হুমায়ুন কবির

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের মাধ্যমে ফের ক্ষমতায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এই জয় পেয়েছে।
বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, দলটি মোট ভোটের দুই-তৃতীয়াংশ আসন লাভ করেছে। তারেক রহমান বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া (যিনি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মারা যান) এবং বাংলাদেশের ষষ্ঠ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেলে।
এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো একটি ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এটিই বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচন। ওই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক নির্বাচনের দুই মাস আগে বাংলাদেশে এক গবেষণা সফরে গিয়ে আমি মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্পষ্ট অনিশ্চয়তা লক্ষ্য করেছি। রাস্তার ধারের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত কফিশপ পর্যন্ত সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশের অনিশ্চিত গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ এবং ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান পুনরুত্থান।
একটি প্রচলিত ধারণা ছিল যে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ‘নতুন বাংলাদেশ’ নিয়ে যে আশা ও স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, তা যেন ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে।
এই অনিশ্চয়তার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও রয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল ছিল অত্যন্ত অস্থিতিশীল।

মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির ঘটনা, অভ্যুত্থানের একজন বিশিষ্ট নেতার হত্যাকাণ্ড, সংবাদপত্রের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ, হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংস নিপীড়ন এবং সুফি মাজারগুলোতে হামলার মতো ঘটনাগুলো অনেক বাংলাদেশিকে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত করে তুলেছে।
বিগত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশ শাসন করা দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের এই নিরঙ্কুশ বিজয় ছিল অনুমেয়। উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তীসরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।
সবচাইতে বিস্ময়কর বিষয় হলো জামায়াতে ইসলামীর উত্থান, যারা সংসদে ৬৮টি আসন (জোটসহ ৭৭টি) নিশ্চিত করেছে। নির্বাচনে এই সাফল্য তাদের রাজনৈতিক প্রান্তিকতা থেকে একদম সামনের সারিতে নিয়ে এসেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য কোন গতিপথ নির্ধারণ করছে? অনেক দিক থেকে এই নির্বাচন ধারাবাহিকতা এবং বিচ্ছেদ—উভয়কেই প্রতিনিধিত্ব করে; যা কিছু ক্ষেত্রে একেবারেই নতুন, আবার কিছু ক্ষেত্রে বেশ পরিচিত।
প্রথমত, এই নির্বাচনটি তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম মানুষ তুলনামূলকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশে তাদের ভোট দিতে পেরেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো ব্যাপকভাবে কারচুপি ও ভীতি প্রদর্শনের কারণে অবাধ বা সুষ্ঠু হিসেবে বিবেচিত হয়নি।
তবে বিএনপি এবং বিরোধী দলগুলোও সাম্প্রতিক এই নির্বাচনে কিছু অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে।
২০২৬ সালের এই নির্বাচনটি জুলাই জাতীয় সনদের ওপর একটি গণভোট বা রেফারেন্ডাম হিসেবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এই সনদে ৮৪টি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল।
এই প্রস্তাবগুলোর জটিলতা এবং সাধারণ মানুষের বোঝার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, বিপুল সংখ্যক ভোটার এই সনদকে সমর্থন করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ৬২ শতাংশেরও বেশি ভোটার এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন, যেখানে বিপক্ষে ভোট পড়েছে ২৯ শতাংশ।
এই সনদে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে— দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন তদারকির জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের প্রসার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ। যেহেতু জনগণ এই সনদের পক্ষে ভোট দিয়েছে, তাই নতুন সরকার এখন এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে বাধ্য।

দ্বিতীয়ত, এই নির্বাচন জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের ভিত্তি এবং সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়িয়ে দলটিকে শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশে ইসলামপন্থী দলগুলোর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মূলত তিনটি ধারায় বিভক্ত: জামায়াতে ইসলামী, সুফি ঘরানার দল এবং দেওবন্দী মাদ্রাসা-কেন্দ্রিক দল। এর আগে তাদের নির্বাচনী সাফল্য খুব একটা উল্লেখযোগ্য ছিল না।
দেশের ইতিহাসে এই প্রথম প্রধান ইসলামপন্থী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে। দলটির সমর্থক গোষ্ঠী মূলত শহর ও গ্রামের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নিয়ে গঠিত।
ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দলগুলো এককভাবে বড় কোনো নির্বাচনী শক্তি হওয়ার বদলে সবসময় কিং-মেকার হিসেবে কাজ করেছে এবং স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখযোগ্য ভোট পেতে হিমশিম খেয়েছে। এখন প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী সম্ভবত ধর্মভিত্তিক নীতি নির্ধারণের জন্য আরও জোরালো দাবি তুলবে। দলটি শাসনব্যবস্থা এবং জনজীবনে ইসলামের ভূমিকা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিভিন্ন নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তৃতীয়ত, জুলাই অভ্যুত্থান ‘জেন-জি’ এবং তরুণ নেতাদের একটি নতুন দল তৈরি করেছিল, যারা স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিল। অবশ্য, এনসিপি নামের দলটির নির্বাচনে সাফল্য ছিল অত্যন্ত সীমিত।
এর প্রধান কারণ ছিল জামায়াতে ইসলামীর সাথে তাদের জোটবদ্ধ হওয়া এবং এই কৌশলগত সিদ্ধান্তের বিষয়ে দলের নেতৃত্বের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভাজন। ফলে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর জোটের অধীনে এনসিপি প্রার্থীরা মাত্র ছয়টি আসন নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।
যেখানে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক প্রান্তিকতা থেকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে উঠে আসতে সফল হয়েছে, সেখানে এনসিপি এবং এর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক উল্টোটি, তারা সামনের সারির রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে প্রান্তিক পর্যায়ে চলে গেছে।

উল্লেখ্য যে, তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে ১৭ বছরের স্বেচ্ছায় নির্বাসন শেষে বাংলাদেশে ফিরেছেন। তিনি দুর্নীতি এবং ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগের সম্মুখীন হয়েছেন (যে হামলায় ২৪ জন নিহত এবং অন্তত ৩০০ জন আহত হয়েছিলেন)।
যদিও তিনি এই অভিযোগগুলো থেকে খালাস পেয়েছেন, তবুও দলের অভ্যন্তরীণ চর্চায় সংস্কার আনা এবং দলটিকে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির কলঙ্ক থেকে দূরে রাখা তার একটি চ্যালেঞ্জ হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রায়শই সংখ্যাগরিষ্ঠের আদর্শিক বয়ান দ্বারা প্রভাবিত হয়। দেশটিতে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো ধর্মনিরপেক্ষ-উদারবাদী আদর্শের উপাদানগুলোকে প্রতিরোধের মাধ্যমে পুনরায় প্রভাব ফিরে পেয়েছে। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ থেকে ‘বহুত্ববাদ’-এ এই স্থানান্তরকে কিছু পর্যবেক্ষক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে তুষ্ট করার একটি উপায় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাই নতুন সরকারের জন্য প্রকৃত বহুত্ববাদ এবং অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা একটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
২০২৬ সালের এই নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হওয়া কিছু অনিশ্চয়তা দূর করতে সাহায্য করেছে। যদি নতুন বিএনপি সরকার ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করে, তবে এটি একটি স্থিতিশীল এবং কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।
তবে, এই নির্বাচন এমন এক প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্বকে পুনরায় ক্ষমতায় বসিয়েছে, যাদের অতীতের শাসনামল স্বজনপ্রীতি, লুটপাটতন্ত্র, দুর্নীতি এবং চাঁদাবাজির জন্য পরিচিত ছিল।
লেখক: কানাডার থম্পসন রিভার্স ইউনিভার্সিটির পরিবেশ, সংস্কৃতি ও সমাজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক
নিবন্ধটি দ্য কনভারসেশন থেকে অনূদিত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের মাধ্যমে ফের ক্ষমতায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এই জয় পেয়েছে।
বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, দলটি মোট ভোটের দুই-তৃতীয়াংশ আসন লাভ করেছে। তারেক রহমান বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া (যিনি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মারা যান) এবং বাংলাদেশের ষষ্ঠ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেলে।
এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো একটি ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এটিই বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচন। ওই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক নির্বাচনের দুই মাস আগে বাংলাদেশে এক গবেষণা সফরে গিয়ে আমি মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্পষ্ট অনিশ্চয়তা লক্ষ্য করেছি। রাস্তার ধারের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত কফিশপ পর্যন্ত সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশের অনিশ্চিত গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ এবং ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান পুনরুত্থান।
একটি প্রচলিত ধারণা ছিল যে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ‘নতুন বাংলাদেশ’ নিয়ে যে আশা ও স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, তা যেন ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে।
এই অনিশ্চয়তার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও রয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল ছিল অত্যন্ত অস্থিতিশীল।

মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির ঘটনা, অভ্যুত্থানের একজন বিশিষ্ট নেতার হত্যাকাণ্ড, সংবাদপত্রের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ, হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংস নিপীড়ন এবং সুফি মাজারগুলোতে হামলার মতো ঘটনাগুলো অনেক বাংলাদেশিকে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত করে তুলেছে।
বিগত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশ শাসন করা দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের এই নিরঙ্কুশ বিজয় ছিল অনুমেয়। উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তীসরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।
সবচাইতে বিস্ময়কর বিষয় হলো জামায়াতে ইসলামীর উত্থান, যারা সংসদে ৬৮টি আসন (জোটসহ ৭৭টি) নিশ্চিত করেছে। নির্বাচনে এই সাফল্য তাদের রাজনৈতিক প্রান্তিকতা থেকে একদম সামনের সারিতে নিয়ে এসেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য কোন গতিপথ নির্ধারণ করছে? অনেক দিক থেকে এই নির্বাচন ধারাবাহিকতা এবং বিচ্ছেদ—উভয়কেই প্রতিনিধিত্ব করে; যা কিছু ক্ষেত্রে একেবারেই নতুন, আবার কিছু ক্ষেত্রে বেশ পরিচিত।
প্রথমত, এই নির্বাচনটি তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম মানুষ তুলনামূলকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশে তাদের ভোট দিতে পেরেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো ব্যাপকভাবে কারচুপি ও ভীতি প্রদর্শনের কারণে অবাধ বা সুষ্ঠু হিসেবে বিবেচিত হয়নি।
তবে বিএনপি এবং বিরোধী দলগুলোও সাম্প্রতিক এই নির্বাচনে কিছু অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে।
২০২৬ সালের এই নির্বাচনটি জুলাই জাতীয় সনদের ওপর একটি গণভোট বা রেফারেন্ডাম হিসেবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এই সনদে ৮৪টি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল।
এই প্রস্তাবগুলোর জটিলতা এবং সাধারণ মানুষের বোঝার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, বিপুল সংখ্যক ভোটার এই সনদকে সমর্থন করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ৬২ শতাংশেরও বেশি ভোটার এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন, যেখানে বিপক্ষে ভোট পড়েছে ২৯ শতাংশ।
এই সনদে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে— দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন তদারকির জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের প্রসার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ। যেহেতু জনগণ এই সনদের পক্ষে ভোট দিয়েছে, তাই নতুন সরকার এখন এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে বাধ্য।

দ্বিতীয়ত, এই নির্বাচন জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের ভিত্তি এবং সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়িয়ে দলটিকে শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশে ইসলামপন্থী দলগুলোর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মূলত তিনটি ধারায় বিভক্ত: জামায়াতে ইসলামী, সুফি ঘরানার দল এবং দেওবন্দী মাদ্রাসা-কেন্দ্রিক দল। এর আগে তাদের নির্বাচনী সাফল্য খুব একটা উল্লেখযোগ্য ছিল না।
দেশের ইতিহাসে এই প্রথম প্রধান ইসলামপন্থী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে। দলটির সমর্থক গোষ্ঠী মূলত শহর ও গ্রামের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নিয়ে গঠিত।
ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দলগুলো এককভাবে বড় কোনো নির্বাচনী শক্তি হওয়ার বদলে সবসময় কিং-মেকার হিসেবে কাজ করেছে এবং স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখযোগ্য ভোট পেতে হিমশিম খেয়েছে। এখন প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী সম্ভবত ধর্মভিত্তিক নীতি নির্ধারণের জন্য আরও জোরালো দাবি তুলবে। দলটি শাসনব্যবস্থা এবং জনজীবনে ইসলামের ভূমিকা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিভিন্ন নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তৃতীয়ত, জুলাই অভ্যুত্থান ‘জেন-জি’ এবং তরুণ নেতাদের একটি নতুন দল তৈরি করেছিল, যারা স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিল। অবশ্য, এনসিপি নামের দলটির নির্বাচনে সাফল্য ছিল অত্যন্ত সীমিত।
এর প্রধান কারণ ছিল জামায়াতে ইসলামীর সাথে তাদের জোটবদ্ধ হওয়া এবং এই কৌশলগত সিদ্ধান্তের বিষয়ে দলের নেতৃত্বের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভাজন। ফলে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর জোটের অধীনে এনসিপি প্রার্থীরা মাত্র ছয়টি আসন নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।
যেখানে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক প্রান্তিকতা থেকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে উঠে আসতে সফল হয়েছে, সেখানে এনসিপি এবং এর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক উল্টোটি, তারা সামনের সারির রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে প্রান্তিক পর্যায়ে চলে গেছে।

উল্লেখ্য যে, তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে ১৭ বছরের স্বেচ্ছায় নির্বাসন শেষে বাংলাদেশে ফিরেছেন। তিনি দুর্নীতি এবং ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগের সম্মুখীন হয়েছেন (যে হামলায় ২৪ জন নিহত এবং অন্তত ৩০০ জন আহত হয়েছিলেন)।
যদিও তিনি এই অভিযোগগুলো থেকে খালাস পেয়েছেন, তবুও দলের অভ্যন্তরীণ চর্চায় সংস্কার আনা এবং দলটিকে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির কলঙ্ক থেকে দূরে রাখা তার একটি চ্যালেঞ্জ হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রায়শই সংখ্যাগরিষ্ঠের আদর্শিক বয়ান দ্বারা প্রভাবিত হয়। দেশটিতে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো ধর্মনিরপেক্ষ-উদারবাদী আদর্শের উপাদানগুলোকে প্রতিরোধের মাধ্যমে পুনরায় প্রভাব ফিরে পেয়েছে। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ থেকে ‘বহুত্ববাদ’-এ এই স্থানান্তরকে কিছু পর্যবেক্ষক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে তুষ্ট করার একটি উপায় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাই নতুন সরকারের জন্য প্রকৃত বহুত্ববাদ এবং অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা একটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
২০২৬ সালের এই নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হওয়া কিছু অনিশ্চয়তা দূর করতে সাহায্য করেছে। যদি নতুন বিএনপি সরকার ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করে, তবে এটি একটি স্থিতিশীল এবং কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।
তবে, এই নির্বাচন এমন এক প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্বকে পুনরায় ক্ষমতায় বসিয়েছে, যাদের অতীতের শাসনামল স্বজনপ্রীতি, লুটপাটতন্ত্র, দুর্নীতি এবং চাঁদাবাজির জন্য পরিচিত ছিল।
লেখক: কানাডার থম্পসন রিভার্স ইউনিভার্সিটির পরিবেশ, সংস্কৃতি ও সমাজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক
নিবন্ধটি দ্য কনভারসেশন থেকে অনূদিত