চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বারবারই ব্যর্থ হয়েছে সেই চেষ্টা। দুই দেশের মধ্যে একবারই সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। তবে ১৮ জুন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে সই হওয়া সেই সমঝোতাও কয়েক দিনের মধ্যে ভেস্তে যায়।
কিন্তু কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনা? সমঝোতার পথে বাধা কোথায়?
বিশেষজ্ঞরা সাধারণত চুক্তির শর্ত ও সেগুলোর জটিলতাকে আলোচনায় ব্যর্থতার কারণ হিসেবে তুলে ধরেন। তবে সম্প্রতি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। সেখানে বলা হয়েছে, আলোচনার অচলাবস্থার কারণ শুধু চুক্তির শর্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে এমন এক সংকটে আটকে আছে, যা বারবার তাদের কূটনৈতিক আলোচনাকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কে দীর্ঘস্থায়ী সংকট কখনো কখনো এমন মানসিক বাধা তৈরি করে, যা একটি দেশের রাজনৈতিক চিন্তা ও স্মৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। এর ফলে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও আলোচনার পথও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কেও এমন দুটি মানসিক বাধা কাজ করছে। ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখলের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ইরানকে ঘিরে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস তৈরি করে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈরী আচরণ এবং ২০১৮ সালে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি থেকে ওয়াশিংটনের সরে যাওয়ার ঘটনা তেহরানের অবিশ্বাস আরও গভীর করে।
অবিশ্বাসের শুরু কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের এই সংকটের শিকড় আরও গভীরে। ১৯৫১ সালে ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের সরকার দেশটির তেলশিল্প জাতীয়করণ করে। এর দুই বছর পর, ১৯৫৩ সালের আগস্টে মোসাদ্দেকের জাতীয়তাবাদী সরকার উৎখাত হয়, যার পেছনে হাত ছিল মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর।
এরপর থেকে ইরানের রাজনৈতিক চিন্তায় একটি ধারণা গভীরভাবে গেঁথে যায়–ওয়াশিংটন এমন সরকারকে মেনে নিতে চায় না, যারা তেহরানে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কোনো সরকার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে, তাকে দুর্বল করা বা ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা করতেও প্রস্তুত ওয়াশিংটন।
এই প্রেক্ষাপটে, ১৯৭৯ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সিদ্ধান্ত ইরানের বিপ্লবী নেতৃত্বের মধ্যে নতুন অভ্যুত্থানের আশঙ্কা তৈরি করে। ক্ষমতাচ্যুত ইরানের শাহ রেজা পাহলভিকে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। ইরানের বিপ্লবী নেতৃত্ব একে আরেকটি অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি হিসেবে দেখেছিল।
ওই বছরের ৪ নভেম্বর ইরানি শিক্ষার্থীরা তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে নেয়। তারা ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে ৪৪৪ দিন আটকে রাখে। এরপর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়, যা আজও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ইরানের দৃষ্টিতে, দূতাবাস দখল ছিল বিপ্লব রক্ষার একটি পদক্ষেপ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এই ঘটনা ইরান সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। দেশটির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এমন ধারণা জন্মায় যে, ইরান আন্তর্জাতিক নিয়ম মানে না, দেশটির কথায় ভরসা করা যায় না এবং এমন আচরণের জন্য তাকে কোনো সুবিধা দেওয়া উচিত নয়।
দূতাবাস দখলের সেই ঘটনার প্রভাব এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে দেখা যায়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে একটি অলিখিত নিয়ম তৈরি হয়ে গেছে–যেকোনো আলোচনায় ইরানকে আগে ছাড় দিতে হবে। সেই ছাড় যাচাই করার পরই যুক্তরাষ্ট্র বিনিময়ে কিছু দেওয়ার কথা বিবেচনা করবে। অনেকটা ‘ডিম আগে না মুরগি আগে’ বিতর্কের মতো অবস্থা দুই দেশের!
