যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি সানায়ে তাকাইচি

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি সানায়ে তাকাইচি
তাকাইচি গণতান্ত্রিক জাপানের ইতিহাসে প্রথম নারী সরকারপ্রধান। ছবি: রয়টার্স

১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাপানের রাজনীতিতে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। মাঝখানে মাত্র দুটি সংক্ষিপ্ত সময় ছাড়া তারা সবসময়ই ক্ষমতায় ছিল। তবে ৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারা যে অভাবনীয় জয় পেয়েছে, তা আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।

এলডিপির নেত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রতি দেশের সব প্রান্ত থেকে সমর্থন এসেছে। জাপানের ৪৬৫ আসনের নিম্নকক্ষে তার দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৩১৬টি আসন নিশ্চিত করেছে। এই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ‘সুপারমেজরিটি’র ফলে দলটি এখন উচ্চকক্ষকে (যা তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই) উপেক্ষা বা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করল।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট-এর মতে, তাকাইচি জাপানি ভোটারদের নিরাপত্তা এবং পরিবর্তন, উভয় আকাঙ্ক্ষাকেই স্পর্শ করতে পেরেছেন। এই কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং সময়ে তিনি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও কঠোর নীতিমালার প্রস্তাব দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি পুরনো প্রথাগত ধারার বাইরে এক নতুন নেতৃত্বের প্রতীক। অনেক পূর্বসূরীর মতো তিনি কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরী নন, বরং এক মধ্যবিত্ত পরিবারের স্পষ্টভাষী সন্তান। এবং সর্বোপরি, তিনি একজন নারী। তাকাইচি গণতান্ত্রিক জাপানের ইতিহাসে প্রথম নারী সরকারপ্রধান।

নির্বাচনী বাজি এবং এই বিপুল বিজয়ের ফলে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার মর্যাদা দিতে হলে তাকাইচিকে আরও বড় পরিসরে ও সুদূরপ্রসারী চিন্তা করতে হবে। বর্তমানের সাময়িক সমস্যাগুলো মিটিয়ে ফেলাকেই তিনি যেন তার শাসনের একমাত্র লক্ষ্য না ধরেন; বরং জাপানের দীর্ঘমেয়াদী জনতাত্ত্বিক এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো তাকে সরাসরি মোকাবিলা করতে হবে। সেই সঙ্গে তাকে এটিও উপলব্ধি করতে হবে যে, উত্তাল এই বিশ্ব পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে জাপানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। সর্বোপরি, তিনি যেন কেবল তার ডানপন্থী সমর্থকদের নয়, বরং পুরো জাপানের নেতা হয়ে ওঠেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, তাকে আবারও সবটুকু বাজি ধরে ঝুঁকি নিয়ে এগোতে হবে।

একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন ঐতিহাসিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয় হলো, তাকাইচি সেই সুযোগগুলো কাজে লাগানোর মতো কতটা সাহসী। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাপানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেওয়ার জন্য তিনি সবচেয়ে উপযুক্ত অবস্থানে আছেন। ২০১২- ২০২০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা প্রয়াত শিনজো আবে চীনের আগ্রাসন এবং আমেরিকার অনিশ্চিত ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করার কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু বিশ্ব জাপানের চেয়েও দ্রুত বদলে গেছে।

এলডিপির নেত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রতি দেশের সব প্রান্ত থেকে সমর্থন এসেছে। ছবি: রয়টার্স
এলডিপির নেত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রতি দেশের সব প্রান্ত থেকে সমর্থন এসেছে। ছবি: রয়টার্স

তাকাইচি ইতিমধ্যেই প্রতিরক্ষা ব্যয় ২০২৭ সালের মধ্যে জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করার যে পরিকল্পনা ছিল, তা চলতি অর্থবছর থেকেই কার্যকর করার পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে জাপানের জন্য এটিও যথেষ্ট নয়। তাছাড়া, কেবল বাজেট বাড়ানোই সব নয়। বর্তমান বিশ্বের নতুন বিশৃঙ্খলার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে জাপানের একটি আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আলোচনা করা সহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ‘ট্যাবু’ বা বিধিনিষেধ ভাঙার ক্ষেত্রে তাকাইচির আগ্রহ একটি ইতিবাচক দিক। প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া, এই খাতে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং দেশের গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তার চিন্তাধারা সঠিক পথেই রয়েছে।

এর জন্য প্রয়োজন হবে উদ্যোগী ও কৌশলী কূটনীতি। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে থাকা মার্কিন মিত্রদের মতো জাপানও ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিতে প্রত্যাবর্তনে কিছুটা বিচলিত। তবে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর চেয়েও জাপানের পক্ষে আমেরিকাকে চটিয়ে দেওয়া বা দূরে ঠেলে দেওয়া মোটেও সম্ভব নয়। কারণ দেশটি চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মতো পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা বেষ্টিত এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে জাপানকে আমেরিকার পারমাণবিক ছত্রচ্ছায়ার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।

ট্রাম্পের নেক নজরে থাকার ক্ষেত্রে তাকাইচি প্রশংসনীয় দক্ষতা দেখিয়েছেন। এমনকি নির্বাচনের আগে ট্রাম্প তাকে সমর্থনও দিয়েছিলেন। তবে আমেরিকার সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি জাপানের উচিত হবে আমেরিকাকে এড়িয়ে বা বিকল্প পথে চলার ক্ষেত্রেও দ্বিধা না করা, ঠিক যেমনটি করেছিলেন শিনজো আবে। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ‘কমপ্রেহেন্সিভ এন্ড প্রগ্রেসিভ অ্যাগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ’ (সিপিএটিপিপি) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে আসার পর আবে একাই সেটি টিকিয়ে রেখেছিলেন। সেটি ট্রাম্পের সাথে আবের উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। এবার জাপানের উচিত হবে সিপিএটিপিপি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেওয়া, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ৩০ শতাংশেরও বেশি এলাকা নিয়ে একটি বিশাল বাণিজ্য জোট তৈরি করবে।

জাপানকে এমন এক সময়ে এই বিশ্বনেতৃত্বের প্রমাণ দিতে হবে যখন তার অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও সক্ষমতা বেশ চাপের মুখে। ক্রমহ্রাসমান এবং বার্ধক্যগ্রস্ত জনগোষ্ঠী জাপানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে প্রধান বাধা। বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশ যেমনটি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে–এই সমস্যার কোনো সহজ সমাধান নেই। পরিবার কোনো উৎপাদন ব্যবস্থা নয় যে চাইলেই এর গতি বাড়িয়ে দেওয়া যাবে। বরং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো এই জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনকেও প্রতিনিয়ত খাপ খাইয়ে নিতে হবে। নির্বাচনের এই বিশাল জয় তাকাইচিকে সেই কঠিন সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, যা অন্যরা এতদিন এড়িয়ে গেছেন।

ট্রাম্পের নেক নজরে থাকার ক্ষেত্রে তাকাইচি প্রশংসনীয় দক্ষতা দেখিয়েছেন। ছবি: রয়টার্স
ট্রাম্পের নেক নজরে থাকার ক্ষেত্রে তাকাইচি প্রশংসনীয় দক্ষতা দেখিয়েছেন। ছবি: রয়টার্স

জাপানের বর্তমান জনশক্তিকে কাজে লাগানো এবং নতুনদের জন্য দেশটিকে আরও উন্মুক্ত করার দিকেই তার মনোযোগ দেওয়া উচিত। সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিরাচরিত জ্যেষ্ঠতা-ভিত্তিক আজীবন চাকরির প্রথা থেকে সরে এসে আরও নমনীয় ও কাজ-ভিত্তিক ব্যবস্থায় যেতে হবে। পিতৃতান্ত্রিক পারিবারিক আইন এবং কর কাঠামো ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। এই আইন তরুণদের বিয়েতে নিরুৎসাহিত করে এবং নারীদের স্বল্প বেতনের কাজে আটকে রাখে।

জাপানের উচিত অভিবাসীদের প্রতি বিরূপ না হয়ে বরং নমনীয় হওয়া এবং দেশের ক্রমবর্ধমান শ্রমিক সংকট কমাতে তাদের কাজে লাগানো। যেহেতু প্রতিরক্ষা এবং জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয়ের চাহিদা বাড়ছে, তাই জাপানকে বাজারকে এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, তাদের প্রয়োজনীয় কর্মসূচিগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন রয়েছে। মোট ঋণ কমানোর লক্ষ্যে বিদেশের সম্পদ থেকে ধীরে ধীরে মুনাফা তুলে নেওয়ার জন্য এখনই উপযুক্ত সময় হতে পারে।

কিন্তু তাকাইচি কি এই কাজের জন্য উপযুক্ত? গত অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাকে  এখনো যাচাই করা হয়নি। এই ব্যাপক জনসমর্থনকে তিনি তার সংকীর্ণ আদর্শিক লক্ষ্য পূরণের লাইসেন্স হিসেবে ভুল বুঝতে পারেন। একজন কট্টর জাতীয়তাবাদী হিসেবে তিনি ‘ইয়াসুকুনি শ্রাইন’ পরিদর্শন করতে পারেন, যা জাপানের যুদ্ধাহতদের শ্রদ্ধা জানায়; যাদের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী নেতা এবং যুদ্ধাপরাধীরাও অন্তর্ভুক্ত। এমন পদক্ষেপ চীনের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে জাপানের ভঙ্গুর সুসম্পর্ককে ধ্বংস করবে; যা চীনের উত্থান মোকাবিলায় অপরিহার্য।

একজন চরম সামাজিক রক্ষণশীল হিসেবে তাকাইচি বিদেশি-বিদ্বেষী মনোভাব উসকে দিতে পারেন, যা জাপানের ক্রমহ্রাসমান জনসংখ্যা পূরণে প্রয়োজনীয় অভিবাসীদের এবং অর্থনীতি চাঙ্গা করা পর্যটকদের বিমুখ করবে। আবার আর্থিক নীতিতে শিথিল হওয়ার কারণে তাকাইচি বড় ধরনের ব্যয়ের এজেন্ডা হাতে নিতে পারেন, যা মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে বন্ডহোল্ডারদের আতঙ্কিত করতে পারে।

দ্য ইকোনমিস্টের মতে, তার একটি বড় পরীক্ষা হবে নির্বাচনী পপুলিস্ট প্রতিশ্রুতি, নতুন কোনো ঋণ না নিয়েই দুই বছরের জন্য খাদ্যের ওপর ৮ শতাংশ সেলস ট্যাক্স স্থগিত করা। যদিও ভোটাররা হয়তো এই ‘যাদুকরী চিন্তায়’ বিশ্বাস করেছে, কিন্তু বাজার বাস্তবতা বোঝে। এই ছাড়ের খরচ মেটানোর পথ তাকে খুঁজে বের করতে হবে, নতুবা এটি বাতিল করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কাজের তালিকা অত্যন্ত কঠিন ও ভয়ংকর। জাপানিরা যে কেন উদ্বিগ্ন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তাকাইচি ভোটারদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, এই উত্তাল সময়ে তিনি তাদের নেতৃত্ব দেবেন কি না। উত্তর এসেছে এক জোরালো ‘হ্যাঁ’। কিন্তু তিনি যদি তার এই বিশাল জনসমর্থন কেবল প্রতীকী কর্মকাণ্ড আর সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনে অপচয় করেন, তবে আরও ক্ষতিকর বিকল্প শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। আর জাপান খুব শিগগিরই অন্য কোনো নেতাকে এমন বিশাল সুযোগ দেবে না।

সম্পর্কিত