ঢাকা–১৫: দাঁড়িপাল্লার সঙ্গে পারবে ধানের শীষ?

ঢাকা–১৫: দাঁড়িপাল্লার সঙ্গে পারবে ধানের শীষ?
ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী।

ঢাকা-১৫ আসনে একাধিক প্রার্থী থাকলেও আলোচনার কেন্দ্রে দুইজন। একজন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। অন্যজন বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।

শফিকুর রহমানের জন্য এই নির্বাচন শুধু একটি আসনের লড়াই নয়, প্রেসটিজের প্রশ্ন। তিনি জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আমির। দলীয় নেতৃত্বের সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকা একজন নেতার জন্য রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় বা পরাজয় রাজনৈতিকভাবে বড় বার্তা বহন করবে।

ঢাকা-১৫ আসন উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪, ১৩, ১৪ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। যার মধ্যে তালতলা, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কাফরুল, মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, কচুক্ষেত ও পূর্ব সেনপাড়া আছে। এ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৬ জন এবং নারী ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৮ জন। চারজন হিজড়া ভোটার রয়েছে এই আসনে।

মোট ভোটারের মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ৪৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ফলে নারী ভোটারদের এই আসনের ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে বিবেচনা করছেন অনেকে।

দীর্ঘদিন বিএনপি-জামায়াতের জোট থাকলেও এবার এই দুই দল সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে মুখোমুখি। এই আসনে ২০১৮ সালে জামায়াতের শফিকুর ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করেছিলেন। ওই সময় নিবন্ধন না থাকায় জোটের হয়ে বিএনপির প্রতীকেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। বিতর্কিত ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কামাল আহমেদ মজুমদারের কাছে হেরে যান তিনি। অন্যদিকে শফিকুল মিল্টন ঢাকা মহানগরের যুবদল নেতা। বিএনপির সহযোগী এ সংগঠনের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন তিনি।

ওই নির্বাচন ছিল একতরফা। রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। এবার পরিস্থিতি বদলেছে। আওয়ামী লীগ নেই। ভোটের মাঠ তুলনামূলক উন্মুক্ত। তাই এবার তার জন্য সুযোগ যেমন আছে, চাপও তেমনি বেশি।

ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর আগে গত ২০ জানুয়ারি পীরেরবাগে প্রচারপত্র বিলিকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে এলাকায় তৈরি হয় উত্তেজনা, একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে দলগুলো।

এবারের ভোটে জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের প্রচারণার মূল সুর ধর্মীয়, নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলা। তিনি বারবার বলছেন, সমাজ থেকে মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধ নির্মূল করবেন। দুর্নীতিমুক্ত শাসনের কথা বলছেন। সরকারি সেবা ডিজিটাল করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। নিজেকে তুলে ধরছেন আদর্শভিত্তিক পরিবর্তনের প্রতিনিধি হিসেবে।

শফিকুর রহমানের সভা-সমাবেশে নৈতিকতার কথা এসেছে বেশি। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র-এই তিন স্তরে শুদ্ধতার কথা বলেছেন জামায়াতের আমির। একটি অংশের ভোটারের কাছে এই বার্তা আকর্ষণীয়।

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান তার আসনে জনসভায় দেওয়া বক্তৃতায় ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নারীর প্রতি সম্মান থেকেই আট ঘণ্টার পরিবর্তে পাঁচ ঘণ্টার কথা বলেছেন। কেউ আট ঘণ্টা কাজ করতে চাইলে তাকে স্বাগত জানায় জামায়াতে ইসলাম।

তবে সব ভোটার কি একইভাবে দেখছেন? অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। নগর জীবনের বাস্তব সমস্যা কি শুধু নৈতিকতা দিয়ে সমাধান সম্ভব? রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ, গ্যাস-পানি, যানজট-এসব প্রশ্নও সামনে আসছে।

