Advertisement Banner

ইরান যুদ্ধ: সংকটে চিপ শিল্প, বড় ক্ষতির শঙ্কা

ইরান যুদ্ধ: সংকটে চিপ শিল্প, বড় ক্ষতির শঙ্কা
ছবি: এইআই দিয়ে তৈরি

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার দূরত্ব প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার। কিন্তু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান বিধ্বংসী যুদ্ধ আজ সিউলের অত্যাধুনিক চিপ ল্যাবরেটরিগুলোতে অন্ধকার নেমে আসার মতো সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংঘাত কেবল তেলের দাম বাড়াচ্ছে না, বরং আধুনিক সভ্যতার ‘মস্তিষ্ক’ হিসেবে পরিচিত সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ শিল্পের জন্য এক অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এবং আমেরিকা-ইসরায়েল যুদ্ধ এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; সরাসরি একটি ‘সেমিকন্ডাক্টর যুদ্ধ’। কেননা এ কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার চিপ শিল্প সংকটে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শেয়ার মার্কেটে।

সম্প্রতি মাত্র চার কার্যদিবসে দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি (শেয়ারবাজার) ইনডেক্স ১৮ শতাংশ ধসে পড়েছে। বাজার মূলধন থেকে স্রেফ মুছে গেছে ৫০০ বিলিয়ন ডলার। ওয়াশিংটন ডিসি–ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস বলছে, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার পর এই প্রথম দক্ষিণ কোরিয়া এমন ভয়াবহ পতনের মুখোমুখি হলো।

বিশ্ববাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি (এইচবিএম) নিয়ন্ত্রণ করা স্যামসাং এবং এসকে হাইনিক্সের শেয়ার দর ২০ শতাংশের বেশি পড়ে গেছে। এই পতন কেবল যুদ্ধের আতঙ্কে নয়, বরং কোরিয়ার একটি গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে; আর তা হলো জ্বালানি নিরাপত্তা।

হরমুজ: প্রযুক্তি পণ্যের ‘রক্তনালী’

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দক্ষিণ কোরিয়া তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের ৭০ শতাংশ এবং এলএনজির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। এই আমদানির প্রায় পুরোটাই আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে।

ইরান যদি এই জলপথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় বা যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তবে কোরিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়বে। চিপ উৎপাদন একটি অত্যন্ত বিদ্যুৎ-নিবিড় প্রক্রিয়া। একটি সেমিকন্ডাক্টর কারখানা সচল রাখতে যে পরিমাণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন, তা বিঘ্নিত হলে বিলিয়ন ডলারের চিপ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরের পর বছর ধরে কোরিয়ার জ্বালানি আমদানির প্রয়োজনীয়তা এবং উন্নত চিপ উৎপাদনের জন্য বিদ্যুতের চাহিদার মধ্যে যে অসামঞ্জস্য রয়েছে, তা দেশটির সেমিকন্ডাক্টর নেতৃত্বের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই মুহূর্তে পারমাণবিক, সৌর, বায়ু এবং জৈব জ্বালানির মতো স্বনির্ভর বিকল্প পথে যাওয়ার প্রক্রিয়া পিছিয়ে গেছে। যদিও দেশটির প্রগতিশীল ও রক্ষণশীল উভয় প্রশাসনই পরিবেশবান্ধব জ্বালানির প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহকারীদের ওপর কম নির্ভরশীল বিদ্যুৎ উৎসগুলোর মধ্যেও কয়লা (৩৩ শতাংশ) এখনও পারমাণবিক শক্তিকে (৩১ শতাংশ) ছাড়িয়ে শীর্ষে রয়েছে।

