সৌদি আরবের সামরিক শক্তি, বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেট এবং আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার- কোনোটিই দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে হুতিদের হামলার ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখতে পারছে না। ইয়েমেনের এই সশস্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলন তুলনামূলকভাবে সস্তা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য আক্রমণাত্মক অস্ত্র ব্যবহার করে সৌদি আরবের জন্য এমন এক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে, যার মোকাবিলায় রিয়াদকে ব্যয় করতে হচ্ছে বিপুল অর্থ। এই সংঘাতের মূল তাৎপর্য শুধু কতটি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারল, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রতিপক্ষের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে তার অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়, হুতিরা সেই কৌশল প্রয়োগের চেষ্টা করছে।
রুশ সংবাদমাধ্যম আরটির এক বিশ্লেষণে সৌদি আরবের এই সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশ্লেষণে মূলত আধুনিক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। সামরিক শক্তিতে অনেক পিছিয়ে থাকা কোনো প্রতিপক্ষও সঠিক লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন, কম খরচের অস্ত্রের ব্যবহার এবং দীর্ঘস্থায়ী চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে। সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাত সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।
গত ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় সৌদি আরবের দাহরানে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর সদর দপ্তরে হামলার ঘটনা ঘটে। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় সেখানে অগ্নিকাণ্ডের কথা জানায়। তবে এ ঘটনায় কেউ নিহত হয়নি। একই সময়ে হুতিরা রিয়াদের একটি তেল শোধনাগার এবং কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার দাবিও করে। এসব হামলার দাবি এবং লক্ষ্যবস্তুর নির্বাচন থেকে বোঝা যায়, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থাকে চাপে ফেলার চেষ্টা করছে হুতিরা। তবে হুতিদের দাবি করা প্রতিটি হামলার ক্ষয়ক্ষতি বা কার্যকারিতা সম্পর্কে তথ্যের যথার্থতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে হামলার দাবির পাশাপাশি এর প্রকৃত প্রভাব মূল্যায়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
আরামকোর মতো প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর, তেল শোধনাগার এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কোনো দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তেল সৌদি আরবের সরকারি রাজস্বের প্রধান উৎসগুলোর একটি। অন্যদিকে বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বৈদেশিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত। এসব স্থাপনায় সীমিত আকারের হামলাও বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। কোনো স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস না হলেও সাময়িকভাবে কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা কিংবা সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে ব্যবসায়ীক সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, হামলার তাৎপর্য শুধু সরাসরি ভৌত ক্ষয়ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে অর্থনৈতিক আস্থা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও।
হুতিদের এই কৌশল বুঝতে হলে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাতের দিকে তাকাতে হয়। আন্দোলনটির উত্থান ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে। তাদের উত্থানের পেছনে ছিল ইয়েমেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা, স্থানীয় সংঘাত এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেঙে পড়া। ইরানের সমর্থন তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। কিন্তু আন্দোলনটির নিজস্ব সামাজিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক লক্ষ্য আগে থেকেই ছিল।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। হুতিদের শুধু ইরানের নির্দেশে পরিচালিত একটি শক্তি হিসেবে দেখলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের বাস্তবতা আড়ালে পড়ে যায়। ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও আন্দোলনটির নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। ইয়েমেনের কোন অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক কী হবে এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাদের অবস্থান কতটা শক্তিশালী হবে- এসব প্রশ্ন তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তাই তেহরান ও হুতিদের স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে এক হলেও সব বিষয়ে অভিন্ন, এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ দুই পক্ষের বিরোধকে আরও গভীর করে। রিয়াদের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ সীমান্তের কাছে একটি বৈরী শক্তির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ঠেকানো এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দেওয়া। অন্যদিকে, হুতিদের নেতৃত্ব সৌদি হস্তক্ষেপকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরে। বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বয়ান তাদের নিজেদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার সঙ্গেও যুক্ত হয়। ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ক্রমে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে ওঠে।
বর্তমান উত্তেজনার পেছনেও এই পুরনো বিরোধ কাজ করছে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর আক্রমণাত্মক তৎপরতায় সৌদি সমর্থন হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চল এবং তাদের দর কষাকষির অবস্থানকে হুমকির মুখে ফেলছে। এর জবাবে সৌদি ভূখণ্ডের গভীরে হামলা চালিয়ে হুতিরা রিয়াদের ওপর চাপ বাড়াতে চাইছে। তাদের হিসাব হলো, ইয়েমেনে প্রতিদ্বন্দ্বিদের সহায়তা অব্যাহত রাখলে সৌদি আরবকে নিজ ভূখণ্ডেও বারবার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি বহন করতে হবে। এভাবে যুদ্ধের ব্যয় বাড়িয়ে সৌদি নেতৃত্বকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করাই তাদের কৌশলের একটি প্রধান উদ্দেশ্য।
হুতিদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- হামলা বন্ধ করা, ইয়েমেনের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর প্রতি সহায়তা সীমিত করা, পরিবহন ও বাণিজ্যের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং রাজস্ব ও অর্থ পরিশোধের বিষয়ে সমঝোতা। এসব দাবি নতুন নয়। জাতিসংঘ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যে শান্তিপথের কাঠামো উপস্থাপন করেছিল, তাতেও দেশব্যাপী যুদ্ধবিরতি, সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ, তেল রপ্তানি পুনরায় চালু করা এবং সানা বিমানবন্দর ও হোদেইদা বন্দরের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয় ছিল। অর্থাৎ, বর্তমান সংকটের সমাধান শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ইয়েমেনের অর্থনীতি, জনগণের জীবনযাত্রা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বণ্টনের জটিল প্রশ্ন।
ইয়েমেন সীমান্তের কাছে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে সৌদি আরব। ফাইল ছবি: রয়টার্স
এখানেই হুতিদের কৌশলের রাজনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট হয়। সৌদি আরবের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তারা এমন একটি সমঝোতা আদায় করতে চায়, যা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে। কিন্তু এ ধরনের সমঝোতা যুদ্ধের তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কমালেও ইয়েমেনে ক্ষমতা কীভাবে ভাগ হবে, সে প্রশ্নের সমাধান নিশ্চিত করে না। বরং কোনো চুক্তিতে হুতিদের বর্তমান অবস্থান শক্তিশালী হলে ভবিষ্যতে দেশের অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বিরোধ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় সামরিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে আক্রমণকারী অস্ত্রের তুলনামূলক কম দাম এবং প্রতিরক্ষার বিপুল ব্যয়ের ব্যবধান থেকে। সৌদি আরব বছরে ৮২ বিলিয়ন ডলারের বেশি সামরিক ব্যয় করলেও হুতিদের হামলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখতে পারছে না। একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টরের দাম ৩০ লাখ ডলারের বেশি, অথচ কিছু হুতি ড্রোনের দাম মাত্র ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার ডলার। এই ব্যবধান আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি করে।
একটি সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হলে আত্মরক্ষাকারী রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে বড় ব্যয় বহন করতে হয়। বিপরীতে আক্রমণকারীকে প্রতিবার সফল হতে হয় না। তার লক্ষ্য হতে পারে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে অবিরাম সতর্ক রাখা, প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমিয়ে দেওয়া এবং প্রতিটি হামলার আশঙ্কাকে অর্থনৈতিক চাপের উৎসে পরিণত করা। সৌদি আরবের মতো বিশাল ভূখণ্ডের দেশকে বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, শহর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় একসঙ্গে বহু জায়গায় প্রস্তুত থাকতে হয়। হুতিরা তাদের পছন্দমতো লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করতে পারে এবং হামলার মধ্যে বিরতি দিতে পারে। কিন্তু সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত প্রস্তুত রাখতে হয়।
এই অসমতা অবশ্য এমন নয় যে প্রতিটি সস্তা ড্রোনই ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে পরাস্ত করবে। আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বহু হামলা প্রতিহত করতে পারে। কিন্তু প্রতিরক্ষার কার্যকারিতা নির্ভর করে শুধু অস্ত্রের মানের ওপর নয়, লক্ষ্য শনাক্ত করা, তথ্য আদান-প্রদান, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং যথাসময়ে প্রতিরোধী ব্যবস্থা ব্যবহারের ওপরও। ছোট ড্রোন ও নিচু দিয়ে উড়ে আসা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে বিস্তৃত রাডার কাভারেজ এবং বিভিন্ন সামরিক ইউনিটের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলে অত্যাধুনিক অস্ত্রও প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
বিশ্লেষণে সৌদি সামরিক কাঠামোর অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের সমস্যার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, নিয়মিত সেনাবাহিনী ও ন্যাশনাল গার্ডের পৃথক কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে রাজতন্ত্রকে অভ্যুত্থানের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত। কিন্তু পৃথক কমান্ডব্যবস্থা ও অত্যন্ত কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সামরিক সমন্বয়কে জটিল করতে পারে। মাঠপর্যায়ের কমান্ডারদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত হলে কিংবা এক ইউনিট থেকে অন্য ইউনিটে তথ্য পৌঁছাতে দেরি হলে আকাশ প্রতিরক্ষার কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে শুধু নতুন অস্ত্র কেনা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
হুতিদের সক্ষমতা বাড়াতে ইরানের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে তাদের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও বিভিন্ন উৎস থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহের নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠায় তাদের অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ কারণে শুধু ইরানের সরবরাহ বন্ধ করার ওপর নির্ভর করে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। তেহরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলেও হুতিরা নিজেদের স্বার্থে হামলা অব্যাহত রাখবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অর্থাৎ, ইরানকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক কূটনীতি চললেও ইয়েমেনের সংঘাতের নিজস্ব গতিপথ রয়েছে।
সৌদি আরব এই পরিস্থিতিতে বিদেশি মিত্রদের সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৫ অক্টোবর মক্কা চুক্তির সঙ্গে যুক্ত পক্ষগুলো সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম দেওয়ার ঘোষণা দেয়। তুরস্ক ও পাকিস্তানও দেশটিকে রক্ষায় সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে রাজনৈতিক ঘোষণা এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ এক বিষয় নয়। সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা দেওয়া, নির্দিষ্ট স্থাপনা রক্ষায় সেনা মোতায়েন করা কিংবা ইয়েমেনের ভেতরে হুতিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান চালানো- এই তিনটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান আকাশ প্রতিরক্ষা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে বিদেশের মাটিতে আক্রমণাত্মক অভিযানে তুর্কি সেনাদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা তিনি নাকচ করেছেন। অর্থাৎ, আঙ্কারা সৌদি আরবকে সহায়তা করতে আগ্রহী হলেও ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সীমা নির্ধারণ করে রেখেছে।
পাকিস্তানের অবস্থানও একই ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি। ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিলে দেশটির সামরিক ব্যয় বাড়বে এবং প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটার ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে হুতিদের পরাজিত করার জন্য পাকিস্তানের পূর্ণাঙ্গ সামরিক হস্তক্ষেপের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যায় না। নির্দিষ্ট স্থাপনা রক্ষা কিংবা সামরিক সহায়তা দেওয়ার মধ্যেই ইসলামাবাদের ভূমিকা সীমিত থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তা সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ওয়াশিংটন হুতিদের হামলা বন্ধ করতে যেকোনো মাত্রার সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ব্যয় এবং আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি যুক্তরাষ্ট্রসহ সৌদি আরবের অন্য মিত্রদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। হুতিরা সম্ভবত এই সীমাবদ্ধতার ওপরই ভরসা করছে। তাদের ধারণা, মিত্ররা সৌদি আরবকে রক্ষা করতে সহায়তা করবে, কিন্তু রিয়াদের ইয়েমেন-সংক্রান্ত সব লক্ষ্য অর্জনের জন্য দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চাইবে না।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সামনে সামরিক ও কূটনৈতিক- দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সামরিকভাবে তাকে আকাশ প্রতিরক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে হবে, ছোট ও নিচু দিয়ে উড়ে আসা লক্ষ্য শনাক্ত করার ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি আক্রমণের জবাবে আরও বড় আকারের সামরিক অভিযান চালানোর বদলে এমন একটি কৌশল প্রয়োজন, যা হামলার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর হবে। কারণ, প্রতিপক্ষের সব অস্ত্র ধ্বংস করা কিংবা প্রতিটি হামলা শতভাগ প্রতিহত করা বাস্তবে কঠিন। দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য হামলা চালানোর প্রণোদনা কমানোও জরুরি।
কূটনৈতিকভাবে ইয়েমেনের সংঘাতের মূল রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর সমাধান ছাড়া স্থায়ী স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন। সৌদি আরব যদি হুতিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে গিয়ে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিদের সামরিক সহায়তা বাড়ায়, তাহলে পাল্টা হামলার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। আবার হুতিদের শর্তে সমঝোতা হলে তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক ক্ষমতা আরও সুদৃঢ় করার সুযোগ পেতে পারে। ফলে রিয়াদের জন্য সিদ্ধান্তটি সহজ নয়। একদিকে নিজস্ব নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অবস্থান রক্ষা, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অর্থনৈতিক ব্যয় কমানো-এই দুই লক্ষ্যকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
হুতিরা সৌদি আরবকে দেখাতে চাইছে যে বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেট এবং বিদেশি মিত্রদের সহায়তা থাকলেও ইয়েমেনে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিদের সমর্থন অব্যাহত রাখার মূল্য দিতে হবে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে বারবার ঝুঁকির মুখে ফেলে হুতিরা এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, যাতে রিয়াদ তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিদের সহায়তা কমাতে অথবা তাদের অনুকূলে থাকা কোনো সমঝোতা মেনে নিতে বাধ্য হয়। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে হুতিরা যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত সুবিধাকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের সুযোগ পাবে। এতে ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবের অবস্থানও দুর্বল হতে পারে। তবে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক লাভ হবে ইয়েমেনের ক্ষমতার লড়াইয়ে হুতিদের নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়া।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাত আধুনিক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সামনে নিয়ে এসেছে: সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং কার্যকর নিরাপত্তা এক বিষয় নয়। ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বিশাল সামরিক বাজেট কোনো রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু প্রতিপক্ষ যদি কম খরচে বারবার আঘাত হানার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে সেই শ্রেষ্ঠত্বের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। হুতিদের জন্য সাফল্যের অর্থ সৌদি আরবের প্রতিটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা নয়; বরং এমন অনিশ্চয়তা তৈরি করা, যার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য রিয়াদকে নিয়মিত দিতে হয়। এই চাপ সৌদি নেতৃত্বকে শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে কতটা ছাড় দিতে বাধ্য করবে, তা নির্ভর করবে সামরিক প্রতিরোধের কার্যকারিতা, আঞ্চলিক মিত্রদের প্রকৃত ভূমিকা এবং ইয়েমেনের রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনার ওপর। তাই এই সংঘাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কে বেশি শক্তিশালী-তা নয়; বরং কে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিপক্ষের ওপর ব্যয়বহুল চাপ বজায় রাখতে পারবে।