গণঅভ্যুত্থান শিক্ষায় কী দিল?

গণঅভ্যুত্থান শিক্ষায় কী দিল?
শিক্ষক ও শ্রমিকদের বেলাতে যত দ্রুত পুলিশকে পুরোনো রূপে দেখা গেছে, আর কোনো ক্ষেত্রে তেমন দেখা যায়নি।

কথায় কথায় আমরা শিক্ষা খুঁজি। এই যে কয়েক দিন আগে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হ‌ুমায়ুন আহমেদের জন্মদিন গেল, তিনিও এই শিক্ষা প্রশ্নে রীতিমতো জেরবার ছিলেন। তাকে একটা দীর্ঘ সময় শুনতে হয়েছে, তার নাটকে বা উপন্যাসে শিক্ষামূলক কিছু থাকে না। গান হোক, সিনেমা হোক, নাটক কিংবা গল্প-উপন্যাস, বাংলাদেশের মানুষ ভীষণভাবে শিক্ষা খোঁজে। মনে হতেই পারে যে, দেশের শীর্ষ থেকে সাধারণ–সবাই ভীষণভাবে শিক্ষানুরাগী। এখানেই প্রশ্ন আসে যে, এই এত যে বড় গণঅভ্যুত্থান, এটা আমাদের শিক্ষায় কী দিল?

নিঃসন্দেহে খুবই জরুরি প্রশ্ন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো–এবার কিন্তু জোরেশোরে এ নিয়ে বড় কোনো আলাপ এল না। না সাধারণের তরফ থেকে, না কোনো শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা থেকে, এমনকি শিক্ষাবিদ হিসেবে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানো বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে। হ্যাঁ, গণঅভ্যুত্থানের শিক্ষা নিয়ে বিস্তর আলাপ হয়েছে এবং এখনো চলছে। কথায় কথায় বলা হচ্ছে–এই অভ্যুত্থানের শিক্ষাকে মাথায় করে রাখতে হবে। বলা হচ্ছে–কোনোভাবেই গণঅভ্যুত্থানের শিক্ষাকে ভোলা যাবে না। এখানেই শেষ নয়। অনেকে আবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বলে বেড়ান–ওনারা এত দ্রুত গণঅভ্যুত্থানের শিক্ষা থেকে দূরে সরে গেছেন! বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ আবার নানা গবেষণার রেফারেন্স টেনে গণঅভ্যুত্থানের শিক্ষা বিষয়টাকে সাধারণের বোধগম্য ও হৃদয়গ্রাহী করে উপস্থাপনের জন্য রীতিমতো ঘাম ঝরান।

এই পুরো আলাপের ঠিক কোথায় কতটা শিক্ষা আছে, তা বোঝা মুশকিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই নানামাত্রিক আর্থ-সামাজিক এবং অতি অবশ্যই রাজনৈতিক শিক্ষার ক্লাসে বাধ্য শিক্ষার্থীর মতো বসতে হয়। কত বিচিত্র পথ ও মত সামনে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু এসব স্বরের মধ্যে খুব কমই শোনা যায় সত্যিকারের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কোনো কথা। সবাই রাষ্ট্র নিয়ে কথা বলছেন, আন্তর্জাতিক চুক্তি, বাণিজ্য, ভূ-রাজনীতি নিয়ে কথা বলছেন। দেরিদা, নেরুদা হয়ে মার্ক্স, বেনিয়ামিন, ফানো, আলথুসার লাকাঁ, হারিরি তক সবাই মোটামুটি উদ্ধৃতি সাপ্লায়ারের কাজ করেন। বিদ্বৎমহলের মাঝখানে বসে তাদের সঙ্গরস এবং অবধারিতভাবেই জ্ঞানরসে সিক্ত হওয়ার বেশ একটা সুযোগ হয়। মন্দ কী? কে বলে শিক্ষা নেই এই বঙ্গমুলুকে!

ভুল বুঝবেন না। শিক্ষা আছে। বেশ প্রকট হয়েই আছে। মাঠে-ময়দানে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার হলে শিক্ষা রীতিমতো জাজ্বল্যমান। কিন্তু ওই যে শ্রেণিকক্ষ, তা এবার হোক স্কুল বা কলেজের কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের, সেখানেই যা একটু নাই। তা চরাচর পুরোটাই শিক্ষায় ছেয়ে ফেলার পর শ্রেণিকক্ষেও শিক্ষা লাগবে কেন–প্রশ্নটা কেউ করে বসলে উত্তর দেওয়ার জো থাকবে না কিন্তু।

বঙ্গমুলুকে শিক্ষার আরেক নাম শাস্তিও সম্ভবত। না হলে, আমরা কি আর সাধে বলি যে, এবার তাকে একটা শিক্ষা দিতে হবে। ভাবা যায়! কাউকে একহাত নেওয়া বা কাউকে সাজা দেওয়া অর্থে শিক্ষার এমন ব্যবহার আমাদের এখানে এমন প্রবলভাবে আছে যে, শিক্ষার পাশ ঘেঁষতেও একটু ভয় পেতে হয় বৈকি।

ফলে শিক্ষার সঙ্গে একটা বেশ আটপৌরে সম্পর্ক আমাদের। যেন ঘরের লোকটি, যার দিকে তেমন নজর না দিলেও চলে। সে আছে, থাকবে কিন্তু তাকে সিরিয়াসলি নেওয়ার তেমন কোনো প্রয়োজন নেই যেন। ফলে বছর বছর শিক্ষা নিয়ে গুটিকয় মানুষ সিরিয়াসভাবে নানা আলাপ তুললেও তা কর্তাব্যক্তিরা অনেকটা হাই তোলার মতো করে পাশ কাটিয়ে যান। এমনকি যে সর্বসাধারণ নাটক-সিনেমাতেও আতশ কাঁচ দিয়ে শিক্ষা খুঁজে বেড়ায়, তারাও এসব আলাপের দিকে ফিরেও তাকায় না। তাকালে গণঅভ্যুত্থানের মতো এত বড় একটা ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষা নিয়ে একটা জোরদার আলাপ সামনে আসত।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান তো এসেছে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বেই। হ্যাঁ, বহু শ্রেণি-পেশা ও বয়সের মানুষের যূথবদ্ধ আন্দোলনেই পটপরিবর্তন এসেছে। কিন্তু ভ্যানগার্ড হিসেবে তো ছিল শিক্ষার্থীরাই। তাহলে শিক্ষার প্রশ্নটি এভাবে এড়িয়ে যাওয়া গেল কীভাবে?

একটু বুঝিয়ে বলা যাক। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছিল। কিন্তু একটা শিক্ষা কমিশন কিন্তু হয়নি। সত্যি আতশ কাঁচ দিয়ে খুঁজলেও এমন একটি কমিশনের দেখা মিলবে না। সংবিধান থেকে শুরু করে গণমাধ্যম নিয়ে পর্যন্ত সংস্কার কমিশন গঠিত হলো। সংখ্যায় ১১টি। এই প্রতিটি কমিশনই গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই। গুরুত্বপূর্ণ বলেই এই ক্ষেত্রগুলো সংস্কারের লক্ষ্যে কমিশন গঠন করা হয়েছিল। একইসঙ্গে এটি এই বার্তাও দেয় যে, শিক্ষা এই গুরুত্বপূর্ণ তালিকায় নেই। শিক্ষা বোধ হয় অতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়নি!

তাই মনে হয়, শিক্ষা বিষয়টা অধরা বলেই হয়তো সবকিছুতে আমরা শিক্ষা খুঁজি। বিষয়টি অনেকটা ‘আইডিয়াল’ বা ‘আদর্শ’ নামটির সঙ্গে তুলনীয়। ইংরেজি হোক বা বাংলা–এই বস্তু এই জনপদে ভীষণভাবে অধরা বলেই হয়তো দিকে দিকে ‘আইডিয়াল’, ‘আদর্শ’ ইত্যাদি নামের প্রতিষ্ঠানের দেখা মেলে। মুখ্যত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামের ক্ষেত্রেই এ ধরনের ‘শব্দ’ দেখা যায়। অথচ সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে আদর্শ তো দূর, শিক্ষারই দেখা মেলা ভার।

এই শিক্ষা খাতে বহুবিচিত্র সংকট আছে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিয়ে অসন্তোষ ও তা থেকে উদ্ভূত আন্দোলন তো আমরা দেখছিই। সাথে আছে অনিরাপদবোধ। গত বছরের ৮ আগস্টের পর বহু আন্দোলন বাংলাদেশ দেখেছে। কিন্তু শিক্ষক ও শ্রমিকদের বেলাতে যত দ্রুত পুলিশকে পুরোনো রূপে দেখা গেছে, আর কোনো ক্ষেত্রে তেমন দেখা যায়নি। বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষক সমাজ যেন সহজ লক্ষ্যবস্তু। আছে পাঠক্রম থেকে শুরু করে আধুনিক সময়োপযোগী শ্রেণিকক্ষের অভাবের বিষয়টি। এর কথা বারবার বলাও হয়।

রাজনীতিকেরা বলেন, তথাকথিত শিক্ষাবিদেরা বলেন, কিন্তু সরকার বদলের পর গদিনসীনের পরিচয় বদলে যাওয়ার মতো করে আমরা দেখি পাঠ্যবইয়ের আধেয় (কনটেন্ট) বদলে যেতে। আর কোনো বদল আমাদের নজরে পড়ে না। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাই বলাই যেতে পারে যে, গণঅভ্যুত্থানের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিষয়ে বিস্তর শিক্ষা নিলেও গণঅভ্যুত্থান শিক্ষায় আদৌ কিছু দিতে পারেনি।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত