ভুলে যাওয়ার ক্যাথেড্রাল
ওয়াশিংটন ন্যাশনাল ক্যাথেড্রালে আমেরিকার রাজনৈতিক অভিজাতরা জড়ো হয়েছিল ডিক চেনির চিরবিদায় অনুষ্ঠানকে পবিত্র করে তুলতে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং সেলিব্রিটিরা তাকে শেষ বিদায় জানাতে সারিবদ্ধ হয়েছিলেন। তার পরিবার তার প্রশংসায় গান গেয়েছিল। বেঞ্চগুলো সম্মানিত ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ভরে গিয়েছিল। তবে তাদের মুখ ছিল গম্ভীর। তাদের কথায় শ্রদ্ধার বর্ষণ চলছিল। (ডিক চেনি গত ৩ নভেম্বর ৮৪ বছর বয়েসে মারা গেছেন।) তবে সেই সব গম্ভীর স্তোত্র এবং মসৃণ শোকবার্তার নিচে ইরাক ছিল অনুচ্চারিত। চেনি যে যুদ্ধ উসকে দিতে সাহায্য করেছিলেন, তাতে লাখ লাখ মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার বিষয়ে ছিল অসীম এক নীরবতা।
তাই এটা কোনো অন্ত্যেষ্টি ছিল না, এটা ছিল মুছে ফেলার আয়োজন।
অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছিল একটি উত্তরাধিকারকে পবিত্র করতে, এক বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে এক সম্মানিত রাষ্ট্রনায়কে রূপান্তরিত করতে। কিন্তু ক্যাথেড্রাল যে জিনিসটি উপস্থাপন করল তা স্মরণ নয়, বলা যায় বিস্মৃতি। জড়ো হওয়া শোকপ্রকাশকারীরা সেবা ও ত্যাগ, নিষ্ঠা ও দায়িত্বের কথা বলছিলেন। যা তারা বলেনি, তা হলো আমেরিকার আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতির বিপর্যয়। যে বিপর্যয় চেনি পরিকল্পিত ও নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করেছিলেন।
যে মিথ্যা সলতে জ্বালিয়ে দিল
ডিক চেনি, জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং টনি ব্লেয়ার ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের কল্পকাহিনী প্রচার করেছিলেন। তারা জানতেন, প্রমাণ ছিল দুর্বল, গোয়েন্দা তথ্য ছিল সন্দেহজনক। তারা জানতেন, সিআইএ সন্দেহ প্রকাশ করেছে মাত্র, পরিদর্শকেরা কিছু খুঁজে পাননি এবং বিশেষজ্ঞরা সতর্কতার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের যুদ্ধ দরকার ছিল। তাই তারা একটি যুদ্ধ তৈরি করলেন।
তাই তারা আমেরিকান জনগণের কাছে মিথ্যা বলেছিলেন। কংগ্রেসের কাছে মিথ্যা বলেছিলেন। এবং সমগ্র বিশ্বের কাছে মিথ্যা বলেছিলেন। সেই মিথ্যার ভিত্তিতে তারা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে আক্রমণ চালালেন।
যুদ্ধের যুক্তি দাঁড় করানো হয়েছিল বাছাই করা গোয়েন্দা তথ্য, বিকৃত সত্য এবং ইচ্ছাকৃত অতিরঞ্জনের মাধ্যমে। তাই অ্যালুমিনিয়ামের নল হয়ে উঠেছিল পারমাণবিক উচ্চাভিলাষের প্রমাণ। সন্দেহজনক সূত্র হয়ে উঠেছিল অকাট্য প্রমাণ। ভিন্নমতগুলোকে উপেক্ষা করা হয়েছিল বা চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জাতিসংঘের সাবেক অস্ত্র পরিদর্শক হান্স ব্লিক্স যেমন বলেছিলেন: “ইরাক কাউকে তৎক্ষণাৎ কোনো হুমকি দিচ্ছিল না। আক্রমণটি ছিল ভুয়া প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এক ট্র্যাজিক ভুল।” যুদ্ধের রণধ্বনি যুক্তিকে ডুবিয়ে দিয়েছিল এবং যখন আক্রমণ হলো, তা হলো অন্তঃসার শূন্য যুক্তির আড়ালে আমেরিকান সামরিক শক্তির পূর্ণ দাপট নিয়ে। বাস্তবে, ইরাকে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র কখনোই পাওয়া যায়নি। কিন্তু যা পাওয়া গিয়েছিল, তা হলো হত্যাযজ্ঞ।
রক্তের বিনিময় মূল্য
