পাবলো বুয়েনো

বৈশ্বিক পোশাক শিল্পে ‘কাঠামোগত খেলোয়াড়ে’ পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। এশিয়ার দেশটি এখন তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম, আগে আছে কেবল চীন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী বাংলাদেশ।
বৃহৎ পরিসর কিন্তু নিম্ন-আয়ের অর্থনীতি নিয়ে ২০২৫ সাল শেষ করেছে বাংলাদেশ। বছরশেষে প্রায় ৪৬০ দশমিক ৪৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নমিনাল জিডিপি (আইএমএফের তথ্যমতে) ছিল বাংলাদেশের। এ ছাড়া ১৭ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই হাজার ৭০০ ডলারে।
মহামারি-পরবর্তী শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের পর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন কিছুটা মন্থর। ২০২৫ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৭% (আইএমএফ-এর মতে ২০২৬ ও ২০২৭ সালে এটি ৪ দশমিক ৭%-এ পৌঁছাবে), যা গড়ের চেয়ে কম। মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং বিশ্বব্যাপী চাহিদা কমে যাওয়া এর প্রধান কারণ। এই নিম্নমুখিতা এমন এক সময়ে এল, যখন পোশাক শিল্প একটি সমন্বয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূলত আমেরিকা ও ইউরোপের চাহিদা চক্রের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল এই শিল্প।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ বৈদেশিক খাত। মোট রপ্তানি প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলার, যার ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক এবং টেক্সটাইল পণ্য থেকে। পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানকে সুসংহত করেছে এই পরিসংখ্যান। একই সঙ্গে, বাংলাদেশ তুলা, কাপড়, জ্বালানি এবং মধ্যবর্তী পণ্যের মতো কাঁচামাল আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যা বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
শ্রমিকদের দিক থেকে আইএমএফ জোর দিয়েছে যে, নিম্ন মজুরি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার একটি কাঠামোগত কারণ হিসেবে রয়ে গেছে। এটি সামাজিক দুর্বলতারও একটি উৎস। শ্রমিক বিক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সম্প্রতি মজুরি সংশোধনের ফলে তৈরি পোশাক শিল্পে ন্যূনতম মজুরি ২০২৩ সালের ৯৭ ডলার থেকে বেড়ে বর্তমানে ১১৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে, ২০২৪ সালের শেষে ‘টুগেদার ফর চেঞ্জ’ (ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় এনজিওগুলোর একটি কনসোর্টিয়াম) পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তত ৩২% কারখানা ২০২৫ সালের মধ্যেও ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করেনি।
ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বনিম্ন শ্রম মজুরির দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। আর এ কারণেই শিল্প অংশীদার হিসেবে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়লেও অভ্যন্তরীণ বাজার ছোট হয়ে যায়, রপ্তানি নির্ভরতা বাড়ে এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি প্রকট হয়। আন্তর্জাতিক সরবরাহের জন্য খরচ, স্কেল ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার এই ভারসাম্যই হলো বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন পুনর্গঠনে বাংলাদেশের ভূমিকা বোঝার মূল চাবিকাঠি।
২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি
নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে চলা একটি অন্তর্বর্তী সরকারের পর সম্প্রতি একটি নতুন নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এই নির্বাচন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সুসংহত করলেও সুশাসন, শ্রম অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সন্দেহ পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। আর এসব বিষয়ই আন্তর্জাতিক ক্রেতা এবং বহুজাতিক সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক চক্র শুরু হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নেতা তারেক রহমানের ক্ষমতায় আসার মাধ্যমে, যিনি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে জয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। ২০২৪ সালের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের পর এটিই ছিল প্রথম নির্বাচন। আদালতের সিদ্ধান্তে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দল আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়া এই নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে। আর এই আওয়ামী লীগই নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলেও একটি ভঙ্গুর সামাজিক পরিবেশের মধ্যে বিএনপি সরকার অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনকে তাদের ইশতেহারের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছিল। বিএনপি অর্থনীতিকে বর্তমান ৪৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে দ্বিগুণ করে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছে। এই লক্ষ্য পূরণে বছরে প্রায় ৯% প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বর্তমান গতি এবং আইএমএফের পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক বেশি। এই পরিকল্পনায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানোর কথা বলা হলেও, এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে অর্থায়ন বা জিডিপির ২৩% এ স্থবির হয়ে থাকা বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ এখনও নেই।
এই এজেন্ডা বাস্তবায়নের চাপ অনেক বেশি। নতুন সরকার একদিকে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান, চাকরিহীনতা ও দুর্নীতি নিয়ে তরুণদের অসন্তোষ এবং অন্যদিকে ‘সুপ্ত’ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের চাপের মধ্যে রয়েছে। পোশাক শিল্পের মতো শ্রমনির্ভর খাতের জন্য অনিশ্চয়তা কেবল রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকও বটে। বিএনপি সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, শিল্পের জন্য জ্বালানি ও বৈদেশিক মুদ্রা নিশ্চিত করা, রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা এবং ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের ফলে বাণিজ্যিক সুবিধা হারানোর প্রস্তুতি নেওয়ার সক্ষমতার ওপর।
বৈদেশিক বাণিজ্য এবং শিল্প ভিত্তি
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশ সম্প্রতি বৈদেশিক বাণিজ্য এজেন্ডাকে শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। ২০২৫ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন বাজার বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রায় ১৮% গ্রহণ করেছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রাহক।

দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিটি মূলত ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও এই প্রবাহ সচল রাখার লক্ষ্য নিয়ে করা হয়েছে। এই চুক্তিতে প্রশাসনিক বাধা কমানো এবং ট্যারিফ কাঠামো পর্যালোচনার বিধান রয়েছে, তবে এতে শ্রম বিষয়েও স্পষ্ট শর্তাবলী যুক্ত করা হয়েছে—বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়ন করার স্বাধীনতা এবং টেক্সটাইল শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে।
খাতটির দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রয়োজনীয়তাগুলোর দ্বিমুখী প্রভাব রয়েছে। একদিকে এগুলো পরিচালন ব্যয় বাড়ায় এবং শ্রম সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকীকরণে বাধ্য করে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে শক্তিশালী করে, যা ইউরোপীয় এবং উত্তর আমেরিকার ক্রেতাদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে একটি বিশাল এবং সুসংহত শিল্প ভিত্তিও কাজ করছে। বাংলাদেশে আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম কিছু টেক্সটাইল গ্রুপ রয়েছে, যারা বহুজাতিক ফ্যাশন কোম্পানিগুলোর নিয়মিত সরবরাহকারী। ডেনিম এবং ক্যাজুয়াল পোশাকে বিশেষায়িত হা-মীম গ্রুপ এইচএন্ডএম, গ্যাপ এবং লেভিসের মতো ক্লায়েন্টদের সাথে কাজ করে। অন্যদিকে বেক্সিমকো অ্যাপারেলস জারা, কেলভিন ক্লেইন এবং টমি হিলফিগারের মতো ব্র্যান্ডের জন্য পণ্য উৎপাদন করে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ডিবিএল গ্রুপ, যারা পরিবেশগত সার্টিফিকেশনের ওপর জোর দিয়ে এইচএন্ডএম এবং পুমার মতো ব্র্যান্ডের সরবরাহকারী। এই গ্রুপগুলো প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ কেবল একটি স্বল্প খরচের দেশ নয়, বরং বিশ্ববাজারের জন্য একটি বৃহৎ পরিসরের উৎপাদন প্ল্যাটফর্ম।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি নতুন চক্রের মুখোমুখি, যেখানে বৈশ্বিক সরবরাহকারী হিসেবে নিজের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখা, বাণিজ্যিক অংশীদারদের দাবি অনুযায়ী শ্রম সংস্কারে অগ্রগতি করা এবং বিশ্বব্যাপী ভোগের ধীর গতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পোশাক শিল্পের জন্য স্কেল, অভিজ্ঞতা ও খরচের দিক থেকে বাংলাদেশ এখনও একটি অপরিহার্য নাম। তবে এটি এখন ক্রমবর্ধমানভাবে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং নিয়ন্ত্রণমূলক ফ্যাক্টর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। এ কারণে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও পাল্টে যেতে পারে।
লেখক: পাবলো বুয়েনো সাংবাদিক। ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা ও যোগাযোগ নিয়ে কাজ করছেন
(লেখাটি অর্থনীতিভিত্তিক স্প্যানিশ জার্নাল মোদেস থেকে নেওয়া)

বৈশ্বিক পোশাক শিল্পে ‘কাঠামোগত খেলোয়াড়ে’ পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। এশিয়ার দেশটি এখন তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম, আগে আছে কেবল চীন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী বাংলাদেশ।
বৃহৎ পরিসর কিন্তু নিম্ন-আয়ের অর্থনীতি নিয়ে ২০২৫ সাল শেষ করেছে বাংলাদেশ। বছরশেষে প্রায় ৪৬০ দশমিক ৪৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নমিনাল জিডিপি (আইএমএফের তথ্যমতে) ছিল বাংলাদেশের। এ ছাড়া ১৭ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই হাজার ৭০০ ডলারে।
মহামারি-পরবর্তী শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের পর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন কিছুটা মন্থর। ২০২৫ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৭% (আইএমএফ-এর মতে ২০২৬ ও ২০২৭ সালে এটি ৪ দশমিক ৭%-এ পৌঁছাবে), যা গড়ের চেয়ে কম। মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং বিশ্বব্যাপী চাহিদা কমে যাওয়া এর প্রধান কারণ। এই নিম্নমুখিতা এমন এক সময়ে এল, যখন পোশাক শিল্প একটি সমন্বয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূলত আমেরিকা ও ইউরোপের চাহিদা চক্রের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল এই শিল্প।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ বৈদেশিক খাত। মোট রপ্তানি প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলার, যার ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক এবং টেক্সটাইল পণ্য থেকে। পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানকে সুসংহত করেছে এই পরিসংখ্যান। একই সঙ্গে, বাংলাদেশ তুলা, কাপড়, জ্বালানি এবং মধ্যবর্তী পণ্যের মতো কাঁচামাল আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যা বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
শ্রমিকদের দিক থেকে আইএমএফ জোর দিয়েছে যে, নিম্ন মজুরি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার একটি কাঠামোগত কারণ হিসেবে রয়ে গেছে। এটি সামাজিক দুর্বলতারও একটি উৎস। শ্রমিক বিক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সম্প্রতি মজুরি সংশোধনের ফলে তৈরি পোশাক শিল্পে ন্যূনতম মজুরি ২০২৩ সালের ৯৭ ডলার থেকে বেড়ে বর্তমানে ১১৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে, ২০২৪ সালের শেষে ‘টুগেদার ফর চেঞ্জ’ (ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় এনজিওগুলোর একটি কনসোর্টিয়াম) পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তত ৩২% কারখানা ২০২৫ সালের মধ্যেও ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করেনি।
ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বনিম্ন শ্রম মজুরির দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। আর এ কারণেই শিল্প অংশীদার হিসেবে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়লেও অভ্যন্তরীণ বাজার ছোট হয়ে যায়, রপ্তানি নির্ভরতা বাড়ে এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি প্রকট হয়। আন্তর্জাতিক সরবরাহের জন্য খরচ, স্কেল ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার এই ভারসাম্যই হলো বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন পুনর্গঠনে বাংলাদেশের ভূমিকা বোঝার মূল চাবিকাঠি।
২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি
নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে চলা একটি অন্তর্বর্তী সরকারের পর সম্প্রতি একটি নতুন নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এই নির্বাচন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সুসংহত করলেও সুশাসন, শ্রম অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সন্দেহ পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। আর এসব বিষয়ই আন্তর্জাতিক ক্রেতা এবং বহুজাতিক সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক চক্র শুরু হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নেতা তারেক রহমানের ক্ষমতায় আসার মাধ্যমে, যিনি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে জয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। ২০২৪ সালের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের পর এটিই ছিল প্রথম নির্বাচন। আদালতের সিদ্ধান্তে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দল আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়া এই নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে। আর এই আওয়ামী লীগই নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলেও একটি ভঙ্গুর সামাজিক পরিবেশের মধ্যে বিএনপি সরকার অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনকে তাদের