ছাইয়ের মাঝে শেষ সম্বলের খোঁজে

ছাইয়ের মাঝে শেষ সম্বলের খোঁজে
রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে আগুনে চিরচেনা এলাকা পরিণত হয়েছে ছাইয়ের শহরে। ছবি: চরচা

রাতের আকাশ যেন কড়াইল বস্তির ওপর কালো চাদর টেনে দিয়েছিল। ধোঁয়ার ঘন মেঘে ঢেকে যায় চারপাশ, বাতাসে ভেসে আসে পোড়া প্লাস্টিক, কাঠ আর চালের তীব্র গন্ধ। মানুষের শেষ আশ্রয়গুলো মুহূর্তেই পরিণত হয় ছাইয়ের স্তূপে।

যে বস্তির প্রতিটি ঘর ছিল কোনো না কোনো পরিবারের স্বপ্নের ঠিকানা, সেই ঘরগুলো এক সন্ধ্যায় বিলীন হয়ে গেছে আগুনের গ্রাসে। প্রাণে বেঁচে গেলেও নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন হাজারো মানুষ–নিস্তব্ধতার মাঝে দাঁড়িয়ে শুধু একটি বাক্যই শোনা যাচ্ছে, ‘পরনের কাপড় ছাড়া কিছুই নাই।‘

মঙ্গলবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে আগুনের সূত্রপাত। মুহূর্তের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের ঘরে ঘরে। ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিটের টানা চেষ্টায় রাত সাড়ে দশটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও আজ বুধবার সকাল সাড়ে নয়টার আগে পুরোপুরি নির্বাপণ করা সম্ভব হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে, পুড়ে গেছে প্রায় দেড় হাজার ঘর। তবে স্থানীয়দের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়েছে। রাতারাতি চিরচেনা এলাকা পরিণত হয়েছে ছাইয়ের শহরে।

বুধবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বস্তির দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত একেবারে ধ্বংসস্তূপ। বৌ বাজারের একাংশ, তালতলা রোড, কবরস্থান গলি ও কুমিল্লা পট্টির বড় অংশই পুড়ে গেছে। অলি-গলিতে হাঁটলে পায়ের নিচে খচখচে ছাইয়ের শব্দ, বাতাসে পোড়া গন্ধ আর মানুষের আহাজারি। কোথাও কোনো বাড়ির চিহ্ন নেই, কোথাও আধভাঙা টিন, পোড়া বাঁশ আর প্লাস্টিকের গলানো দলা পড়ে আছে। আগুন থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরলেও কেউ ফিরতে পারেনি নিজের শেষ সম্বল নিয়ে।

ছাইয়ের মাঝে শেষ সম্বল খুঁজছেন কয়েকজন। ছবি: চরচা
ছাইয়ের মাঝে শেষ সম্বল খুঁজছেন কয়েকজন। ছবি: চরচা

ধ্বংসস্তূপের এক কোণে দুই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে বসে আছেন আইরিন আক্তার। চোখে শূন্যতার ছাপ। বনানীর এক বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন তিনি। আগুনের খবর পেয়ে দৌঁড়ে এসেছিলেন। কিন্তু এসে দেখতে পান, ঘর নেই, জিনিসপত্র নেই, টাকার থলিটাও নেই। কাঁপা গলায় তিনি বলেন, ‘’চোখের সামনে আমার ঘরটা পুড়লো। সন্তানদের খোঁজে ছোটাছুটি করছিলাম। পরে দেখি বাজারের এক পাশে ওরা বাবার হাত ধরে বসে আছে। ঘরের টাকা, কাগজ, কাপড় সব শেষ। পরনের কাপড় ছাড়া কিছুই নাই।‘’

ভ্যানচালক রাজিব হোসেনও স্তূপের ভেতর কাঁদতে কাঁদতে কিছু খোঁজার চেষ্টা করছেন। স্ত্রী আর দুই মেয়েকে নিয়ে কবরস্থান গলির এক ঘরে থাকতেন। জানালেন, ট্রাংকের ভেতরে রক্ষিত ২০ হাজার টাকাই ছিল তার শেষ সঞ্চয়। “ভেবেছিলাম আগুন থেমে যাবে। কিন্তু কয়েক মিনিটেই চারদিক অন্ধকার। নিজের চোখের সামনে ঘর পুড়তে দেখলাম। এখন ওই টাকার খোঁজে এসেছি, পেলে বাচ্চাদের জন্য কিছু করতে পারবো।”

এলাকার পুরোনো বাসিন্দা আব্দুর রশিদ বলেন, ‘’আমি ফিরতে ফিরতে দেখি পাশের ব্লকগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। দৌঁড়ে ঘরের দিকে গেলাম, কিন্তু ঢুকতেই পারিনি। সব শেষ। এখন পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসে আছি। কোথায় যাব জানি না।‘’

ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বস্তির ঘিঞ্জি কাঠামো, দাহ্য উপকরণ আর পানির সংকট–সব মিলিয়ে আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। যানজট আর সরু গলির কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘’প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী আনুমানিক ১,৫০০ ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তদন্ত শেষে চূড়ান্ত সংখ্যা জানা যাবে।‘’ তিনি জানান, আগুন লাগার পর ৩৫ মিনিটের মধ্যেই তিনটি স্টেশনের ইউনিট পৌঁছালেও প্রবেশে বাধা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

আগুনে পুড়ে ছাই কড়াইলের বস্তি। ছবি: চরচা
আগুনে পুড়ে ছাই কড়াইলের বস্তি। ছবি: চরচা

এখন কড়াইলের বাস্তবতা শুধুই অনিশ্চয়তা। যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল, আজ তারা খোলা আকাশের নিচে। শিশুরা আতঙ্কে কাঁপছে, বৃদ্ধরা অসহায়ের মতো বসে আছেন। কোথাও সামান্য খাবার বিতরণ হচ্ছে, কোথাও দেওয়া হচ্ছে পানির বোতল। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ঘটনাস্থলে এসে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। দুপুরে কয়েকটি সংগঠনের পক্ষ থেকে খাবার বিতরণ করতে দেখা গেছে।

এখন কড়াইল বস্তির আগুনেপোড়া এলাকায় শুধু ছাই, পোড়া বাঁশ, ভেঙে যাওয়া টিন আর মানুষের দীর্ঘশ্বাস। যাদের সব পুড়ে গেছে, তাদের সবার মুখে একই প্রশ্ন— ‘এখন আমরা কোথায় যাব?’

তবু ধ্বংসস্তূপের ভেতর কোথাও কোথাও দেখা যায় আশা জাগানোর দৃশ্য–পুড়ে যাওয়া বই তুলে কেউ ঝেড়ে নিচ্ছেন, কেউবা ধ্বংসস্তূপের মাঝে নিজের শেষ সম্বলটুকু খোজার চেষ্টা করছেন।

সম্পর্কিত