করপোরেট ভূরাজনীতি: রাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী যখন ধনকুবেররা

রালুকা চের্নাতোনি
রালুকা চের্নাতোনি
করপোরেট ভূরাজনীতি: রাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী যখন ধনকুবেররা
করপোরেট ভূরাজনীতি

বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির মালিক, বিশেষত শতকোটিপতি উদ্যোক্তারা নিজেরাই এখন ভূ-রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছেন। কিছু টেক-জায়ান্ট আবার ক্ষমতার দিক থেকে ক্ষেত্রবিশেষে রাষ্ট্রের সমান শক্তিশালী, কেউ কেউ আবার রাষ্ট্রের সঙ্গেই শাসনক্ষমতা নিয়ে প্রতিযোগিতা করছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এই অবস্থাকে বলছেন, টেকনোপোলার বিশ্ব, যেখানে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত সার্বভৌম সত্তার মতো আচরণ করে। তারা সামাজিক যোগাযোগের ধরন কেমন হবে, বৈশ্বিক বাণিজ্য কেমন হবে, এমনকি কীভাবে দুই দেশ যুদ্ধ করবে–সেসব নিয়মও ঠিক করে দেয়।

আর তাদের এই প্রভাব ক্রমাগত বাড়ছে। এই টেক-জায়ান্টরা এবং তাদের উদ্যোক্তাদের সিদ্ধান্ত এখন পুরো বিশ্বের ওপর প্রভাব ফেলছে। আর সেখানেই নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র নিয়ে জরুরি প্রশ্ন উঠছে।

একবিংশ শতাব্দীর আসল ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং, এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে রাষ্ট্রের পাশাপাশি চলে এসেছে সেই করপোরেশনগুলো, যারা বিশ্বের ডিজিটাল পরিকাঠামোর নিয়ন্ত্রণক।

আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো—প্রযুক্তি থেকে নিয়ন্ত্রণ জোর করে কেড়ে নেওয়া নয়, বরং এটিকে গণতান্ত্রিক করে তোলা। এর অর্থ হলো, যে অ্যালগরিদম, পরিকাঠামো ও এদের সমন্বয় নীরবে আমাদের ডিজিটাল ভবিষ্যতকে নিয়ন্ত্রণ করছে, সেগুলোর মধ্যে নৈতিকতা ও বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা।

টেক-জায়ান্টরা কীভাবে বৈশ্বিক নানা বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করছে, তার একটা বড় উদাহরণ ইউক্রেন যুদ্ধ। ২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই বিলিয়নেয়ার ইলন মাস্ক তার প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স–এর পরিচালিত স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক স্টারলিংক সরবরাহ করেন, যাতে সাইবার হামলার মাঝেও ইউক্রেন অনলাইনে নিজের উপস্থিতি ধরে রাখতে পারে। একজন অনির্বাচিত প্রযুক্তি উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত ক্ষমতা দেশের যোগাযোগব্যবস্থা ও যুদ্ধক্ষেত্রের সমন্বয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

Map
Map

কিন্তু কয়েক মাস পর মাস্ক একটি ইউক্রেনীয় ড্রোন অভিযানের জন্য স্যাটেলাইট পরিষেবা চালু রাখতে অস্বীকৃতি জানান। এতে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, যুদ্ধের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহায়তা দিতে আমেরিকার সরকার আদৌ কতটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করতে পারে?

সামগ্রিকভাবে দেখলে ইউক্রেনের জন্য এই প্রতিষ্ঠান মিত্র হিসেবে কাজ করেছিল। কিন্তু স্টারলিংকের ওপর ইউক্রেনের এই নির্ভরশীলতা মূলত জাতীয় নিরাপত্তার ভঙ্গুর অবস্থা আর করপোরেট খাতের প্রভাবকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর প্রভাব এখন সামরিক ও গোয়েন্দা ক্ষেত্রে শুধু যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা বহু দূর প্রসারিত হয়েছে। যেমন, উদ্যোক্তা পিটার থিয়েলের প্যালান্টিয়ার টেকনোলজিস এখন পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর জন্য তথ্য-ভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণের সফটওয়্যার তৈরি ও সরবরাহ করছে। এরই মধ্যে ড্রোন শিল্প বিশ্বব্যাপী প্রতিরক্ষা খাতে নতুন বিনিয়োগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই মানববিহীন ব্যবস্থা বা আনম্যানড সিস্টেমস যুদ্ধের ধরন, গতি ও ব্যাপকতা পাল্টে দিচ্ছে। আর এই খাতে আসছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ। প্রযুক্তি খাতের এই প্রবণতাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন-সিলিকিন ভ্যালির সামরিকীকরণ।

এর অর্থ হলো-সাধারণ নাগরিকদের কথা বিবেচনা করে যে প্রযুক্তিগুলো একসময় যাত্রা করেছিল, সেগুলোই এখন সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সিলিকন ভ্যালী
সিলিকন ভ্যালী

এসব থেকে বোঝা যায় যে, নজরদারিসহ সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন কাজে আগে যেখানে রাষ্ট্রের একচেটিয়া প্রভাব ছিল, এখন সেখানে প্রযুক্তি খাতের আধিপত্য দিন দিন বাড়ছে। ফলে সামরিক-প্রযুক্তি খাতের মধ্যে এক জটিল পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন উপায়ে প্রযুক্তি খাতের মহারথীরা জাতীয় নিরাপত্তার ওপর কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করছে।

এই ভূ-রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের এই বেসরকারিকরণ একটি উভয়সংকট সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধ্রুপদি তত্ত্ব অনুযায়ী, সার্বভৌমত্ব শুধু জাতি-রাষ্ট্রগুলোর একচেটিয়া অধিকার। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর হাতে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, তথ্য, অ্যালগরিদম ও স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ সেই একচেটিয়া আধিপত্যকে দুর্বল করে দিয়েছে। আর যেসব প্রযুক্তি কোম্পানি দক্ষতার সাথে এসব নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদেরকে বিশেষজ্ঞরা আখ্যা দিচ্ছেন ‘ডিজিটাল দানব’ হিসেবে।

বিরাট পরিসর ও অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে এক ধরনের ক্ষমতা ভোগ করে, যা তাদের নীতিপ্রণেতাদের সান্নিধ্য পেতে সহায়তা করে। এর মাধ্যমে তারা গোটা খাতের স্ট্যান্ডার্ড বা মান নির্ধারণের পাশাপাশি নিজেদের মতো করে বিধি তৈরি করে। একইসঙ্গে এই প্ল্যাটফর্মগুলোর ক্ষমতার জোরেই তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বহুজাতিক জোট গঠনের সক্ষমতা পায়।

এই যে পরিস্থিতি, তাকে বিদ্যমান সার্বভৌম ধারণার প্রতিস্থাপন বলা যাবে না, বরং এটি একটি শংকর দশা তৈরি করছে। এখনো রাষ্ট্রই আইন বানায়, যদিও করপোরেটদের মাধ্যমে শাসন করে। তথ্যভাণ্ডার, অনলাইনে প্রচারিত নানা ভাষ্য কিংবা নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার ইত্যাদি বিষয়ক সিদ্ধান্ত জাতীয় আইনি কাঠামোর চেয়েও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভ্যন্তরীণ বিধির ওপর নির্ভরশীল।

তবে এই নতুন বাস্তবতা গনতন্ত্রের সাথে ঠিক খাপ খায় না। টেক-জায়ান্টদের এই ভূরাজনৈতিক আধিপত্য শুধু রাষ্ট্রকেই না, জনমত ও জনগণের কাছে রাষ্ট্রের জবাবদিহিকেও চ্যলেঞ্জ করে। কিন্তু তারা মানুষের ভোটে নির্বাচিত না হলেও প্রায় সরকারের সমান ক্ষমতার চর্চা করে। পুরোনো ও নতুন প্রচলিত গণমাধ্যম কিনে বা তার ওপর প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে তারা শুধু যোগাযোগ কাঠামোই বদলে দিচ্ছে না, নির্বাচনের ওপরও প্রভাব বিস্তার করছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হতে পারে ইলন মাস্কের এক্স (সাবেক টুইটার) আর আমাজনের মালিক জেফ বেজোসের ওয়াশিংটন পোস্ট কিনে ফেলা।

Musk
Musk

স্বৈরাচারী রাষ্ট্রকাঠামোয় দেশের অভ্যন্তরে প্রযুক্তি খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে দেখা যায়। চীনের আলিবাবার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এই বার্তা দেয় যে, কোনো করপোরেট জায়ান্টই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাথে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে না।

বিপরীতে, গণতান্ত্রিক দেশগুলো এই বিষয়ে এখনো অনিশ্চিত বা দ্বিধান্বিত। আমেরিকা তার অর্থনৈতিক প্রভাব, প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা তথ্যের জন্য সে দেশের টেক জায়ান্টদের ওপর নির্ভরশীল। একই সময়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আইন প্রণয়ন ও নিজস্ব সক্ষমতায় বিনিয়োগের মাধ্যমে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব অর্জনের চেষ্টা করছে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—প্রযুক্তির উদ্ভাবনকে কীভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

টেক জায়ান্টদের উত্থান বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন সৃষ্টি করছে। সার্বভৌম ক্ষমতা এখন আর কেবল রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের আওতার বাইরের সংস্থাগুলোর মধ্যকার একটিমাত্র বিভাজন নয়। বরং এটি পরস্পর নির্ভরশীল পক্ষগুলোর মধ্যে একটি আলোচনা ও বোঝাপড়ার বিষয়।

কোনো সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সংযোগ সরবরাহ করা বা রাজনৈতিক বক্তব্য নিষিদ্ধের মতো ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে টেক জায়ান্টদের নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করছে। অথচ এসবের তদারকি বা পর্যবেক্ষণের বর্তমান ব্যবস্থাটি দাঁড়িয়ে আছে তাৎক্ষণিকতা ও দরকারি প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে।

রাষ্ট্রগুলো অবস্থা বুঝে কখনো এই টেক জায়ান্টদের সাথে সহাবস্থান করে, আবার কখনো সংঘর্ষের পথে যায়। সংকটের সময় তাদের দক্ষতা ও সামর্থ্যের প্রশংসা করতেও দেখা যায়। আবার বিপদ কেটে গেলে বাজারের ওপর তাদের একচ্ছত্র আধিপত্যের সমালোচনা করে রাষ্ট্র।

বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মোকাবিলা করতে রাষ্ট্র যেভাবে ব্যবস্থা নেয়, সেভাবেই এই টেক জায়ান্টদেরকে ঠেকাতে তাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে নতুন পলিসি বা আইন তৈরি করতে হবে।

প্রথমত, সরকার ও প্রধান প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর মধ্যে আলোচনার ব্যবস্থা থাকা অত্যাবশ্যক। জাতীয় প্রযুক্তি প্রতিনিধি নিয়োগের যে প্রবণতা বাড়ছে, সেটিকে এমন এক সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে করা উচিত, যেখানে জরুরি অবস্থার সময় গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল পরিষেবা প্রদান বা প্রত্যাহারের বিষয়গুলো স্পষ্ট থাকবে।

দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের সময় করপোরেট আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের দায়িত্ব নির্ধারণ করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একটি প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য হওয়া উচিত এবং তা সম্পূর্ণ প্রযুক্তি ব্যবস্থার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।

সবশেষে, বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উচিত সরবরাহ চেইন ও ভিত্তির বহুমুখীকরণ, স্থানীয় উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল পরিকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতকে সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতা বাড়ানো। ইইউ এবং আরও কিছু অঞ্চলে নিজস্ব প্রযুক্তি খাত উন্নয়নে নেওয়া উদ্যোগ বিশ্বের টেক-জায়ান্টদের একাধিপত্য কমানোর একটি পদক্ষেপ।

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর টেক-জায়াণ্টদের ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসাটা একইসঙ্গে জটিল ও ভয়াবহ; যদিও তা যুগান্তকারীও বটে। এর মাধ্যমে ক্ষমতার বেসরকারিকরণ হবে। তাই টেক জায়ান্টদের ভূরাজনৈতিক ক্ষমতা চলে যাওয়ার চেয়ে ইউরোপ ও তার মিত্রদের বড় মাথাব্যথার বিষয় টেক জায়ান্টদের ওপর তাদের কর্তৃত্ব ফিরে পাওয়া।

লেখক: রালুকা চের্নাতোনি

কার্নেগি ইউরোপের একজন ফেলো, যিনি ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নিয়ে কাজ করছেন।

**কার্নেগি ইউরোপের লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত।**

সম্পর্কিত