Advertisement Banner

কিউবাতেও কি সরকার পতনের ‘পাঁয়তারা’ করছে আমেরিকা?

কিউবাতেও কি সরকার পতনের ‘পাঁয়তারা’ করছে আমেরিকা?
কিউবায় বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স

কিউবা বর্তমানে তার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে দেশব্যাপী বিদ্যুৎ বিপর্যয়, অন্যদিকে খাদ্যসংকট ও জনরোষ। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসনের গোয়েন্দা প্রধান জন র‍্যাটক্লিফের হাভানা সফর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল ও জল্পনার জন্ম দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ফলে সৃষ্ট জ্বালানি ঘাটতিতে কিউবার হাসপাতালগুলো স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারছে না। একই সঙ্গে স্কুল ও সরকারি অফিসও বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল ডিয়াজ-কানেল বলেছেন, সহায়তার প্রস্তাব দেওয়ার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি অবরোধ তুলে নেয়, তবে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি সম্ভব।

এমন পরিস্থিতিতে সিআইএর সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর নাতি রাউল রদ্রিগেজ কাস্ত্রো, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাজারো আলভারেজ কাসাস এবং কিউবার গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান। সিআইএর এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিনিধি দলটি মূলত ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বার্তা ব্যক্তিগতভাবে পৌঁছে দিতে’ সেখানে গিয়েছিল। বৈঠকে গোয়েন্দা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়।

বর্তমানে কিউবার জ্বালানি পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর। জ্বালানি মন্ত্রী ভিসেন্তে দে লা ও লেভি সতর্ক করে জানিয়েছেন, দেশে ডিজেল ও জ্বালানি তেল প্রায় সম্পূর্ণ ফুরিয়ে গেছে।

জ্বালানি সংকটের কারণে লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে গত বুধবার হাভানায় শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে। বিক্ষোভকারীরা রাস্তা অবরোধ করে সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়। গত জানুয়ারিতে জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর এটিই ছিল হাভানার সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ।

মানবিক সহায়তায় সিআইএ প্রধান কেন?

সংবাদমাধ্যম নিউজ ডট এজেডের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণত মানবিক সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে রেড ক্রস বা জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা যান। কিন্তু কিউবার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা প্রধানের সফর ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিষয়টি শুধু মানবিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে গভীর নিরাপত্তা কৌশলও রয়েছে।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

বিশ্লেষকদের মতে, কিউবায় যদি সম্পূর্ণ অরাজকতা সৃষ্টি হয়, তবে লাখো কিউবান নাগরিক সমুদ্রপথে ফ্লোরিডার দিকে পাড়ি জমাতে পারে। এমন গণ-অভিবাসন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় অভ্যন্তরীণ সংকট হয়ে দাঁড়াবে। ধারণা করা হচ্ছে, সিআইএ প্রধান কিউবার নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে এই স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়েই আলোচনা করতে গেছেন।

কিউবা আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরে। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, এই সংকটের সুযোগে রাশিয়া বা চীন কিউবায় তাদের সামরিক বা গোয়েন্দা উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে পারে। সিআইএ প্রধানের উপস্থিতি কিউবান নেতৃত্বের প্রতি এক ধরনের বার্তাও বহন করে। তা হলো, “সাহায্য নাও, তবে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের জায়গা দিও না।”

যখন কূটনৈতিক সম্পর্ক উত্তপ্ত থাকে, তখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেক সময় ব্যাক-চ্যানেল হিসেবে কাজ করে। র‍্যাটক্লিফ সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বার্তা নিয়ে গেছেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে, যা প্রচলিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্ভব হতো না।

কিউবার বর্তমান অন্ধকারের কারণ কী?

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, কিউবার বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হলো জ্বালানি আমদানিতে ধস। ঐতিহাসিকভাবে কিউবা ভেনেজুয়েলা ও মেক্সিকো থেকে স্বল্পমূল্যে তেল পেত। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের হুমকির মুখে। বিশেষ করে কিউবায় তেল বহনকারী জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় এসব দেশ তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে কিউবায় ডিজেল ও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া কিউবার বিদ্যুৎ অবকাঠামোর বেশিরভাগই ৪০ থেকে ৫০ বছরের পুরোনো। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে এসব স্থাপনা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। কিউবা সরকারের দাবি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলার জোগাড় করতে পারছে না।

আমেরিকা কি কিউবায় সরকার পতনের চেষ্টা করছে?

ভেনেজুয়েলাসহ লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের প্রবণতার উদাহরণ রয়েছে। কিউবার ক্ষেত্রেও বর্তমান কৌশলকে অনেকে বহুমাত্রিক চাপ প্রয়োগ হিসেবে দেখছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ১০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে, তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তসহ। তারা চায় এই সহায়তা সরাসরি কিউবা সরকারের হাতে না গিয়ে ক্যাথলিক চার্চ বা বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌঁছাক। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কিউবা সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করার কৌশল হতে পারে।

একই সময়ে ১৯৯৬ সালের বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অভিযোগের গুঞ্জনও কিউবান নেতৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থাৎ, একদিকে সহায়তার আশ্বাস, অন্যদিকে বিচারের আশঙ্কা এই দুইয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কিউবাকে রাজনৈতিক সংস্কারের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ সংকটের কারণে রাস্তায় নেমে আসা সাধারণ মানুষের ক্ষোভও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অবস্থানের পক্ষে ব্যবহার করতে পারে বলে কিউবান সরকারের অভিযোগ। তাদের দাবি, এই সংকট তৈরি করে জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

বৈঠকে কারা ছিলেন?

কিউবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ প্রতিনিধি জন র‍্যাটক্লিফ, কিউবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাজারো আলভারেজ কাসাস এবং রাউল কাস্ত্রোর নাতি রাউল রদ্রিগেজ কাস্ত্রো।

সামনে কী হতে পারে

কমিউনিস্ট শাসিত এই দ্বীপরাষ্ট্রের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের সম্ভাবনাকে যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্কের একটি নতুন মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জ্বালানি অবরোধের কারণে দেশটি বর্তমানে নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখে পড়েছে।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্প একাধিকবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান।

ফিদেল কাস্ত্রোর উত্তরসূরি হিসেবে কিউবার প্রেসিডেন্ট হওয়া রাউল কাস্ত্রো ২০১৫ সালে বারাক ওবামার আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কোন্নয়ন প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পরে ট্রাম্প সেই নীতি থেকে সরে আসেন। এবার তিনি আসলে কী করতে চাইছেন, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কিউবা চায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে স্বাভাবিক বাণিজ্যে ফিরতে, যাতে তাদের জ্বালানি সংকট কাটে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় কিউবায় সমাজতান্ত্রিক প্রভাব কমিয়ে গণতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী সংস্কার জোরদার করতে এবং রাশিয়া-চীনের প্রভাব সীমিত করতে।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ না করলেও, জ্বালানি সংকট, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মানবিক সহায়তার শর্ত -এই তিনের সমন্বয়ে কিউবান সরকারকে চাপে রাখার একটি প্রবণতা স্পষ্ট। সিআইএ প্রধানের এই সফর বড় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত কিনা, তা সময়ই বলে দেবে।

সম্পর্কিত