সুনন্দা কবীর

১৪ মে, শিক্ষাবিদ ও লেখক আনিসুজ্জামানের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ছিলেন আদর্শ শিক্ষক, ধীমান গবেষক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ এ দেশের সব গণতান্ত্রিক সংগ্রামে তার অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল।
আনিসুজ্জামানের জন্ম পশ্চিমবঙ্গে, চব্বিশ পরগনার বসিরহাটে ১৯৩৭-এ। পারিবারিকভাবে লেখালেখির চর্চা ছিল। পিতামহ শেখ আবদুর রহিম লেখক ও সাংবাদিক, মা সৈয়দা খাতুনও লিখতেন। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় করলেন দেশত্যাগ, এলেন তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে। পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতিতেও জড়িয়ে ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর প্রভাষক পদে যোগ দিলেন ১৯৫৯ সালে। ১০ বছর পর ১৯৬৯-এ ‘রিডার’ হয়ে গেলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরলেন আবার ১৯৮৫ সালে। অবসর নিলেন ২০০৩-এ।
প্রতিভা, মেধা ও সুরুচির প্রতিভূ ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। প্রিয়দর্শন, ভরাট কণ্ঠস্বর, বিশুদ্ধ প্রমিত উচ্চারণ, সহজ অথচ দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন আনিসুজ্জামান। ছাত্রমহলেও তার ঈর্ষনীয় জনপ্রিয়তা ছিল। বলা বাহুল্য সেই জনপ্রিয়তা তার জন্য সবসময় সুখকর হয়নি।
শিক্ষার সঙ্গে বৈশ্বিক সংস্কৃতি ও মুক্তচেতনার পাঠ দিতেন আনিসুজ্জামান। বিশ্বাস করতেন, পরমতসহিষ্ণু উদারমনস্ক সংস্কৃতি ছাড়া দেশে বৌদ্ধিক উন্নতি ও মানবিক কল্যাণ নিশ্চিত করা যাবে না। তার আক্ষেপ ছিল, গণতান্ত্রিক দেশের প্রত্যয় নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বৃহত্তর জনমণ্ডলীকে গণতান্ত্রিক চেতনায় শামিল করা যায়নি। সংবিধান ও সমাজ থেকে স্বাধীনতার অন্যতম ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতা হারিয়ে গেছে। শোষণহীন, বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন রয়ে গেছে অধরা, আমাদের রাজনীতিও সর্বজনীন ঐকমত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আনিসুজ্জামানের অবদান বিস্মৃত হওয়ার নয়। তিনি মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলেন। স্বাধীনতার পর পর ১৯৭২ সালে যে সংবিধান রচিত হয়, তার বাংলা অনুবাদও তার হাতে। রাজনীতিবিদ না হয়েও আনিসুজ্জামানের ছিল প্রবল দেশাত্মবোধ। স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীন মহলের কাছাকাছি থেকেও অন্যায্য কোনো সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেননি আনিসুজ্জামান। সাম্প্রদায়িক শক্তির ভীতিপ্রদর্শন ও হুমকির মুখে এক সময় তাকে সরকারের দেওয়া নিরাপত্তাও নিতে হয়েছিল।
বাংলাভাষায় আদ্যন্ত নিবেদিত মানুষটি সামগ্রিকভাবে ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা করেছেন মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে। তিনি বলতেন ,বাংলা কোন পোশাকি ভাষা নয়। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাংলা ভাষারও একটা ব্যবহারিক ও সাহিত্যিক মূল্য আছে। এদের কাব্য, গান, শিল্পসংস্কৃতির সমৃদ্ধি নিয়েই আমাদের ভাষা। প্রমিত বাংলার পাশাপাশি এসবের চর্চা ও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। যে ভাষার জন্য বাংলাদেশের মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন সেই ভাষার প্রতি বহুক্ষেত্রে অবহেলা তাকে ব্যথিত করত। সমৃদ্ধ পরিভাষা সত্ত্বেও অন্য ভাষার আশ্রয় নেওয়া তার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি কখনও।
সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি হিসেবে আনিসুজ্জামান রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, নেতাজি সুভাষ বিশ্ববিদ্যালয় এবং কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি-লিট উপাধি পেয়েছিলেন। পেয়েছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জগত্তারিণী’ ও ‘সরোজিনী বসু’ পদক। সার্ক-২০১৯ সাহিত্য পুরস্কারও পেয়েছিলেন। এ ছাড়াও দুইবার আনন্দ পুরস্কার এবং ভারত সরকারের ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে সম্মানিত হয়েছিলেন তিনি। নিজের দেশ থেকে পেয়েছিলেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি ও স্বাধীনতা পুরস্কার। ২০১৮ সালে হয়েছিলেন জাতীয় অধ্যাপক।
১৯৬০ সাল, কুমিল্লা থেকে এসেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়তে। কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল চিরকালই বিখ্যাত ছিল, বিখ্যাত ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্যেও। আমার বাবা সুধীর সেন প্রথমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং পরে শান্তিনিকেতনে গবেষক হওয়ায় রবীন্দ্রনাথ থেকে আরম্ভ করে সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, ক্ষিতিমোহন সেন প্রমুখের জীবনচর্চার আলোচনা মনে একটা পরোক্ষ প্রভাব ফেলেছিল। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই নিষ্করুণ মধ্যাহ্নে প্রথম যার পাঠদান আমাকে আবিষ্ট করে রাখত তিনি ছিলেন তরুণ শিক্ষক, আনিসুজ্জামান। মেধা ও সুরুচির প্রতিভূ ছিলেন তিনি। আদর্শ শিক্ষকের সমস্ত গুণের সমন্বয় এই নিরহংকার সজ্জন ব্যক্তির মধ্যে ছিল।
প্রত্যক্ষ ছাত্রী হওয়ার সুবাদে একটা প্রশ্রয় ছিল। সেই প্রশ্রয়ে অনেক অযৌক্তিক আবদারও তাকে সামলাতে হতো।এ ছিল এক পরম পাওয়া। তিনি তো এখন জ্যোাতির্ময় অর্ন্তলোকে। ছাত্রী হিসেবে, এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে প্রতি মুহূর্তে তার শূন্যতা অনুভূত হয় তীব্রভাবে।
সুনন্দা কবীর: লেখক ও অনুবাদক

১৪ মে, শিক্ষাবিদ ও লেখক আনিসুজ্জামানের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ছিলেন আদর্শ শিক্ষক, ধীমান গবেষক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ এ দেশের সব গণতান্ত্রিক সংগ্রামে তার অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল।
আনিসুজ্জামানের জন্ম পশ্চিমবঙ্গে, চব্বিশ পরগনার বসিরহাটে ১৯৩৭-এ। পারিবারিকভাবে লেখালেখির চর্চা ছিল। পিতামহ শেখ আবদুর রহিম লেখক ও সাংবাদিক, মা সৈয়দা খাতুনও লিখতেন। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় করলেন দেশত্যাগ, এলেন তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে। পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতিতেও জড়িয়ে ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর প্রভাষক পদে যোগ দিলেন ১৯৫৯ সালে। ১০ বছর পর ১৯৬৯-এ ‘রিডার’ হয়ে গেলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরলেন আবার ১৯৮৫ সালে। অবসর নিলেন ২০০৩-এ।
প্রতিভা, মেধা ও সুরুচির প্রতিভূ ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। প্রিয়দর্শন, ভরাট কণ্ঠস্বর, বিশুদ্ধ প্রমিত উচ্চারণ, সহজ অথচ দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন আনিসুজ্জামান। ছাত্রমহলেও তার ঈর্ষনীয় জনপ্রিয়তা ছিল। বলা বাহুল্য সেই জনপ্রিয়তা তার জন্য সবসময় সুখকর হয়নি।
শিক্ষার সঙ্গে বৈশ্বিক সংস্কৃতি ও মুক্তচেতনার পাঠ দিতেন আনিসুজ্জামান। বিশ্বাস করতেন, পরমতসহিষ্ণু উদারমনস্ক সংস্কৃতি ছাড়া দেশে বৌদ্ধিক উন্নতি ও মানবিক কল্যাণ নিশ্চিত করা যাবে না। তার আক্ষেপ ছিল, গণতান্ত্রিক দেশের প্রত্যয় নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বৃহত্তর জনমণ্ডলীকে গণতান্ত্রিক চেতনায় শামিল করা যায়নি। সংবিধান ও সমাজ থেকে স্বাধীনতার অন্যতম ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতা হারিয়ে গেছে। শোষণহীন, বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন রয়ে গেছে অধরা, আমাদের রাজনীতিও সর্বজনীন ঐকমত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আনিসুজ্জামানের অবদান বিস্মৃত হওয়ার নয়। তিনি মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলেন। স্বাধীনতার পর পর ১৯৭২ সালে যে সংবিধান রচিত হয়, তার বাংলা অনুবাদও তার হাতে। রাজনীতিবিদ না হয়েও আনিসুজ্জামানের ছিল প্রবল দেশাত্মবোধ। স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীন মহলের কাছাকাছি থেকেও অন্যায্য কোনো সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেননি আনিসুজ্জামান। সাম্প্রদায়িক শক্তির ভীতিপ্রদর্শন ও হুমকির মুখে এক সময় তাকে সরকারের দেওয়া নিরাপত্তাও নিতে হয়েছিল।
বাংলাভাষায় আদ্যন্ত নিবেদিত মানুষটি সামগ্রিকভাবে ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা করেছেন মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে। তিনি বলতেন ,বাংলা কোন পোশাকি ভাষা নয়। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাংলা ভাষারও একটা ব্যবহারিক ও সাহিত্যিক মূল্য আছে। এদের কাব্য, গান, শিল্পসংস্কৃতির সমৃদ্ধি নিয়েই আমাদের ভাষা। প্রমিত বাংলার পাশাপাশি এসবের চর্চা ও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। যে ভাষার জন্য বাংলাদেশের মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন সেই ভাষার প্রতি বহুক্ষেত্রে অবহেলা তাকে ব্যথিত করত। সমৃদ্ধ পরিভাষা সত্ত্বেও অন্য ভাষার আশ্রয় নেওয়া তার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি কখনও।
সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি হিসেবে আনিসুজ্জামান রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, নেতাজি সুভাষ বিশ্ববিদ্যালয় এবং কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি-লিট উপাধি পেয়েছিলেন। পেয়েছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জগত্তারিণী’ ও ‘সরোজিনী বসু’ পদক। সার্ক-২০১৯ সাহিত্য পুরস্কারও পেয়েছিলেন। এ ছাড়াও দুইবার আনন্দ পুরস্কার এবং ভারত সরকারের ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে সম্মানিত হয়েছিলেন তিনি। নিজের দেশ থেকে পেয়েছিলেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি ও স্বাধীনতা পুরস্কার। ২০১৮ সালে হয়েছিলেন জাতীয় অধ্যাপক।
১৯৬০ সাল, কুমিল্লা থেকে এসেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়তে। কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল চিরকালই বিখ্যাত ছিল, বিখ্যাত ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্যেও। আমার বাবা সুধীর সেন প্রথমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং পরে শান্তিনিকেতনে গবেষক হওয়ায় রবীন্দ্রনাথ থেকে আরম্ভ করে সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, ক্ষিতিমোহন সেন প্রমুখের জীবনচর্চার আলোচনা মনে একটা পরোক্ষ প্রভাব ফেলেছিল। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই নিষ্করুণ মধ্যাহ্নে প্রথম যার পাঠদান আমাকে আবিষ্ট করে রাখত তিনি ছিলেন তরুণ শিক্ষক, আনিসুজ্জামান। মেধা ও সুরুচির প্রতিভূ ছিলেন তিনি। আদর্শ শিক্ষকের সমস্ত গুণের সমন্বয় এই নিরহংকার সজ্জন ব্যক্তির মধ্যে ছিল।
প্রত্যক্ষ ছাত্রী হওয়ার সুবাদে একটা প্রশ্রয় ছিল। সেই প্রশ্রয়ে অনেক অযৌক্তিক আবদারও তাকে সামলাতে হতো।এ ছিল এক পরম পাওয়া। তিনি তো এখন জ্যোাতির্ময় অর্ন্তলোকে। ছাত্রী হিসেবে, এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে প্রতি মুহূর্তে তার শূন্যতা অনুভূত হয় তীব্রভাবে।
সুনন্দা কবীর: লেখক ও অনুবাদক

সলিল ছাড়াও সুকান্তর কবিতাকে গানে রূপ দিয়েছেন আরও কয়েকজন সুরকার। কিন্তু সলিল হেমন্তের সহযোগিতায় সুকান্তর গানকে যে উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছেন, তা আর কেউ পারেননি। সলিল ও হেমন্ত পারলেন কেন? সম্ভবত আর কেউ গণমানুষের কবি সুকান্ত এবং তার সৃষ্টিকে তাদের মতো করে এত গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারেননি বলে।