ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য তো বটেই অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ ও এর কৌশলগুলোর দিকে তাকালে বাংলাদেশের কথা মাথায় আসাটা অস্বাভাবিক নয়। আর বাংলাদেশে গত বেশ কয়েক বছর ধরে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দের একটিই তো এই ‘ফ্যাসিবাদ’। অবস্থা এমন হয়েছে যে, এই দেশে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী সবচেয়ে সহজলভ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকটা বাজারে কিনতে পাওয়া দুই মিনিটের নুডলসের প্যাকেটের মতোই!
হ্যাঁ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সরকার ক্ষমতাসীন ছিল, তা অনেকটা অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদী ঘরানারই। যদি নিখুঁতভাবে বলতে হয়, তাহলে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের সরকার এই ঘরানারই ছিল।
২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ফ্যাসিবাদের এমন লক্ষণ ততটা প্রকট ছিল না। তবে এর পর থেকে দিনকে দিন লক্ষণগুলো প্রকট থেকে প্রকটতর হয়েছে। শেখ হাসিনা নিজেকে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছেন ক্রমে। তার এমন সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হয়, যারা নানাভাবে এই কেন্দ্রীভূত ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছেন নিজেদের স্বার্থে। তৈরি হয় স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী বা মালিকগোষ্ঠীও, এরা বিভিন্ন তরিকায় লুণ্ঠনতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাইরে থাকে কথিত উন্নয়নের একটি রঙচঙা মোড়ক। তবে তা দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার সম্পূর্ণ চিত্র কখনোই প্রকাশিত হতো না।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরিওই সময়টায় দেশে আওয়ামী লীগ ব্যতীত অন্য কোনো রাজনৈতিক দল স্বাধীনভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারত না। আওয়ামী গোষ্ঠীর রাজনৈতিক বয়ানের বাইরে অন্য সকল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ে। তৈরি হয় ভয়ের সংস্কৃতি। এ ছিল এমন এক ভয়ের বলয়, যাতে সরাসরি নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল ‘চাইলেই নিপীড়ন করতে পারি’ শীর্ষক ভয়। কে না জানে, নিপীড়ন চালানোর চেয়ে নিপীড়ন করা সম্ভব-এমন আশঙ্কা বিরোধী মতকে দমাতে বেশি কাজে দেয়। আর এভাবেই গড়ে ওঠে একটি জনতুষ্টিবাদী একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, যেখানে অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদের কিছু লক্ষণ মূর্ত হয়ে ওঠে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, দেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া বিকল্প কোনো রাজনৈতিক দল নেই, শেখ হাসিনা ছাড়া বিকল্প কোনো রাষ্ট্রনায়কও নেই। আর তা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতেই যেন চালু হয়ে যায় ‘আমি দিয়েছি’ বা ‘বন্ধ করে দিই?’ শীর্ষক শব্দগুচ্ছ সংবলিত বিবিধ বাক্য।
এক্ষেত্রে একটি কথা বলতেই হয় যে, সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ফ্যাসিবাদের পরিপূর্ণ লক্ষণ একসাথে কখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। সেটি ওপরে বর্ণিত আওয়ামী শাসনেও না। ফ্যাসিবাদ আগের চেয়ে ঢের বদলে গেছে। বিশ্বযুদ্ধের সময়কার লক্ষণ বিবেচনায় নিয়ে এগোলে সরাসরি এ দেশের কোনো শাসনব্যবস্থাকেই পুরোপুরি ফ্যাসিবাদী বলার সুযোগ নেই। এবং সেটি দাবি করলে, তা বৈশ্বিক সংজ্ঞায় কখনোই প্রমাণ করা যাবে না। তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশের গত ৫৩ বছরের ইতিহাসের প্রায় সিংহভাগ সময়েই ফ্যাসিবাদের বিভিন্ন লক্ষণ নানাভাবে স্পষ্ট ছিল এবং কার্যকরও ছিল। এ ক্ষেত্রে ‘ভালো কে?’-এই অসহায় সংশয় উঠে যায় জোরেশোরেই।
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম একনায়কতান্ত্রিক শাসনের উদাহরণ আসে বাকশাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের হাত ধরেই। এবং বাকশালের প্রকৃতিতে ফ্যাসিবাদের বেশ কিছু লক্ষণ যে স্পষ্টভাবেই মূর্ত হয়েছিল, তা অস্বীকারের উপায় নেই। বোঝাই যায় যে, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব পড়েছিল তাতে। তবে সেটি মাথায় নিলেও বলতে হয় যে, একনায়কতান্ত্রিক বা ফ্যাসিবাদী লক্ষণ তাতে ফিকে হয়ে পড়ে না।
স্বাধীন বাংলাদেশে পটপরিবর্তনের জন্য সহিংস পন্থা অবলম্বনের শুরুও হয় ওই সময়ই। বলতেই হয়, পটপরিবর্তনের জন্য সব সময়ই যে এ দেশে সহিংস উপায়ের দ্বারস্থ হওয়ার ট্রেন্ড চালু হয়েছে, তার সূতিকাগার ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। সেদিন সরকার উৎখাতের যে চূড়ান্ত অসাংবিধানিক ও অবৈধ উপায়ের গোড়াপত্তন হয়, তারই উত্তরাধিকার আমরা এখনও বয়ে চলেছি। এবং খারাপ কাজ দিয়ে যেমন কোনো খারাপ কাজের প্রতিবিধান হয় না, সেই সূত্র অনুযায়ীই, কোনো একনায়কতান্ত্রিক বা ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থার উৎখাতের সহিংস প্রকৃতির কারণেই এই দেশ একনায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ থেকে এখনও মুক্ত হতেই পারেনি। কারণ আমরা সর্বদা ভুল পথে চালিত হতেই যে ভালোবাসি!
যদি আমরা ৭৫–পরবর্তী এবং ৯০–পূর্ববর্তী যেকোনো সরকার ও তার শাসনামলের দিকে তাকাই এবং পূঙ্খানুপূঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করি, তবে দেখব, এই সময়ের মধ্যে এমন কোনো শাসন ছিল না, যাতে একনায়কতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদের লক্ষণ মূর্ত হয়নি। এক কথায়, এই সময়টায় ক্ষমতার ক্রমিক পালাবদল চলেছে, ক্রীড়নক হিসেবে ছিল সামরিক বাহিনী। ফলে সামরিক আইন বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। এই আইন ও কাঠামো বৈশিষ্ট্যগতভাবেই কখনোই গণতান্ত্রিক নয়। আর এ থেকেই স্পষ্ট যে, ওই সময়কালে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কতটা অনুপস্থিত ছিল!
গণতন্ত্রের সঠিক সংস্করণ বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা হয়নি কখনোই। ছবি: পেক্সেলস৯০-পরবর্তী সময়ে ঘটা করে এ দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের ঘোষণা আসে। কিন্তু গণতন্ত্র কি আসে? না। গণতন্ত্রের সঠিক সংস্করণ এ দেশে প্রতিষ্ঠা হয়নি কখনোই। তাই গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় ফিরে আসার ৫ বছরের মাথাতেই একটি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকার জন্য বিরোধী রাজনৈতিক দাবিকে পুরোপুরি খারিজ করে দিয়ে প্রহসনের নির্বাচন আয়োজন করেছিল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির সেই চেষ্টা সফল হয়নি। আওয়ামী লীগের দাবির কাছে মাথা নত করে আরেক নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল। তবে ক্ষমতায় গিয়ে ক্ষমতার মোহে পড়ে যায় আওয়ামী লীগও। তাদেরও আবার বিএনপির কাছে মাথা নত করে ক্ষমতা ছাড়তে হয়।
১৯৯১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই চলেছে। দুই দলই নিজেদের ক্ষমতায় থেকে যাওয়াকে দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছে অগণতান্ত্রিক উপায়ে। কখনো প্রশাসনকে দলীয়করণ করার চেষ্টা হয়েছে, কখনো তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে, কখনো আইন বদলানোর চেষ্টাও চলেছে। অর্থাৎ, ক্ষমতায় থাকার জন্য অগণতান্ত্রিক উপায় অবলম্বনে কোনো দলই কম যায়নি। একে অনেকটা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করা হয়েছিল। ক্ষমতায় যেনতেন উপায়ে থেকে যাওয়ার এই আকাঙ্ক্ষাই জন্ম দেয় একনায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের লক্ষণের। যার চূড়ান্ত রূপ আমরা ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেখেছি।
অর্থাৎ, মূল সমস্যা হলো, ক্ষমতায় যাওয়া এ দেশের কোনো রাজনৈতিক দল বা অরাজনৈতিক পক্ষই ক্ষমতায় আরোহণের পর আর গণতান্ত্রিক থাকতে চায় না। তথাকথিত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে মডেল এ দেশে চলেছে, সেটিও বিশ্বাসভঙ্গ করেছে নিদারুণভাবে। এতটাই যে, এর চেয়ে নির্বাচিত ত্রুটিপূর্ণ সরকারকেও মানুষ বেছে নিতে একপর্যায়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এ দেশে ক্ষমতায় আরোহণকারী কোনো পক্ষই (রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক) বুঝতে চায় না যে, গণতান্ত্রিকভাবে পাওয়া জনতার রায়ে মাথা নত করে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার মাহাত্ম্য অনেক। আর এই সুযোগেই একনায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়। বাংলাদেশেও গত ৫৩ বছরে এমনটাই হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে।
