পি কে বালাচন্দ্রন

ভারত, বিএনপি ও মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক এক সমঝোতা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই সমঝোতা হয়েছে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সঠিক পথে চালিত করা এবং এই অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে।
সমঝোতাটি ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
এই সমঝোতায় বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতে অবস্থান করা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগকে এক ধরনের অব্যাহতি বা আইনি সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়ে থাকতে পারে। শেখ হাসিনা বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের দণ্ডিত এবং তার দল আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ।
যেভাবে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াতে ইসলামীর ওপর থেকে ইউনূস সরকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিল, ঠিক একইভাবে শেখ হাসিনা তার মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারেন এবং পরবর্তী সরকার আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হতেও পারে।
ভারত চায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, যেমনটি সম্প্রতি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বলেছেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, বর্তমান সরকারের অভিযোগ যদি এমন হয় যে, শেখ হাসিনা নির্বাচনে কারচুপি করেছিলেন। তবে সেই পরিস্থিতি সংশোধনের সর্বোত্তম উপায় হলো, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা।
গত ২৩ ডিসেম্বর মার্কিন কংগ্রেসের পাঁচ সদস্য গ্রেগরি ডব্লিউ. মিকস, বিল হুইজেঙ্গা, সিডনি কামলাগার-ডোভ, জুলি জনসন ও থমাস আর. সুওসি ড. ইউনূসকে খোলা চিঠি লিখে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানান। তাদের যুক্তি ছিল, ফৌজদারি দায়ভার কেবল কোনো ব্যক্তির ওপর বর্তাতে পারে, কোনো সমষ্টি বা দলের ওপর নয়। তারা এমন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আহ্বান জানান যেখানে সব দল অংশগ্রহণ করতে পারবে।
বিএনপির বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশে বর্তমানে বিরাজমান ভঙ্গুর শান্তি ও নিরাপত্তা কেবল তখনই নিশ্চিত করা সম্ভব, যদি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার জন্য জামায়াতে ইসলামীর সব প্রচেষ্টাকে রুখে দেওয়া যায়। আর এটি কেবল একটি শক্তিশালী বিএনপিই করতে পারে।

গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় এক জনসভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে রাজনৈতিক অবস্থান ব্যক্ত করেছেন, তা ভারতের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের উদ্বেগ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, “এ দেশ সমতল ও পাহাড়ী মানুষ, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান–সবার। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজেকে নিরাপদ মনে করবে।”
তারেক রহমান তার সমর্থকদের বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং কোনো উসকানিতে পা না দিতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমাদের যেকোনো মূল্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।” মূলত দুটি প্রধান সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’ ও ‘দ্য ডেইলি স্টার’ এবং ‘ছায়ানট’সহ দুটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জামায়াতের ভূমিকার প্রতি পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত করেই তিনি এ কথা বলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ
গত ২ ডিসেম্বর ‘ইন্ডিয়া টুডে’ এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপে বেশ ‘সতর্ক অবস্থান’ দেখা যাচ্ছে। এই সম্পর্কের বরফ গলার সূচনা হয় যখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান নয়াদিল্লি সফর করেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে টুইট করেন। ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় করা সেই পোস্টে মোদি খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য ‘সব ধরনের সহায়তার’ প্রস্তাব দেন।
এর জবাবে বিএনপি তাদের এক্স’ হ্যান্ডেলে জানায়, “বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সহমর্মিতাপূর্ণ বার্তা এবং শুভকামনার জন্য বিএনপি তার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।”
এস. জয়শঙ্করের মন্তব্য
সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘হিন্দুস্তান টাইমস লিডারশিপ সামিট’-এ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বলেন, “বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান করা ‘তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত’। এ বিষয়ে তাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
এই মন্তব্যের মাধ্যমে দিল্লি শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিজেদের কোনো ভূমিকা নেই বলে স্পষ্ট করে। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, তিনি কোথায় থাকবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার তার রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ‘ঢাকা ট্রিবিউন’-কে বলেন, শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য হস্তান্তরের মতো দু-একটি অমীমাংসিত ইস্যুর কারণে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত হবে না।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, “আমরা বাংলাদেশের জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থে শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা এ বিষয়ে সকল স্টেকহোল্ডার বা অংশীদারদের সাথে গঠনমূলকভাবে কাজ চালিয়ে যাবো।”

গত ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বলেন, “ভারত বাংলাদেশের সাথে সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি স্থিতিশীল, ইতিবাচক, গঠনমূলক, দূরদর্শী এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক সম্পর্ক চায়, যেখানে উভয় দেশের জনগণই হবে প্রধান অংশীদার।” ভারত কর্তৃক বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতির ৫৪তম বার্ষিকী বা ‘মৈত্রী দিবস’ উদ্যাপনের এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহও ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। কলকাতায় ‘মার্চেন্টস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘নতুন ক্যানভাসে’ কাজ করার চেষ্টা করছে, যেখানে উভয় দেশের ভবিষ্যৎ একসূত্রে গাঁথা। তিনি আরও বলেন, “কেবল একটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিলে তা ঠিক হবে না।” তিনি এই সম্পর্ককে ‘পারস্পরিক নির্ভরশীলতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং জানান যে, ঢাকা এখন সাংস্কৃতিক কূটনীতি, পর্যটন সুবিধা এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক সংহতির ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ভারতীয় নৌবাহিনী প্রধান
ভারতীয় নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল দিনেশ কে ত্রিপাঠি গত ৩০ নভেম্বর বলেছেন, তিনি বাংলাদেশকে একটি বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে দেখেন এবং আশা করেন, বর্তমান অস্থিরতা দ্রুতই কেটে যাবে। তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
অ্যাডমিরাল ত্রিপাঠি বলেন, “আমরা তাদের কর্মীদের এখানে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আজ সকালেই এনডিএ (ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমি) থেকে পাস করে বের হওয়া একজন বাংলাদেশি ক্যাডেটের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার প্রথম বিদেশ সফর বাংলাদেশ হওয়ার কথা ছিল। অন্য একটি হাই-প্রোফাইল রাজধানীতে যাওয়ার বিকল্প থাকলেও আমি বাংলাদেশকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিলাম।”
গত ৯ ডিসেম্বর ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দুই দেশের সরকার আজ নৌযানসহ ৪৭ জন ভারতীয় এবং ৩৮ জন বাংলাদেশি জেলের মুক্তি ও প্রত্যাবাসন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ভারত সরকার ৯৫ জন ভারতীয় জেলের মুক্তি সহজতর করেছিল এবং একইভাবে ৯০ জন বাংলাদেশি জেলেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
বিএনপি জানিয়েছে, তারা ভারতের সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।
বৃহত্তম দল হিসেবে বিএনপি
নির্বাচনী মাঠে বিএনপি এখন একমাত্র প্রধান মূলধারার রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশে গত ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট’ (আইআরআই) পরিচালিত একটি জরিপ অনুযায়ী, ৩৩ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে, ২৯ শতাংশ জামায়াতকে এবং ৬ শতাংশ শিক্ষার্থীদের নতুন দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি(এনসিপি)’-কে ভোট দেবেন। আওয়ামী লীগ এই হিসাবের বাইরে ছিল, কারণ দলটি নিষিদ্ধ।
সুতরাং, এই মুহূর্তে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিএনপি জামায়াতের চেয়ে এগিয়ে থাকবে, তবে সেই ব্যবধান হবে খুবই সামান্য।
দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে জামায়াত
নির্বাচনী দৌঁড়ে জামায়াতের শক্ত অবস্থানে থাকা ভারতের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়, কারণ দলটি তীব্র ভারত-বিরোধী এবং হিন্দু-বিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার দায়ে ‘প্রথম আলো’ এবং ‘দ্য ডেইলি স্টার’- এই দুটি সংবাদপত্রের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে শেখ হাসিনার আমলে নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াত ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পুনরায় বৈধ রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন দমনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সমর্থন দেওয়ার কারণে জামায়াতের পাকিস্তান-ঘেঁষা অবস্থান সর্বজনবিদিত।

