Advertisement Banner

ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আমেরিকার আর্থিক আধিপত্যের সংকট

ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আমেরিকার আর্থিক আধিপত্যের সংকট
হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধের বাস্তবতা যেকোনো নীতিনির্ধারণী নথির চেয়ে দ্রুত সত্য উন্মোচন করে। ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েলি সংঘাত এমন কিছু ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, যা কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক পুঁজি বণ্টনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়ানো বা হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্ন এসব এই গল্পের আংশিক দিক মাত্র। বাজার আগে বহুবার জ্বালানি সংকট সামাল দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা এবং তার বৈশ্বিক প্রভাব মূল উদ্বেগের বিষয়কে আরও গভীরতর করেছে।

কয়েক দশক ধরে চলা ভূ-রাজনৈতিক সংকটগুলো মূলত মার্কিন আর্থিক আধিপত্যকেই শক্তিশালী করেছে। বিনিয়োগকারীরা ডলার, সরকারি বন্ড ও মার্কিন শেয়ারবাজারে আশ্রয় নিয়েছেন, কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে এই ব্যবস্থার স্থিতিশীল ভিত্তি হিসেবে দেখা হতো। স্থিতিশীলতা, পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতাই ছিল মূল শক্তি।

আগে বাজারে একক নীতির চেয়ে স্থিতিশীলতা, পূর্বাভাসযোগ্যতা ও ধারাবাহিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু এখন সেই স্থিতিশীলতার ওপর আস্থা এতটাই কমে গেছে যে, এটাকে তেলের দাম সাময়িকভাবে বাড়ার মতো সাধারণ ঘটনা ভেবে উপেক্ষা করা যায় না।

ইরান সংঘাত দেখিয়েছে যে নীতির লক্ষ্য এবং বাস্তবায়ন উভয়ই এখন অনিশ্চিত। বাজার এখন শুধু আলাদা সিদ্ধান্ত বিচার করছে না, বরং এই সিদ্ধান্তগুলোকে চালানো মূল পদ্ধতি বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু তা বোঝা এখন কঠিন

জ্বালানি বাজার এক্ষেত্রে সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। বিশ্বব্যাপী তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য হরমুজ প্রণালী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাণকেন্দ্র হিসেবে রয়ে গেছে। এখানকার যেকোনো সমস্যা সরাসরি মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা, মুদ্রার অস্থিরতা এবং এশিয়া ও ইউরোপজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর অবস্থান নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।

ইরান ইস্যু এখন এমন বড় নীতিগত পরিবর্তনের অংশ, যা বিনিয়োগকারীরা আগে থেকে অনেক বেশি খেয়াল করছেন। বাণিজ্য নীতি এখন আগের মতো নিয়মের ওপর নির্ভর করে পূর্বাভাস করা যাচ্ছে না; বরং তা পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হচ্ছে।

ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি নতুন নয়, তবে পরিবর্তন এসেছে মার্কিন সিদ্ধান্তগ্রহণে যুক্ত অনিশ্চয়তার মাত্রায়। নীতিগত ঝুঁকি এখন আর বাইরে থেকে আসা বিপদ নয়, বরং নীতিনির্ধারণ ব্যবস্থার ভেতরকার অস্থিরতাই বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

বিশ্ব বাণিজ্য এখন আর স্থির নিয়মে চলছে না; বরং হঠাৎ, পরিস্থিতি অনুযায়ী, বড় দেশগুলোর ওপরও অনিশ্চিতভাবে শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে ,যা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। যেমন আমেরিকার বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের ক্ষেত্রেও এটি ব্যাপকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে। প্রায়ই স্বল্প নোটিশে এবং অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য এসব শুল্ক আরোপ হচ্ছে।

উচ্চ শুল্কের কারণে শুধু পণ্যের দামই বাড়ছে না, বরং ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হচ্ছে, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছোট হয়ে যাচ্ছে এবং কোম্পানিগুলো আরও সতর্ক ও ধীরগতির হয়ে পড়ছে।

কৌশলগত খাতগুলোতে এখন শুল্কের হার ১০০ শতাংশেরও বেশি। বাজার এটাকে সাময়িক পরিবর্তন হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন হিসেবেই দেখছে।

এর প্রভাব এখন স্পষ্ট। পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা আগের মতো কার্যকর থাকছে না, কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কমিয়ে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হওয়ায় সিদ্ধান্ত নিতে আরও সাবধান হচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞার প্রভাবও একই রকম। ভেনেজুয়েলার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য করলে অনেক উন্নয়নশীল দেশ চাপের মুখে পড়ছে। এতে তাদের জন্য নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, আইনি জটিলতা বাড়ছে এবং লেনদেন নিরাপদ থাকবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

আমেরিকার মিত্র দেশগুলোও নতুন বার্তা পাচ্ছে। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিতর্ক বা কিউবা নীতির পরিবর্তন সবই ইঙ্গিত দেয়, পুরনো অংশীদারত্বের ধরন বদলাচ্ছে। নিরাপত্তা সম্পর্কও এখন আর নিঃশর্ত নয়।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ডলারের কোনো তাৎক্ষণিক বিকল্প নেই, তবুও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি এবং বিনিয়োগকারীর ভরসা এক জিনিস নয়। এ পার্থক্য এখন গুরুত্বপূর্ণ।

বছরের পর বছর মার্কিন সম্পদে বিদেশি পুঁজি আসছে স্থিতিশীলতার ওপর ভর করে। বড় অঙ্কের পুঁজি সরানোর দরকার নেই ধীরে ধীরে বিনিয়োগের পুনর্বণ্টনই বাজারকে বদলাতে পারে।

এর প্রভাব এখনই দেখা যাচ্ছে। আগে বৈশ্বিক সংকটে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ সরাতেন, কিন্তু এখন সবসময় তা হচ্ছে না। কখনো শেয়ারবাজার দুর্বল থাকছে, আবার বন্ডের সুদ বাড়ছে। এমনকি অনেক সময় ডলারও আগের মতো শক্তিশালী হচ্ছে না।

এগুলো চূড়ান্ত পরিবর্তন নয়, তবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিনিয়োগকারীরা এখন বাড়তি ঝুঁকির জন্য বেশি মুনাফা দাবি করছেন। ফলে বন্ডের সুদহার বাড়ছে, যা সরকার ও বেসরকারি উভয় খাতের ঋণ ব্যয় বাড়াচ্ছে।

এর প্রভাব আর্থিক বাজার ছাড়িয়ে সরাসরি বিনিয়োগেও পড়ছে। নীতিগত অনিশ্চয়তা বাড়লে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের স্থায়িত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে।

তাই অনেক দেশ এখন এক জায়গার ওপর নির্ভর না করে বিকল্প খুঁজছে। তারা নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াচ্ছে, নতুন লেনদেন পদ্ধতি তৈরি করছে এবং জ্বালানির উৎসও বদলাচ্ছে।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

ডলার এখনও শক্তিশালী থাকলেও, বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে অন্য বিকল্প খুঁজছেন। ইরান সংঘাত এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো অনেক শক্তিশালী এর বাজার, প্রতিষ্ঠান ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। তবে দৃষ্টিভঙ্গির সামান্য পরিবর্তনও দীর্ঘদিনের এই শক্ত অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে বর্তমান পরিস্থিতি সেটাই দেখাচ্ছে।

বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ে নয়, বরং কতটা ভরসা করা যায় সেটা নিয়ে ভাবছেন। আর এই চিন্তাভাবনাই ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের ধারা ঠিক করবে।

হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এশিয়া টাইমস-এর নিবন্ধটি ইংরেজি থেকে অনূদিত

লেখক: এশিয়া টাইমসের সাংবাদিক

সম্পর্কিত