গাজা যুদ্ধ তৃতীয় বছরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে জাতিসংঘ তার ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে দুই-রাষ্ট্র সমাধান সম্পর্কিত একটি সম্মেলনের আয়োজন করেছে। নিউ ইয়র্কে এই বৈঠকের (যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে হাই-লেভেল ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স ফর দ্য পিসফুল সেটেলমেন্ট অব দ্য কোয়েশ্চন অব দ্য প্যালেস্টাইন অ্যান্ড দ্য ইমপ্লিমেন্টেশন অব দ্য টু স্টেট সল্যুশন বলা হয়) লক্ষ্য ছিল গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং ফিলিস্তিনিদের স্ব-নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত করা।
সম্মেলনের আগে ও চলাকালীন বেশিরভাগ দেশই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সবমিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ১৬০টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যার মধ্যে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের চারটিও রয়েছে। এছাড়াও কিছু দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অস্ত্র স্থানান্তরে সীমাবদ্ধতার ঘোষণা করেছে। সম্মেলনের ঠিক আগে একটি জাতিসংঘ কমিশন গাজায় চলমান গণহত্যা এবং পশ্চিম তীরে জাতিগত নির্মূলকরণের জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে।
কয়েক দিনের মধ্যেই অবশ্য আন্তর্জাতিক মনোযোগ সরে আসে গাজার জন্য নতুন ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনার দিকে।
ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যৌথভাবে এই ২০ দফা ঘোষণা করেন। জাতিসংঘের মহাসচিব এবং ফিলিস্তিনসহ বেশিরভাগ আরব দেশ, এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তারা পরিকল্পনার সব শর্তগুলো পুরোপুরি গ্রহণ করেনি।
তাদের নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়া সমস্যাজনক হতো। জাতিসংঘ ও এই সম্মেলনের লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) পরামর্শমূলক মতামত এবং আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্বকে এগিয়ে নেওয়া।
গাজা উপত্যকার মানচিত্রঅন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা সমস্যাটিকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে-তাদের মতে এটি মূলত ফিলিস্তিনিদের উগ্রপন্থায় রূপান্তরের সমস্যা, যা মোকাবিলায় একটি তৃতীয় পক্ষকে অন্তত একটি অনির্দিষ্ট কাল গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব নিতে হবে, যতক্ষণ না ফিলিস্তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার সম্ভব হয়।
যদি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং দুই-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নের কোনো সম্ভাবনা রাখতে হয়, তবে জাতিসংঘ ও প্রধান অংশীদারদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়ে এই পরিকল্পনাটি পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে এটি আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
এটি করতে ব্যর্থ হলে গাজায় ভোগান্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে, অঞ্চলটি অবিরাম সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে নিমজ্জিত থাকবে, এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষকে অনির্দিষ্টকালের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যায় জড়িয়ে থাকতে হবে।
জাতিসংঘের সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আইসিজের দেওয়া পরামর্শমূলক মতামত বাস্তবায়ন করা। সেই মতামতে রাষ্ট্রগুলোকে গাজা, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনের স্ব-নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে এবং ইসরায়েলি দখল ভাঙতে আহ্বান জানানো হয়েছিল।
আদালত তার রায়ে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ‘সংঘাত’-এর ধারণাটিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে জানায় যে ইসরায়েল অধিকৃত অঞ্চলে বর্ণবৈষম্যমূলক নীতি অনুসরণ করছে। গাজা ও পশ্চিম তীরে তাদের অনির্দিষ্টকালীন সামরিক দখল বেআইনি, এবং দখল অবস্থায় ফিলিস্তিনিদের চাপ দিয়ে সমঝোতা আদায়ের চেষ্টা সম্পূর্ণ অবৈধ।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আদালতের এই মতামত গ্রহণ করে এবং এর বাস্তবায়নের জন্য একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের আহ্বান জানায়। সর্বশেষ সম্মেলনের আগে সহ-সভাপতি দেশ ফ্রান্স ও সৌদি আরব সেই সব রাষ্ট্রকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করে, যারা এখনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি।
এছাড়া, সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ও সমর্থনকারী দেশগুলো নিউ ইয়র্ক ঘোষণাতে স্বাক্ষর করে, যেখানে তারা ‘গাজার যুদ্ধের অবসানে সম্মিলিত পদক্ষেপ’ এবং ‘দুই-রাষ্ট্র সমাধানের কার্যকর বাস্তবায়ন’-এর অঙ্গীকার করে। ঘোষণার স্বাক্ষরকারীরা আরও প্রতিশ্রুতি দেয় যে এই লক্ষ্যগুলো ‘নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে’ অর্জনের জন্য তারা একসঙ্গে কাজ করবে।