সংখ্যাগুলো ভয়াবহ। প্রায় অচিন্তনীয়: দশ লাখেরও বেশি ইরাকির মৃত্যু হয়েছে। পুরুষ, নারী, শিশু–পুরো পরিবার মুছে গেছে। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত, তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, জীবন উপড়ে গেছে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ও এর বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। এক দেশ যেখানে এক সময় কার্যকর প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ছিল, তা ইরানের হাতে তুলে দেওয়া হলো এবং সাম্প্রদায়িকতায় ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ল–যা এই অঞ্চলকে দশকের পর দশক অস্থিতিশীল করে দিল। ইরাককে অর্ধশতাব্দী পেছনে ঠেলে দেওয়া হলো। তার অবকাঠামো ধ্বংস করা হলো। তার সমাজ সহিংসতায় বিষাক্ত হলো–যা আজও চলছে।
ব্রিটেনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবিন কুক ইরাক আক্রমণের আগে প্রতিবাদস্বরূপ পদত্যাগ করেছিলেন। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, এই যুদ্ধ “আল-কায়েদাকে শক্তিশালী করবে এবং সন্ত্রাসবাদ দূর করার বদলে তার উর্বর পরিবেশ তৈরি করবে।” তার কথাগুলো ভবিষ্যদ্বাণীর মতো সত্যি হয়েছিল।
এই একতরফা হামলার মধ্যে কোনো মুক্তি ছিল না। এটা কোনো গণতন্ত্রের প্রমোশনও ছিল না। এটা ছিল ধ্বংস। যুদ্ধ আইএসআইএসকে বিশৃঙ্খলার ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসার পরিবেশ তৈরি করে দেয়। এটা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ভেঙে দিয়েছিল। এটা মুসলিম বিশ্বে যে ধাক্কা দিয়েছিল তার প্রতিধ্বনি এখনো শোনা যায়। মানবিক মূল্য অগণনীয়–কেবল মৃত্যু নয়, মানসিক আঘাত, বাস্তুচ্যুতি, এবং সহিংসতায় ক্ষতবিক্ষত বহু প্রজন্ম, যারা কিছুই করেনি এসব ডেকে আনতে।
মামলা আর অপরাধ
করপোরেট মিডিয়া ডিক চেনি ও জর্জ ডব্লিউ বুশকে রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে দেখায়। কিন্তু ইতিহাস তাদের অপরাধী হিসেবেই বিচার করবে। তারা এমন এক কাজ করেছিলেন, যাকে ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল বলেছিল ‘সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ’–এক আগ্রাসী যুদ্ধ। তারা একটি দেশ ধ্বংস করেছেন এবং তা করেছেন জেনে, ইচ্ছাকৃতভাবে, সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন থাকেই।
ইরাকে জোটবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল রিকার্ডো সানচেজ পরে যুদ্ধকে বর্ণনা করেছিলেন ‘এক অনন্ত দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে। বলেছিলেন পরিকল্পনায় ছিল ‘ভয়াবহ অদক্ষতা এবং দায়িত্বে অবহেলা।’
কিন্তু হেগে বিচার হওয়ার বদলে তারা প্রশংসা পাচ্ছেন। জবাবদিহির বদলে আছে করতালি, বইয়ের চুক্তি এবং প্রেসিডেন্ট লাইব্রেরি। কারাগারের বদলে আছে আরামদায়ক অবসর, তাদের সুনাম ধীরে ধীরে পুনর্নির্মিত হচ্ছে এক রাজনৈতিক মহলের দ্বারা, যারা ভুলে যেতে এবং ক্ষমা করতে উৎসুক।
আরব লিগের মহাসচিব আমর মুসা আঞ্চলিক ক্ষোভকে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই আক্রমণ ‘সমগ্র অঞ্চলকে আগুনের গোলায় পরিণত করার হুমকি সৃষ্টি করেছে।’ লাখ লাখ ইরাকি এবং তাদের প্রতিবেশীদের জন্য সেই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে পরিণত হয়েছিল।
এটাই আমেরিকার ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা নৈতিক পচন। ক্ষমতাবানরা অনুষ্ঠানিকতার নিচে নিজেদের অপরাধ গোপন করে, পতাকায় মুড়ে তাদের পাপকে দেশপ্রেম বলে চালায়।
তিন ট্রিলিয়ন ডলারের যুদ্ধ
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জোসেফ স্টিগলিটজ দ্য থ্রি ট্রিলিয়ন ডলার ওয়ার বইয়ে ভয়াবহ ব্যয়ের হিসাব তুলে এনেছিলেন–শুধু অর্থে নয়, বিশ্বাসযোগ্যতায়, স্থিতিশীলতায় এবং মানবজীবনে। এই আর্থিক বোঝা গিয়ে পড়েছিল আমেরিকান করদাতাদের ওপর। এর সুযোগব্যয় বা অপরচুনিটি কস্ট ছিল বিশাল: অর্থাৎ সেই ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে কী নির্মাণ করা যেত? কোন রোগ নিরাময় করা যেত, কোন অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করা যেত, কোন শিক্ষায় অর্থায়ন করা যেত?