বাংলাদেশে তাই ফ্যাসিস্ট শব্দটি আদতে একটি বহুল ও যেনতেনভাবে ব্যবহৃত রাজনৈতিক অভিধা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই দেশের এমন কোনো শাসনকাল বা শাসক দেখানো যাবে না, যেটি বা যারা সুযোগ পেয়ে একনায়কতান্ত্রিক বা স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে চায়নি। এমনকি ২০২৪ সালের আগস্টে ফ্যাসিবাদী সরকারকে উৎখাতের ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারও এর ব্যতিক্রম নয়। এরই মধ্যে ‘ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার’ ও ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ পরিচয় উল্লেখ করে ন্যায়বিচারের নামে যে ধরনের আদর্শিক স্বেচ্ছাচার ও ধর্মীয় মৌলবাদের প্রসার পরিলক্ষিত হচ্ছে, তাতে স্পষ্ট যে, ফ্যাসিবাদ উৎখাতের কথা বলে আরেক ধরনের ফ্যাসিবাদকে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যেভাবে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বিধি-নিষেধকে থোড়াই কেয়ার করা হচ্ছে, তাতে কোনো গণতান্ত্রিক চর্চার চিহ্ন চোখে পড়ছে না। এতে একটি বিষয় দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে, আরেকটি আদর্শিক বা দলগত স্বেচ্ছাচার আসন্ন। আগে জনগণকে দেওয়া হতো ন্যায্য অধিকার পাওয়ার অন্যায্য খোঁটা, আর এখন ভিন্নমত দিলেই নিতে হয় দোসরসম্বন্ধীয় বর্গীকরণ। শ্রমিকেরা আগেও ছিল অবহেলিত, এখনও উপেক্ষিতই। সাধারণ জনতাকে আগেও আমলে নেওয়া হতো না, আর এখন একটি কল্পিত ‘সাধারণ জনগণ’ তৈরি করে তার দোহাই দিয়ে চলছে নিজেদের খুশিমতো চলা। এমতাবস্থায় বর্তমানের সুপ্ত ফ্যাসিবাদের লক্ষণ যে আগের চেয়েও প্রকট হয়ে উঠবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে? যেখানে এ দেশের অবস্থা কেবলই ‘যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ’-এর মতো! অর্থাৎ, আমাদের শুধু তুলনামূলক ভালোর মধ্যেই থাকতে হয় এবং নিচের দিকে নামা ছাড়া আর বিকল্প থাকে না। অন্তত গত ৫৩ বছরের ইতিহাস এ দেশের মানুষকে সেই অশনি সংকেতই দেয়। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, ফ্যাসিবাদের একটি লক্ষণও নেই, এমন শাসনকাল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর কে না জানে, এক গামলা দুধকে নষ্ট ও গুণহীন করতে এক চিমটি গোচনাই যথেষ্ট।
বাংলাদেশের গত ৫৩ বছরের ইতিহাসের প্রায় সিংহভাগ সময়েই ফ্যাসিবাদের বিভিন্ন লক্ষণ নানাভাবে স্পষ্ট ছিল এবং কার্যকরও ছিল। ছবি: পেক্সেলসএক্ষণে কিছু প্রশ্ন তুলে এই দীর্ঘ রচনার ইতি টানা যাক। এতটুকু অন্তত বোঝা গেছে যে, একনায়কতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী মনোভাব আমাদের রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক তথাকথিত নিরপেক্ষ কাঠামোরও অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এসব পক্ষ তো সব এ দেশের মানুষ দিয়েই তৈরি। গণের কোনো না কোনো মাত্রার প্রতিনিধিত্ব এই সব পক্ষেই আছে।
স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর তাই এমন প্রশ্ন উঠেই যায় যে, এ দেশের সাধারণ মানুষ কি তবে ব্যক্তিগত পর্যায়েই একনায়কতান্ত্রিক? ব্যক্তিগতভাবেই তারা একেকজন স্বৈরাচার? ব্যক্তি পর্যায়েই কি তবে এ দেশে ফ্যাসিবাদের লক্ষণগুলোর চর্চা হয়?
এসব প্রশ্নের সমাজতাত্ত্বিক উত্তর খোঁজা জরুরি। নইলে এ দেশের অন্তত নিয়মিত বিরতিতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একনায়ক বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ফ্যাসিস্টের খপ্পরে পড়ার হাত থেকে মুক্তি মিলবে না কোনোভাবেই!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা