পর্ব-১
ফজলুল কবির

বাংলাদেশ–এক চির সংকট ও আর্তির ভূখণ্ড যেন। এই ব-দ্বীপ কখনো শান্ত হয় না। হত্যা, ধর্ষণ, গুম, দুর্নীতি, চুরি, ডাকাতি–একটা নিত্যকার ঘটনা এখানে। আর কাঠামোবদ্ধভাবে সাধারণের পকেট কাটা থেকে গলা কাটা তক বিষয় তো আছেই।
হিমালয় থেকে সুন্দরবন বিস্তীর্ণ ভূ-মানচিত্রের মধ্যে হঠাৎ বাংলাদেশ আর পদ্মার উচ্ছ্বাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে না। তবে তার কম্পন থামে না। মৃতপ্রায় পদ্মার উচ্ছ্বাস নিতান্তই এখন কাগুজে বয়ান, সুকান্তের কবিতাতেই যার একমাত্র ঠাঁই। তবু সে কাঁপে কীসে? কাঁপে ভয়ে, আতঙ্কে, দুর্ভাবনায়। প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে।
ভয়ে ও দুর্ভাবনায় সিঁটিয়ে থাকা মানুষের একটা স্বভাব আছে। যখন সে ফুঁসে ওঠে, তখন সে অনেকটাই কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
এ দেশে এমন কাণ্ডজ্ঞান হারানোর নজির কম তো নেই। দেশ এখন আবার উত্তাল। না, সরাসরি রাজনৈতিক কারণে নয়। কিন্তু রাজনৈতিক তো বটেই। সে অন্য আলাপ–যথাস্থানে করা যাবে।
দেশের মানুষ সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে পাড়ার চা দোকান কিংবা বেডরুম পর্যন্ত একটি বিষয় নিয়েই এখন ব্যস্ত। আর তা হচ্ছে শিশু ধর্ষণ। সম্প্রতি এক শিশুকে তার প্রতিবেশী ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করেছে। শিশুটির বয়স কত? মাত্র ৭ বছর।
এ ঘটনায় নিন্দার ঝড় বইছে। বীভৎস নির্যাতনে হত্যার শিকার হওয়ার পর শিশুটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। তার সূত্রে তার বাবা–মাও। তার ঘরে প্রধানমন্ত্রী গেছেন। তার বড় বোনের শিক্ষার ব্যয়ভারের দায়িত্ব নিয়েছেন। পাশে বসে কথা শুনেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অভিযুক্ত ব্যক্তি দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। আর এই জবানবন্দির সূত্র ধরেই সংক্ষুব্ধ নাগরিকেরা বলছেন, ‘তাহলে আর দেরি কেন, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক’, ‘প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে দেওয়া হোক’, ‘দেড়ঘণ্টা ধরে তার গলা কাটা হোক’, ‘তদনগদ হত্যা করা হোক’, ‘তার বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হোক’, ‘তার স্বজনকে একইভাবে ধর্ষণ করা হোক’। আর বার কাউন্সিল থেকে ঘোষণা এসেছে–আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াবে না।
অপরাধীর বিচার এবং সেই বিচারের রায় থেকে শুরু করে বিচিত্র সব সাজার তালিকা দেওয়া থেকে শুরু করে সাজা কার্যকরের নানা তরিকা পর্যন্ত বাতলে দেওয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আজকের দুনিয়ার পুলিশ, গোয়েন্দা, বিচারালয় থেকে শুরু করে কবরখানা পর্যন্ত সবকিছুই তো এখন সামাজিক মাধ্যম। কে তাকে রুখবে?
মনে রাখা জরুরি যে, ন্যায়বিচার মানে যথাযথ বিচার, সেখানে কোনো ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ইত্যাদি ঢুকবার সুযোগ সজ্ঞানে রাখা মানে নিজের পায়েই কুড়োল মারা। যেনতেনভাবে দ্রুত বিচার করার দাবির বদলে যথাযথভাবে কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্নের দাবি বরং তুলুন। বিচার প্রক্রিয়াকে ফাস্ট ট্র্যাক করার দাবি তুলুন
কিন্তু এই যে বিচার ও সাজা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এই যে এক অভাবিত চাপ তৈরি করা হচ্ছে, কোনো কিছু না ভেবেই, তার ফলাফল সম্পর্কে আমরা সচেতন তো? আমরা কি হারকিউলিসকে ভুলে গেছি? এমনই এক প্রেক্ষাপটে হারকিউলিস মাথাচাড়া দিয়েছিল দেশে। সামাজিকমাধ্যমে অনেকেই তখন একে সাধুবাদ জানিয়েছিল। হাততালি দিয়ে কেউ কেউ অভিবাদন জানিয়েছিল হারকিউলিসকে। কী করত এই হারকিউলিস? ধর্ষককে হত্যা। কয়েকজন ধর্ষককে হত্যার পর তাদের গলায় ঝোলানো চিরকুটে এ হারকিউলিস নামটি পাওয়া যায়। আর হারকিউলিসকে খুঁজতে গিয়ে মেলে আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর পদচিহ্ন। অর্থাৎ, গ্রিক বীর হারকিউলিসের নামের আড়ালে আরেকটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নাটক শুরু হচ্ছিল। তফাৎ এটুকুই যে, ‘বোমা তৈরির সরঞ্জাম তৈরি’, ‘ডাকাতির প্রস্তুতিকালে’, বা ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীর পলায়নের’ সময় আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে (সাবেক ক্রসফায়ার) নয়, হারকিউলিস নামের এক দারুণ আড়াল তখন খুঁজে নিয়েছিল বাহিনীর সদস্যরা।
সবার কাছে রহস্যমানব বা নয়া জমানার রবিনহুড হিসেবে আড়াল মানা এই হারকিউলিস আবির্ভূত হয়েছিল ২০১৮ সালের সেই ভীষণ সমালোচিত নির্বাচনের পর, ২০১৯ সালের শুরুর দিকে। প্রথম আলোতে এই হারকিউলিসের পরিচয় উদ্ঘাটন করে প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়ার পর ধীরে ধীরে মানুষের উত্তেজনা কমতে থাকে। কিন্তু তারপরও কেউ কেউ বলতে থাকেন যে, এ ধরনের ধর্ষকদের এভাবেই মেরে ফেলা উচিত।
একটু দাঁড়ান, প্রশ্ন করুন। আপনার আবেগকে সম্মান জানিয়েই বলছি–একটু স্থির হোন, একটু দম নিন, ভাবুন। দীর্ঘসূত্রি বিচার প্রক্রিয়া, বা বিচারহীনতাকে প্রশ্ন করতে গিয়ে, তার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠতে গিয়ে আরেক ধরনের অবিচারের দরজা খুলে দিচ্ছেন না তো?
কেন বলছি? শুনুন, এই দেশে তো এও তো দেখেছি আমরা যে, পারিবারিক বা সম্পত্তির দ্বন্দ্বের জেরে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এ ধরনের অভিযোগ তুলেছে কেউ কেউ, কেউবা আবার সন্তানকে মেরে প্রতিবেশী বা প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে চেয়েছে। সুতরাং, তাৎক্ষণিক বিচার ও সাজার পথ অনেক বড় অপরাধের বৃত্ত তৈরি করতে পারে।
নিজের আবেগ, ভুক্তভোগীর প্রতি মমতা কিংবা ধর্ষণ ও ধর্ষকের প্রতি ঘৃণা–যে জায়গা থেকেই উত্তেজিত অবস্থায় এ ধরনের বিচার ও সাজার তরিকা আপনি দিন না কেন, তা দিনশেষে আরেকটি ভয়াবহ খাদই তৈরি করে। সেই খাদের শুরুতে রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয়, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে কাজে লাগে
বিচার প্রক্রিয়াকে অন্ধ হতে হয়। মনে রাখা জরুরি–ন্যায়বিচার মানে যথাযথ বিচার। এই ন্যায়বিচার যেন দ্রুত করতে গিয়ে অন্যায়কে পৃষ্ঠপোষকতা না দেয়। যথাযথ তদন্ত যেমন বিচারের জন্য জরুরি, তেমনি বাদী–বিবাদী উভয়পক্ষের কথা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে স্বাক্ষ্যপ্রমাণসহ সব ধরনের বিষয়কে মিলিয়েই বিচারটি হতে হবে। আর সেই বিচারের মধ্য দিয়ে অপরাধীকে সাজার আওতায় আনতে হবে।
এই সহজ অথচ জরুরি কথাটি আমরা যদি ভুলে যাই, তাহলে আরও বড় অনাচার তৈরির আশঙ্কা থাকে। কারণ, তখন কে কাকে ‘ধর্ষক’ আখ্যা দিয়ে তার ওপর হামলে পড়বে, মবের দেশে বাড়িঘর পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেবে শুধু প্রতিপক্ষ বলেই–তার হিসাব তখন কে রাখবে।
এ ধরনের প্রবণতা অনেকটা দ্বিধারী তলোয়ারের মতো। এর একটি তো ভুল বিচার, নিরপরাধীর পীড়নের আশঙ্কা এবং একটি সার্বিক অনাচার সৃষ্টিজনিত; অন্যটি হলো–এই ধরনের তাৎক্ষণিক বিচার একপর্যায়ে গুরুতর এই অভিযোগ সম্পর্কেই মানুষকে সন্দিহান করে তুলতে পারে, যা ক্রমে ধর্ষণ ও ধর্ষণের অভিযোগের মতো বিষয়কে আবার ভিন্ন পন্থায় ‘নর্মালাইজ’ করতে পারে। আজকের ভিকটিম ব্লেমিংয়ের এক নয়া সংস্করণ তখন সামনে চলে আসবে, যা প্রকরণে হতে পারে আরও ভয়াবহ।
নিজের আবেগ, ভুক্তভোগীর প্রতি মমতা কিংবা ধর্ষণ ও ধর্ষকের প্রতি ঘৃণা–যে জায়গা থেকেই উত্তেজিত অবস্থায় এ ধরনের বিচার ও সাজার তরিকা আপনি দিন না কেন, তা দিনশেষে আরেকটি ভয়াবহ খাদই তৈরি করে। সেই খাদের শুরুতে রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয়, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে কাজে লাগে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক, সামাজিক প্রতিপত্তি বা নিদেনপক্ষে সম্পত্তি নিয়ে বিবাদের জেরেও এমন হত্যাকাণ্ড হতে পারে, যার বহু নজির আমাদের সামনেই আছে, এই দেশেই। সেগুলোর উদাহরণ দিয়ে লেখাটি ভারাক্রান্ত করার কোনো মানে হয় না।
মনে রাখা জরুরি যে, ন্যায়বিচার মানে যথাযথ বিচার, সেখানে কোনো ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ইত্যাদি ঢুকবার সুযোগ সজ্ঞানে রাখা মানে নিজের পায়েই কুড়োল মারা। যেনতেনভাবে দ্রুত বিচার করার দাবির বদলে যথাযথভাবে কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্নের দাবি বরং তুলুন। বিচার প্রক্রিয়াকে ফাস্ট ট্র্যাক করার দাবি তুলুন। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে ধর্ষণ মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে কথা বলুন, রাষ্ট্রকে বাধ্য করুন এ ধরনের সামগ্রিক পদক্ষেপ নিতে। কারণ, শুধু শাস্তির বিধান দিয়ে অপরাধ ঠেকানো যায় না।
চলবে...
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

বাংলাদেশ–এক চির সংকট ও আর্তির ভূখণ্ড যেন। এই ব-দ্বীপ কখনো শান্ত হয় না। হত্যা, ধর্ষণ, গুম, দুর্নীতি, চুরি, ডাকাতি–একটা নিত্যকার ঘটনা এখানে। আর কাঠামোবদ্ধভাবে সাধারণের পকেট কাটা থেকে গলা কাটা তক বিষয় তো আছেই।
হিমালয় থেকে সুন্দরবন বিস্তীর্ণ ভূ-মানচিত্রের মধ্যে হঠাৎ বাংলাদেশ আর পদ্মার উচ্ছ্বাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে না। তবে তার কম্পন থামে না। মৃতপ্রায় পদ্মার উচ্ছ্বাস নিতান্তই এখন কাগুজে বয়ান, সুকান্তের কবিতাতেই যার একমাত্র ঠাঁই। তবু সে কাঁপে কীসে? কাঁপে ভয়ে, আতঙ্কে, দুর্ভাবনায়। প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে।
ভয়ে ও দুর্ভাবনায় সিঁটিয়ে থাকা মানুষের একটা স্বভাব আছে। যখন সে ফুঁসে ওঠে, তখন সে অনেকটাই কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
এ দেশে এমন কাণ্ডজ্ঞান হারানোর নজির কম তো নেই। দেশ এখন আবার উত্তাল। না, সরাসরি রাজনৈতিক কারণে নয়। কিন্তু রাজনৈতিক তো বটেই। সে অন্য আলাপ–যথাস্থানে করা যাবে।
দেশের মানুষ সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে পাড়ার চা দোকান কিংবা বেডরুম পর্যন্ত একটি বিষয় নিয়েই এখন ব্যস্ত। আর তা হচ্ছে শিশু ধর্ষণ। সম্প্রতি এক শিশুকে তার প্রতিবেশী ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করেছে। শিশুটির বয়স কত? মাত্র ৭ বছর।
এ ঘটনায় নিন্দার ঝড় বইছে। বীভৎস নির্যাতনে হত্যার শিকার হওয়ার পর শিশুটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। তার সূত্রে তার বাবা–মাও। তার ঘরে প্রধানমন্ত্রী গেছেন। তার বড় বোনের শিক্ষার ব্যয়ভারের দায়িত্ব নিয়েছেন। পাশে বসে কথা শুনেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অভিযুক্ত ব্যক্তি দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। আর এই জবানবন্দির সূত্র ধরেই সংক্ষুব্ধ নাগরিকেরা বলছেন, ‘তাহলে আর দেরি কেন, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক’, ‘প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে দেওয়া হোক’, ‘দেড়ঘণ্টা ধরে তার গলা কাটা হোক’, ‘তদনগদ হত্যা করা হোক’, ‘তার বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হোক’, ‘তার স্বজনকে একইভাবে ধর্ষণ করা হোক’। আর বার কাউন্সিল থেকে ঘোষণা এসেছে–আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াবে না।
অপরাধীর বিচার এবং সেই বিচারের রায় থেকে শুরু করে বিচিত্র সব সাজার তালিকা দেওয়া থেকে শুরু করে সাজা কার্যকরের নানা তরিকা পর্যন্ত বাতলে দেওয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আজকের দুনিয়ার পুলিশ, গোয়েন্দা, বিচারালয় থেকে শুরু করে কবরখানা পর্যন্ত সবকিছুই তো এখন সামাজিক মাধ্যম। কে তাকে রুখবে?
মনে রাখা জরুরি যে, ন্যায়বিচার মানে যথাযথ বিচার, সেখানে কোনো ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ইত্যাদি ঢুকবার সুযোগ সজ্ঞানে রাখা মানে নিজের পায়েই কুড়োল মারা। যেনতেনভাবে দ্রুত বিচার করার দাবির বদলে যথাযথভাবে কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্নের দাবি বরং তুলুন। বিচার প্রক্রিয়াকে ফাস্ট ট্র্যাক করার দাবি তুলুন
কিন্তু এই যে বিচার ও সাজা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এই যে এক অভাবিত চাপ তৈরি করা হচ্ছে, কোনো কিছু না ভেবেই, তার ফলাফল সম্পর্কে আমরা সচেতন তো? আমরা কি হারকিউলিসকে ভুলে গেছি? এমনই এক প্রেক্ষাপটে হারকিউলিস মাথাচাড়া দিয়েছিল দেশে। সামাজিকমাধ্যমে অনেকেই তখন একে সাধুবাদ জানিয়েছিল। হাততালি দিয়ে কেউ কেউ অভিবাদন জানিয়েছিল হারকিউলিসকে। কী করত এই হারকিউলিস? ধর্ষককে হত্যা। কয়েকজন ধর্ষককে হত্যার পর তাদের গলায় ঝোলানো চিরকুটে এ হারকিউলিস নামটি পাওয়া যায়। আর হারকিউলিসকে খুঁজতে গিয়ে মেলে আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর পদচিহ্ন। অর্থাৎ, গ্রিক বীর হারকিউলিসের নামের আড়ালে আরেকটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নাটক শুরু হচ্ছিল। তফাৎ এটুকুই যে, ‘বোমা তৈরির সরঞ্জাম তৈরি’, ‘ডাকাতির প্রস্তুতিকালে’, বা ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীর পলায়নের’ সময় আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে (সাবেক ক্রসফায়ার) নয়, হারকিউলিস নামের এক দারুণ আড়াল তখন খুঁজে নিয়েছিল বাহিনীর সদস্যরা।
সবার কাছে রহস্যমানব বা নয়া জমানার রবিনহুড হিসেবে আড়াল মানা এই হারকিউলিস আবির্ভূত হয়েছিল ২০১৮ সালের সেই ভীষণ সমালোচিত নির্বাচনের পর, ২০১৯ সালের শুরুর দিকে। প্রথম আলোতে এই হারকিউলিসের পরিচয় উদ্ঘাটন করে প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়ার পর ধীরে ধীরে মানুষের উত্তেজনা কমতে থাকে। কিন্তু তারপরও কেউ কেউ বলতে থাকেন যে, এ ধরনের ধর্ষকদের এভাবেই মেরে ফেলা উচিত।
একটু দাঁড়ান, প্রশ্ন করুন। আপনার আবেগকে সম্মান জানিয়েই বলছি–একটু স্থির হোন, একটু দম নিন, ভাবুন। দীর্ঘসূত্রি বিচার প্রক্রিয়া, বা বিচারহীনতাকে প্রশ্ন করতে গিয়ে, তার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠতে গিয়ে আরেক ধরনের অবিচারের দরজা খুলে দিচ্ছেন না তো?
কেন বলছি? শুনুন, এই দেশে তো এও তো দেখেছি আমরা যে, পারিবারিক বা সম্পত্তির দ্বন্দ্বের জেরে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এ ধরনের অভিযোগ তুলেছে কেউ কেউ, কেউবা আবার সন্তানকে মেরে প্রতিবেশী বা প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে চেয়েছে। সুতরাং, তাৎক্ষণিক বিচার ও সাজার পথ অনেক বড় অপরাধের বৃত্ত তৈরি করতে পারে।
নিজের আবেগ, ভুক্তভোগীর প্রতি মমতা কিংবা ধর্ষণ ও ধর্ষকের প্রতি ঘৃণা–যে জায়গা থেকেই উত্তেজিত অবস্থায় এ ধরনের বিচার ও সাজার তরিকা আপনি দিন না কেন, তা দিনশেষে আরেকটি ভয়াবহ খাদই তৈরি করে। সেই খাদের শুরুতে রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয়, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে কাজে লাগে
বিচার প্রক্রিয়াকে অন্ধ হতে হয়। মনে রাখা জরুরি–ন্যায়বিচার মানে যথাযথ বিচার। এই ন্যায়বিচার যেন দ্রুত করতে গিয়ে অন্যায়কে পৃষ্ঠপোষকতা না দেয়। যথাযথ তদন্ত যেমন বিচারের জন্য জরুরি, তেমনি বাদী–বিবাদী উভয়পক্ষের কথা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে স্বাক্ষ্যপ্রমাণসহ সব ধরনের বিষয়কে মিলিয়েই বিচারটি হতে হবে। আর সেই বিচারের মধ্য দিয়ে অপরাধীকে সাজার আওতায় আনতে হবে।
এই সহজ অথচ জরুরি কথাটি আমরা যদি ভুলে যাই, তাহলে আরও বড় অনাচার তৈরির আশঙ্কা থাকে। কারণ, তখন কে কাকে ‘ধর্ষক’ আখ্যা দিয়ে তার ওপর হামলে পড়বে, মবের দেশে বাড়িঘর পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেবে শুধু প্রতিপক্ষ বলেই–তার হিসাব তখন কে রাখবে।
এ ধরনের প্রবণতা অনেকটা দ্বিধারী তলোয়ারের মতো। এর একটি তো ভুল বিচার, নিরপরাধীর পীড়নের আশঙ্কা এবং একটি সার্বিক অনাচার সৃষ্টিজনিত; অন্যটি হলো–এই ধরনের তাৎক্ষণিক বিচার একপর্যায়ে গুরুতর এই অভিযোগ সম্পর্কেই মানুষকে সন্দিহান করে তুলতে পারে, যা ক্রমে ধর্ষণ ও ধর্ষণের অভিযোগের মতো বিষয়কে আবার ভিন্ন পন্থায় ‘নর্মালাইজ’ করতে পারে। আজকের ভিকটিম ব্লেমিংয়ের এক নয়া সংস্করণ তখন সামনে চলে আসবে, যা প্রকরণে হতে পারে আরও ভয়াবহ।
নিজের আবেগ, ভুক্তভোগীর প্রতি মমতা কিংবা ধর্ষণ ও ধর্ষকের প্রতি ঘৃণা–যে জায়গা থেকেই উত্তেজিত অবস্থায় এ ধরনের বিচার ও সাজার তরিকা আপনি দিন না কেন, তা দিনশেষে আরেকটি ভয়াবহ খাদই তৈরি করে। সেই খাদের শুরুতে রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয়, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে কাজে লাগে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক, সামাজিক প্রতিপত্তি বা নিদেনপক্ষে সম্পত্তি নিয়ে বিবাদের জেরেও এমন হত্যাকাণ্ড হতে পারে, যার বহু নজির আমাদের সামনেই আছে, এই দেশেই। সেগুলোর উদাহরণ দিয়ে লেখাটি ভারাক্রান্ত করার কোনো মানে হয় না।
মনে রাখা জরুরি যে, ন্যায়বিচার মানে যথাযথ বিচার, সেখানে কোনো ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ইত্যাদি ঢুকবার সুযোগ সজ্ঞানে রাখা মানে নিজের পায়েই কুড়োল মারা। যেনতেনভাবে দ্রুত বিচার করার দাবির বদলে যথাযথভাবে কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্নের দাবি বরং তুলুন। বিচার প্রক্রিয়াকে ফাস্ট ট্র্যাক করার দাবি তুলুন। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে ধর্ষণ মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে কথা বলুন, রাষ্ট্রকে বাধ্য করুন এ ধরনের সামগ্রিক পদক্ষেপ নিতে। কারণ, শুধু শাস্তির বিধান দিয়ে অপরাধ ঠেকানো যায় না।
চলবে...
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা