এই দেশে শুধু বাউলের স্মৃতি থাকবে, বাউল থাকবে না?

এই দেশে শুধু বাউলের স্মৃতি থাকবে, বাউল থাকবে না?
গত মাসের ১৭ অক্টোবর সারা দেশে একযোগে লালন উৎসব ও লালন মেলা উদ্বোধন হয়। ফাইল ছবি

এই তো গত মাসের ১৭ অক্টোবর সারা দেশে একযোগে লালন উৎসব ও লালন মেলা উদ্বোধন হলো। চলল তিন দিন ধরে। জাতীয় পর্যায়ে এ উদ্যোগ এবারই প্রথম। এ নিয়ে বেশ প্রশংসাও কুড়ায় অন্তর্বর্তী সরকার। প্রশংসনীয়ই বটে। কিন্তু এই উৎসবের আলোর পেছনে তখনো চলেছে বাউল ধারা ও মাজারপন্থীদের ওপর হামলা। প্রশ্ন ওঠে—লালন কি তবে বাউল ছিলেন না? আর যদি থেকেই থাকেন, তবে তার ভূমির বাউলেরা আজ আক্রান্ত কেন?

নতুন বন্দোবস্তে প্রবেশের পর থেকে বাউলদের ওপর হামলা যেমন বেড়েছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মাজারে হামলা ও ভাঙচুর। এমনকি মৃত ব্যক্তির লাশ কবর থেকে তুলে আগুনে ভস্মিভূত করতেও আমরা দেখেছি।

এই কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গে ঠিক কী কী ভাষ্য পাল্টা হিসেবে সামনে আসবে, তা মোটামুটি জানা। তবুও বলে রাখা ভালো যে, আগেও বিভিন্ন স্থানে বাউলদের ওপর হামলা হয়েছে। কেটে দেওয়া হয়েছে তাদের চুল। বাউল গানের আসর পণ্ড করা হয়েছে। কথা সত্য। খুবই সত্য।

পাল্টা প্রশ্ন যদি করা হয়—আগে যে হারে এসব হামলা হয়েছে, এই গত প্রায় দেড় বছরে এ হার কি একই ছিল? বারবার নাগরিক পরিসর থেকে এ নিয়ে উদ্বেগ জানানোর পরও এ বিষয়ে কিছু “আরও এমন হলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে’–এর মতো কিঞ্চিৎ বকে দেওয়া ছাড়া আর কিছু কি আমরা শুনতে বা জানতে পেরেছি, কর্তব্যক্তিদের তরফ থেকে?

এবারে যে ঘটনাটি ঘটল, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ একটা আলাপ চলছে। কর্তাব্যক্তিরা এ নিয়ে একটু একটু করে মুখ খুলছেন। কিন্তু ওই যে, “আগেও এমন কত হয়েছে”, সেই হিসাবের পরতে পরতে গুঁজে দিয়ে একমুঠো প্রতিবাদ আমরা দেখছি। তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ পরিষ্কার করে একটা বক্তব্য দিয়েছেন তার সোশ্যাল হ্যান্ডেলে। তিনি এই প্রবণতাকে নয়া–ফ্যাসিবাদী প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আরও অনেকেই একইভাবে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কিন্তু বাউল আবুল সরকার এখনো অন্তরীণ।

আমাদের ভুলে যাওয়ার কথা নয় কবি সোহেল হাসান গালিবের কথা। আবুল সরকারের মতো তাকেও ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। নানা পরিসর থেকে এর প্রতিবাদ হয়। এমনকি তার মুক্তির দাবি জানিয়ে কবি–সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা নানা বিবৃতিও দিয়েছেন। সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ৭২ ঘণ্টা। কিন্তু কিছু কি হয়েছে? সোহেল হাসান গালিবের গ্রেপ্তার ঢেকে দিয়েছে অন্য কোনো মাজারে হামলা কিংবা নুরাল পাগলার লাশ পোড়ানোর মতো বিষয়গুলো। আর জুলাই সনদ প্রণয়ন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, বন্দর, ইনক্লুসিভিটির মতো বিষয়গুলো আমাদের এমনভাবে ব্যস্ত রেখেছে যে, কোথায় কে পুড়ে গেল বা কার কবিতা কারারুদ্ধ হলো কিংবা কোন শিল্পীর কণ্ঠ কতটা রুদ্ধ হলো—তা দেখার কোনো সুযোগ আমাদের নেই। কত বড় বড় ব্যাপার আমাদের সামনে!

