Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
২৬ অক্টোবর, ২০২৬
২৬ অক্টোবর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
২৬ অক্টোবর, ২০২৬
২৬ অক্টোবর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

Chaarcha Logo
> বিশেষ প্রতিবেদন

কড়াইল বস্তিতে বারবার অগ্নিকাণ্ড কেন?

আরমান ভূঁইয়া

আরমান ভূঁইয়া

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫, ০৯: ১৬
কড়াইল বস্তিতে বারবার আগুন, দুর্ঘটনা নাকি দখলের রাজনীতি?

কড়াইল বস্তির কথা উঠলেই আগুনের দৃশ্য সামনে আসে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বিকেলে কড়াইলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেছে অন্তত দেড় হাজার ঘর। এর আগে এ বছরেরই ফ্রেব্রুয়ারিতে অগ্নিকাণ্ড হয় এই বস্তিতে। বছরে একাধিকবার আগুনে পোড়াটাই যেন এর নিয়তি। স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন ওঠে–বারবার কেন এই আগুন? এটা কি নিছকই দুর্ঘটনা, নাকি রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা ব্যক্তি স্বার্থ বা বস্তির নানা এলাকার দখলের প্রশ্ন এর সঙ্গে যুক্ত?

Advertisement

রাজধানীর কেন্দ্রস্থল অভিজাত এলাকা গুলশান–বনানীর পাশে প্রায় এক শ একর এলাকায় গড়ে ওঠা রাজধানীর বৃহত্তম অনানুষ্ঠানিক বসতি কড়াইল বস্তি। প্রায় ২০ হাজারের বেশি নিম্নআয়ের মানুষের এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আগুন যেন নিয়মিত দুর্যোগ। প্রতি বছরই অগ্নিকাণ্ডে শত শত পরিবার ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারালেও ঝুঁকি কমাতে কোনো স্থায়ী উদ্যোগ নিচ্ছে না রাষ্ট্র। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব আগুনের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থ ও উচ্ছেদ অভিযান।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার জানান, মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে আগুন লাগার খবর পেয়ে মোট ১৯টি ইউনিটের চেষ্টায় রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে ১৫ ঘণ্টা চেষ্টায় বুধবার (২৬ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টায় আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ সম্ভব হয়। তবে এই আগুনে কোনো হতাহত না হলেও প্রায় দেড় হাজার ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

কড়াইল বস্তির আগুনে পুড়েছে অন্তত ১৫০০ ঘরfire-service-press-breifing

ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বস্তির অধিকাংশ ঘরই টিন, বাঁশ, কাঠসহ দাহ্য উপকরণে নির্মিত। এই ঘরগুলো আবার পরস্পর লাগোয়া, গলিপথ সরু এবং কোনো খোলা স্থান নেই। ফলে একটি ঘরে আগুন লাগলেই কয়েক মিনিটে তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো ব্লকে। দমকলের বড় গাড়িগুলো সরু গলিতে ঢুকতেই পারে না; আগুনের কাছে পৌঁছাতে দেরি হয়, তততক্ষণে আগুন ‘ডেভেলপ স্টেজ’-এ চলে যায়।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

কড়াইলের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বৈদ্যুতিক তারের জঙ্গল। একটি লাইন থেকে শতাধিক ঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ, মিটারবিহীন সংযোগ ও ওভারলোডের কারণে প্রায় সব অগ্নিকাণ্ডই শর্ট সার্কিট থেকে ঘটছে বলে ফায়ার সার্ভিসের ধারণা। এ ছাড়া বস্তির প্রায় সব ঘরেই নিম্নমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারের কারণেও অগ্নিঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করে সংস্থাটি।

আগুনে ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে অনেক পরিবার। ছবি: চরচা
আগুনে ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে অনেক পরিবার। ছবি: চরচা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কড়াইলে অগ্নিকাণ্ড কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি পূর্বনির্ধারিত বিপর্যয়। রাজনৈতিক স্বার্থ ও প্রশাসনিক কারণে এসব অগ্নিকাণ্ড হচ্ছে। মালিকানা বিরোধ, অনিয়ন্ত্রিত ঘনবসতি, অবৈধ সংযোগ, সুরক্ষা ব্যবস্থাহীনতা—সব মিলিয়ে কড়াইলকে অগ্নিকাণ্ডপ্রবণ এলাকায় পরিণত করেছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহমেদ খান চরচাকে বলেন, “কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের প্রধান কারণ হলো ঘিঞ্জি ঘরবসতি, দাহ্য উপকরণে নির্মাণ এবং নিম্নমানের বৈদ্যুতিক লাইন। পাশাপাশি যত্রতত্র এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের ফলে আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।”

কড়াইল বস্তির আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সরকার সহায়তা করবে: প্রধান উপদেষ্টাMohammad Yunus

তবে রাজনৈতিক স্বার্থ ও প্রশাসনিক কারণের সংযোগের ধারণাকে উড়িয়ে দেননি তিনি। তিনি বলেন, “আধিপত্য বিস্তার বা রাজনৈতিক কারণেও আগুন লাগানো হতে পারে—এ সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”

আগুন নিয়ন্ত্রণে লম্বা সময় লাগার কারণ হিসেবে সংস্থাটির সাবেক এই মহাপরিচালক বলেন, “নতুন ফায়ারফাইটাররা কড়াইল বস্তির গলি ও পথ চেনেন না। তাই অভিজ্ঞ জনবল না থাকলে দ্রুত আগুন নেভানো সম্ভব হয় না।” তার মতে, কড়াইলের জন্য বিশেষায়িত ইউনিট, সাব-স্টেশন, পর্যাপ্ত ফায়ার হাইড্রেন্ট এবং অভিজ্ঞ কর্মী স্থায়ীভাবে মোতায়েন করলে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।

চার দশক আগে প্রায় এক শ একর জায়গায় কড়াইল বস্তি গড়ে উঠেছে। কড়াইলের মালিকানা মূলত বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল)। তবে প্রায় ৪৩ একর জমি ‘বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের’ কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। যদিও জমির দখল নিতে না পারায় বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ সেখানে নির্মাণকাজ শুরু করতে পারেনি।

১৬ ঘণ্টা পর পুরোপুরি নির্বাপণ হয় কড়াইল বস্তির আগুন। ছবি: চরচা
১৬ ঘণ্টা পর পুরোপুরি নির্বাপণ হয় কড়াইল বস্তির আগুন। ছবি: চরচা

প্রায় এক শ একর এলাকায় বিস্তৃত এই বস্তিতে জনসংখ্যার সুনির্দিষ্ট কোনো তালিকা কারও কাছে। তবে স্থানীয়দের ভাষ্যে বস্তিতে এক লাখের বেশি মানুষ বসবাস করে। এখানে দোকান আছে প্রায় সাড়ে চার হাজার। আর ছোট-বড় ঘরের সংখ্যা রয়েছে ২০ হাজারেও বেশি। বড় এই বস্তির কোনো ব্লক না থাকলেও স্থানীয়রা কয়েকটি এলাকা বা নামে একে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে বেলতলা বস্তি, টিঅ্যান্ডটি বস্তি, বাইদার বস্তি, এরশাদনগর ও গোডাউন বস্তি, বৌ-বাজার, কবরস্থান রোড এবং কুমিল্লা পট্টি ও বরিশাল পট্টি রয়েছে।

এখানে বসবাসরত সিংহভাগই দিনমজুর, রিকশাচালক ও গৃহকর্মী। অধিকাংশ বাসিন্দা দুপুর–বিকেলে ঘরে থাকেন না। ফলে দিনের বেলায় আগুন লাগার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সর্বশেষ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায়ও অনেকে ফিরে এসে দেখেন—তাদের সবকিছু ছাই হয়ে গেছে।

আরিফা বেগম নামে এক গৃহকর্মীর সঙ্গে কথা বলার সময় তার গলা কাঁপছিল। তিনি বলেন, “মাইয়া-ছেলে স্কুলে ছিল। ঘরে কেউ ছিল না। কিন্তু জমানো কিছু টাকা, কাপড়চোপড় ও কিছু মালামাল ছিল। কিছুই রক্ষা করতে পারলাম না।”

কথা হয় রবিউল নামে এক রিকশাচালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, “বাজারের একটি দোকানদার ফোন করে কইল (বলল) আগুন লাগছে। দৌড়াইয়া আসলাম। এসে দেখি আগুন আর আগুন। আমার বাচ্চার বই-খাতা, জিনিসপত্র সব পুইড়া ছাই।”

আরিফা ও রবিউলের মতোই পুরো বস্তির চিত্র। প্রতিটি আগুনের পরই এরা নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। আবারও কোনো এক আগুনে তাদের সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

আগুন থেকে দুর্ঘটনা এড়াতে যা করতে হবেfire

কড়াইল বস্তির গলিগুলো এতটাই সংকীর্ণ যে, বড় কোনো গাড়িই ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে ফায়ার সার্ভিসকে আগুন নেভানোর জন্য বিকল্প ভাবতে হয়। বুধবার কড়াইলের ঘটনাস্থলে একজন ফায়ারফাইটার চরচাকে বলেন, “জায়গাটাই এমন যে, এখানে আগুন নেভাতে আসা মানে যুদ্ধ করতে আসা। পানির উৎস কম, রাস্তা নেই—সব মিলিয়ে মহাবিপদের সম্মুখে পড়তে হয়।”

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কড়াইল বস্তির অগ্নিকাণ্ড তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপপরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মামুনুর রশিদের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে রয়েছেন উপসহকারী পরিচালক অতীশ চাকমা, সিনিয়র স্টেশন অফিসার নাজিম উদ্দিন সরকার, ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর সোহরাব হোসেন ও সদস্যসচিব সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান।

দীর্ঘদিন ধরে কড়াইল বস্তিবাসীর স্বাস্থ্য, উন্নয়ন ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন এমন একাধিক সমাজকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে চরচা। নিরাপত্তার স্বার্থে তারা কেউই নাম প্রকাশ করতে চানি। তারা বলেন, কড়াইল দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার শ্রমবাজারের অপরিহার্য অংশ হলেও এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। একদিকে ঘনবসতি, অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ, কাঠ-টিন-প্লাস্টিকের দাহ্য স্ট্রাকচার—এসব মিলেই আগুনের ঝুঁকি প্রকট। অন্যদিকে বারবার অগ্নিকাণ্ডের পর একই প্লট কি আগের বাসিন্দারাই পুনর্নির্মাণ করেন, নাকি নতুন কেউ জায়গা দখল করে—এ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। ঢাকা শহরের ইতিহাসে দেখা গেছে, একাধিক বস্তি উচ্ছেদ হয়েছে আগুনের ঘটনার পরই, যার সংযোগ কখনো কখনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গেও পাওয়া যায়। ২০১৭ সালে কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে “রুমি পাঠাগার”-এর তরুণদের লড়াইয়ের মতো ঘটনাও প্রমাণ করে—অনেক পরিবারেরই গ্রামে ফিরে যাওয়ার জায়গা নেই; কড়াইলই তাদের একমাত্র ঠিকানা।

প্রায় প্রতিবছরই আগুনে পুড়ে ছাই হয় কড়াইল বস্তি। ছবি: চরচা
প্রায় প্রতিবছরই আগুনে পুড়ে ছাই হয় কড়াইল বস্তি। ছবি: চরচা

এই সমাজকর্মীরা বলেন, কড়াইল শুধু একটি ‘বস্তি’ নয়; এখানে রয়েছে স্কুল, কমিউনিটি ইনিশিয়েটিভ, সাংস্কৃতিক চর্চা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মানুষের প্রতি মানুষের গভীর মমতা। ড্রাইভার, গৃহকর্মী, দোকানদার—যারা সারাদিন এলিট এলাকার মানুষকে সেবা দেন, তারা রাতে ফিরে আসেন এমন এক কমিউনিটিতে, যেখানে দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও জীবন প্রবল উচ্ছ্বাসে স্পন্দিত। অথচ সরকারি-বেসরকারি আলোচনায় এই শক্তির গল্পটি অনুপস্থিত। বারবার তাদের শুধু দারিদ্র্যের লেন্সে দেখা হয়, মানুষ হিসেবে তাদের মর্যাদা, দৃঢ়তা ও মানবিকতা—এসব বড় সত্য চাপা পড়ে যায়। কড়াইলকে বুঝতে হলে তার মানুষের এই শক্তির ইতিহাসটিকে সামনে আনতেই হবে।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কড়াইল বস্তিতে বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে। তাদের পুনর্বাসন পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তার মধ্যে। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডে সব হারানো মানুষের অসহায়তা নতুন করে সামনে আসে। রাতের আঁধারে আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘর-বসত, নারী–শিশুদের কান্না, আর বাঁচার অনিশ্চয়তা মিলে তৈরি হয় এক গভীর মানবিক সংকট।