২০১৮ সালের পর ইরানের অবিশ্বাস গভীরতর হয়
ইরানের অবিশ্বাসের পেছনেও রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। তবে তা আরও গভীর হয় ২০১৮ সালের মে মাসে। ওই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। অথচ তার মাত্র তিন বছর আগে বারাক ওবামার প্রশাসন ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের জন্য চুক্তিটা করেছিলেন, ছয় জাতি সেই চুক্তিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের বাকি দেশগুলোকেও (রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স) রেখেছিলেন ওবামা। চুক্তিতে একটা পক্ষ ছিল ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) তখন নিশ্চিত করেছিল, তেহরান চুক্তির শর্ত মেনে চলছিল। তবু ট্রাম্প প্রথম দফায় ক্ষমতায় গিয়েই ওবামার করা চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন।
এর মাত্র দুই সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও নতুন চুক্তির জন্য ১২টি শর্ত ঘোষণা করেন। এর মধ্যে চারটি ছিল ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে। বাকি শর্তগুলোর মধ্যে সাতটি ছিল লেবানন, ফিলিস্তিন, ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়া, আফগানিস্তান ও উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ভূমিকা নিয়ে। অর্থাৎ, ওয়াশিংটন শুধু আগের চুক্তি থেকে সরে আসেনি, ভবিষ্যতে নতুন চুক্তির শর্তও আরও কঠিন করেছে।
২০২৫ সালের জুনে দুই দেশের অবিশ্বাস আরও বাড়ে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ১২ দিনব্যাপী যুদ্ধে অংশ নেয় এবং ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালায়। অথচ এর মধ্যেই ওমানের রাজধানী মাসকাটে দুই দেশের মধ্যে নতুন দফার পরোক্ষ আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।
চলমান যুদ্ধেও ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ইরানের অবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে।
এসব ঘটনার ফলে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে একটি ধারণা আরও শক্ত হয়েছে–যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করলেই সেটিকে নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া যায় না। মার্কিন প্রশাসনে বদলের সঙ্গে সঙ্গে যেকোনো চুক্তি বাতিল হয়ে যেতে পারে। এমনকি চুক্তির আলোচনাটা যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে যুদ্ধ এড়ানোর পথ না হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি আড়াল করার কৌশলও হতে পারে বলে সন্দেহ করে ইরান।
ফলে ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি অলিখিত নিয়ম তৈরি হয়েছে–বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নয়, আর চাপ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কোনো ছাড় নয়।
এভাবেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অবিশ্বাসের দুটি বিপরীত অবস্থান তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরান আগে পদক্ষেপ নিক, তারপর বিনিময়ে সুবিধা দেওয়া হবে। অন্যদিকে, ইরান চায়, যুক্তরাষ্ট্র আগে নিশ্চয়তা দিক, সেটি বাস্তবায়ন করুক, তারপর তারা পদক্ষেপ নেবে।
আলোচনায় দুই পক্ষের শর্ত কী?
সাম্প্রতিক আলোচনার উদ্যোগগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি প্রস্তাবেই ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখলের ঘটনার প্রভাব রয়েছে।
মার্চে দেওয়া ১৫ দফা পরিকল্পনায় ইরানের নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদোর পরমাণু স্থাপনা ভেঙে ফেলা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি স্থগিত করা এবং মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি জানায় যুক্তরাষ্ট্র। এর বিনিময়ে পরে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
মে মাসে হোয়াইট হাউসের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার একটি খসড়া প্রস্তাব দেন। এতে বলা হয়, ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড়ার আগে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা প্রস্তাবেও একই শর্ত রাখা হয়। বলা হয়, আলোচনা চলার পুরো সময়জুড়ে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখতে হবে এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের দেশটিতে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি প্রস্তাবেই একই বিষয় দেখা যায়: আগে ইরানকে পদক্ষেপ নিতে হবে, তারপর যুক্তরাষ্ট্র বিনিময়ে সুবিধা দেবে। আর ইরানের পদক্ষেপ যাচাই না করে দেশটিকে বিশ্বাস করতে রাজি নয় ওয়াশিংটন।
দাবির ব্যবধান কমেছে, কিন্তু অবিশ্বাস রয়ে গেছে। ছবি: রয়টার্স
অন্যদিকে, ইরানের প্রস্তাবগুলোতেও ২০১৮ সালে পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার অভিজ্ঞতার প্রভাব রয়েছে।
মার্চের শেষ দিকে দেওয়া পাঁচ দফা প্রস্তাবে ইরান দাবি জানায়, ভবিষ্যতে আর যুদ্ধ শুরু করবে না–এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। এপ্রিলে দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাবে বলা হয়, যেকোনো চুক্তি যেন পরে বাতিল করা না যায়, সে জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। মে মাসের ১৪ দফা প্রস্তাবে ইসরায়েলসহ কোনো পক্ষ যেন হামলা না চালায়, সেই অঙ্গীকার চাওয়া হয়।
গত মাসে তেহরান সাত দিনের একটি পরিকল্পনাও দেয়। এতে বলা হয়, ইরানের দিক থেকে ষষ্ঠ দিনে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং সপ্তম দিনে পরমাণু আলোচনা শুরুর আগে, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে।
অর্থাৎ, ইরানের প্রস্তাবেও একটি বিষয় স্পষ্ট: আগে নিশ্চয়তা দিতে হবে, তারপর ইরান পদক্ষেপ নেবে। আর ইরান কোনো ছাড় দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ তুলে নিতে হবে।
দুই দেশের এসব প্রস্তাবের পেছনে কাজ করেছে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া গভীর অবিশ্বাস। এক পক্ষ অন্য পক্ষের আশঙ্কা দূর করে সমঝোতায় পৌঁছানোর বদলে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে আলোচনায় দুই দেশের মূল দাবির ব্যবধান কমলেও, পারস্পরিক বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েই গেছে।
যে সমঝোতা সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছেছিল
ইসলামাবাদে তৈরি সমঝোতা স্মারকটি ছিল এর ব্যতিক্রম। দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছেছিল এই উদ্যোগ। কারণ, এতে উভয় পক্ষের মূল উদ্বেগ দূর করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করতে ইরানের মজুত করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের পরিমাণ কমানোর কথা বলা হয়। একই সঙ্গে শর্ত দেওয়া হয়, ইরান চুক্তি বাস্তবায়ন করলেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে এবং জব্দ করা অর্থ ছাড় করা হবে।
অন্যদিকে, ইরানকে আশ্বস্ত করতে যুদ্ধ বন্ধ, দুই দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক সম্মান এবং চুক্তি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়। চূড়ান্ত চুক্তিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের কথাও ছিল। তবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়ে কোনো উল্লেখ ছিল না।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সমঝোতা টেকেনি। লেবাননে যুদ্ধবিরতি না হওয়ায় জেনেভায় পরবর্তী দফার আলোচনা থেকে সরে আসে ইরান। মার্চ থেকে দেওয়া প্রতিটি প্রস্তাবেই লেবাননে যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়ে আসছিল তেহরান।
ইরানের দৃষ্টিতে, ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যর্থতা দেখিয়ে দিয়েছে যে, শুধু মার্কিন স্বাক্ষর কোনো চুক্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না। ফলে ২০১৮ সালে পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আবারও সামনে আসে। দুই পক্ষ ফিরে যায় আগের অবস্থানে।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এসে বিরোধের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, কোন পদক্ষেপ আগে নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, তখন দুই দেশের মতপার্থক্য শুধু চুক্তির শর্ত নিয়ে ছিল না, বরং কোন শর্ত আগে কার্যকর হবে, তা নিয়েও ছিল। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল জুনের সমঝোতা স্মারকের আরও উন্নত একটি সংস্করণে ফিরে যাওয়া।
এখানেই দুই দেশের অবিশ্বাস সবচেয়ে স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র চায়, আগে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হোক এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা হোক। কারণ, ওয়াশিংটন ইরানকে বিশ্বাস করে না। অন্যদিকে, ইরান চায়, আগে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হোক। কারণ, তেহরানও যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না।
দাবির ব্যবধান কমেছে, কিন্তু অবিশ্বাস রয়ে গেছে
২০১৮ সালে মাইক পম্পেওর দেওয়া শর্তের সঙ্গে ২০২৬ সালের জুনের সমঝোতা স্মারক তুলনা করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের দাবিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আঞ্চলিক ভূমিকা বদলাতে চেয়েছিল। এখন তাদের মূল দাবি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে।
অন্যদিকে, আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ চাইলেও এখন ইরান অন্য পক্ষের অর্থায়নে একটি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিচ্ছে। তবে এই তহবিল গঠনের সঙ্গে কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, দুই দেশের মধ্যে মূল দাবির ব্যবধান অনেকটাই কমেছে। আট বছর আগে এমন পরিবর্তনের কথা কল্পনা করাও কঠিন ছিল।
কিন্তু দুই দেশের অবিশ্বাস কমেনি। বরং যুদ্ধের কারণে তা আরও বেড়ে থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অবিশ্বাস ইরানের সন্দেহ বাড়াচ্ছে। আবার ইরানের অবিশ্বাসও যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ বাড়াচ্ছে। এভাবে দুই পক্ষের অবিশ্বাস সমস্যাগুলোকে আরও গভীর করছে। ফলে সাময়িক সমস্যা হিসেবে শুরু হওয়া কূটনৈতিক অচলাবস্থা এখন দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে।
তাই কে আগে কোন পদক্ষেপ নেবে, তা নিয়ে নতুন কোনো সমঝোতা করলেই এই অচলাবস্থা কাটবে না। এর জন্য দুই দেশের অবিশ্বাস দূর করার উদ্যোগও নিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে এমন একটি তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন, যারা একই সঙ্গে দুই পক্ষের কে কী পদক্ষেপ নেবে, এবং এসবের বিনিময়ে অন্য পক্ষটি কী পদক্ষেপ নেবে–তার নিশ্চয়তা দিতে পারবে। অর্থাৎ, এক পক্ষ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নিলে অন্য পক্ষও যেন বিনিময়ে তার দিকের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।