যেকোনো ব্যবস্থাই গড়ে ওঠে একটা ভিতের ওপর। আর এই ভিত তৈরিতে বেশ কিছু উপাদানকে ব্যবহার করা হয়। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে নতুন একটা ব্যবস্থার কথা শোনা যাচ্ছে। শুরু থেকেই এই ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হিসেবে বৈষম্য নিরসন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, সবার জন্য সমান সুযোগ ও অধিকারের প্রসঙ্গটি আসছে। আর এই অধিকারের দাবিটি বা ব্যবস্থা বদলের প্রসঙ্গটি যারা সামনে এনেছে, তাদের সামনের সারিতে ছিল তরুণেরা।

সমাজের নানা স্রোত এই দাবিতে আশার আলো দেখেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এটা আরেকটা ভাঁওতা হিসেবে সামনে আসে। কারণ, ব্যবস্থা বদল বা অধিকার সম্পর্কিত যাবতীয় আলোচনা শেষ পর্যন্ত একগোছা তত্ত্বীয় বিষয়ে পরিণত হয়। নানা মতবাদ ও তা নিয়ে তর্ক আমাদের সামনে এসে হাজির হয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে তারস্বরে চিৎকার করতে থাকা কতিপয় লোককে আমরা সভয়ে আবিষ্কার করতে থাকি, যারা অন্তর্ভুক্তি শব্দটি যত উচ্চতায়, যতটা জোর দিয়ে উচ্চারণ করেন, অন্যের অধিকার রদে চলা মবের পক্ষেও ঠিক ততটাই আবেগ দিয়ে কথা বলেন।

এখানে উল্লেখ করাটা অবান্তর হবে না যে, বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর কথা, যিনি একদিকে অন্তর্ভুক্তির কথা বলেন, অন্যদিকে “যারা বলবে মব মারানি, মব জাস্টিস তাদেরকে আগে শোয়াইবি” ধরনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নিজের নেতা–কর্মীদের নির্দেশনা দেন। এই নির্দেশনা ঠিক সেই সময় দেওয়া হচ্ছে, যখন একের পর এক স্থাপনা ভাঙচুর হচ্ছে, মাজারে মাজারে হামলা হচ্ছে, ভবঘুরেদের চুল কেটে ‘সভ্য–ভব্য’ বানানোর নামে নির্যাতন করা হচ্ছে।

হাসনাত আবদুল্লাহ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে এ বক্তব্য দেন। ততদিনে অর্থাৎ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে প্রায় শখানেক মাজারে হামলা হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর–ডিসেম্বরে বিভিন্ন এলাকায় অনুষ্ঠেয় বাউল অনুষ্ঠান, পালাগানের আসর ইত্যাদি পণ্ড হয়েছে। সমাজ সংস্কারক হিসেবে একদল লোক ক্যামেরা নিয়ে পথে নেমে পড়েছে ভবঘুরেদের জটা, চুল, দাড়ি কামিয়ে দিতে। হামলা হলো নারীদের ওপরে। প্রকাশ্যে নারীদের কটূক্তি তো বটেই, সরাসরি হেনস্তা করা শুরু হলো। এমনকি হেনস্তার অভিযোগে গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে ফুলের মালা পরিয়ে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিতেও দেখা গেল। প্রতিটি পর্যায়ে, প্রতিটি ধাপে একের পর এক এমন সব দৃশ্য সামনে এল, যা আর যাই হোক অন্তর্ভুক্তির কথা বলে না। বরং বিযুক্তির কথা বলে। এমন এক বার্তা সবার কাছে গেল, যেখানে বলা হচ্ছে তোমার পরিধেয় থেকে শুরু করে তোমার ভাষা–কথা, তোমার চোখ ও চাহনি সব একটা প্রণম্য পরিমাপে হতে হবে। সমাজের গজ–ফিতা নির্ধারণ করে দেবে, তোমার মাপ ঠিক কত হওয়া চাই। সোশ্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা–সমালোচনার পর হঠাৎ করেই টনক নড়ল সবার। কিন্তু ততদিনে যে ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভিত থেকে যে এনসিপির জন্ম হলো–তারা আজ পরিষ্কার একটা অবস্থান ঘোষণা করেছে। বাউল ও মাজারে হামলার প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু যে সময়ে একটা পরিষ্কার ও জোরালো অবস্থান নেওয়া দরকার ছিল, সে সময়ে মৃদু বকে দেওয়া ছাড়া আর কিছু আমরা দেখিনি। তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম অবশ্য শুরু থেকে, বিশেষত মাজারে হামলার ইস্যুতে কথা বলেছেন। কিন্তু তার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে এ ক্ষেত্রে তার বোধ হয় দূরত্ব ছিল। আসতে পারে অপরাপর রাজনৈতিক দলের প্রসঙ্গ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো অবস্থান নেয়নি। বিএনপিও ওই মৃদু বকে দেওয়ার দলে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিসরের কোনো সংঘ বা সামষ্টিক আওয়াজই ছিল না, যা রাষ্ট্রকে বা প্রশাসনকে এসব অনাচারের বিরুদ্ধে মিঠা ভাষণের বদলে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করতে পারে।

এই তো এভাবেই ক্রমে বাউল আবুল সরকার সামনে হাজির হন। বাউল ধারা বা এর মতবাদ, পালাগানের নানা পর্যায়, এর নানা পর্যায়ে নানা ধরনের সওয়াল–জওয়াবের রীতি ও রেওয়াজ, স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার সম্পর্ক ইত্যাদি হাজির হয়। একই ধর্মবিশ্বাসের নানা ধারা–উপধারা থাকে। থাকে নানা আলাপ। এই ধারা ও উপধারাগুলো স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার সম্পর্কের ধরন বিচারেও আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। বাউল ও ফকিরি যে ধারা, মাজারের যে ধারা, তা বহুকাল আগে থেকেই এ অঞ্চলের নানা শ্রেণি–পেশার মানুষের আধ্যাত্মিক চাহিদা পূরণ করে আসছে। নানাভাবে মানুষকে ধর্মতত্ত্বের গূঢ় কথাটি বোঝাতে বা তার মতো করে আচরিক বিষয়াদিকে প্রশ্ন করেছে। আর এই প্রশ্ন আচারের নামে ভণ্ডামীকেই। আচারসর্বস্ব বিষয়াদিকে খারিজ করেই এ ধারাগুলো দাঁড়ায়। প্রতিটি ধর্মেই এমন বহু ধারা–উপধারা রয়েছে। এ ধারাগুলোর মধ্যে তর্ক চলতে পারে, কিন্তু একটি আরেকটিকে কতলযোগ্য করতে পারে না।

বাউল আবুল সরকারের বিরুদ্ধে যে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উঠেছে, তাও এ ধরনের একটি প্রশ্নোত্তরের সূত্র ধরে। দুই ঘণ্টার একটি আসরের মাত্র ২ মিনিটের একটি ফুটেজ ধরে এ আলাপ। এই বিতর্ক ও গ্রেপ্তার। অথচ কে না জানে প্রসঙ্গ সরিয়ে নিলে, যেকোনো কথা বা ভাষ্যকেই আদতে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায়। আবুল সরকারের পুরো ভাষ্যটি কি ইচ্ছা করেই প্রচার করা হচ্ছে না? প্রশ্নটি উঠছেই।

সবাই মিলে এই ভাষ্যের বিচার–আচার করতে বসলেও একটি কথা ভুলেই যাচ্ছেন যে, এই দেশে ব্লাশফেমি আইন নেই। এ আইন করার বিষয়ে নানা সময়ে ক্ষুদ্র একটি অংশ চাপ তৈরি করেছে বা করার চেষ্টা করেছে কেবল। অথচ, আজকে সোহেল হাসান গালিব বা আবুল সরকার নিজের শিল্পমাধ্যমে দেওয়া ভাষ্যের কারণে অন্তরীণ। এ নিয়ে রাষ্ট্রকে বা প্রশাসনকে প্রশ্ন করা তো দূর, গালিব বা আবুল সরকার আসলে কতটা ‘সহি মুসলমান’ তা প্রমাণে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে তাদের গুণমুগ্ধদের। এমনকি ফরহাদ মজহারের মতো ব্যক্তিত্বকেও বলতে হচ্ছে যে, “আবুল সরকার আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন।” হ্যাঁ, ফরহাদ মজহার অনেক কড়া বক্তব্য দিয়েছেন, মাহফুজ সরাসরি এ ধরনের প্রবণতাকে ‘নয়া ফ্যাসিবাদ’ বলে চিহ্নিত করেছেন।

পাশাপাশি আগেই বলা হয়েছে যে, কতিপয় বুদ্ধির বনসাই এই হামলা, এমন নিপীড়ন ফ্যাসিবাদ জমানায়ও ছিল বলে এই পরিস্থিতিকে লঘু করার একটা চমৎকার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এর সঙ্গে তো “আমরা বাউল–ফকিরদের” পক্ষের লোক বলে নিজের অবস্থান প্রস্তুত করার বিষয়টি আছে। এই প্রবণতা আমাদের একেবারে চেনা। এই “আমরা অমুকের লোক, কিন্তু…” লোকেরা সাধারণত ‘অমুক’ বিষয়টিকে ধসিয়ে দিতে দারুণভাবে কাজ করে থাকে। এরা অনেকটা ‘আমেরিকা’র মতো, যে পক্ষে থাকলে শত্রুর তেমন প্রয়োজন হয় না।

এরা একদিকে বাউল উৎসব করবে, বাউল স্মৃতি রক্ষায় বিচিত্র সব ভবন, এমনকি ভূবনও বানিয়ে প্রাণ জেরবার করবে, কিন্তু জ্যান্ত বাউলের জন্য কিছু নয়। অবশ্য স্মৃতি রক্ষার বিষয়টি তো এভাবেই ঘটে। যথাযথভাবে মৃত্যু না হলে কি আর কারও বা কোনো কিছুর স্মৃতি সংরক্ষণ সম্ভব? ফলে বাউল স্মৃতি, মাজারের স্মৃতি, ফকিরির স্মৃতি, কিংবা এই সবগুলোরই ঐতিহ্য সংরক্ষণের স্বার্থেই তাদের উচ্ছেদ, তাদের হরণ ও ক্ষরণে–সবাই তৎপর বলা যায়। এ কারণে মাঠের হামলাকারী থেকে শুরু করে নাগরিক পরিসরে থাকা এই একই হুক্কাহুয়া রবে গলা মেলানো বা মিঠা করে বকে দেওয়া কর্তাব্যক্তিরা সব এক কাতারেই অবস্থান করে। তারা যেন সত্যিই বাউল–ফকিরদের বা এ ধারাকে মাটিচাপা দিয়ে বা মাজারগুলোকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকা ও বিস্তার পাওয়া চর্চাকে লোপাট করে দিয়ে একে স্মৃতিতে পরিণত করা। সেই অর্থে বাউল স্মৃতি রক্ষার লোক হিসেবে এরা যদিও–বা থাকে, বাউল–ফকিরদের পক্ষের লোক হিসেবে কোনোভাবেই নয়। রাষ্ট্রও যেন ক্রমেই এই বিষয়টিকে সত্য এবং ন্যায্য বলে ধরে নিয়েছে।

সম্পর্কিত