চরচা ডেস্ক

মার্কিন প্রতিরক্ষা (যুদ্ধ) বিভাগ একটি আকস্মিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাদের হাওয়াই-ভিত্তিক সামরিক সদর দপ্তর ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ (INDOPACOM)-এর নাম পরিবর্তন করে পুনরায় আগের নাম ‘প্যাসিফিক কমান্ড’ বা ‘প্যাকম’ (PACOM) করেছে।
বাহ্যিকভাবে পেন্টাগন যুক্তি দিয়েছে যে, এই ঐতিহাসিক নাম পুনর্বহালের মাধ্যমে কমান্ডের গভীর ঐতিহ্যকে সম্মান জানানো এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত সামরিক বাহিনীর মধ্যে একটি যৌথ চেতনা ও গৌরব জাগ্রত করা হচ্ছে। তবে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ডেরেক গ্রসম্যানের ফরেন পলিসি ম্যগাজিনে লেখা সাম্প্রতিক নিবন্ধ অনুসারে, এই নাম পরিবর্তনের পেছনে কেবলই সামরিক ঐতিহ্যের চেয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনের এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক এবং কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই পদক্ষেপটি মূলত চীনের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতার পথ পরিহার করে এক ধরনের দ্বিপাক্ষীয় বোঝাপড়া ও চুক্তিভিত্তিক কূটনীতির দিকে ট্রাম্পের ঝুঁকে পড়ার প্রবণতাকে প্রতিফলিত করে।
ডেরেক গ্রসম্যান লিখেছেন, ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই তার প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকার সময় ‘প্যাকম’ নাম পরিবর্তন করে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ বা ‘ইন্ডোপ্যাকম’ করেছিলেন। তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব জিম ম্যাটিস ট্রাম্পের পক্ষে এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছিলেন যে, ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংযোগের বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিতেই এই নতুন নামকরণ করা হয়েছিল।
যদিও এই নামকরণের ফলে সামরিক কমান্ডের ভৌগোলিক কার্যপরিধি বা দায়িত্বের সীমানায় কোনো পরিবর্তন আসেনি–যা যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে শুরু করে ভারতের জলসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত (যাকে সাবেক কমান্ডার হ্যারি হ্যারিস রসাত্মকভাবে ‘হলিউড থেকে বলিউড’ বলে অভিহিত করতেন)। তবুও এই নাম পরিবর্তনের একটি বিশাল প্রতীকী ও কৌশলগত মূল্য ছিল। এটি মূলত ২০১৭ সালে ট্রাম্পের ভিয়েতনাম সফরের সময় ঘোষিত ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতির সামরিক বাস্তবায়ন ছিল।
এই কৌশলের মূল রূপকার ছিলেন জাপানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, যিনি চেয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো একজোট হয়ে কাজ করুক, যাতে একনায়কতান্ত্রিক চীন দক্ষিণ চীন সাগরকে সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ‘লেক বেইজিং’-এ পরিণত করতে না পারে।
ডেরেক গ্রসম্যানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের কাছে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ শব্দটির তাৎপর্য ছিল আরও ব্যাপক। এর মাধ্যমে শুধুমাত্র ভারতের সাথেই নয়, বরং সমগ্র ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ওশেনিয়ার বন্ধুভাবাপন্ন উপকূলীয় ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করার একটি যৌথ প্রয়াস ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের এই মহাপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল বেইজিংকে একটি বহুমুখী কৌশলগত চাপের মুখে রাখা, যাতে চীন বাধ্য হয়ে তার মনোযোগ ও সম্পদের একটি বড় অংশ তাইওয়ান, পূর্ব চীন সাগর বা দক্ষিণ চীন সাগরের সার্বভৌমত্ব বিতর্ক থেকে সরিয়ে ভারত মহাসাগরের দিকেও বণ্টন করতে বাধ্য হয়।
সামগ্রিকভাবে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চীনের ক্রমবর্ধমান উত্থান এবং প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ করার জন্য ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক কৌশলের প্রধান ভিত্তি। তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এই সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বার্তা বহন করছে।
গ্রসম্যান স্পষ্ট করেছেন, এর মানে এই নয় যে ট্রাম্প প্রশাসন এই অঞ্চলে চীনের সমস্ত লক্ষ্য বা আধিপত্যকে মেনে নিচ্ছে, বরং এর অর্থ হলো যে কৌশলগত যুক্তির ওপর ভিত্তি করে একদা ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণার জন্ম হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই বহুপক্ষীয় জোট গঠনের নীতি থেকে সরে আসছে।
প্রথমবার যখন ‘ইন্ডোপ্যাকম’ নামকরণ করা হয়েছিল, তখন ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মনে একটি সুদৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, চীনের উত্থান ঠেকাতে ভারত এই অঞ্চলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করবে। ভারত মহাসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি করা, নয়াদিল্লির সাথে সামরিক ও কূটনৈতিক বন্ধন সুদৃঢ় করা এবং পূর্ব আফ্রিকা থেকে শুরু করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সমমনা শক্তিগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করাই ছিল এর লক্ষ্য। কিন্তু ট্রাম্পের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে সেই পূর্বানুমানগুলো আর অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বজায় থাকলেও ট্রাম্পের কৌশলগত চিন্তাভাবনায় নয়াদিল্লি তার পূর্বের সেই বিশেষ বা বিশেষায়িত সুবিধাভোগী অবস্থানটি হারিয়েছে।
ডেরেক গ্রসম্যানের বিবরণ অনুযায়ী, বিগত কিছু সময় ধরে ট্রাম্প অন্যান্য স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি নিতেও দ্বিধাবোধ করেননি। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের একটি সামরিক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি নিরসনে ট্রাম্প নিজে মধ্যস্থতা করেছিলেন বলে দাবি করার পর, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানান, তখন ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন।
এছাড়া রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ভারতের পক্ষ থেকে রুশ তেল ক্রয় অব্যাহত রাখা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে পারস্পরিক মতবিরোধের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছিল। এই সমস্ত টানাপোড়েনের জের ধরে ট্রাম্প ভারতে আয়োজিত একটি পরিকল্পিত ‘কোয়াড’ শীর্ষ সম্মেলনে তার অংশগ্রহণ বাতিল করেন, যা নয়াদিল্লির জন্য আন্তর্জাতিক মহলে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
একই সময়ে ট্রাম্প ভারতের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ও আপত্তিকে তোয়াক্কা না করে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর সাথে ইসলামাবাদের সম্পর্ক নিয়ে ভারতের গভীর সংশয় থাকা সত্ত্বেও, ট্রাম্প মার্কিন-ইরান কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে একজন প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ইসলামাবাদের এই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন ভারতের সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক দৃশ্যমানভাবে শীতল ও চাপের মধ্যে আছে।
এই কৌশলগত পরিবর্তনের আরেকটি বড় নিয়ামক হলো চীনের সাথে ট্রাম্পের সরাসরি যোগাযোগ। বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের সাথে ট্রাম্পের অতি সাম্প্রতিক উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠকের পরই মূলত সামরিক কমান্ডের নাম পুনরায় ‘প্যাকম’ করার ঘোষণাটি এলো। শুল্ক যুদ্ধ, প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা এবং ইরান সংঘাত নিয়ে কয়েক মাসের তীব্র উত্তেজনার পর ট্রাম্প বেইজিং সফরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে স্থিতিশীল করতে চেয়েছিলেন। সেখানে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বড় করে দেখানোর পরিবর্তে ট্রাম্প বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোর ওপর জোর দিয়েছেন। দুই নেতাই এই সফরকে পারস্পরিক সম্পর্কের একটি নতুন সূচনা বা ‘রিসেট’ হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন, যা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সেই ব্যক্তিগত স্তরের কূটনীতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