কোরিয়া যত বেশি চিপ উৎপাদন বাড়াতে চাইবে, তার জ্বালানির চাহিদাও তত বাড়বে। গেয়ংগি প্রদেশের ইয়ংগিনে বর্তমানে নির্মাণাধীন বিশ্বের বৃহত্তম চিপ কমপ্লেক্সটি ২০২৭ সালে আংশিকভাবে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এটি মূলত এআই চালিত চাহিদার যুগে বৈশ্বিক মেমোরি-চিপ উৎপাদনে দেশটির আধিপত্য শক্তিশালী করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। কিন্তু এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। এর উন্নয়নে প্রধান চ্যালেঞ্জ জ্বালানি। গেয়ংগি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একটি জ্বালানি মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইয়ংগিন কমপ্লেক্সটি পরিচালনার জন্য ১৬ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে। বর্তমানে জাতীয় সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ৯৪ গিগাওয়াট। অর্থাৎ কমপ্লেক্সটি একাই জাতীয় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৭ শতাংশ দাবি করবে।

এআই বিপ্লবের ওপর বড় ধাক্কা

বর্তমান বিশ্ব এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোয়ারে ভাসছে। এনভিডিয়া বা অ্যাপলের মতো কোম্পানিগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক মেমোরি চিপ সরবরাহ করে কোরিয়া। চ্যাটজিপিটি বা গুগল জেমিনির মতো এআই মডেল চালানোর জন্য এইচবিএম চিপ অপরিহার্য। কোরিয়ার বিদ্যুৎ সংকটে যদি উৎপাদন ১০ শতাংশও কমে, তবে বিশ্ববাজারে এআই হার্ডওয়্যারের দাম দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বড় টেক জায়ান্টরা ইতিমধ্যে কয়েক বছরের অগ্রিম চুক্তি করে রেখেছে। সরবরাহ ব্যাহত হলে পুরো বৈশ্বিক স্মার্টফোন ও অটোমোবাইল শিল্প স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

জ্বালানির চড়া মূল্য এবং অনিয়শ্চয়তা কোরিয়ার চিপ নির্মাতাদের দেশত্যাগে বাধ্য করছে। স্যামসাং ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে তাদের বিশাল কারখানা সম্প্রসারণ করছে। তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে এবং ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে কোরিয়া এখন দুটি প্রধান পথে হাঁটছে। আর তা হলো–

নিউক্লিয়ার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি: প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউংয়ের প্রশাসন কয়লা বিদ্যুৎ কমিয়ে পারমাণবিক এবং সৌরবিদ্যুতের ওপর জোর দিচ্ছে।

গ্রিড আধুনিকায়ন: ২০২৭ সালের মধ্যে নির্মিতব্য ইয়ংগিন চিপ ক্লাস্টারের জন্য ১৬ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন, যা মেটাতে আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রান্সমিশন লাইনের কাজ দ্রুত করা হচ্ছে।

ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ

২০২৬ সালের এই যুদ্ধ প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, ভৌগোলিক সীমানা এখন আর নিরাপত্তার গ্যারান্টি নয়। মধ্যপ্রাচ্যের একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সিউলের চিপ কারখানাকে অচল করে দিয়ে সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিকে অকেজো করে দিতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য শিক্ষাটি স্পষ্ট, চিপ শিল্পে বিশ্বসেরা হয়েও লাভ নেই, যদি সেই চিপ বানানোর বিদ্যুৎ অন্যের হাতের মুঠোয় থাকে। তাইওয়ান যেমন তাদের জ্বালানি নীতিকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ করেছে, কোরিয়াকেও এখন ‘জ্বালানি স্বনির্ভরতা’ অর্জন করতে হবে। নাহলে হরমুজ প্রণালীর প্রতিটি ঢেউ কোরিয়ার অর্থনীতিতে সুনামি নিয়ে আসবে।

ইরান যুদ্ধ কোরিয়ার জ্বালানিগত নাজুকতা তৈরি করেনি। এটি কেবল দেখিয়ে দিয়েছে যে এই দুর্বলতা কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এমন এক যুগে যখন বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল অর্থনীতি কোরিয়ান মেমোরি চিপের ওপর নির্ভরশীল, তখন সেই চিপগুলো যাতে নির্ভরযোগ্যভাবে বিদ্যুৎ পায় তা নিশ্চিত করা আর কেবল কোনো জ্বালানি ইস্যু নয়—এটি এখন অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়।

সম্পর্কিত