ফজলে রাব্বি

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন গতি আনার লক্ষ্যে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে অফশোর বিডিং রাউন্ডের দরপত্র আহ্বান করেছে সরকার। দীর্ঘ বিরতির পর শুরু হওয়া এই উদ্যোগকে শুধু একটি জ্বালানি প্রকল্প নয়, বরং ক্রমবর্ধমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের বড় কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তবে বিদেশি কোম্পানিগুলো আদৌ আগ্রহ দেখাবে কি না, সেটি অনেকটাই নির্ভর করছে নতুন প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট বা পিএসসি ২০২৬-এর শর্তগুলোর ওপর। পেট্রোবাংলার ১৩৩ পৃষ্ঠার এই খসড়া চুক্তিতে গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, গভীর সমুদ্রে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে মুনাফা বণ্টনের কাঠামো শিথিল করা হয়েছে, আবার পরিবেশ সুরক্ষা ও রাষ্ট্রের মালিকানাও জোরালোভাবে ধরে রাখা হয়েছে।
কে বিড করবে–সেই প্রশ্নের চেয়ে নতুন শর্তগুলো বাংলাদেশের জন্য কতটা লাভজনক ও টেকসই হবে, সেটিই জ্বালানি বিশ্লেষকদের কাছে হয়ে উঠেছে মূল আলোচনার বিষয়।
অনুসন্ধানে দীর্ঘ সময়, গভীর সমুদ্রে বাড়তি সুবিধা
নতুন চুক্তি অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি সর্বোচ্চ নয় বছর অনুসন্ধান চালাতে পারবে। প্রথম ধাপে থাকবে ছয় বছর। এর মধ্যে প্রথম চার বছর মূলত ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও তথ্য সংগ্রহের জন্য। পরে কূপ খননের সিদ্ধান্ত নিলে অতিরিক্ত সময় পাওয়া যাবে। প্রথম ধাপ শেষে আরও তিন বছর বাড়ানোর সুযোগও রাখা হয়েছে।
একবার বাণিজ্যিক মজুত পাওয়া গেলে তেলক্ষেত্রে ২০ বছর এবং গ্যাসক্ষেত্রে ২৫ বছর উৎপাদনের সুযোগ থাকবে। প্রয়োজনে আরও ১০ বছর বাড়ানো যাবে।
গভীর সমুদ্রের প্রকল্পগুলো যে ব্যয়বহুল ও জটিল, সেটিও চুক্তিতে স্বীকার করা হয়েছে। তাই গভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনা জমা দেওয়ার সময়সীমা অগভীর ব্লকের তুলনায় দ্বিগুণ রাখা হয়েছে।
গ্যাসের দাম আর স্থির নয়
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে। আগে গ্যাসের দাম স্থির ছিল। এখন সেটি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
অগভীর সমুদ্রে গ্যাসের দাম হবে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের তিন মাসের গড়মূল্যের ১০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গভীর সমুদ্রে ১১ শতাংশ। তবে দাম পুরোপুরি উন্মুক্ত নয়। একটি সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমা থাকবে, যা গত পাঁচ বছরের ব্রেন্ট ক্রডের দামের ভিত্তিতে প্রতি বছর নির্ধারণ করা হবে।
উদাহরণ হিসেবে, ব্রেন্টের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলার হয়, তাহলে গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম দাঁড়াবে প্রতি হাজার ঘনফুটে প্রায় ৮ দশমিক ৮ ডলার। আগের পিএসসিতে এই দাম ছিল ৭ দশমিক ২৫ ডলার। অর্থাৎ, নতুন চুক্তিতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য আর্থিক প্রণোদনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মুনাফা ভাগের নতুন হিসাব
আগের চুক্তিতে উৎপাদন বাড়লে সরকারের অংশও বাড়ত। নতুন পিএসসিতে এসেছে R-factor ভিত্তিক পদ্ধতি। এখানে কোম্পানির আয় ও ব্যয়ের অনুপাত অনুযায়ী মুনাফা ভাগ নির্ধারণ হবে।
কোম্পানির আয় যদি ব্যয়ের দেড় গুণের কম হয়, তাহলে অগভীর সমুদ্রে পেট্রোবাংলা পাবে ৪০ শতাংশ এবং গভীর সমুদ্রে ৩৫ শতাংশ। আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের অংশও বাড়বে। আয় যদি ব্যয়ের তিনগুণ ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সরকারের অংশ অগভীর সমুদ্রে ৬৫ শতাংশ এবং গভীর সমুদ্রে ৬০ শতাংশে পৌঁছাবে।
এখানে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আরেকটি বিশেষ প্রণোদনাও দেওয়া হয়েছে। কোনো কূপ খনন করে গ্যাস না পাওয়া গেলে এবং কোম্পানি আবার অনুসন্ধানে যেতে রাজি হলে তাদের মুনাফার অংশ সামান্য বাড়বে। অর্থাৎ, ঝুঁকি নেওয়ার জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তবে এই ব্যবস্থার সমালোচনাও আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম বহুবার সতর্ক করে বলেছেন, কস্ট রিকভারি ব্যবস্থায় বিদেশি কোম্পানিগুলো অনেক সময় ব্যয় ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখায়। অতীতে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
নতুন চুক্তিতে ব্যয় পুনরুদ্ধারের সর্বোচ্চ সীমা ৭৫ শতাংশে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটি কার্যকর করতে কঠোর অডিটই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
পাইপলাইন বানাবে কোম্পানি, মালিক হবে রাষ্ট্র
গ্যাস পাওয়া গেলে সেটি পরিবহনের জন্য পাইপলাইন নির্মাণ করতে পারবে কোম্পানি। তবে পাইপলাইনের মালিকানা থাকবে পেট্রোবাংলার হাতে।
আগে পরিবহন ট্যারিফ নিয়ে বিদেশি কোম্পানিগুলোর বড় আপত্তি ছিল। এবার সেই হার নির্দিষ্ট না রেখে আলোচনা সাপেক্ষে নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। মজুতের পরিমাণ, দূরত্ব ও পানির গভীরতার মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কথাও মাথায় রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে পাইপলাইনের বদলে এলএনজি বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে গ্যাস পরিবহন লাভজনক হলে সেটির সুযোগও রাখা হয়েছে।
বাধ্যতামূলক ব্যাংক গ্যারান্টি
চুক্তি সইয়ের ৩০ দিনের মধ্যে কোম্পানিকে ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে। ভূতাত্ত্বিক জরিপের জন্য ৩০ লাখ ডলার এবং কূপ খননের জন্য ২ কোটি ডলারের গ্যারান্টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এ ছাড়া গ্যাসের বাণিজ্যিক মজুত পাওয়া গেলে আবিষ্কার বোনাস দিতে হবে। উৎপাদন বাড়লে ধাপে ধাপে অতিরিক্ত বোনাসও দিতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অর্থ ব্যয় পুনরুদ্ধারের আওতায় পড়বে না। অর্থাৎ, এটি সরাসরি পেট্রোবাংলার আয় হবে।
স্থানীয় কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণে জোর
নতুন পিএসসিতে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বাধ্যবাধকতা ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত ১০ শতাংশ বাংলাদেশি কর্মী রাখতে হবে। উৎপাদনের ১০ বছর পর এই হার ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিদেশি কর্মী নিয়োগে পেট্রোবাংলার অনুমোদন লাগবে। স্থানীয় ঠিকাদার ও দেশীয় সরঞ্জাম ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রশিক্ষণে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের শর্ত রাখা হয়েছে। কর্মী প্রশিক্ষণে কোম্পানিকে প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা কস্ট রিকভারির আওতায় আসবে না।
পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর অবস্থান
চুক্তিতে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ড্রিলিংয়ের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তেল বা গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও আগে থেকেই জমা দিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুন্দরবন ও অন্যান্য পরিবেশগতভাবে স্পর্শকাতর এলাকায় সরাসরি কার্যক্রম কার্যত নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।
সালিশ হবে সিঙ্গাপুরে
বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে বিরোধ নিষ্পত্তির স্থান হিসেবে রাখা হয়েছে সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আর্বিট্রেশন সেন্টারকে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি পরিচিত ও নিরপেক্ষ মঞ্চ।
তবে এর ঝুঁকিও আছে। আন্তর্জাতিক সালিশে হেরে গেলে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বিশাল হতে পারে। পাকিস্তানের রেকো দিক প্রকল্প কিংবা নাইজেরিয়ার পিঅ্যান্ডআইডি মামলায় দেখা গেছে, তুলনামূলক ছোট বিনিয়োগ থেকেও বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ গুনতে হয়েছে রাষ্ট্রকে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে এমন ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যা বদলায়নি
অনেক পরিবর্তনের পরও কিছু বিষয়ে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আগের মতোই রয়েছে। গ্যাস কেনার প্রথম অধিকার পেট্রোবাংলার। সব তথ্য ও সম্পদের মালিকানাও রাষ্ট্রের হাতে থাকবে। কোম্পানির মালিকানা বদলাতেও সরকারের অনুমোদন লাগবে।
শেষ প্রশ্ন
পিএসসি ২০২৬ আগের চেয়ে বেশি বিনিয়োগবান্ধব হয়েছে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতাও এতে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করেন তারা। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কি যথেষ্ট?
কারণ, সমুদ্রের গ্যাস খুঁজে উৎপাদনে আনতে সাধারণত সাত থেকে ১০ বছর লেগে যায়। অথচ বাংলাদেশের বিদ্যমান গ্যাস মজুত দ্রুত কমছে। ফলে সফল বিডিং হলেও নতুন গ্যাস হাতে পাওয়ার আগেই দেশীয় মজুতে চাপ আরও বাড়তে পারে।
এখন নজর নভেম্বরের বিড বাক্সে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলো শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সমুদ্রকে কতটা সম্ভাবনাময় মনে করে, সেটিই নির্ধারণ করবে পিএসসি ২০২৬-এর প্রকৃত সাফল্য।

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন গতি আনার লক্ষ্যে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে অফশোর বিডিং রাউন্ডের দরপত্র আহ্বান করেছে সরকার। দীর্ঘ বিরতির পর শুরু হওয়া এই উদ্যোগকে শুধু একটি জ্বালানি প্রকল্প নয়, বরং ক্রমবর্ধমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের বড় কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তবে বিদেশি কোম্পানিগুলো আদৌ আগ্রহ দেখাবে কি না, সেটি অনেকটাই নির্ভর করছে নতুন প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট বা পিএসসি ২০২৬-এর শর্তগুলোর ওপর। পেট্রোবাংলার ১৩৩ পৃষ্ঠার এই খসড়া চুক্তিতে গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, গভীর সমুদ্রে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে মুনাফা বণ্টনের কাঠামো শিথিল করা হয়েছে, আবার পরিবেশ সুরক্ষা ও রাষ্ট্রের মালিকানাও জোরালোভাবে ধরে রাখা হয়েছে।
কে বিড করবে–সেই প্রশ্নের চেয়ে নতুন শর্তগুলো বাংলাদেশের জন্য কতটা লাভজনক ও টেকসই হবে, সেটিই জ্বালানি বিশ্লেষকদের কাছে হয়ে উঠেছে মূল আলোচনার বিষয়।
অনুসন্ধানে দীর্ঘ সময়, গভীর সমুদ্রে বাড়তি সুবিধা
নতুন চুক্তি অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি সর্বোচ্চ নয় বছর অনুসন্ধান চালাতে পারবে। প্রথম ধাপে থাকবে ছয় বছর। এর মধ্যে প্রথম চার বছর মূলত ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও তথ্য সংগ্রহের জন্য। পরে কূপ খননের সিদ্ধান্ত নিলে অতিরিক্ত সময় পাওয়া যাবে। প্রথম ধাপ শেষে আরও তিন বছর বাড়ানোর সুযোগও রাখা হয়েছে।
একবার বাণিজ্যিক মজুত পাওয়া গেলে তেলক্ষেত্রে ২০ বছর এবং গ্যাসক্ষেত্রে ২৫ বছর উৎপাদনের সুযোগ থাকবে। প্রয়োজনে আরও ১০ বছর বাড়ানো যাবে।
গভীর সমুদ্রের প্রকল্পগুলো যে ব্যয়বহুল ও জটিল, সেটিও চুক্তিতে স্বীকার করা হয়েছে। তাই গভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনা জমা দেওয়ার সময়সীমা অগভীর ব্লকের তুলনায় দ্বিগুণ রাখা হয়েছে।
গ্যাসের দাম আর স্থির নয়
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে। আগে গ্যাসের দাম স্থির ছিল। এখন সেটি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
অগভীর সমুদ্রে গ্যাসের দাম হবে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের তিন মাসের গড়মূল্যের ১০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গভীর সমুদ্রে ১১ শতাংশ। তবে দাম পুরোপুরি উন্মুক্ত নয়। একটি সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমা থাকবে, যা গত পাঁচ বছরের ব্রেন্ট ক্রডের দামের ভিত্তিতে প্রতি বছর নির্ধারণ করা হবে।
উদাহরণ হিসেবে, ব্রেন্টের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলার হয়, তাহলে গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম দাঁড়াবে প্রতি হাজার ঘনফুটে প্রায় ৮ দশমিক ৮ ডলার। আগের পিএসসিতে এই দাম ছিল ৭ দশমিক ২৫ ডলার। অর্থাৎ, নতুন চুক্তিতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য আর্থিক প্রণোদনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মুনাফা ভাগের নতুন হিসাব
আগের চুক্তিতে উৎপাদন বাড়লে সরকারের অংশও বাড়ত। নতুন পিএসসিতে এসেছে R-factor ভিত্তিক পদ্ধতি। এখানে কোম্পানির আয় ও ব্যয়ের অনুপাত অনুযায়ী মুনাফা ভাগ নির্ধারণ হবে।
কোম্পানির আয় যদি ব্যয়ের দেড় গুণের কম হয়, তাহলে অগভীর সমুদ্রে পেট্রোবাংলা পাবে ৪০ শতাংশ এবং গভীর সমুদ্রে ৩৫ শতাংশ। আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের অংশও বাড়বে। আয় যদি ব্যয়ের তিনগুণ ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সরকারের অংশ অগভীর সমুদ্রে ৬৫ শতাংশ এবং গভীর সমুদ্রে ৬০ শতাংশে পৌঁছাবে।
এখানে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আরেকটি বিশেষ প্রণোদনাও দেওয়া হয়েছে। কোনো কূপ খনন করে গ্যাস না পাওয়া গেলে এবং কোম্পানি আবার অনুসন্ধানে যেতে রাজি হলে তাদের মুনাফার অংশ সামান্য বাড়বে। অর্থাৎ, ঝুঁকি নেওয়ার জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তবে এই ব্যবস্থার সমালোচনাও আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম বহুবার সতর্ক করে বলেছেন, কস্ট রিকভারি ব্যবস্থায় বিদেশি কোম্পানিগুলো অনেক সময় ব্যয় ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখায়। অতীতে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
নতুন চুক্তিতে ব্যয় পুনরুদ্ধারের সর্বোচ্চ সীমা ৭৫ শতাংশে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটি কার্যকর করতে কঠোর অডিটই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
পাইপলাইন বানাবে কোম্পানি, মালিক হবে রাষ্ট্র
গ্যাস পাওয়া গেলে সেটি পরিবহনের জন্য পাইপলাইন নির্মাণ করতে পারবে কোম্পানি। তবে পাইপলাইনের মালিকানা থাকবে পেট্রোবাংলার হাতে।
আগে পরিবহন ট্যারিফ নিয়ে বিদেশি কোম্পানিগুলোর বড় আপত্তি ছিল। এবার সেই হার নির্দিষ্ট না রেখে আলোচনা সাপেক্ষে নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। মজুতের পরিমাণ, দূরত্ব ও পানির গভীরতার মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কথাও মাথায় রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে পাইপলাইনের বদলে এলএনজি বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে গ্যাস পরিবহন লাভজনক হলে সেটির সুযোগও রাখা হয়েছে।
বাধ্যতামূলক ব্যাংক গ্যারান্টি
চুক্তি সইয়ের ৩০ দিনের মধ্যে কোম্পানিকে ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে। ভূতাত্ত্বিক জরিপের জন্য ৩০ লাখ ডলার এবং কূপ খননের জন্য ২ কোটি ডলারের গ্যারান্টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এ ছাড়া গ্যাসের বাণিজ্যিক মজুত পাওয়া গেলে আবিষ্কার বোনাস দিতে হবে। উৎপাদন বাড়লে ধাপে ধাপে অতিরিক্ত বোনাসও দিতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অর্থ ব্যয় পুনরুদ্ধারের আওতায় পড়বে না। অর্থাৎ, এটি সরাসরি পেট্রোবাংলার আয় হবে।
স্থানীয় কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণে জোর
নতুন পিএসসিতে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বাধ্যবাধকতা ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত ১০ শতাংশ বাংলাদেশি কর্মী রাখতে হবে। উৎপাদনের ১০ বছর পর এই হার ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিদেশি কর্মী নিয়োগে পেট্রোবাংলার অনুমোদন লাগবে। স্থানীয় ঠিকাদার ও দেশীয় সরঞ্জাম ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রশিক্ষণে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের শর্ত রাখা হয়েছে। কর্মী প্রশিক্ষণে কোম্পানিকে প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা কস্ট রিকভারির আওতায় আসবে না।
পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর অবস্থান
চুক্তিতে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ড্রিলিংয়ের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তেল বা গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও আগে থেকেই জমা দিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুন্দরবন ও অন্যান্য পরিবেশগতভাবে স্পর্শকাতর এলাকায় সরাসরি কার্যক্রম কার্যত নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।
সালিশ হবে সিঙ্গাপুরে
বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে বিরোধ নিষ্পত্তির স্থান হিসেবে রাখা হয়েছে সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আর্বিট্রেশন সেন্টারকে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি পরিচিত ও নিরপেক্ষ মঞ্চ।
তবে এর ঝুঁকিও আছে। আন্তর্জাতিক সালিশে হেরে গেলে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বিশাল হতে পারে। পাকিস্তানের রেকো দিক প্রকল্প কিংবা নাইজেরিয়ার পিঅ্যান্ডআইডি মামলায় দেখা গেছে, তুলনামূলক ছোট বিনিয়োগ থেকেও বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ গুনতে হয়েছে রাষ্ট্রকে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে এমন ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যা বদলায়নি
অনেক পরিবর্তনের পরও কিছু বিষয়ে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আগের মতোই রয়েছে। গ্যাস কেনার প্রথম অধিকার পেট্রোবাংলার। সব তথ্য ও সম্পদের মালিকানাও রাষ্ট্রের হাতে থাকবে। কোম্পানির মালিকানা বদলাতেও সরকারের অনুমোদন লাগবে।
শেষ প্রশ্ন
পিএসসি ২০২৬ আগের চেয়ে বেশি বিনিয়োগবান্ধব হয়েছে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতাও এতে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করেন তারা। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কি যথেষ্ট?
কারণ, সমুদ্রের গ্যাস খুঁজে উৎপাদনে আনতে সাধারণত সাত থেকে ১০ বছর লেগে যায়। অথচ বাংলাদেশের বিদ্যমান গ্যাস মজুত দ্রুত কমছে। ফলে সফল বিডিং হলেও নতুন গ্যাস হাতে পাওয়ার আগেই দেশীয় মজুতে চাপ আরও বাড়তে পারে।
এখন নজর নভেম্বরের বিড বাক্সে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলো শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সমুদ্রকে কতটা সম্ভাবনাময় মনে করে, সেটিই নির্ধারণ করবে পিএসসি ২০২৬-এর প্রকৃত সাফল্য।