এই যুদ্ধে আমেরিকানরা অর্থে ও বিশ্বের আস্থায় নিজেদের মূল্য দিয়েছে। আর ইরাকিরা মূল্য চুকিয়েছে রক্তে দিয়ে। এবং এখনও কেউ জবাবদিহির মুখোমুখি হয়নি। যুদ্ধের এই নির্মাতারা কোনো পরিণতির মুখে পড়েননি, কোনো শাস্তি ভোগ করেননি, কোনো জবাবদিহি সহ্য করেননি।
ইরাকিরা ন্যায়বিচারের জন্য কোথায় যাবে?
ইরাকিরা একটি সহজ ও বিধ্বংসী প্রশ্ন করে: আমাদের ন্যায়বিচার কোথায়? ফাল্লুজা, বাগদাদ, মসুলের কবরগুলো–কোনোটাই কোনো উত্তর দেয় না। জর্ডান থেকে জার্মানি পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা শরণার্থী শিবিরের বাস্তুচ্যুত মানুষেরাও কোনো উত্তর পায় না। অনাথ ও বিধবাদেরও কোনো উত্তর নেই। আন্তর্জাতিক আদালত নীরব থাকে–দায়ীদের বিচার করতে তারা অক্ষম বা অনিচ্ছুক।
এই যুদ্ধের স্থপতিরা হাত না ধুয়েই অবাধে ঘুরে বেড়ান। সময় এবং বাছাই করা স্মৃতি তাদের সুনামকে পালিশ করে। চেনির অন্ত্যেষ্টি অনুষ্ঠান ছিল এসবের এক কঠোর স্মারক। আমেরিকায় ক্ষমতা দুর্বলদের কাছ থেকে ন্যায়বিচার কেড়ে নেয় এবং তা প্রভাবশালীদের জন্য সংরক্ষিত রাখে। আর সেই বঞ্চনাই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি চূড়ান্ত অপমান।
ইতিহাসের রায়
ইতিহাসকে ডিক চেনি ও জর্জ ডব্লিউ বুশকে গঙ্গা জলে ধুয়ে পরিশুদ্ধ করতে দেওয়ার যেকোনো উদ্যোগ আমরা প্রত্যাখ্যান করব। তারা কেউই আমেরিকা রক্ষাকারী দেশপ্রেমিক ছিলেন না। তারা মিথ্যাবাদী, যারা একটি দেশ ধ্বংস করেছিলেন এমন সব কারণে যা আজও অস্পষ্ট। হতে পারে সেটা তেল বা ভূ-কৌশলগত আধিপত্য বা বোকামি অথবা নিছক অহংকার।
তাদের নাম মার্বেল ক্যাথেড্রালে খোদাই হওয়া উচিত নয়, বরং অযথা যুদ্ধ ও গণ-দুঃখের অন্য স্থপতিদের পাশে কুখ্যাতির ইতিহাসে লেখা থাকা উচিত।
ইরাকিরা ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে। বিশ্ব অধিকার রাখে সত্য প্রতিষ্ঠার। আর মৃতেরা অধিকার রাখে তাদের স্মরণ করার। এবং ইতিহাসের উচিত চেনি ও বুশকে নেতা নয়, বরং সেই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে মনে রাখা, যারা তাদের প্রাপ্য জবাবদিহি এড়িয়েছেন।
ক্যাথেড্রাল হয়তো ইরাককে বিস্মৃত হতে সাহায্য করবে। কিন্তু জোর করে হলেও আমরা তা মনে রাখব।
**লেখাটি মিডিল ইস্ট মনিটরের সৌজন্যে**
জাসিম আল-আজ্জাভি: ইরাকের নাগরিক এবং কাতার ভিত্তিক নিউজ চ্যানেল আল জাজিরা ইংলিশ-এ কর্মরত