মিরপুর ১৩ নম্বারের বাসিন্দা সুমনের অভিযোগ, “প্রতি বছর বর্ষায় ভোগান্তিতে পড়তে হয়। নীতিকথার কিংবা আশ্বাসের চেয়ে সমস্যার সমাধান দেখতে চাই আমরা।”

এখানেই বিএনপি প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের প্রচারণা আলাদা মাত্রা পাচ্ছে। তিনি কথা বলছেন, নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন সংকট নিয়ে। কিশোর গ্যাং, মাদক, চাঁদাবাজি ও ছিনতাই বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। নারীর নিরাপত্তাকে সামনে আনছেন। ২৪ ঘণ্টা নাগরিক হেল্প ডেস্ক চালুর ঘোষণা দিয়েছেন।

তার প্রচারে এলাকার বাস্তব সমস্যা বেশি ফুটে উঠেছে। রাস্তা ও ড্রেনেজ উন্নয়ন, গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে প্রতিশ্রুতির কথা শোনা গেছে বেশি।

মিল্টন চরচাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “এলাকায় গ্যাস থাকে না। পানি থাকে না। রাস্তগুলো খুবই সরু। যুব সমাজ আমার কাছে দাবি করেছে, তারা প্রতি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ চায়। ঢাকা-১৫ আসনে ২০ লাখ মানুষ বসবাস করে। এখানে ভালো কোনো হাসপাতাল নেই। আমি তাদের আশ্বস্ত করেছি, ২৫০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে।”

ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই সিদ্ধান্তহীন। কেউ বলছেন, জামায়াতের আমির হওয়ায় শফিকুর রহমানের একটি গ্রহণযোগ্যতা আছে। আবার কেউ বলছেন, নগর সমস্যার বাস্তব সমাধানে বিএনপি প্রার্থীর কথাবার্তা বেশি বাস্তবসম্মত।

কাফরুল এলাকার ভোটার সজীব ইসলাম ভোটের পরিবশ নিয়ে আশাবাদী। ভোটের দিনও একইরকম পরিবেশ থাকবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

নারীর নিরাপত্তা নিয়ে দুই প্রার্থীর প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিলুফার বেগম উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, “প্রতিশ্রুতি কেন দিতে হবে? নারীসহ সকল মানুষের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা সরকারের দ্বায়িত্ব।”

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই এলাকা বিএনপি-জামায়াত জোটের অংশ ছিল। সে সময় জোট জয়ী হয়েছিল। যদিও তখনকার সীমানা ও বাস্তবতা বর্তমানের মতো ছিল না। তবু জোট রাজনীতিতে জামায়াতের সাংগঠনিক প্রভাব ছিল।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটি নতুনভাবে গঠিত হয়। সে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা ছিল একতরফা। আওয়ামী লীগ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ভোট পেয়ে জয়ী হয়। বিএনপি–জামায়াত জোট পায় প্রায় ৮০ হাজার ভোট। সেই ফলাফল এখনো অনেক ভোটারের স্মৃতিতে আছে।

এবার সেই বাস্তবতা নেই। আওয়ামী লীগ মাঠে নেই। ফলে ভোটারদের বড় অংশ নতুন করে হিসাব কষছেন। কেউ কৌশলগত ভোটের কথা ভাবছেন। কেউ আদর্শের কথা ভাবছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই নির্বাচন জামায়াতের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে দলের আমির নিজে প্রার্থী হওয়ায় প্রশ্ন একটাই—তিনি কি তার প্রেজটিজ রক্ষা করতে পারবেন?

ঢাকা–১৫ আসনে ধর্মীয়, নগর মধ্যবিত্ত, তরুণ, নিরাপত্তা ও সেবা-কেন্দ্রিক ভোট আছে। এই সবগুলোকে একসঙ্গে টানতে না পারলে জয় কঠিন। ১২ তারিখের ভোটে সেই হিসাবেরই ফয়সালা হবে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ভোটার উপস্থিতিই শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে ঢাকা–১৫-এর এই প্রেসটিজের লড়াইয়ে কে এগিয়ে থাকবেন।

সম্পর্কিত