যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ সম্প্রতি ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে—এটা এমন এক বিশাল সংখ্যা, যা মানুষের মস্তিষ্ক ঠিকঠাক ধারণই করতে পারে না। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন তার দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য শপথ নেন, তখন ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৬.২ ট্রিলিয়ন ডলার। এই সময়ের মধ্যে আরও প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে ফেলাটা যেন দেশের ক্রেডিট কার্ডের সীমা পুরোপুরি শেষ করে ফেলার এক সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টারই বহিঃপ্রকাশ।
এই আর্থিক তাণ্ডবের প্রধান শিকার হলো খোদ ফেডারেল বাজেট। মার্কিন সরকার এখন অতীতের ঋণের চক্রবৃদ্ধি সুদ পরিশোধ করতেই যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে, তা জাতীয় প্রতিরক্ষা কিংবা লাখ লাখ নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবার জন্য বরাদ্দ অর্থের চেয়েও বেশি। ওয়াশিংটন এমন এক আর্থিক কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে রাষ্ট্র মূলত বৈশ্বিক বন্ডধারীদের অর্থ প্রদানের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। অতীতের অপরিশোধিত দেনা এখন ভবিষ্যতের সরকারি ব্যয়ের খাত থেকে অর্থ শুষে নিচ্ছে। বিষয়টি যদি এত উদ্বেগজনক না হতো, তবে একে এক অদ্ভুত ও হাস্যকর পরিস্থিতি হিসেবে দেখা যেত।
করদাতারা যখন এই বোধগম্যতার বাইরের সংখ্যাগুলো নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের দায়িত্বে থাকা পরিবারটি যেন বেশ আনন্দেই দিন কাটাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ২.২ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়েছেন। তার বড় দুই ছেলে, এরিক ও ডোনাল্ড জুনিয়র, বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, বিশ বছর বয়সী ব্যারনের ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ অর্জনের খবর পাওয়া গেছে। সরকারি কোষাগার থেকে যখন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার বেরিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই রাষ্ট্রপ্রধানের পরিবারের বিপুল ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ে তোলার এই দৃশ্য আধুনিক অগ্রাধিকারগুলোর এক স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
উভয় দলের রাজনীতিবিদরাই কয়েক দশক ধরে তিল তিল করে ঋণের এই পাহাড় গড়ে তুলেছেন। তবে বর্তমান ঋণের গতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। আগের প্রশাসনগুলো যে পরিমাণ ঋণ কয়েক দশকে তৈরি করেছিল, এখন তা মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই জমা হচ্ছে। চলমান সামরিক দায়বদ্ধতাগুলো প্রতিদিন এই ক্ষতিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সরকারি কোষাগার থেকে সরাসরি কয়েক হাজার কোটি ডলার শুষে নিচ্ছে, অথচ দেশের লাখ লাখ পরিবার তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় মাসিক বিল পরিশোধ করতেই হিমশিম খাচ্ছে।
বিশাল জাতীয় ঋণকে ওয়াশিংটনের হিসাবের খাতায় খেলা এক বিমূর্ত হিসাবরক্ষণ প্রক্রিয়া বলে মনে হতে পারে—যতক্ষণ না এর পরিণতি অনিবার্যভাবে দৈনন্দিন জীবনে আঘাত হানে। ফেডারেল সরকারের কাছে জাদুকরী সোনার কোনো গোপন ভাণ্ডার নেই। বিশাল অঙ্কের সুদ পরিশোধের জন্য তারা হয় অভ্যন্তরীণ সরকারি পরিষেবাগুলো ছাঁটাই করে, অথবা নতুন নোট ছাপায়। যখন সুদের অর্থ ফেডারেল বাজেটের বড় অংশ গ্রাস করে ফেলে, তখন জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রয়োজনীয় তহবিল থেকে বঞ্চিত হয়। পরিবহন অবকাঠামো জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে, দুর্যোগ মোকাবিলাকারী সংস্থাগুলো মাঝপথেই অর্থসংকটে পড়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা গবেষণা থমকে যায়।
বিদ্যমান দায় মেটাতে নতুন নোট ছাপানো সরাসরি মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়। মার্কিন ডলার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে টিকে থাকলেও, ক্রমাগত ঋণ গ্রহণের ফলে এর প্রকৃত মূল্য ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ফেডারেল সংস্থাগুলোকে সচল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন অর্থের সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়, তখন স্থানীয় বাজারে পণ্যের দামও সেই অনুপাতে বেড়ে যায়। এই প্রক্রিয়াটি দেশের প্রতিটি মানুষের আয়ের ওপর এক ধরনের স্থায়ী ও অনিবার্য করের মতো কাজ করে—যার জন্য কোনো ভোটাভুটির প্রয়োজন পড়ে না।
কয়েক দশকের রাজনৈতিক অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ডের মূল্য পরিশোধের সময় এসেছে, আর রাজনৈতিক শ্রেণি এই খরচের বোঝা সাধারণ নাগরিকদের কাঁধে চাপিয়ে দিতে চাইছে। ঋণের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং জনসেবার অবনতি—এগুলো কোনো আকস্মিক দুর্ভাগ্য নয়; বরং এমন দাবি করা চরম অসততা। প্রকৃতপক্ষে, এগুলো হলো সরকারের এমন এক গাণিতিক পরিণতি, যেখানে সরকার নিজের কাছে না থাকা পুঁজি ব্যয় করছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করছেন এমন কিছু ব্যক্তি, যারা নিজেরা ক্রমাগত ধনী হচ্ছেন, অথচ জাতীয় অর্থনীতির হিসাবের খাতা ধ্বংসের মুখে পড়ছে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে দুঃখজনক দিক হলো, এটি পুরোপুরি আগে থেকেই অনুমেয় ছিল। জাতীয় ঋণের খাতায় প্রতি ট্রিলিয়ন ডলার যোগ হওয়ার অর্থ হলো, উৎপাদনশীল খাত থেকে সম্পদ সরিয়ে তা ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় করা। যুক্তরাষ্ট্রের আগে থেকেই নাজুক অবস্থায় থাকা অবকাঠামো আরও বেশি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে।
হাসপাতালগুলোর বাজেট কমানো হচ্ছে, অথচ সরকারি ঋণের বড় বিনিয়োগকারীরা তাদের মুনাফা তুলে নিচ্ছেন। সাধারণ পরিবারগুলোকে আগের চেয়ে বেশি সময় ধরে কাজ করতে হচ্ছে, কিন্তু তারা কিনতে পারছে আগের চেয়ে কম পণ্য। এমন সব নীতিগত সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হচ্ছে তাদের, যেখানে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার চেয়ে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ব্যয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এক পর্যায়ে, ক্রমাগত ঋণ নেওয়ার সীমাবদ্ধতাগুলো অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে সামনে চলে আসে। বিশ্ব ইতিহাসে এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই যেখানে কোনো জাতি কেবল ঋণের অর্থে ব্যয় করে স্থায়ী সমৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে। ‘বিনামূল্যে পাওয়া অর্থ’—এই বিভ্রমটি কেবল ততক্ষণই টিকে থাকে, যতক্ষণ বৈশ্বিক বাজারগুলো সংশ্লিষ্ট মুদ্রাকে গ্রহণ করে।
একবার সেই আস্থা হারিয়ে গেলে, ওয়াশিংটনের নথিপত্রে থাকা বিমূর্ত সংখ্যাগুলো সাধারণ পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিক ও কাঠামোগত দুর্দশায় পরিণত হয়। ঋণটা ওয়াশিংটনই করে, কিন্তু তার মূল্য চোকাতে হয় সাধারণ কর্মজীবী মানুষকে—মজুরি কমে যাওয়ার মাধ্যমে এবং সরকারি সেবার মান পড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। পুরো ব্যবস্থাটি এমনভাবেই সাজানো হয়েছে যে, এটি সরকারি ঋণকে ব্যক্তিগত সুবিধায় রূপান্তরিত করে, আর চূড়ান্ত ঝুঁকিটি চাপিয়ে দেয় তাদের ওপর, যাদের তা বহন করার সক্ষমতা সবচেয়ে কম।
জন ম্যাক গ্লিওন: লেখক ও গবেষক।
(এই লেখাটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য হিল–এর সৌজন্যে প্রকাশিত।)