বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির পথে বাধা তাপপ্রবাহ

ওয়ামেক আজফার রাজা
ওয়ামেক আজফার রাজা
বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির পথে বাধা তাপপ্রবাহ
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম তাপ-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ছবি: রয়টার্স

গত এক দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অর্জনের গল্প ছিল বিস্ময়কর। দারিদ্র্যের হার কমেছে, বেড়েছে মানুষের গড় আয়ুষ্কাল। নানা বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ধাক্কা সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলেছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান হুমকি বিশেষ করে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা এখন এই কষ্টার্জিত সাফল্যগুলোকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

তীব্র তাপপ্রবাহ: মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বাস্তবতা

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম তাপ-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা বৃদ্ধির শিকার হওয়া জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো মানুষ বাস্তবে যে তাপমাত্রা অনুভব করে, তা বেড়েছে প্রায় ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

বিশ্বব্যাপী গত নয় বছর ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ সময়। আর এই বৈশ্বিক সংকটের সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশে তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে তা আসলেই খুব আশ্চর্যজনক। ছবি: রয়টার্স
বাংলাদেশে তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে তা আসলেই খুব আশ্চর্যজনক। ছবি: রয়টার্স

তাপমাত্রা বৃদ্ধির অর্থনৈতিক প্রভাবও ভয়াবহ। শুধুমাত্র ২০২৪ সালেই তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশে যে কর্মঘণ্টার ক্ষতি হয়েছে তার পরিমাণ প্রায় ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলার। এটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশ।

এই ক্ষতি কেবল গরমের অস্বস্তির কারণে হয়নি। তাপজনিত বিভিন্ন রোগ যেমন ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ক্লান্তি, বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়াই এর মূল কারণ। যেসব দিনে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, সেসব দিনে উৎপাদনশীলতা অন্যান্য দিনের তুলনায় সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

গরমে বাড়ছে রোগের প্রকোপ

তীব্র গরমে শীতের তুলনায় বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। যেমন—

দীর্ঘস্থায়ী কাশি: তাপমাত্রা ৩০° সেলসিয়াস ছাড়ালে দীর্ঘস্থায়ী কাশির ঝুঁকি ২২.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। শীতকালে যেখানে এই হার ৩.৩ শতাংশ, গ্রীষ্মে তা বেড়ে ৬.০ শতাংশে দাঁড়ায়।

গরমজনিত ক্লান্তি: তাপমাত্রা ৩৫° সেলসিয়াসের ওপরে গেলে প্রচণ্ড ক্লান্তিবোধের ঝুঁকি ২৬.৫ শতাংশ বেড়ে যায়। গ্রীষ্মকালে গড়ে ২.৬ শতাংশ মানুষ এতে আক্রান্ত হন, যাদের মধ্যে কর্মক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্কদের সংখ্যাই বেশি।

ডায়রিয়া: ৩৫° সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় ডায়রিয়ার ঝুঁকি ৪৭.৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। শীতকালে যেখানে এই হার ১.৮ শতাংশ, গ্রীষ্মে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪.৪ শতাংশে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু ও নারীরা এতে সবচেয়ে বেশি ভুগছে।

বিষণ্নতা: অতিরিক্ত গরমের দিনে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ২৩.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। শীতকালে এই হার ১৬.২ শতাংশ হলেও গ্রীষ্মে তা ২০.০ শতাংশে পৌঁছায়।

দুশ্চিন্তা: গরমের দিনে দুশ্চিন্তাজনিত মানসিক সমস্যার হার ৩৭.১ শতাংশ বেড়ে যায়। শীতকালে যেখানে এটি ৮.৩ শতাংশ, গ্রীষ্মে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০.০ শতাংশে।

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয়

এই পরিস্থিতিতে আশার কথা হলো বাংলাদেশের হাতে এই সংকট মোকাবিলার বাস্তবসম্মত উপায় রয়েছে। প্রতিবেদনে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পেতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে—

তাপপ্রবাহকে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া: বন্যার মতো তীব্র তাপপ্রবাহকেও জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। দুর্যোগ প্রস্তুতি ও অর্থায়ন কাঠামোর মধ্যে একে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি মাল্টি-সেক্টরাল টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।

যেসব দিনে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, সেসব দিনে উৎপাদনশীলতা অন্যান্য দিনের তুলনায় সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ছবি: রয়টার্স
যেসব দিনে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, সেসব দিনে উৎপাদনশীলতা অন্যান্য দিনের তুলনায় সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ছবি: রয়টার্স

জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা: হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় সক্ষম করতে হবে। এজন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পর্যাপ্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং ডাক্তার-নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। শিশু, নারী ও বয়স্কদের চিকিৎসায় বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ: আবহাওয়া ও স্বাস্থ্য তথ্যের ভিত্তিতে একটি কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। শহরের তাপমাত্রা কমাতে গাছ লাগানো, পার্ক তৈরি এবং জলাশয় সংরক্ষণের মতো উদ্যোগ জরুরি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান ও তীব্র রোদে বাইরে না যাওয়ার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

তথ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা: অঞ্চলভিত্তিক তাপমাত্রা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির ডেটা ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে, যাতে নির্দিষ্ট এলাকায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নির্ভুলভাবে গ্রহণ করা যায়।

আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করা: তাপপ্রবাহজনিত মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। এর মাধ্যমে জলবায়ু অর্থায়ন এবং ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্য আদায় সহজ হবে।

সন্তুষ্টি নয়, প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ

বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে। ‘আরবান হেলথ, নিউট্রিশন অ্যান্ড পপুলেশন প্রজেক্ট’-এর আওতায় পরীক্ষামূলকভাবে হিট-হেলথ অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ‘হেলথ, পপুলেশন অ্যান্ড নিউট্রিশন সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার উদ্যোগ চলছে।

মূল বার্তাটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত জরুরি—তীব্র দাবদাহ কোনো ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি ইতোমধ্যেই বর্তমান বাস্তবতা। তাপজনিত রোগ মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে। তবে আশার কথা হলো, এর সমাধান সম্ভব।

সঠিক তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে বিশ্বকে পথ দেখাতে পারে। মানবসম্পদ রক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীলতাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করলে, উষ্ণায়ন-আক্রান্ত এই পৃথিবীতেও বাংলাদেশ তার প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হবে।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে ব্লগের নিবন্ধটি অনুবাদ করে প্রকাশিত

সম্পর্কিত