১৬ ঘণ্টা পর পুরোপুরি নিভল কড়াইল বস্তির আগুনkorail-fire

নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব চরচাকে বলেন, “কড়াইলে বারবার আগুনের সঙ্গে রাজনীতি, জমি ও শ্রেণিশোষণের রাজনীতি রয়েছে। কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগার ঘটনাগুলোকে কেবল দুর্ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। এখানে রাজনীতি, জমির মালিকানা ও শ্রেণিশোষণের একটি জটিল কাঠামো কাজ করে। বস্তির ঘর যারা ভাড়া নিয়ে থাকেন, তাদের মালিকানা নেই। মালিকানা থাকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একদল দখলদারের হাতে। এই দখলদার গোষ্ঠীই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থেকে জমি দখল, ভাড়া ব্যবসা ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। ফলে আগুন লাগা মানে কেবল ঘর পোড়া নয়—কার ঘর থাকবে আর কার ঘর উঠবে, কার দখল থাকবে আর কার দখল ভাঙবে—তারই এক নোংরা ‘মাটির রাজনীতি’ চলে এখানে।”

ইকবাল হাবিব বলেন, “ঢাকায় আগে যেসব বড় বস্তি উচ্ছেদ হয়েছে— বিএনপি বস্তি, তেজগাঁও রেললাইন বস্তি, মিরপুরে একাধিক বস্তি—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আগুন ছিল উচ্ছেদের ‘সাইলেন্ট টুল’। একই প্যাটার্ন কড়াইলেও স্পষ্ট। আগুনের পর প্রথমেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভাড়াটে পরিবারগুলো। কিন্তু প্রকৃত দুর্বৃত্ত বা রাজনৈতিক (ক্ষমতাধর) মালিকদের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং তাদের আধিপত্য আরও শক্ত হয়। আগুনের আগের সপ্তাহেই ‘বস্তি দখল’ নিয়ে আদালতে রিট হয়েছিল। এটিও ঘটনাগুলোর নেপথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। যারা আগুন-পোড়া, সেই ভাড়াটেদের জীবনভর সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। আর দখলদার মালিকানার রাজনীতি আরও শক্তিশালী কাঠামো পায়।”

আবাসন-নীতিতে আমূল পরিবর্তন ছাড়া মুক্তি নেই উল্লেখ করে এ নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, “ঢাকার বস্তিবাসীর আবাসন সংকট বহু দশকের রাজনৈতিক ব্যর্থতার ফল। ধনী এলাকা—পূর্বাচল, উত্তরা, বসুন্ধরা রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি প্রভাবশালীদের জন্য তৈরি হলেও শহরের শ্রমজীবী মানুষের জন্য কোনো নিরাপদ আবাসননীতি নেই। অথচ এই মানুষগুলোরই শ্রমে শহর চলে। জমি ব্যবসা আর রাজনীতির আঁতাত যে বৈষম্য তৈরি করেছে, সেটিই আগুনকে বারবার ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য করেছে। তাই সমাধান কেবল আগুনের উৎস অনুসন্ধান নয়—বরং রাষ্ট্রকে এনজিও, সামাজিক সংগঠন ও নীতিনির্ধারকদের নিয়ে পরিকল্পিত সরকারি আবাসন নির্মাণে এগোতে হবে। দরকার অ্যাপার্টমেন্টভিত্তিক, নিরাপদ, রাষ্ট্রীয়ভাবে সাশ্রয়ী আবাসন; জমি নয়—ঘরই ন্যূনতম অধিকার। অন্যথায় আগুন নিভলেও আগুনের রাজনীতি নিভবে না।”

কড়াইল বস্তিতে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে সরকার। ছবি: চরচা
কড়াইল বস্তিতে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে সরকার। ছবি: চরচা

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী চরচাকে বলেন, “বস্তিগুলোতে আগুন লাগার মূল কারণ হচ্ছে সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক সংযোগ, নিয়ম না মেনে সিলিন্ডার বা লাইন গ্যাসের অনিরাপদ ব্যবহার, বিড়ি-সিগারেট, মশার কয়েল ও খোলা বাতির ব্যবহার, উন্মুক্ত চুলা ও হিটারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার। উদাসীনতা ও অসাবধানতা এই ঝুঁকি আরও বাড়ায়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বস্তির আগুনসহ বেশির ভাগ অগ্নিদুর্ঘটনার প্রধান উৎস বৈদ্যুতিক গোলোযোগ। তাই নিয়ম মেনে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ নেওয়া, এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করতে সতর্ক থাকা, খোলা আগুন—বিড়ি-সিগারেট, মশার কয়েল বা উন্মুক্ত চুলার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা বজায় রাখা এবং আগুন প্রতিরোধে হাইড্রেন্ট পয়েন্ট স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত সাবধানতা অবলম্বন করলেই অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।”

অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে ফায়ার সার্ভিসে গৃহীত নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “কড়াইল বস্তিতে ফায়ার সার্ভিস নিয়মিত মহড়া ও গণসংযোগের মাধ্যমে মানুষকে অগ্নি প্রতিরোধে সচেতন করার চেষ্টা করে। তবে বাস্তবে সেখানে আগুন নেভাতে গিয়ে অপ্রশস্ত রাস্তা, অপরিকল্পিত ও ঘিঞ্জি ভবন, দুর্ঘটনাস্থলের কাছে পানির উৎসের অভাব এবং উৎসুক জনতার ভিড়—এসব কারণে অগ্নিনির্বাপণ কাজ কঠিন হয়। তবুও সব বাধা মোকাবিলা করে ফায়ার সার্ভিস প্রতিবারই সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালায়।”

বিষয়: রাজধানীআগুনঝুঁকিকড়াইল বস্তিঅগ্নিকাণ্ডসিলিন্ডার বিস্ফোরণঝুঁকিপূর্ণফায়ার সার্ভিস
Advertisement
সর্বশেষ
  • ১

    সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর: বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে সংসদীয় কমিটি

  • ২

    অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টে সুপারকারসে রোমাঞ্চ, শেষ রেসে ব্রক ফিনির জয়

  • ৩

    দ্বিপক্ষীয় নাকি বহুপক্ষীয়, কোন কূটনীতির পথে বিএনপি সরকার?

  • ৪

    ‘দেশের অসংখ্য নাগরিক সৌদিতে কারাগারে আছেন’

  • ৫

    শ্রেণিকক্ষে ফিরলেও চুয়েট শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলবে

সম্পর্কিত
  • শিক্ষাক্রমে বদল: অন্য দেশের অভিজ্ঞতা কী?

    শিক্ষাক্রমে বদল: অন্য দেশের অভিজ্ঞতা কী?

    স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রমে সাতবার বড় পরিবর্তন হয়েছে। প্রতিবারই দেখা গেছে, দেশে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে অবধারিতভাবেই বদলে যায় শিক্ষানীতি। শিক্ষানীতি বা পাঠক্রমে বদল অন্য দেশেও হয়। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংযোগ যতটা না থাকে, তারচেয়ে বেশি থাকে নতুন প্রযুক্তি

  • ব্যাংকের সিএসআর: টাকা কোথায় যায়, নীতিমালা থাকলেও মানছে কতটা?

    ব্যাংকের সিএসআর: টাকা কোথায় যায়, নীতিমালা থাকলেও মানছে কতটা?

    দেশের ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিলের অর্থ প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

  • নারীর প্রতি সহিংসতা কতটা ঠেকাতে পারছে ৯৯৯?

    নারীর প্রতি সহিংসতা কতটা ঠেকাতে পারছে ৯৯৯?

    রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা নাজমা আক্তার। শাশুড়ি ও জায়ের সঙ্গে পারিবারিক মনোমালিন্য থেকে একদিন বাগবিতণ্ডা, পরে মারধরের শিকার হন তিনি। নির্যাতনের শিকার হয়ে সাহায্য চেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করেন নাজমা। তার কল পেয়ে সংশ্লিষ্ট থানা থেকে পুলিশও আসে। কিন্তু যে প্রতিকার পাওয়ার আশায় তিনি জরুরি

  • রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগের নীতিমালা কিছুটা শিথিল হচ্ছে কোন হিসাবে?

    রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগের নীতিমালা কিছুটা শিথিল হচ্ছে কোন হিসাবে?

    সম্প্রতি ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক পদে মনোনয়ন, নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন নীতিমালা’ সংশোধন করেছে সরকার। এদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) না থাকায় নতুন নেতৃত্ব নিয়োগের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। সোনালী