চরচা ডেস্ক

বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ বা আনুমানিক ৩৪০ কোটি মানুষের নিরাপদ ও উপযুক্ত আবাসন সুবিধা নেই। দশকের পর দশক ধরে আবাসন খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, তীব্র নগরায়ণ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতিরই চূড়ান্ত ফল হলো আজকের এই বৈশ্বিক আবাসন সংকট।
সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড সিটিজ রিপোর্ট ২০২৬’-এ এসব কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বাসস্থান এমন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত, যা প্রায়ই বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্যান্য পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। এর মধ্যে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ বাস করছেন বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক বসতি ও বস্তিতে, যেখানে নেই কোনো স্থায়ী মালিকানা। যেখানে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, পরিবেশগত ঝুঁকি ও মৌলিক নাগরিক সুবিধার তীব্র অভাব রয়েছে। আবাসনকে আন্তর্জাতিকভাবে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, এই সংকট নিরসনে অগ্রগতি এখনো অত্যন্ত হতাশাজনক।

ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানুষের জীবিকা ও সামাজিক মর্যাদাকে হুমকিতে ফেলে ২০০৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ মানুষকে তাদের বাসস্থান থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে। যা তাদের নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার ওপর মারাত্মক আঘাত হেনেছে। একই সাথে যুদ্ধ, সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে প্রতি বছর লাখো মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু বা বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হচ্ছে।
আয়ের তুলনায় আকাশচুম্বী আবাসন ব্যয়
এই আবাসন সংকট প্রকট হওয়ার পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো আয়ের চেয়ে বাড়ির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়া। বিশ্বব্যাপী ঘরবাড়ির দাম যেভাবে বাড়ছে, মানুষের আয় সেই হারে না বাড়ায় মধ্য ও নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলোর জন্য নিজের একটা ফ্ল্যাট বা বাড়ির মালিক হওয়া ক্রমেই আকাশকুসুম কল্পনা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আবাসন সাধ্যের পরিমাপ করা হয় ‘প্রাইস-টু-ইনকাম রেশিও’ (আয়ের অনুপাতে বাড়ির দাম) দিয়ে। অর্থাৎ একটি পরিবারের গড় আয়ের তুলনায় ঘরের গড় দাম কত বেশি। বিশ্বব্যাপী এই অনুপাত ২০১০ সালের ৯.৩ থেকে লাফিয়ে ২০২৩ সালে ১১.২-এ দাঁড়িয়েছে, আর সেন্ট্রাল ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এই চাপ সবচেয়ে মারাত্মক, যেখানে এই অনুপাত ১৬.৮-এ পৌঁছে গেছে। উচ্চ মূল্যের কারণে মানুষ যখন বাড়ি কিনতে পারছে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে ভাড়ার চাপ।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিবার তাদের মোট আয়ের ৩০ শতাংশের বেশি টাকা শুধু বাসা ভাড়ার পেছনেই খরচ করে ফেলছে। এর বাইরে গৃহহীনতাও বিশ্বজুড়ে এক বড় ক্ষত হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পরিসংখ্যান বলছে যে প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ২০ জন এবং চীনে ২১ জন মানুষ সম্পূর্ণ গৃহহীন।
উৎপাদন ক্ষমতা, নির্মাণ খরচ ও ঋণের বৈষম্য
সংকটের পেছনে নির্মাণ খরচ ও সরবরাহ ব্যবস্থার বৈষম্যসহ ভূমির উচ্চ মূল্য ও আবাসন ঋণের অভাবও বড় ভূমিকা রাখছে। জমির দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া এবং রড-সিমেন্টসহ নির্মাণ সামগ্রীর আকাশচুম্বী খরচের কারণে নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য বাসস্থান তৈরি করা আর্থিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ছে। অবশ্য চীন বা বড় দেশগুলো তাদের বিশাল উৎপাদন ক্ষমতার কারণে প্রতি বর্গমিটারে নির্মাণ খরচ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেও শাদ, জাম্বিয়া বা ঘানার মতো আফ্রিকান দেশগুলোতে অনানুষ্ঠানিক সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) এবং দুর্বল নির্মাণ শিল্পের কারণে বাড়ি তৈরির খরচ অনেক বেশি। এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধকী ব্যবস্থা বা সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ পাওয়ার সুযোগও অত্যন্ত সীমিত।
আবাসন নীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ঐতিহাসিকভাবে দেখলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটার পর তীব্র বৈশ্বিক আবাসন সংকট এবং যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও সংস্থা-যেমন ব্রিটিশ কলোনিয়াল অফিস, হাউজিং অ্যান্ড হোম ফাইন্যান্স এজেন্সি, ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট-আন্তর্জাতিক আবাসন নীতি নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করতে শুরু করে, যার প্রভাব আজও রয়ে গেছে।

জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এই বিষয়ে প্রভাবশালী পরামর্শক হয়ে ওঠে। যদিও শুরুতে অনেক দেশ সরকারি উদ্যোগে আবাসন নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ করেছিল, কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই মডেলটিকে খুব একটা সমর্থন করেনি। উল্টো তারা যুক্তি দিয়েছিল যে, সদ্য স্বাধীন হওয়া এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশগুলোর জন্য সরকারি আবাসন তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই তারা সরকারি বাসস্থানের পরিবর্তে ‘সহায়তাভিত্তিক স্বনির্ভরতা’ (যেখানে পরিবারগুলো নিজেরা নিজেদের বাড়ি তৈরি বা মেরামত করে) এবং আবাসন খাতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে, যা বর্তমান সংকটের কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও ভবিষ্যৎ নগরীর রূপরেখা
ভবিষ্যতের জন্য বড় উদ্বেগ হলো, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আবাসন ঝুঁকি। ওয়ার্ল্ড সিটিজ রিপোর্টে আশঙ্কা করা হয়েছে যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৬ কোটি ৭০ লাখ বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যাবে। কেবল ২০২৩ সালেই বিভিন্ন বিপর্যয়ের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ২৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, যার বেশির ভাগেরই কোনো বীমা করা ছিল না। দ্রুত বর্ধনশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ নগর এলাকাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার গতি যদি বাড়ানো না হয়, তবে শহর ও জনবসতি ক্রমান্বয়ে আরও চরম বিপদের মুখে পড়বে। তবে এই জলবায়ু সংকটের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়বে না।

অনানুষ্ঠানিক বসতি বা বস্তি এবং নিম্ন-আয়ের মানুষগুলো, যাদের এই দুর্যোগ মোকাবিলা করার মতো প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা নেই, তারাই সবচেয়ে বেশি অসহায়। ফলে তাদের বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো আরও প্রকট হয়ে উঠছে এবং সমাজে আবাসন বৈষম্যকে আরও গভীর করছে।
এই সংকট এখনই শেষ হচ্ছে না, কারণ হিসাব অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের শহরগুলোতে আরও অতিরিক্ত ২০০ কোটি মানুষ যুক্ত হবে। তাই জাতিসংঘ স্পষ্ট জানিয়েছে যে, আবাসন সংকট নিরসনে কেবল বাজার ব্যবস্থার ওপর ভরসা করলেই চলবে না, বরং সাশ্রয়ী বাসস্থান নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
যদি এখনই সঠিক নগর পরিকল্পনা এবং সাশ্রয়ী আবাসন নীতিমালা নেওয়া না হয়, তবে আগামী দিনে শহরের ভূমি, অবকাঠামো এবং আবাসন ব্যবস্থার ওপর এই চাপ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
সমাধান হিসেবে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে যে, বস্তিগুলোকে শহরের বাইরে না সরিয়ে সেগুলোকে শহরেরই অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে নিয়ে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে হবে এবং একই সাথে ভবিষ্যৎ আবাসন ও নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করার সক্ষমতা যুক্ত করতে হবে।

বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ বা আনুমানিক ৩৪০ কোটি মানুষের নিরাপদ ও উপযুক্ত আবাসন সুবিধা নেই। দশকের পর দশক ধরে আবাসন খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, তীব্র নগরায়ণ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতিরই চূড়ান্ত ফল হলো আজকের এই বৈশ্বিক আবাসন সংকট।
সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড সিটিজ রিপোর্ট ২০২৬’-এ এসব কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বাসস্থান এমন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত, যা প্রায়ই বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্যান্য পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। এর মধ্যে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ বাস করছেন বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক বসতি ও বস্তিতে, যেখানে নেই কোনো স্থায়ী মালিকানা। যেখানে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, পরিবেশগত ঝুঁকি ও মৌলিক নাগরিক সুবিধার তীব্র অভাব রয়েছে। আবাসনকে আন্তর্জাতিকভাবে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, এই সংকট নিরসনে অগ্রগতি এখনো অত্যন্ত হতাশাজনক।

ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানুষের জীবিকা ও সামাজিক মর্যাদাকে হুমকিতে ফেলে ২০০৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ মানুষকে তাদের বাসস্থান থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে। যা তাদের নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার ওপর মারাত্মক আঘাত হেনেছে। একই সাথে যুদ্ধ, সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে প্রতি বছর লাখো মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু বা বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হচ্ছে।
আয়ের তুলনায় আকাশচুম্বী আবাসন ব্যয়
এই আবাসন সংকট প্রকট হওয়ার পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো আয়ের চেয়ে বাড়ির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়া। বিশ্বব্যাপী ঘরবাড়ির দাম যেভাবে বাড়ছে, মানুষের আয় সেই হারে না বাড়ায় মধ্য ও নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলোর জন্য নিজের একটা ফ্ল্যাট বা বাড়ির মালিক হওয়া ক্রমেই আকাশকুসুম কল্পনা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আবাসন সাধ্যের পরিমাপ করা হয় ‘প্রাইস-টু-ইনকাম রেশিও’ (আয়ের অনুপাতে বাড়ির দাম) দিয়ে। অর্থাৎ একটি পরিবারের গড় আয়ের তুলনায় ঘরের গড় দাম কত বেশি। বিশ্বব্যাপী এই অনুপাত ২০১০ সালের ৯.৩ থেকে লাফিয়ে ২০২৩ সালে ১১.২-এ দাঁড়িয়েছে, আর সেন্ট্রাল ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এই চাপ সবচেয়ে মারাত্মক, যেখানে এই অনুপাত ১৬.৮-এ পৌঁছে গেছে। উচ্চ মূল্যের কারণে মানুষ যখন বাড়ি কিনতে পারছে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে ভাড়ার চাপ।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিবার তাদের মোট আয়ের ৩০ শতাংশের বেশি টাকা শুধু বাসা ভাড়ার পেছনেই খরচ করে ফেলছে। এর বাইরে গৃহহীনতাও বিশ্বজুড়ে এক বড় ক্ষত হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পরিসংখ্যান বলছে যে প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ২০ জন এবং চীনে ২১ জন মানুষ সম্পূর্ণ গৃহহীন।
উৎপাদন ক্ষমতা, নির্মাণ খরচ ও ঋণের বৈষম্য
সংকটের পেছনে নির্মাণ খরচ ও সরবরাহ ব্যবস্থার বৈষম্যসহ ভূমির উচ্চ মূল্য ও আবাসন ঋণের অভাবও বড় ভূমিকা রাখছে। জমির দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া এবং রড-সিমেন্টসহ নির্মাণ সামগ্রীর আকাশচুম্বী খরচের কারণে নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য বাসস্থান তৈরি করা আর্থিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ছে। অবশ্য চীন বা বড় দেশগুলো তাদের বিশাল উৎপাদন ক্ষমতার কারণে প্রতি বর্গমিটারে নির্মাণ খরচ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেও শাদ, জাম্বিয়া বা ঘানার মতো আফ্রিকান দেশগুলোতে অনানুষ্ঠানিক সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) এবং দুর্বল নির্মাণ শিল্পের কারণে বাড়ি তৈরির খরচ অনেক বেশি। এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধকী ব্যবস্থা বা সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ পাওয়ার সুযোগও অত্যন্ত সীমিত।
আবাসন নীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ঐতিহাসিকভাবে দেখলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটার পর তীব্র বৈশ্বিক আবাসন সংকট এবং যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও সংস্থা-যেমন ব্রিটিশ কলোনিয়াল অফিস, হাউজিং অ্যান্ড হোম ফাইন্যান্স এজেন্সি, ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট-আন্তর্জাতিক আবাসন নীতি নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করতে শুরু করে, যার প্রভাব আজও রয়ে গেছে।

জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এই বিষয়ে প্রভাবশালী পরামর্শক হয়ে ওঠে। যদিও শুরুতে অনেক দেশ সরকারি উদ্যোগে আবাসন নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ করেছিল, কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই মডেলটিকে খুব একটা সমর্থন করেনি। উল্টো তারা যুক্তি দিয়েছিল যে, সদ্য স্বাধীন হওয়া এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশগুলোর জন্য সরকারি আবাসন তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই তারা সরকারি বাসস্থানের পরিবর্তে ‘সহায়তাভিত্তিক স্বনির্ভরতা’ (যেখানে পরিবারগুলো নিজেরা নিজেদের বাড়ি তৈরি বা মেরামত করে) এবং আবাসন খাতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে, যা বর্তমান সংকটের কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও ভবিষ্যৎ নগরীর রূপরেখা
ভবিষ্যতের জন্য বড় উদ্বেগ হলো, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আবাসন ঝুঁকি। ওয়ার্ল্ড সিটিজ রিপোর্টে আশঙ্কা করা হয়েছে যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৬ কোটি ৭০ লাখ বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যাবে। কেবল ২০২৩ সালেই বিভিন্ন বিপর্যয়ের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ২৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, যার বেশির ভাগেরই কোনো বীমা করা ছিল না। দ্রুত বর্ধনশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ নগর এলাকাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার গতি যদি বাড়ানো না হয়, তবে শহর ও জনবসতি ক্রমান্বয়ে আরও চরম বিপদের মুখে পড়বে। তবে এই জলবায়ু সংকটের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়বে না।

অনানুষ্ঠানিক বসতি বা বস্তি এবং নিম্ন-আয়ের মানুষগুলো, যাদের এই দুর্যোগ মোকাবিলা করার মতো প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা নেই, তারাই সবচেয়ে বেশি অসহায়। ফলে তাদের বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো আরও প্রকট হয়ে উঠছে এবং সমাজে আবাসন বৈষম্যকে আরও গভীর করছে।
এই সংকট এখনই শেষ হচ্ছে না, কারণ হিসাব অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের শহরগুলোতে আরও অতিরিক্ত ২০০ কোটি মানুষ যুক্ত হবে। তাই জাতিসংঘ স্পষ্ট জানিয়েছে যে, আবাসন সংকট নিরসনে কেবল বাজার ব্যবস্থার ওপর ভরসা করলেই চলবে না, বরং সাশ্রয়ী বাসস্থান নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
যদি এখনই সঠিক নগর পরিকল্পনা এবং সাশ্রয়ী আবাসন নীতিমালা নেওয়া না হয়, তবে আগামী দিনে শহরের ভূমি, অবকাঠামো এবং আবাসন ব্যবস্থার ওপর এই চাপ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
সমাধান হিসেবে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে যে, বস্তিগুলোকে শহরের বাইরে না সরিয়ে সেগুলোকে শহরেরই অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে নিয়ে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে হবে এবং একই সাথে ভবিষ্যৎ আবাসন ও নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করার সক্ষমতা যুক্ত করতে হবে।