গ্রসম্যানের মতে, বেইজিং সামিটের এই ফলাফল এটিই প্রমাণ করে যে, ট্রাম্প চীনকে মোকাবিলা করার জন্য কোনো বহুপক্ষীয় আঞ্চলিক জোট বা কোয়ালিশন গঠনের চেয়ে সি চিনপিংয়ের সাথে সরাসরি ওয়ান-অন-ওয়ান বা দ্বিপক্ষীয় চুক্তিভিত্তিক লেনদেনকে বেশি পছন্দ করছেন। এই প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করলে, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ কাঠামোকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা কমিয়ে আনার অংশ হিসেবেই এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই পরিবর্তনের হাওয়া মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও ভাষাতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। যদিও মার্কিন প্রশাসনের কেউ কেউ এখনো মাঝে মাঝে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করছেন, তবে সামগ্রিকভাবে প্রশাসনের ভাষা এখন বহুপক্ষীয় জোটের চেয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের দিকে বেশি ঝুঁকছে। উদাহরণস্বরূপ, সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত বার্ষিক ঐতিহ্যবাহী ‘শাংগ্রি-লা সংলাপ’ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ তার পুরো বক্তৃতায় একবারের জন্যও ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ শব্দটি ব্যবহার করেননি।
নিবন্ধের শেষে ডেরেক গ্রসম্যান উপসংহার টেনেছেন এই বলে যে, ‘ইন্ডোপ্যাকম’ লেবেলটি পরিত্যাগ করা আসলে কোনো ভৌগোলিক সীমানার পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি গভীর কৌশলগত পরিবর্তন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন চীনের উত্থানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী কোনো বহুপক্ষীয় জোট গঠনে আগ্রহী নয়, বরং তারা তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য দ্বিপক্ষীয় ও লেনদেনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। যদিও এই নাম পরিবর্তনের ফলে মার্কিন সামরিক কার্যক্রম, তাদের বাহিনীর অবস্থান কিংবা এই অঞ্চলের অপারেশনাল দায়িত্বের কোনো পরিবর্তন হবে না। তবুও কৌশলগত কূটনীতিতে নাম কখনোই কেবলই কোনো সাধারণ নাম নয়।
‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণাটি ভারতকে একটি প্রধান অংশীদার হিসেবে দেখা, বহুপক্ষীয় জোট গঠনকে শক্তির উৎস মনে করা এবং চীনের সাথে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতাকে শতাব্দীর প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য করার প্রতীক ছিল। আর এখন, পুনরায় ‘প্যাকম’ নাম ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট সংকেত দিলেন যে, ওয়াশিংটনের বর্তমান কৌশলগত নীতিতে সেই পুরনো ধারণা ও অনুমিতিগুলো আর আগের মতো কাজ করছে না।

মার্কিন প্রতিরক্ষা (যুদ্ধ) বিভাগ একটি আকস্মিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাদের হাওয়াই-ভিত্তিক সামরিক সদর দপ্তর ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ (INDOPACOM)-এর নাম পরিবর্তন করে পুনরায় আগের নাম ‘প্যাসিফিক কমান্ড’ বা ‘প্যাকম’ (PACOM) করেছে।
বাহ্যিকভাবে পেন্টাগন যুক্তি দিয়েছে যে, এই ঐতিহাসিক নাম পুনর্বহালের মাধ্যমে কমান্ডের গভীর ঐতিহ্যকে সম্মান জানানো এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত সামরিক বাহিনীর মধ্যে একটি যৌথ চেতনা ও গৌরব জাগ্রত করা হচ্ছে। তবে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ডেরেক গ্রসম্যানের ফরেন পলিসি ম্যগাজিনে লেখা সাম্প্রতিক নিবন্ধ অনুসারে, এই নাম পরিবর্তনের পেছনে কেবলই সামরিক ঐতিহ্যের চেয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনের এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক এবং কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই পদক্ষেপটি মূলত চীনের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতার পথ পরিহার করে এক ধরনের দ্বিপাক্ষীয় বোঝাপড়া ও চুক্তিভিত্তিক কূটনীতির দিকে ট্রাম্পের ঝুঁকে পড়ার প্রবণতাকে প্রতিফলিত করে।
ডেরেক গ্রসম্যান লিখেছেন, ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই তার প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকার সময় ‘প্যাকম’ নাম পরিবর্তন করে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ বা ‘ইন্ডোপ্যাকম’ করেছিলেন। তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব জিম ম্যাটিস ট্রাম্পের পক্ষে এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছিলেন যে, ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংযোগের বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিতেই এই নতুন নামকরণ করা হয়েছিল।
যদিও এই নামকরণের ফলে সামরিক কমান্ডের ভৌগোলিক কার্যপরিধি বা দায়িত্বের সীমানায় কোনো পরিবর্তন আসেনি–যা যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে শুরু করে ভারতের জলসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত (যাকে সাবেক কমান্ডার হ্যারি হ্যারিস রসাত্মকভাবে ‘হলিউড থেকে বলিউড’ বলে অভিহিত করতেন)। তবুও এই নাম পরিবর্তনের একটি বিশাল প্রতীকী ও কৌশলগত মূল্য ছিল। এটি মূলত ২০১৭ সালে ট্রাম্পের ভিয়েতনাম সফরের সময় ঘোষিত ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতির সামরিক বাস্তবায়ন ছিল।
এই কৌশলের মূল রূপকার ছিলেন জাপানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, যিনি চেয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো একজোট হয়ে কাজ করুক, যাতে একনায়কতান্ত্রিক চীন দক্ষিণ চীন সাগরকে সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ‘লেক বেইজিং’-এ পরিণত করতে না পারে।
ডেরেক গ্রসম্যানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের কাছে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ শব্দটির তাৎপর্য ছিল আরও ব্যাপক। এর মাধ্যমে শুধুমাত্র ভারতের সাথেই নয়, বরং সমগ্র ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ওশেনিয়ার বন্ধুভাবাপন্ন উপকূলীয় ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করার একটি যৌথ প্রয়াস ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের এই মহাপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল বেইজিংকে একটি বহুমুখী কৌশলগত চাপের মুখে রাখা, যাতে চীন বাধ্য হয়ে তার মনোযোগ ও সম্পদের একটি বড় অংশ তাইওয়ান, পূর্ব চীন সাগর বা দক্ষিণ চীন সাগরের সার্বভৌমত্ব বিতর্ক থেকে সরিয়ে ভারত মহাসাগরের দিকেও বণ্টন করতে বাধ্য হয়।
সামগ্রিকভাবে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চীনের ক্রমবর্ধমান উত্থান এবং প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ করার জন্য ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক কৌশলের প্রধান ভিত্তি। তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এই সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বার্তা বহন করছে।
গ্রসম্যান স্পষ্ট করেছেন, এর মানে এই নয় যে ট্রাম্প প্রশাসন এই অঞ্চলে চীনের সমস্ত লক্ষ্য বা আধিপত্যকে মেনে নিচ্ছে, বরং এর অর্থ হলো যে কৌশলগত যুক্তির ওপর ভিত্তি করে একদা ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণার জন্ম হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই বহুপক্ষীয় জোট গঠনের নীতি থেকে সরে আসছে।
প্রথমবার যখন ‘ইন্ডোপ্যাকম’ নামকরণ করা হয়েছিল, তখন ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মনে একটি সুদৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, চীনের উত্থান ঠেকাতে ভারত এই অঞ্চলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করবে। ভারত মহাসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি করা, নয়াদিল্লির সাথে সামরিক ও কূটনৈতিক বন্ধন সুদৃঢ় করা এবং পূর্ব আফ্রিকা থেকে শুরু করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সমমনা শক্তিগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করাই ছিল এর লক্ষ্য। কিন্তু ট্রাম্পের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে সেই পূর্বানুমানগুলো আর অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বজায় থাকলেও ট্রাম্পের কৌশলগত চিন্তাভাবনায় নয়াদিল্লি তার পূর্বের সেই বিশেষ বা বিশেষায়িত সুবিধাভোগী অবস্থানটি হারিয়েছে।
ডেরেক গ্রসম্যানের বিবরণ অনুযায়ী, বিগত কিছু সময় ধরে ট্রাম্প অন্যান্য স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি নিতেও দ্বিধাবোধ করেননি। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের একটি সামরিক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি নিরসনে ট্রাম্প নিজে মধ্যস্থতা করেছিলেন বলে দাবি করার পর, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানান, তখন ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন।
এছাড়া রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ভারতের পক্ষ থেকে রুশ তেল ক্রয় অব্যাহত রাখা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে পারস্পরিক মতবিরোধের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছিল। এই সমস্ত টানাপোড়েনের জের ধরে ট্রাম্প ভারতে আয়োজিত একটি পরিকল্পিত ‘কোয়াড’ শীর্ষ সম্মেলনে তার অংশগ্রহণ বাতিল করেন, যা নয়াদিল্লির জন্য আন্তর্জাতিক মহলে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
একই সময়ে ট্রাম্প ভারতের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ও আপত্তিকে তোয়াক্কা না করে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর সাথে ইসলামাবাদের সম্পর্ক নিয়ে ভারতের গভীর সংশয় থাকা সত্ত্বেও, ট্রাম্প মার্কিন-ইরান কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে একজন প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ইসলামাবাদের এই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন ভারতের সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক দৃশ্যমানভাবে শীতল ও চাপের মধ্যে আছে।
এই কৌশলগত পরিবর্তনের আরেকটি বড় নিয়ামক হলো চীনের সাথে ট্রাম্পের সরাসরি যোগাযোগ। বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের সাথে ট্রাম্পের অতি সাম্প্রতিক উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠকের পরই মূলত সামরিক কমান্ডের নাম পুনরায় ‘প্যাকম’ করার ঘোষণাটি এলো। শুল্ক যুদ্ধ, প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা এবং ইরান সংঘাত নিয়ে কয়েক মাসের তীব্র উত্তেজনার পর ট্রাম্প বেইজিং সফরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে স্থিতিশীল করতে চেয়েছিলেন। সেখানে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বড় করে দেখানোর পরিবর্তে ট্রাম্প বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোর ওপর জোর দিয়েছেন। দুই নেতাই এই সফরকে পারস্পরিক সম্পর্কের একটি নতুন সূচনা বা ‘রিসেট’ হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন, যা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সেই ব্যক্তিগত স্তরের কূটনীতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
গ্রসম্যানের মতে, বেইজিং সামিটের এই ফলাফল এটিই প্রমাণ করে যে, ট্রাম্প চীনকে মোকাবিলা করার জন্য কোনো বহুপক্ষীয় আঞ্চলিক জোট বা কোয়ালিশন গঠনের চেয়ে সি চিনপিংয়ের সাথে সরাসরি ওয়ান-অন-ওয়ান বা দ্বিপক্ষীয় চুক্তিভিত্তিক লেনদেনকে বেশি পছন্দ করছেন। এই প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করলে, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ কাঠামোকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা কমিয়ে আনার অংশ হিসেবেই এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই পরিবর্তনের হাওয়া মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও ভাষাতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। যদিও মার্কিন প্রশাসনের কেউ কেউ এখনো মাঝে মাঝে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করছেন, তবে সামগ্রিকভাবে প্রশাসনের ভাষা এখন বহুপক্ষীয় জোটের চেয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের দিকে বেশি ঝুঁকছে। উদাহরণস্বরূপ, সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত বার্ষিক ঐতিহ্যবাহী ‘শাংগ্রি-লা সংলাপ’ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ তার পুরো বক্তৃতায় একবারের জন্যও ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ শব্দটি ব্যবহার করেননি।
নিবন্ধের শেষে ডেরেক গ্রসম্যান উপসংহার টেনেছেন এই বলে যে, ‘ইন্ডোপ্যাকম’ লেবেলটি পরিত্যাগ করা আসলে কোনো ভৌগোলিক সীমানার পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি গভীর কৌশলগত পরিবর্তন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন চীনের উত্থানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী কোনো বহুপক্ষীয় জোট গঠনে আগ্রহী নয়, বরং তারা তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য দ্বিপক্ষীয় ও লেনদেনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। যদিও এই নাম পরিবর্তনের ফলে মার্কিন সামরিক কার্যক্রম, তাদের বাহিনীর অবস্থান কিংবা এই অঞ্চলের অপারেশনাল দায়িত্বের কোনো পরিবর্তন হবে না। তবুও কৌশলগত কূটনীতিতে নাম কখনোই কেবলই কোনো সাধারণ নাম নয়।
‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণাটি ভারতকে একটি প্রধান অংশীদার হিসেবে দেখা, বহুপক্ষীয় জোট গঠনকে শক্তির উৎস মনে করা এবং চীনের সাথে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতাকে শতাব্দীর প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য করার প্রতীক ছিল। আর এখন, পুনরায় ‘প্যাকম’ নাম ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট সংকেত দিলেন যে, ওয়াশিংটনের বর্তমান কৌশলগত নীতিতে সেই পুরনো ধারণা ও অনুমিতিগুলো আর আগের মতো কাজ করছে না।