দিল্লিতে বোমা হামলা যে বার্তা দেয়

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
দিল্লিতে বোমা হামলা যে বার্তা দেয়
সম্প্রতি দিল্লিতে গাড়ি বিস্ফোরণের পরের চিত্র। ছবি: রয়টার্স

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই গত মে মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি নতুন সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী মতবাদ ঘোষণা করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, “যদি ভারতে সন্ত্রাসী হামলা হয়, তবে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।’’

এ কারণে গত ১০ নভেম্বর দিল্লির লাল কিল্লার বাইরে একটি গাড়ি বিস্ফোরণে অন্তত আটজন নিহত এবং ২০ জন আহত হওয়ার পর নতুন করে উদ্বেগ বাড়ে। তবে আপাতত আরেকটি যুদ্ধের ঝুঁকি কম।

বিস্ফোরণটি ওই দিন সকালে দিল্লির কাছে ফরিদাবাদে ভারতীয় পুলিশের বানচাল করা একটি ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে। পুলিশ সেখানে অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম আবিষ্কার করে। সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীরের পুলিশ জানায়, তারা পাকিস্তান-সমর্থিত জঙ্গিগোষ্ঠী জইশ-ই-মোহাম্মদ (জেইএম) এবং কাশ্মীরের আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট সংগঠন আনসার গাজওয়াতুল-হিন্দের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সন্ত্রাসী দলের অংশ ছিল।

দিল্লিতে বিস্ফোরিত গাড়িটির মালিক উমর উন-নবী নামে একজন ডাক্তার, যিনি ওই অভিযান থেকে পালিয়ে গেছেন বলে খবর পাওয়া যায়।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের জানায়, ষড়যন্ত্রকারীরা পাকিস্তান-সমর্থিত গোষ্ঠীর নির্দেশে কাজ করছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, ভারতীয় ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতারা প্রকাশ্যে এই অভিযোগটি একবারও বলেননি।

সংবাদমাধ্যম ইকোনোমিস্ট বলছে, এপ্রিলে কাশ্মীরে যে হত্যাকাণ্ডের কারণে মে মাসে সংঘর্ষ হয়েছিল, তার বিপরীতে এই হামলায় জড়িতরা পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারীদের পরিবর্তে ভারতীয় নাগরিক বলে মনে হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করা একজন ভারতীয় বিশেষজ্ঞ এই হামলার প্লটকারীদের আল-কায়েদা এবং জইশ-ই-মোহাম্মদ উভয়ের সঙ্গে কথিত যোগসূত্র সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেন। কারণ এই দুটি দলের আদর্শ আলাদা। তিনি বলেন, আল-কায়েদা ভারতে দীর্ঘদিন ধরে অস্তিত্বহীন। জইশ-ই-মোহাম্মদ আল-কায়েদাকে সহযোগী নয় বরং প্রতিযোগী হিসেবে দেখে।

এ ছাড়া ২০১০-এর দশকে সক্রিয় থাকা ভারতীয় সংগঠন ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন বর্তমানে নিষ্ক্রিয়। এর সমর্থকরা নেটওয়ার্কের বাইরে চলে গেছে।

গত এক দশকে ভারতের বড় শহরগুলোতে সন্ত্রাসবাদ বিরল ছিল। গত বছর ব্যাঙ্গালোরের একটি ক্যাফেতে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর একটি বোমা হামলা ছিল দীর্ঘদিন পর এই ধরনের প্রথম আক্রমণ। দিল্লিতে শেষ বড় হামলা হয়েছিল ২০১১ সালে। তখন একটি ব্রিফকেস বোমা হামলায় ১৫ জন নিহত হয়।

সাউথ এশিয়া টেররিজম পোর্টালের পরিচালক অজয় সাহনি বলেন, সম্ভাব্য সন্ত্রাসীরা কাশ্মীরের বাইরে কাজ করা সহজ মনে করতে পারে। কারণ সেখানে তারা আইন প্রয়োগকারী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তীব্র চাপের মুখে পড়ে।

১৯৯০ এবং ২০০০-এর দশকে সন্ত্রাসী সহিংসতার বেড়ে গিয়েছিল। এবার সেই ধারা শুরু হয়নি বলে জানান এই বিশ্লেষক। তিনি বলেন, সেই সময়ে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী ছিল এবং রাষ্ট্র দুর্বল ছিল। এখন পরিস্থিতি উল্টো।

ষড়যন্ত্রকারীদের উৎস, তাদের পরিকল্পনা বানচাল হওয়া এবং মোদির পূর্বনির্ধারিত ভুটান সফর চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত—সবকিছুই ইঙ্গিত দেয় যে, ভারত এখন পাকিস্তান আক্রমণ করার ঝুঁকি নেবে না। যদি না বিদেশ থেকে নির্দেশনার নতুন প্রমাণ পাওয়া যায়।

তবুও, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক এখনও অস্থির। ১১ নভেম্বর পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে একটি আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়। পাকিস্তানি তালেবান দায় স্বীকার করেছে।

এ বছর বিভিন্ন হামলায় ১৬০০ জনের বেশি পাকিস্তানি বেসামরিক এবং সেনা নিহত হয়েছে, যা এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বাজে হামলার ইঙ্গিত। পাকিস্তানি নেতারা সর্বশেষ হামলার জন্য ভারতীয় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদকে দায়ী করেছেন। তবে ভারত এই দাবিকে ‘প্রলাপ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

সম্পর্কিত