ইশতেহারের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছিল। বিএনপি অর্থনীতিকে বর্তমান ৪৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে দ্বিগুণ করে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছে। এই লক্ষ্য পূরণে বছরে প্রায় ৯% প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বর্তমান গতি এবং আইএমএফের পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক বেশি। এই পরিকল্পনায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানোর কথা বলা হলেও, এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে অর্থায়ন বা জিডিপির ২৩% এ স্থবির হয়ে থাকা বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ এখনও নেই।
এই এজেন্ডা বাস্তবায়নের চাপ অনেক বেশি। নতুন সরকার একদিকে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান, চাকরিহীনতা ও দুর্নীতি নিয়ে তরুণদের অসন্তোষ এবং অন্যদিকে ‘সুপ্ত’ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের চাপের মধ্যে রয়েছে। পোশাক শিল্পের মতো শ্রমনির্ভর খাতের জন্য অনিশ্চয়তা কেবল রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকও বটে। বিএনপি সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, শিল্পের জন্য জ্বালানি ও বৈদেশিক মুদ্রা নিশ্চিত করা, রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা এবং ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের ফলে বাণিজ্যিক সুবিধা হারানোর প্রস্তুতি নেওয়ার সক্ষমতার ওপর।
বৈদেশিক বাণিজ্য এবং শিল্প ভিত্তি
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশ সম্প্রতি বৈদেশিক বাণিজ্য এজেন্ডাকে শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। ২০২৫ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন বাজার বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রায় ১৮% গ্রহণ করেছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রাহক।

দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিটি মূলত ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও এই প্রবাহ সচল রাখার লক্ষ্য নিয়ে করা হয়েছে। এই চুক্তিতে প্রশাসনিক বাধা কমানো এবং ট্যারিফ কাঠামো পর্যালোচনার বিধান রয়েছে, তবে এতে শ্রম বিষয়েও স্পষ্ট শর্তাবলী যুক্ত করা হয়েছে—বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়ন করার স্বাধীনতা এবং টেক্সটাইল শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে।
খাতটির দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রয়োজনীয়তাগুলোর দ্বিমুখী প্রভাব রয়েছে। একদিকে এগুলো পরিচালন ব্যয় বাড়ায় এবং শ্রম সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকীকরণে বাধ্য করে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে শক্তিশালী করে, যা ইউরোপীয় এবং উত্তর আমেরিকার ক্রেতাদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে একটি বিশাল এবং সুসংহত শিল্প ভিত্তিও কাজ করছে। বাংলাদেশে আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম কিছু টেক্সটাইল গ্রুপ রয়েছে, যারা বহুজাতিক ফ্যাশন কোম্পানিগুলোর নিয়মিত সরবরাহকারী। ডেনিম এবং ক্যাজুয়াল পোশাকে বিশেষায়িত হা-মীম গ্রুপ এইচএন্ডএম, গ্যাপ এবং লেভিসের মতো ক্লায়েন্টদের সাথে কাজ করে। অন্যদিকে বেক্সিমকো অ্যাপারেলস জারা, কেলভিন ক্লেইন এবং টমি হিলফিগারের মতো ব্র্যান্ডের জন্য পণ্য উৎপাদন করে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ডিবিএল গ্রুপ, যারা পরিবেশগত সার্টিফিকেশনের ওপর জোর দিয়ে এইচএন্ডএম এবং পুমার মতো ব্র্যান্ডের সরবরাহকারী। এই গ্রুপগুলো প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ কেবল একটি স্বল্প খরচের দেশ নয়, বরং বিশ্ববাজারের জন্য একটি বৃহৎ পরিসরের উৎপাদন প্ল্যাটফর্ম।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি নতুন চক্রের মুখোমুখি, যেখানে বৈশ্বিক সরবরাহকারী হিসেবে নিজের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখা, বাণিজ্যিক অংশীদারদের দাবি অনুযায়ী শ্রম সংস্কারে অগ্রগতি করা এবং বিশ্বব্যাপী ভোগের ধীর গতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পোশাক শিল্পের জন্য স্কেল, অভিজ্ঞতা ও খরচের দিক থেকে বাংলাদেশ এখনও একটি অপরিহার্য নাম। তবে এটি এখন ক্রমবর্ধমানভাবে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং নিয়ন্ত্রণমূলক ফ্যাক্টর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। এ কারণে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও পাল্টে যেতে পারে।
লেখক: পাবলো বুয়েনো সাংবাদিক। ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা ও যোগাযোগ নিয়ে কাজ করছেন
(লেখাটি অর্থনীতিভিত্তিক স্প্যানিশ জার্নাল মোদেস থেকে নেওয়া)

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট