Advertisement Banner

ফরেন পলিসির প্রতিবেদন

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি, বাংলাদেশ কি বিপদে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি, বাংলাদেশ কি বিপদে?
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জনসভা। ছবি: ফেসবুক

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বড় জয় ভারতের। এ জয় বাংলাদেশসহ অন্য প্রতিবেশীদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। মাইকেল কুগেলম্যান গত ৬ মে ফরেন পলিসিতে এই বিষয়টি পরিষ্কার করে লিখেছেন। তার লেখা এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভারতের চার রাজ্যের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

বিজেপির এই পুনরুত্থান যেমন ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে তাদের আধিপত্য নিশ্চিত করছে, তেমনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন এবং সম্ভবত আরও কঠোর অধ্যায়ের সূচনা করছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো এবং ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কলামিস্ট মাইকেল কুগেলম্যান সাম্প্রতি তার ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে লিখেছেন, চলতি মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের রাজ্য রাজনীতিতে এবং বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপটে এক নাটকীয় পটপরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে। গত ৪ মে ঘোষিত পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের চারটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচনের ফলাফল ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক সঞ্জীবনী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ফলাফলকে কুগেলম্যান একটি ‘গেরুয়া ঢেউ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যেখানে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজেপি ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে।

এই ফলাফল কেবল একটি রাজ্যের ক্ষমতা বদল নয়, বরং ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপির অবস্থানকে পুনঃসংহত করার একটি শক্তিশালী সংকেত। ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয়লাভের মাধ্যমে বিজেপি প্রমাণ করেছে যে, তারা ভারতের চতুর্থ জনবহুল এই রাজ্যে তাদের ৪৬ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে।

কুগেলম্যানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের এই ফলাফলের পেছনে অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীনদের প্রতি জনগণের বিরূপ মনোভাব প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। তবে এই বিজয়ের পাশাপাশি একটি বিতর্কিত প্রসঙ্গও উঠে এসেছে, যা হলো নির্বাচন কমিশন কর্তৃক রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া।

সমালোচকদের মতে, বাদ পড়া ভোটারদের একটি বড় অংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের, যারা ঐতিহ্যগতভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। যদিও নয়াদিল্লি এটিকে একটি জাতীয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দাবি করেছে। তবে বিরোধী দলগুলো এটিকে বিজেপির নির্বাচনী কৌশল হিসেবেই দেখছে।

এই বিজয়ের মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কমার ফলে যে, রাজনৈতিক চাপের মুখে ছিল, তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। কুগেলম্যান মনে করেন, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে বিজেপির বিরোধী জোটের প্রধান শরিকদের পরাজয় জাতীয় স্তরের বিরোধী জোটকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে, যা ২০২৯ সালে মোদির টানা চতুর্থ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথকে প্রশস্ত করছে।

প্রতিবেদনটিতে পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের সম্ভাব্য সমীকরণ নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কুগেলম্যান উল্লেখ করেছেনে, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছিল। তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার সম্ভবত বাংলাদেশের সাথে আন্তঃসীমান্ত ইস্যুতে অনেক বেশি কঠোর অবস্থান নেবে।

বিশেষ করে অবৈধ অনুপ্রবেশের যে অভিযোগ বিজেপি নেতারা নিয়মিতভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তুলে আসছিলেন, তা এখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন উত্তাপ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের বর্তমান বিএনপি সরকার যখন নয়াদিল্লির সাথে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।

কুগেলম্যানের মতে, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে, তা সীমান্ত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এখনো একটি চ্যালেঞ্জ। যদি পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার কোনো কঠোর নীতি গ্রহণ করে, তবে তা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিদ্যমান ভারত-বিরোধী মনোভাবকে আরও উসকে দিতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার প্রসঙ্গে কুগেলম্যান ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কের এক বছর আগের যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেছেন। এক বছর আগে কাশ্মীর সীমান্তে ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক হত্যার প্রতিশোধ নিতে ভারত যে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল, তা ১৯৭১ সালের পর দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত ছিল। যদিও ২০২১ সাল থেকে দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ হিমাঙ্কে পৌঁছেছে। বাণিজ্য বন্ধ, সীমান্ত সিল করা এবং সিন্ধু নদ জল চুক্তি স্থগিত করার মতো ভারতের কঠোর পদক্ষেপগুলো দুই দেশের মধ্যকার আস্থাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

কুগেলম্যানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই এখন প্রচলিত যুদ্ধ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, যা পারমাণবিক ছায়াতলে থাকা এই অঞ্চলের জন্য একটি অশনিসংকেত। তিনি সতর্ক করেছেন যে, যেকোনো সময় আবারও সংঘাতের সূত্রপাত ঘটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

নেপালে মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর-এর সাম্প্রতিক সফর নিয়েও কুগেলম্যান এক কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য প্রদান করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন শাহ্-এর সাথে গোর-এর বৈঠক না হওয়াটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা। বলেন শাহ্-এর এই অনড় অবস্থান যে তিনি কেবল সমমর্যাদার ব্যক্তিবর্গের সাথেই সাক্ষাৎ করবেন, তা নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার শক্তিশালী অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ।

কুগেলম্যানের মতে, এটি প্রমাণ করে যে, হিমালয় কন্যা নেপালে বৈদেশিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকেও মাঝে মাঝে বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অন্যদিকে, সোমালিয়া উপকূলে জলদস্যুদের হাতে জিম্মি হওয়া পাকিস্তানি নাবিকদের উদ্ধার নিয়ে পাকিস্তানে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ এবং এর সাথে সম্পর্কিত মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রচেষ্টাও এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের গভর্নর নিহাল হাশমি নাবিকদের উদ্ধারের আশ্বাস দিলেও পরিবারগুলোর মধ্যে দুশ্চিন্তা কমেনি।

কুগেলম্যান তার বিশ্লেষণের শেষাংশে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য কণ্ঠস্বরকেও প্রাধান্য দিয়েছেন। যেমন, বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন দেশে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝোঁকার যে পরামর্শ দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

একইভাবে পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞ সৈয়দ খিজার আলী শাহ্ এবং ভুটানের কুয়েনসেল পত্রিকার সম্পাদকীয় যথাক্রমে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া জন্মহার নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা এই অঞ্চলের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জকেই তুলে ধরে।

সবশেষে কুগেলম্যানের এই বিশ্লেষণটি এটিই স্পষ্ট করে যে, ২০২৬ সালের এই মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয়, বরং এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

সম্পর্কিত