কলম্বাসের সাথে যুক্ত করতে চেয়েছিল। অবশ্য কলম্বাস উত্তর আমেরিকায় কোনোদিন পা রাখেননি। সে অন্য আলোচনা।
কলাম্বিয়া নামটি এতটাই প্রচলিত ছিল যে, ১৭৮৪ সালে নিউইয়র্ক সিটির কিংস কলেজের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘কলাম্বিয়া কলেজ’ এবং ১৮০০ সাল নাগাদ নতুন রাজধানীর নাম হয় ‘ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া’। এখনো যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি কিন্তু এই ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়াতেই। উনিশ শতকের সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গানগুলোর মধ্যে ছিল ‘কলাম্বিয়া’, ‘হেইল, কলাম্বিয়া’ ও ‘কলাম্বিয়া, জেম অব দ্য ওশান’।
‘কলাম্বিয়া’ নামটি কেবল ব্রিটেনের সাথে সম্পর্কই ছিন্ন করেনি, এটি যুক্তরাষ্ট্রকে লাতিন আমেরিকার নব্য স্বাধীন প্রজাতন্ত্রগুলোর সঙ্গেও এক কাতারে নিয়ে এসেছিল। এর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ ছিল স্বল্পস্থায়ী স্বাধীন দেশ গ্রান কলাম্বিয়া (বর্তমান কলম্বিয়া, পানামা, ভেনেজুয়েলা ও ইকুয়েডর নিয়ে গঠিত এ ইউনিয়নের অস্তিত্ব ছিল ১৮১৯ থেকে ১৮৩১ সাল পর্যন্ত), যা দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের এক বিশাল অংশজুড়ে বিস্তৃত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ শুরুতে লাতিন আমেরিকার এই স্বাধীনতা সংগ্রামকে অত্যন্ত উদ্দীপনার সাথে গ্রহণ করে। এমনকি ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, পেরু ও গ্রান কলাম্বিয়ার বিভিন্ন সময়ের প্রেসিডেন্ট সিমোন বলিভারের নামানুসারে তারা কিছু শহরের নামও রেখেছিল। আজও ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ওহাইও, পেনসিলভানিয়া ও নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে ‘বলিভার’ নামে শহর রয়েছে।
সবকিছু বদলাতে শুরু করে ১৮৯৮ সাল থেকে। সে সময় স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত আজকের যুক্তরাষ্ট্র। সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কেবল স্প্যানিশ উপনিবেশ ফিলিপাইন, পুয়ের্তো রিকো ও গুয়ামই দখল করেনি, বরং স্পেনের অংশ নয়–এমন হাওয়াই ও আমেরিকান সামোয়াকেও নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।
সেই থেকে এক সময়ের ‘ফ্রিডোনিয়া’, যা স্বাধীন সত্তাকে মূল্য দিত, তা অন্যকে পরাধীন করার, নিজের পদানত করার এক নতুন যাত্রায় নামল। এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের ক্লাবে তাদের গর্বিত প্রবেশ। সেই সময় থেকেই ‘দ্য রিপাবলিক’, ‘দ্য ইউনিয়ন’, ‘দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’–এই পুরোনো নামগুলো তাদের কাছে আর যুৎসই লাগল না। রুজভেল্ট এলেন, এবং মনরো ডকট্রিনকে দিলেন নতুন আদল, যার মধ্য দিয়ে গোটা আমেরিকার রক্ষাকর্তা হিসেবে নিজেকে হাজির করতে চাইলেন। ভাষণেও উঠে এল ‘আমেরিকা’ নামটি।
যে বছর মনরো ডকট্রিনে রুজভেল্ট করোলারি যুক্ত হয়, ঠিক সেই বছরই শুরু হয়, পানামা খাল খননের কাজ। অবাক লাগছে কি? সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর মতো যুক্তরাষ্ট্রও সে সময় চেয়েছিল নৌশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে। আজও কি তা তার চাওয়ার অংশ নয়? ফলে সে বাণিজ্য রুটকে নিজের জন্য অবারিত করতে পানামা খাল খনন শুরু করে, যা সম্পন্ন হয় ১৯১৩ সালে। ক্যারিবিয়ানের মধ্য দিয়ে যুক্ত হয় প্রশান্ত ও আটলান্টিক।

খেয়াল করুন ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর কী বলছেন? ১৯৭৭ সালে চুক্তির মাধ্যমে যে খালের মালিকানা যুক্তরাষ্ট্র পানামাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, তার মালিকানা ফের চেয়ে বসেছে ওয়াশিংটন। এমনিতে তার নির্বাচনী প্রচারে এটা ছিল না। কিন্তু নির্বাচনের পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে হঠাৎ করেই ট্রাম্প বলতে শুরু করেন যে, পানামা খালে ব্যবহারের সময় বাড়তি পয়সা দিতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। ভেনেজুয়েলা থেকে মাদুরোকে অপহরণের পর তিনি যে কয়েকটি দেশ ও অঞ্চলের নাম উচ্চারণ করেছেন, তার মধ্যে পানামা খাল একটি। তার ভাষ্য ওই একই, চীনারা সব নিয়ে যাচ্ছে।
অথচ এ বিষয়ে হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের গ্রোথ ল্যাবের পরিচালক ও ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির অধ্যাপক রিকার্ডো হোসম্যান এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “পানামার কাছে সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার পর থেকে খালটি পানামা পরিচালনা করছে, চীনারা নয়। যখন দুটি নতুন বন্দরের নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তখন হংকংয়ের কোম্পানি ‘সি কে হাচিসন’ দরপত্র দিয়ে কাজ পায়। সে সময় কেউ তাদের চীনা কোম্পানি হিসেবে বিবেচনা করেনি। আমি আশা করি, সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী মার্কিন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘ব্ল্যাকরক’ যখন হাচিসনের স্থলাভিষিক্ত হবে এবং বন্দর পরিচালনাকারী কোম্পানির মালিকানা পাবে, তখন এই বিতর্কের অবসান ঘটবে।
তবে অধ্যাপক রিকার্ডোর মতো এতটা আশাবাদী হওয়াটা কঠিন। কারণ, শুধু বাণিজ্য নয়, এর সাথে পুরো অঞ্চলকে আমেরিকা নামের ছাতার নিচে এনে উত্তর ও দিক্ষণের ভেদরেখা মুছে দিয়ে নয়া বিশ্বব্যবস্থার ধ্বজা ফের ওড়ানোর আকাঙ্ক্ষাটি ক্রমে দৃশ্যমান হচ্ছে।
মানচিত্রে ভালো করে তাকালে পানামা খাল, ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, কিউবা ইত্যাদির অবস্থান ও তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণ আইঢাই করার কারণটি স্পষ্ট হয়। যুক্তরাষ্ট্র এই দখিনা দরজাটি খোলা রাখতে চায়। আর উত্তরে দিতে চায় জোর হাওয়া, যাতে গ্রিনল্যান্ড তার অঙ্গীভূত হয়। ফলে কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে নিজের সাথে জুড়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা গালফ অব মেক্সিকোকে গালফ অব আমেরিকা বলাটা নিতান্তই মুখ ফসকে বেরিয়ে আসা নিছক ট্রাম্পীয় বচন নয়। (চলবে)

বিসিবির গঠনতন্ত্র বলছে, একজন পরিচালক যদি নিজে থেকে সরে না যান, তাহলে তাকে সরানো যাবে না। একজন পরিচালকের পদ শূন্য হয় কয়েকটি ব্যাপারে—তার মৃত্যু হলে, তিনি মানসিক ভারসাম্য হারালে, গুরুতর কোনো অনৈতিক কারণে আর পরপর তিনটি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত থাকলে আর নিজে থেকে পদত্যাগ করলে।

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান চালনায় বিশ্ববাসী বিস্মিত হয়েছে। বিশেষত একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে রাতের অভিযানে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আরেক দেশ বিচার করতে পারে কিনা, তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। কিন্তু এটা কি এতটাই বিস্ময়কর? নাকি এ প্রশ্নকেই বিস্ময়কর লাগছে?