মার্কিন-ইসরায়েলি পরিকল্পনা প্রকাশের পর এই প্রচেষ্টাগুলোর গতি অনেকটাই থেমে যায়। পরিকল্পনাটির ঘোষিত লক্ষ্য গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করা হলেও, আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা বা ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্ব সমর্থনের পরিবর্তে এর মূল লক্ষ্য হলো ফিলিস্তিনিদের নিরস্ত্র করা এবং গাজাকে সামরিকভাবে দুর্বল করা। এই লক্ষ্য পূরণ হয়ে গেলেই গাজার উন্নয়ন পরিচালনা করবে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন একটি ‘বোর্ড অব পিস’, যা সেখানে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তদারকি করবে। মার্কিন-ইসরায়েলি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, কিছু অনির্দিষ্ট ‘সংস্কার’ না হওয়া পর্যন্ত গাজার শাসন কাঠামোয় ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষর কোনো ভূমিকা থাকবে না।
মার্কিন-ইসরায়েলি পরিকল্পনায় এমন একটি ‘অরাজনৈতিক’ ও ‘প্রযুক্তিনির্ভর’ ফিলিস্তিনি সত্তার ধারণা দেওয়া হয়েছে, যা কেবলমাত্র একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। ফিলিস্তিনি আইনে, ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ হলো ফিলিস্তিন লিবারেশন অরগ্যানাইজেশনের অধীনস্থ একটি সংস্থা যা ফিলিস্তিনি জনগণের স্বীকৃত প্রতিনিধি। ট্রাম্পের ২০২০ সালের শান্তি পরিকল্পনায় যে পদক্ষেপগুলো উল্লেখ ছিল, এই ২০ দফায় সেগুলোও রয়েছে। সেই পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া বন্ধ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহু আবারও বলেন, ফিলিস্তিনিদের উচিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শেষ করা।
এই দাবি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০২৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়োয়াভ গালান্টের বিরুদ্ধে গাজায় জনগণকে ইচ্ছাকৃতভাবে অনাহারে রাখাসহ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। একই সময়ে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে আইসিজে’র করা মামলার চূড়ান্ত রায় এখনো অপেক্ষমাণ।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে শাসনে ফিরে আসার শর্ত হিসেবে আইনি মামলাগুলো ত্যাগ করতে বাধ্য করা মূলত আইনি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা। যদিও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সেই মামলাগুলো বন্ধ করার ক্ষমতা নেই। মোটের উপর, এই ধারাগুলোকে চুক্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যেন তা কার্যত ফিলিস্তিনের জন্য একটা শাঁখের করাতের মতো হয়।
মার্কিন-ইসরায়েলি পরিকল্পনা প্রকাশের পর নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে বলেন যে, ইসরায়েলের সেনারা গাজার অধিকাংশ অংশে থাকবেই এবং তিনি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র স্থাপনের জন্য কোনো সম্মতি দেননি। আসলে, চুক্তিতে শুধুমাত্র বলা হয়েছে যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যা ফিলিস্তিনিদের স্ব-নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রপদে পৌঁছনোর একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি করতে পারে। ফিলিস্তিনিদের জুন ১৯৬৭ থেকে ইসরায়েলের অধীনে থাকা ফিলিস্তিনি অঞ্চলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইনি স্ব-নিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে, ২০ দফায় এমন কোনো কথার উল্লেখমাত্র নেই।
যুদ্ধে গাজার ধ্বংসাবশেষজাতিসংঘের সম্মেলনের যে উদ্দেশ্য ছিল গাজায় স্থায়ী যুদ্ববিরতি এবং স্ব-নিয়ন্ত্রনের, তারসঙ্গে আমেরিকা-ইসরাইলের দ্বৈরথের যে পরিকল্পনা তার তেমন কোনো মিল নেই।
মার্কিন-ইসরায়েলি পরিকল্পনা আইসিজের পরামর্শমূলক মতামত যেখানে ফিলিস্তিনের স্বনিয়ন্ত্রন এবং ইসরাইলি বাহিনীর অনুপস্থিতির কথা বলা হয়েছে, আমেরিকা-ইসরাইলের গাজা নিয়ে যে পরিকল্পনা সেখানে এই মতামতকে খারিজ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা মূলত সেই আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থাগুলোকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যেই তৈরি, যা দেশগুলোকে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্বে পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করেছিল।
তবে নিউ ইয়র্ক ডিক্লারেশন সমর্থনকারী দেশগুলো এবং যারা জাতিসংঘ সম্মেলনকে সহযোগিতা করছে, তাদের এখনো মিলেমিশে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। তাদেরকে সম্মিলিত এবং এককভাবে গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করা এবং ইসরায়েলি দখল ভাঙার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিশ দফার পরিকল্পনাটি আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে; তা না হলে এই বহুপক্ষীয় উদ্যোগ দুর্বল হবে, আন্তর্জাতিক আইন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তৃতীয় কোনো দেশও অনিচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধাপরাধে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
** কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লেখা অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো। **
যাহা হাসান মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী এবং কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো। তার গবেষণার মূল বিষয় - ফিলিস্তিন-ইসরায়েল শান্তি, রাজনৈতিক আন্দোলনের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক আইনগত প্রক্রিয়ার ব্যবহার এবং এই অঞ্চলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি।