ইসলামভীতি: ক্ষমতার নতুন বৈশ্বিক মুদ্রা

ইসমাইল সালাহউদ্দিন
ইসমাইল সালাহউদ্দিন
ইসলামভীতি: ক্ষমতার নতুন বৈশ্বিক মুদ্রা
ইসলামভীতি হয়ে উঠেছে গণতন্ত্র ও স্বৈরশাসন–উভয়েরই যৌথ ভাষা।

আজকের পৃথিবীকে বোঝার সবচেয়ে সৎ উপায় হলো এ কথা স্বীকার করা–ইসলামভীতি এখন ক্ষমতার নতুন বৈশ্বিক মুদ্রা। এই মুদ্রা রাজনীতিবিদদের বক্তৃতায় লেনদেন হয়, কূটনীতিকদের আলোচনায় বিনিময় হয়, সংবাদমাধ্যমের পাতায় ছাপা হয়, আর নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী ভাষার মাধ্যমে ধোয়ামোছা হয়। এর বিনিময়ে পাওয়া যায় গণহত্যার দায়মুক্তি, স্বৈরাচারী শাসকদের বৈধতা এবং নজরদারি ও দমননীতির নতুন বাজার। গাজায় চলমান গণহত্যা সেই মুখোশ ছিঁড়ে দিয়েছে– মুসলমানদের রক্ত কেবলই সস্তা নয়, তা যেন বৈশ্বিক শক্তির লেনদেনে ব্যবহৃত এক ‘অব্যয় পুঁজি’।

দুই বছর ধরে বিশ্বের চোখের সামনে গাজার ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে। বাড়িঘর মাটিতে মিশে গেছে, পরিবারগুলো ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়েছে, হাসপাতাল লক্ষ্যবস্তু হয়েছে, শিশুরা ক্ষুধায় কথা হারিয়েছে। যখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ফিলিস্তিনিদের ‘মানুষ নয়, জন্তু’ বলেন এবং পশ্চিমা নেতারা ইসরায়েলের ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ পুনরাবৃত্তি করেন, তখন তারা আসলে নিরাপত্তার নয়, অমানবিকতার রাজনীতি চালাচ্ছেন। ইসলামভীতি সেই মাধ্যম, যার দ্বারা গোটা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার নৈতিক অনুমতি পাওয়া যায়।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ইতিমধ্যেই বলেছে, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড গণহত্যার আওতায় পড়তে পারে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধের বদলে ইসরায়েল পাচ্ছে আরও অস্ত্র, আরও অর্থ, আরও কূটনৈতিক সুরক্ষা। এই ‘মুদ্রা’-র উপমা এখানে বাস্তব হয়ে ওঠে: পশ্চিমা দেশগুলোর বিলিয়ন ডলার সহায়তা এমন এক দখল ও যুদ্ধকে টিকিয়ে রাখে, যার ভিত্তিই হলো মুসলমানদের জীবনের অবমূল্যায়ন।

গাজা কোনো বিচ্ছিন্ন বিপর্যয় নয়; এটি এক বৈশ্বিক ধারার কেন্দ্রবিন্দু। চিনে উইঘুর মুসলমানদের আটক শিবির, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগে বাধ্য করা, ফ্রান্সে মুসলিম কিশোরীদের হিজাব খুলে নেওয়া, কিংবা আমেরিকার ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’–সব জায়গায় একই যুক্তি কাজ করছে। ইসলামভীতি হয়ে উঠেছে গণতন্ত্র ও স্বৈরশাসন–উভয়েরই যৌথ ভাষা। এর মাধ্যমে বর্বরতা ‘শৃঙ্খলা’ নামে বিক্রি হয়, বর্ণবাদ ‘নিরাপত্তা’ নামে প্রচার পায়, আর গণহত্যা ‘নীতিগত পদক্ষেপ’ হিসেবে বৈধতা লাভ করে।

ফিলিস্তিনের বাইরে এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ভারত। সেখানে ২০ কোটি মুসলমানকে আরএসএস-বিজেপি শাসন ঠেলে দিয়েছে প্রান্তিকতা ও নিপীড়নের চূড়ান্ত প্রান্তে। নরেন্দ্র মোদির শাসনে ইসলামভীতি কোনো প্রান্তিক ঘৃণা নয়, বরং রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক মতাদর্শ। নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) ও নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি)–এর মতো আইন মুসলমানদের নিজ দেশে রাষ্ট্রহীন করে দেওয়ার কাঠামো তৈরি করেছে। দিল্লির দাঙ্গা, গরুর মাংস থাকার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা, মুসলিম বাড়িঘরে বুলডোজার, এমনকি প্রকাশ্য গণহত্যার আহ্বান–এসবই এক সুচিন্তিত রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের অংশ।

এই প্রকল্পের কৌশলও নতুন নয়। ইসরায়েল যেমন ফিলিস্তিনিদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেয়, তেমনি ভারতীয় মুসলমানদের বলা হয় ‘জিহাদি’ বা ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’। গাজার প্রতিরোধকে অপরাধ হিসেবে দেখানো হয় যেমন, তেমনি ভারতের মুসলমানদের প্রতিবাদকেও ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। উভয় ক্ষেত্রেই মুসলমানদের অস্তিত্বকেই অপরাধে পরিণত করা হয়।

হিন্দুত্ববাদ ও জায়নবাদের এই সাদৃশ্য কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়। ভারত ইসরায়েল থেকে নজরদারি প্রযুক্তি, সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল ও প্রচারণার ধরন আমদানি করেছে। প্রথমে কাশ্মীরে তা প্রয়োগ করা হয়, এখন গোটা ভারতের মুসলমানদের ওপর। বার্তাটি স্পষ্ট–ইসরায়েল যেমন ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে করে, ভারতও মুসলমানদের সঙ্গে তাই করতে পারে। ফলে ইসলামভীতি শুধু ঘরোয়া রাজনীতির অস্ত্র নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতির বন্ধনও বটে। এটি অস্ত্র, অর্থ ও বৈধতার আদান-প্রদান সহজ করে তোলে।

অনেকে বলেন, ‘ইসলামভীতি’ শব্দটি অতিরিক্ত সরলীকরণ; এটি ধর্মের সমালোচনাকে নিপীড়নের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। কিন্তু এ যুক্তি এক ধরনের পলায়ন। এখানে ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রযুক্তি কাজ করছে–কে নাগরিক হিসেবে বাঁচবে, আর কে ‘সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত হবে, তার নিয়ন্ত্রণ। মাহমুদ মামদানি যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, ‘ভালো মুসলমান’ ও ‘খারাপ মুসলমান’ এই বিভাজন বিশ্বাসের নয়, শাসনের। গাজায় প্রত্যেক মুসলমানকে ‘খারাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাই তাদের হত্যা বৈধ। ভারতে ‘ভালো মুসলমান’ সে-ই, যে প্রতিবাদ করে না, প্রতিবেশিকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার পরও নীরব থাকে। এই বাস্তবতাকে ‘প্রমাণ কর’ বলা নিজেই সেই অস্বীকারের অর্থনীতির অংশ, যা ইসলামভীতিকে টিকিয়ে রাখে।

ইসরায়েল যেমন ফিলিস্তিনিদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেয়, তেমনি ভারতীয় মুসলমানদের বলা হয় ‘জিহাদি’ বা ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী
ইসরায়েল যেমন ফিলিস্তিনিদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেয়, তেমনি ভারতীয় মুসলমানদের বলা হয় ‘জিহাদি’ বা ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী

ইসলামভীতি তাই কেবল পক্ষপাত নয়, এটি এক রাজনৈতিক অর্থনীতি। রাষ্ট্রের ভেতরে এটি সংখ্যাগরিষ্ঠদের একত্র করে, অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে দৃষ্টি সরায়, নিপীড়নকে বৈধতা দেয়। আন্তর্জাতিক পরিসরে এটি জোট গঠনের ভাষা, যুক্তরাষ্ট্র যেমন ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’-এর নামে ইসরায়েলকে অস্ত্র দেয়, তেমনি ভারত মুসলিমবিরোধী প্রচারণা চালিয়েও পশ্চিমাদের ‘গণতান্ত্রিক অংশীদার’ হয়ে ওঠে। ফলে ইসলামভীতি আজ পৃথিবীর সবচেয়ে লেনদেনযোগ্য রাজনৈতিক পণ্য।

তবে যদি ইসলামভীতি ক্ষমতার মুদ্রা হয়, তবে প্রতিরোধই হতে হবে তার প্রতিবিপণন অর্থনীতি। এই প্রতিরোধকে হতে হবে সীমান্তহীন ও বৈশ্বিক– কারণ নিপীড়নও বৈশ্বিক। গাজা থেকে কাশ্মীর, শিনজিয়াং থেকে রোহিঙ্গা শিবির, প্যারিসের উপশহর থেকে দিল্লির বস্তি– প্রতিটি সংগ্রামকে যুক্ত করতে হবে একই সূত্রে। দুঃখ ও শোকের শ্রেণিবিন্যাস ভেঙে ফেলতে হবে– কিছু মৃত্যু শোকযোগ্য আর কিছু নয়, এই বিভাজনকে অস্বীকার করতে হবে। এডওয়ার্ড সাঈদের ভাষায়, মানবিক কষ্ট অবিভাজ্য; মুসলমানদের বেদনা কোনো নিম্নতর ট্র্যাজেডি নয়।

প্রকৃত সত্য হলো, ইসলামভীতি বৈশ্বিক রাজনীতির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়, এটি তার রক্তপ্রবাহ। যখন গাজায় বোমা পড়ে এবং সেটি ‘নিরাপত্তা’র ভাষায় বৈধতা পায়, যখন ভারতে মুসলমানকে পুলিশ পাহারায় হত্যা করা হয়, কিংবা ফ্রান্সে হিজাব পরা মেয়েকে স্কুলে ঢুকতে দেওয়া হয় না– তখন প্রতিবারই এক একটি লেনদেন ঘটে। ক্ষমতা কেনা-বেচা হয়, বৈধতা বিক্রি হয়, আর ভয় মজুত থাকে রাষ্ট্রের ব্যাংকে। যদি পৃথিবী এই ঘৃণার অর্থনীতি ধ্বংস না করতে শেখে, তাহলে আমরা এমন এক সভ্যতায় রয়ে যাব, যা টিকে আছে মুসলমানদের রক্তে কেনা লাভে।

ইসলামভীতিকে ‘মুদ্রা’ বলা মানে হলো– সেই লেনদেনগুলো দৃশ্যমান করা, যা আমাদের চোখের আড়ালে ঘটে। কোনো বক্তৃতার একটি শব্দ কেমন করে পুলিশি দমনকে বৈধতা দেয়, ‘নিরাপত্তা নীতি’ কীভাবে মানুষের ভূমি কেড়ে নেওয়ার হাতিয়ার হয়, কিংবা ‘জাতীয় বিশুদ্ধতা’র মিথ কেমন করে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিকিয়ে রাজনৈতিক মুনাফা অর্জন করে– সেটিই বোঝানো।

গাজায় ‘সন্ত্রাস’ শব্দ উচ্চারণ মানে পুরো মহল্লা নিশ্চিহ্ন করার ছুটি পাওয়া, ভারতে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ বললেই মুসলমানের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়– এসবই সেই বাজারের নিয়ম, যেখানে মুসলমানভীতিই সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন পণ্য।

এই মুদ্রাকে মূল্যহীন করতে হলে প্রতিরোধের অর্থনীতিকে হতে হবে আরও শক্তিশালী, আরও কল্পনাপ্রবণ, আরও মানবিক। সেটি এমন সংহতি তৈরি করবে, যা ‘ভাল ও ‘খারাপ’ মুসলমানের ভুয়া বিভাজন মানবে না; যা গাজা, ইয়েমেন, রাফাহ, দিল্লি, শিনজিয়াং ও রোহিঙ্গা শিবিরকে একই সংগ্রামের বিভিন্ন রণক্ষেত্র হিসেবে দেখবে।

অন্যথায়, আমরা এমন এক বিশ্বে পৌঁছে যাব যেখানে ভয়ই হয়ে উঠবে রাজনীতির প্রধান লেনদেন– আর সেই মূল্য কোনো সভ্য সমাজ, কোনো নৈতিকতার দাবিদার রাষ্ট্রই বহন করতে পারবে না।

ইসমাইল সালাহউদ্দিন: দিল্লি ও কলকাতাভিত্তিক লেখক ও গবেষক। তার গবেষণার মূল ক্ষেত্র মুসলিম পরিচয়, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, জাত-প্রথা এবং জ্ঞানের রাজনীতি। তিনি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার সোশ্যাল এক্সক্লুশন অ্যান্ড ইনক্লুসিভ পলিসি বিভাগে গবেষণা করছেন।

লেখাটি মিডিল ইস্ট মনিটরের সৌজন্যে

সম্পর্কিত