বলা হয়ে থাকে যে, হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর জামায়াতের প্রভাব থাকার কারণেই ২০২৪ সালের আগস্টে ড. ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হতে পেরেছিলেন। এরপর থেকে ইউনূস পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন এবং ভারতের স্পর্শকাতর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) দিকে নজর দিয়েছেন।
বিএনপির পরিবর্তন
অতীতে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোটে ছিল এবং ভারত-বিরোধী অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে, দলটি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে। কারণ ৪০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে এবং ভারতের সাথে বাণিজ্য সচল রাখতে তাদের নয়াদিল্লির সমর্থন প্রয়োজন। আর এটি নিশ্চিত করতে তারা জামায়াতকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে।
গত ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান তার বক্তৃতায় বিএনপির যে নতুন নীতির কথা তুলে ধরেছেন, তাতে স্পষ্ট যে, ২০২৫ সালের বিএনপি ১৯৮০ বা ১৯৯০-এর দশকের সেই বিএনপি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সে সময় ভারতের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত তিক্ত। তৎকালীন বিএনপি সরকারের ভারত-বিদ্বেষী মনোভাবই নয়াদিল্লিকে বাধ্য করেছিল শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে সর্বাত্মক সমর্থন দিতে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতের সাথে জোটে না গিয়ে এককভাবে লড়াই করার বিএনপির সিদ্ধান্ত ‘দিল্লি-বিএনপি’ সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক সংকেত।
ভারতের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
তবে ভারতকেও বাংলাদেশের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে অন্য যেকোনো দেশের সাথে বন্ধুত্ব করা এবং নিজস্ব অর্থনীতি পরিচালনা করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে অধিকার রয়েছে, তার প্রতি ভারতকে সহনশীল হতে হবে। ঢাকার ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ভারতের জন্যই বুমেরাং হতে পারে, যেমনটি সম্প্রতি ঘটেছে। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন এবং সাধারণ মানুষ ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
তবে বিশ্ব শক্তি হোক বা আঞ্চলিক শক্তি, দুর্বল ও ছোট দেশগুলোর ওপর নিজেদের প্রভাব খাটানোর একটি প্রবণতা তাদের মধ্যে থাকেই। ভারত এবং বাংলাদেশ তাদের এই দীর্ঘদিনের বদ্ধমূল প্রবণতা কাটিয়ে উঠে সম্পর্ককে একটি স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।
ইউরেশিয়া রিভিউতে প্রকাশিত এবং ইংরেজি থেকে অনূদিত
লেখক: পি. কে. বালাচন্দ্রন একজন প্রবীণ ভারতীয় সাংবাদিক। তিনি শ্রীলঙ্কায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার জন্য কাজ করেন এবং ২১ বছর ধরে দক্ষিণ এশীয় বিষয় নিয়ে লেখালেখি করছেন

ভারত, বিএনপি ও মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক এক সমঝোতা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই সমঝোতা হয়েছে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সঠিক পথে চালিত করা এবং এই অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে।
সমঝোতাটি ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
এই সমঝোতায় বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতে অবস্থান করা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগকে এক ধরনের অব্যাহতি বা আইনি সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়ে থাকতে পারে। শেখ হাসিনা বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের দণ্ডিত এবং তার দল আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ।
যেভাবে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াতে ইসলামীর ওপর থেকে ইউনূস সরকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিল, ঠিক একইভাবে শেখ হাসিনা তার মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারেন এবং পরবর্তী সরকার আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হতেও পারে।
ভারত চায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, যেমনটি সম্প্রতি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বলেছেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, বর্তমান সরকারের অভিযোগ যদি এমন হয় যে, শেখ হাসিনা নির্বাচনে কারচুপি করেছিলেন। তবে সেই পরিস্থিতি সংশোধনের সর্বোত্তম উপায় হলো, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা।
গত ২৩ ডিসেম্বর মার্কিন কংগ্রেসের পাঁচ সদস্য গ্রেগরি ডব্লিউ. মিকস, বিল হুইজেঙ্গা, সিডনি কামলাগার-ডোভ, জুলি জনসন ও থমাস আর. সুওসি ড. ইউনূসকে খোলা চিঠি লিখে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানান। তাদের যুক্তি ছিল, ফৌজদারি দায়ভার কেবল কোনো ব্যক্তির ওপর বর্তাতে পারে, কোনো সমষ্টি বা দলের ওপর নয়। তারা এমন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আহ্বান জানান যেখানে সব দল অংশগ্রহণ করতে পারবে।
বিএনপির বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশে বর্তমানে বিরাজমান ভঙ্গুর শান্তি ও নিরাপত্তা কেবল তখনই নিশ্চিত করা সম্ভব, যদি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার জন্য জামায়াতে ইসলামীর সব প্রচেষ্টাকে রুখে দেওয়া যায়। আর এটি কেবল একটি শক্তিশালী বিএনপিই করতে পারে।

গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় এক জনসভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে রাজনৈতিক অবস্থান ব্যক্ত করেছেন, তা ভারতের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের উদ্বেগ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, “এ দেশ সমতল ও পাহাড়ী মানুষ, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান–সবার। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজেকে নিরাপদ মনে করবে।”
তারেক রহমান তার সমর্থকদের বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং কোনো উসকানিতে পা না দিতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমাদের যেকোনো মূল্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।” মূলত দুটি প্রধান সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’ ও ‘দ্য ডেইলি স্টার’ এবং ‘ছায়ানট’সহ দুটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জামায়াতের ভূমিকার প্রতি পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত করেই তিনি এ কথা বলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ
গত ২ ডিসেম্বর ‘ইন্ডিয়া টুডে’ এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপে বেশ ‘সতর্ক অবস্থান’ দেখা যাচ্ছে। এই সম্পর্কের বরফ গলার সূচনা হয় যখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান নয়াদিল্লি সফর করেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে টুইট করেন। ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় করা সেই পোস্টে মোদি খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য ‘সব ধরনের সহায়তার’ প্রস্তাব দেন।
এর জবাবে বিএনপি তাদের এক্স’ হ্যান্ডেলে জানায়, “বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সহমর্মিতাপূর্ণ বার্তা এবং শুভকামনার জন্য বিএনপি তার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।”
এস. জয়শঙ্করের মন্তব্য
সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘হিন্দুস্তান টাইমস লিডারশিপ সামিট’-এ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বলেন, “বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান করা ‘তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত’। এ বিষয়ে তাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
এই মন্তব্যের মাধ্যমে দিল্লি শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিজেদের কোনো ভূমিকা নেই বলে স্পষ্ট করে। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, তিনি কোথায় থাকবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার তার রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ‘ঢাকা ট্রিবিউন’-কে বলেন, শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য হস্তান্তরের মতো দু-একটি অমীমাংসিত ইস্যুর কারণে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত হবে না।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, “আমরা বাংলাদেশের জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থে শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা এ বিষয়ে সকল স্টেকহোল্ডার বা অংশীদারদের সাথে গঠনমূলকভাবে কাজ চালিয়ে যাবো।”

গত ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বলেন, “ভারত বাংলাদেশের সাথে সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি স্থিতিশীল, ইতিবাচক, গঠনমূলক, দূরদর্শী এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক সম্পর্ক চায়, যেখানে উভয় দেশের জনগণই হবে প্রধান অংশীদার।” ভারত কর্তৃক বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতির ৫৪তম বার্ষিকী বা ‘মৈত্রী দিবস’ উদ্যাপনের এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহও ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। কলকাতায় ‘মার্চেন্টস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘নতুন ক্যানভাসে’ কাজ করার চেষ্টা করছে, যেখানে উভয় দেশের ভবিষ্যৎ একসূত্রে গাঁথা। তিনি আরও বলেন, “কেবল একটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিলে তা ঠিক হবে না।” তিনি এই সম্পর্ককে ‘পারস্পরিক নির্ভরশীলতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং জানান যে, ঢাকা এখন সাংস্কৃতিক কূটনীতি, পর্যটন সুবিধা এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক সংহতির ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ভারতীয় নৌবাহিনী প্রধান
ভারতীয় নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল দিনেশ কে ত্রিপাঠি গত ৩০ নভেম্বর বলেছেন, তিনি বাংলাদেশকে একটি বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে দেখেন এবং আশা করেন, বর্তমান অস্থিরতা দ্রুতই কেটে যাবে। তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
অ্যাডমিরাল ত্রিপাঠি বলেন, “আমরা তাদের কর্মীদের এখানে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আজ সকালেই এনডিএ (ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমি) থেকে পাস করে বের হওয়া একজন বাংলাদেশি ক্যাডেটের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার প্রথম বিদেশ সফর বাংলাদেশ হওয়ার কথা ছিল। অন্য একটি হাই-প্রোফাইল রাজধানীতে যাওয়ার বিকল্প থাকলেও আমি বাংলাদেশকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিলাম।”
গত ৯ ডিসেম্বর ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দুই দেশের সরকার আজ নৌযানসহ ৪৭ জন ভারতীয় এবং ৩৮ জন বাংলাদেশি জেলের মুক্তি ও প্রত্যাবাসন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ভারত সরকার ৯৫ জন ভারতীয় জেলের মুক্তি সহজতর করেছিল এবং একইভাবে ৯০ জন বাংলাদেশি জেলেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
বিএনপি জানিয়েছে, তারা ভারতের সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।
বৃহত্তম দল হিসেবে বিএনপি
নির্বাচনী মাঠে বিএনপি এখন একমাত্র প্রধান মূলধারার রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশে গত ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট’ (আইআরআই) পরিচালিত একটি জরিপ অনুযায়ী, ৩৩ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে, ২৯ শতাংশ জামায়াতকে এবং ৬ শতাংশ শিক্ষার্থীদের নতুন দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি(এনসিপি)’-কে ভোট দেবেন। আওয়ামী লীগ এই হিসাবের বাইরে ছিল, কারণ দলটি নিষিদ্ধ।
সুতরাং, এই মুহূর্তে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিএনপি জামায়াতের চেয়ে এগিয়ে থাকবে, তবে সেই ব্যবধান হবে খুবই সামান্য।
দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে জামায়াত
নির্বাচনী দৌঁড়ে জামায়াতের শক্ত অবস্থানে থাকা ভারতের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়, কারণ দলটি তীব্র ভারত-বিরোধী এবং হিন্দু-বিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার দায়ে ‘প্রথম আলো’ এবং ‘দ্য ডেইলি স্টার’- এই দুটি সংবাদপত্রের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে শেখ হাসিনার আমলে নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াত ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পুনরায় বৈধ রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন দমনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সমর্থন দেওয়ার কারণে জামায়াতের পাকিস্তান-ঘেঁষা অবস্থান সর্বজনবিদিত।

বলা হয়ে থাকে যে, হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর জামায়াতের প্রভাব থাকার কারণেই ২০২৪ সালের আগস্টে ড. ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হতে পেরেছিলেন। এরপর থেকে ইউনূস পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন এবং ভারতের স্পর্শকাতর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) দিকে নজর দিয়েছেন।
বিএনপির পরিবর্তন
অতীতে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোটে ছিল এবং ভারত-বিরোধী অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে, দলটি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে। কারণ ৪০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে এবং ভারতের সাথে বাণিজ্য সচল রাখতে তাদের নয়াদিল্লির সমর্থন প্রয়োজন। আর এটি নিশ্চিত করতে তারা জামায়াতকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে।
গত ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান তার বক্তৃতায় বিএনপির যে নতুন নীতির কথা তুলে ধরেছেন, তাতে স্পষ্ট যে, ২০২৫ সালের বিএনপি ১৯৮০ বা ১৯৯০-এর দশকের সেই বিএনপি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সে সময় ভারতের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত তিক্ত। তৎকালীন বিএনপি সরকারের ভারত-বিদ্বেষী মনোভাবই নয়াদিল্লিকে বাধ্য করেছিল শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে সর্বাত্মক সমর্থন দিতে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতের সাথে জোটে না গিয়ে এককভাবে লড়াই করার বিএনপির সিদ্ধান্ত ‘দিল্লি-বিএনপি’ সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক সংকেত।
ভারতের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
তবে ভারতকেও বাংলাদেশের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে অন্য যেকোনো দেশের সাথে বন্ধুত্ব করা এবং নিজস্ব অর্থনীতি পরিচালনা করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে অধিকার রয়েছে, তার প্রতি ভারতকে সহনশীল হতে হবে। ঢাকার ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ভারতের জন্যই বুমেরাং হতে পারে, যেমনটি সম্প্রতি ঘটেছে। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন এবং সাধারণ মানুষ ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
তবে বিশ্ব শক্তি হোক বা আঞ্চলিক শক্তি, দুর্বল ও ছোট দেশগুলোর ওপর নিজেদের প্রভাব খাটানোর একটি প্রবণতা তাদের মধ্যে থাকেই। ভারত এবং বাংলাদেশ তাদের এই দীর্ঘদিনের বদ্ধমূল প্রবণতা কাটিয়ে উঠে সম্পর্ককে একটি স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।
ইউরেশিয়া রিভিউতে প্রকাশিত এবং ইংরেজি থেকে অনূদিত
লেখক: পি. কে. বালাচন্দ্রন একজন প্রবীণ ভারতীয় সাংবাদিক। তিনি শ্রীলঙ্কায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার জন্য কাজ করেন এবং ২১ বছর ধরে দক্ষিণ এশীয় বিষয় নিয়ে লেখালেখি করছেন

পূর্ব আফ্রিকার একটি ভূমিবেষ্টিত দেশ উগান্ডা। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল এই দেশটিকে অভিহিত করেছিলেন ‘দ্য পার্ল অব আফ্রিকা’ নামে। কুখ্যাত স্বৈরশাসক ইদি আমিনের দেশ হিসেবেও উগান্ডা পরিচিতি পেয়েছিল একসময়। সেসব অবশ্য বেশ আগের কথা। চলতি শতাব্দীর শুরুর দশকে বরং মবের দেশ

ভারত, বিএনপি ও মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক এক সমঝোতা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই সমঝোতা হয়েছে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সঠিক পথে চালিত করা এবং এই অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে।