সোহরাব হাসান

ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত বাস ভাড়া নেওয়ার কথা অস্বীকার করলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তার দাবি, কোথাও নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না। এটা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু মন্ত্রী যখন বলেন, যেসব যাত্রী কম ভাড়ায় যেতে অভ্যস্ত সেসব যাত্রীর কাছে হয়তো বেশি ভাড়া মনে হচ্ছে, তখন মনে হয় তিনি মালিক পক্ষের হয়েই কথা বলছেন। ৮৭ শতাংশ বাসে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে যাত্রীকল্যাণ সমিতি যে দাবি করেছে, তাও নাকচ করে দিয়েছেন মন্ত্রী।
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সড়ক ও সেতু মন্ত্রী সড়ক পথে চাঁদাবাজির কথাও অস্বীকার করেছিলেন। তার ভাষ্য, সমঝোতার মাধ্যমে বাস মালিক ও শ্রমিকেরা মালিক ও শ্রমিক সংগঠনকে যে চাঁদা দেন, সেটা হলো সমঝোতা। এটাকে কোনোভাবে চাঁদা বলা যাবে না।
কিন্তু মন্ত্রী কি হলফ করে বলতে পারবেন, বাস মালিকেরা স্বেচ্ছায় ও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে চাঁদা দেন। অনেকটা বাধ্য হয়ে দেন। না দিলে তাদের রুট পারমিট বাতিল হবে। মন্ত্রী মহোদয়ের এটাও জানার কথা যে, ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনটির বাস্তবায়ন এই মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোই ঠেকিয়ে দিয়েছিল। তারা আইনের প্রতিবাদে অবরোধও পালন করে। সারা বছর বাস মালিকেরা নির্ধারিত ভাড়া চেয়ে কম ভাড়ায় যাত্রীদের নেওয়া আসা করেন–এটা মন্ত্রীর অভিনব আবিষ্কার বলেই মনে হয়। যারা বাসে ট্রেনে যান তারাই বোঝেন কত ধানে কত চাল।
মন্ত্রী যখন অতিরিক্ত বাস ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না বলে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করছেন, তখন বাস্তব অবস্থাটা কী। বণিকবার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা থেকে মাদারীপুরের শিবচরগামী যাত্রীরা দ্বিগুণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও গুলিস্তান থেকে শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত স্বাভাবিক সময়ে ভাড়া ১৭০ টাকা। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে যাত্রাবাড়ী ও গুলিস্তান থেকে বিভিন্ন পরিবহন সিটের ভাড়া ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং দাঁড়ানো যাত্রীদের কাছ থেকে ২৫০-৩০০ টাকা আদায় করছে।
ঢাকা থেকে আসা যাত্রী আলাউদ্দিন আলাল বলেন, “পরিবারের তিনজনকে নিয়ে গুলিস্তান থেকে বাসে ওঠেছি। বাসে উঠার আগে বলছে, দাঁড়িয়ে গেলে ৩০০ টাকা ভাড়া এবং বসে গেলে ৫০০ টাকা ভাড়া লাগবে। পরে অনেক অনুরোধ করে ৪০০ টাকা দিয়ে পাঁচ্চরে এসেছি।” রুবাইত হোসেন নামের এক যাত্রী বলেন, “লম্বা ছুটি পাওয়ায় প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদ উদ্যাপনের লক্ষ্যে শিবচরে এসেছি। দুঃখের বিষয় হচ্ছে প্রত্যেকবারের মতো এবারও বাস মালিকরা ১৫০-২০০ টাকা বাড়তি আদায় করছে।”
এদিকে ঈদে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঈদযাত্রা ঘিরে ভাড়া বৃদ্ধির বিশৃঙ্খলা ও যাত্রী হয়রানির অভিযোগ তুলে ধরেন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরকারের কড়া হুঁশিয়ারির পরও বিভিন্ন শ্রেণির বাস ও মিনিবাসে ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার ঘটনা চলছে। তবে সরকার এ অভিযোগ সবসময়ই অস্বীকার করছে এবং মালিকদের নির্দেশনা অনুযায়ী গণমাধ্যমে বক্তব্য প্রকাশ করছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে অনুযায়ী, এবারের ঈদে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। ঢাকা থেকে পাবনা বাসের ভাড়া সাধারণত ৫৫০-৬০০ টাকা হলেও ঈদে ১২০০, নাটোর ৫৫০-৫৮০ থেকে ১২০০, রংপুর ৫০০ থেকে ১৫০০, নোয়াখালী ৫০০ থেকে ৮০০, লক্ষ্মীপুর ৫০০ থেকে ৭০০, রামগঞ্জ ৩৫০ থেকে ৮০০, ময়মনসিংহ লোকাল বাস ২৫০ থেকে ৬০০, খুলনা ৫০০ থেকে ৮০০, চট্টগ্রাম থেকে লক্ষ্মীপুর ৪০০ থেকে ৮০০, ভোলা ৪৫০ থেকে ৯০০ এবং ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ ট্রাক-পিকআপে যাত্রীর জন্য ৫০০ টাকা ভাড়া আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া ঈদের দিন যত কাছে আসছে, ভাড়া প্রতিদিনই বাড়ছে।
তাদের দাবি, ৫২ আসনের বাসও ৪০ আসনের বাসের ভাড়ার সঙ্গে মিলিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে অসাধু পরিবহন মালিকেরা। সিএনজি ও ডিজেলচালিত বাসের ভাড়ার পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ঈদযাত্রায় সব বাসে সমান হারে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। কিছু পরিচিত কোম্পানির বাসে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকিট নেই বলে যাত্রীকে সাতকানিয়া, চকরিয়া বা বান্দরবানের টিকিট কাটতে বাধ্য করা হচ্ছে। একইভাবে উত্তরবঙ্গের বগুড়া রুটে রংপুর বা নওগাঁ পর্যন্ত টিকিট নিতে হচ্ছে। অন্যান্য রুটেও যাত্রীদের তাদের কঙ্ক্ষিত গন্তব্য থেকে দূরের টিকিট কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতি পরিবহন কর্মীদের যে সমস্যাটি তুলে ধরেছেন, মন্ত্রীর কথায় তা পাওয়া গেল না। তিনি যাত্রীকল্যাণ সমিতির দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, এই সমিতির মহাসচিব মন্ত্রণালয়ে পরিবহন সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্য হওয়ার জন্য তদ্বির করেছেন। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব সেই তদ্বির করলেও পরিবহন কর্মীদের ন্যায্য পাওনার কথা বলেছেন, সেটি তো মিথ্যে নয়। ভাড়া নির্ধারনের সময় কর্মীদের বেতন ভাতা ও বোনাসের বিষয়টিও ধরা হয়। কিন্তু বেশির ভাগ বাস মালিক তাদের ন্যায্য পাওনা দেন না। সড়কে বেশির ভাগ বাস চলাচল করে লিজ পদ্ধতিতে। বাস মালিকেরা ট্রিপ হিসেবে টাকা নেন। কর্মীরা যত বেশি ট্রিপ দিতে পারবেন, মালিকদের তত লাভ। সড়কে বেপরোয়া বাস চালানো ও দুর্ঘটরারও বড় কারণ এটি।
মন্ত্রী যাত্রীদের সমস্যা ও ভোগান্তির দিকে মনোযোগ না দিয়ে কেন সমঝোতার চাঁদা ও নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম ভাড়ায় যেতে অভ্যস্ত যাত্রীদের নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন, বোধগম্য নয়।
আমাদের এক রসিক বন্ধু ঢাকা থেকে রংপুরের পাটগ্রাম যাওয়ার বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, গত রাতে (১৯ মার্চ) ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করেছি রাত ১০টায়। আজ এখন বিকেল তিনটা। এই মাত্র বগুড়া ক্রস করলাম। তবে কি মন্ত্রীকে রেহাই দিতে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রয়োগ করব? মানে প্রেমিকার ১০ ঘণ্টা মানে এক মিনিট। আর অগ্নিকুণ্ডের সামনে এক মিনিট মানে ১০ ঘণ্টা?
কেবল বাস নয়, ট্রেনেও বাড়তি ভাড়া নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ট্রেনের টিকিট অনলাইনে বিক্রি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি ১০ শতাংশের বেশি করা যায়নি। অনলাইনে সব টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করলেও টিকিট কালোবাজারিদের ব্যবসা থাকে না। আর এই ব্যবসার সঙ্গে যে রেলওয়ের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী জড়িত সেটি এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার। আপনি কমলাপুর রেলওয়ের কাউন্টারে গিয়ে টিকিট পাবেন না। কিন্তু আশপাশে কালোবাজারিরা টিকিট টিকিট বলে চিৎকার করবেন। ঈদের আগে ঢাকা–জামালপুরগামী ট্রেনের একযাত্রী খেদের সঙ্গে বলেছিলেন, “হাইরে, এক হাজার টাকায় বেলেকে (ব্লাকে) টিকেট কিইন্নাও ট্রেনে উঠতে পারতাছি না।” কালোবাজারে বেশি দামে টিকিট কিনেও অনেকে নির্ধারিত আসনে বসে যেতে পারেন না। আবার টিকিট না করেও অনেকে ছাদে-হাতলে ঝুলে অনেকে যাচ্ছেন। এই হলো, আমাদের ঈদযাত্রার ভোগান্তির খণ্ডিত চিত্র।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।

ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত বাস ভাড়া নেওয়ার কথা অস্বীকার করলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তার দাবি, কোথাও নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না। এটা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু মন্ত্রী যখন বলেন, যেসব যাত্রী কম ভাড়ায় যেতে অভ্যস্ত সেসব যাত্রীর কাছে হয়তো বেশি ভাড়া মনে হচ্ছে, তখন মনে হয় তিনি মালিক পক্ষের হয়েই কথা বলছেন। ৮৭ শতাংশ বাসে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে যাত্রীকল্যাণ সমিতি যে দাবি করেছে, তাও নাকচ করে দিয়েছেন মন্ত্রী।
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সড়ক ও সেতু মন্ত্রী সড়ক পথে চাঁদাবাজির কথাও অস্বীকার করেছিলেন। তার ভাষ্য, সমঝোতার মাধ্যমে বাস মালিক ও শ্রমিকেরা মালিক ও শ্রমিক সংগঠনকে যে চাঁদা দেন, সেটা হলো সমঝোতা। এটাকে কোনোভাবে চাঁদা বলা যাবে না।
কিন্তু মন্ত্রী কি হলফ করে বলতে পারবেন, বাস মালিকেরা স্বেচ্ছায় ও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে চাঁদা দেন। অনেকটা বাধ্য হয়ে দেন। না দিলে তাদের রুট পারমিট বাতিল হবে। মন্ত্রী মহোদয়ের এটাও জানার কথা যে, ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনটির বাস্তবায়ন এই মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোই ঠেকিয়ে দিয়েছিল। তারা আইনের প্রতিবাদে অবরোধও পালন করে। সারা বছর বাস মালিকেরা নির্ধারিত ভাড়া চেয়ে কম ভাড়ায় যাত্রীদের নেওয়া আসা করেন–এটা মন্ত্রীর অভিনব আবিষ্কার বলেই মনে হয়। যারা বাসে ট্রেনে যান তারাই বোঝেন কত ধানে কত চাল।
মন্ত্রী যখন অতিরিক্ত বাস ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না বলে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করছেন, তখন বাস্তব অবস্থাটা কী। বণিকবার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা থেকে মাদারীপুরের শিবচরগামী যাত্রীরা দ্বিগুণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও গুলিস্তান থেকে শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত স্বাভাবিক সময়ে ভাড়া ১৭০ টাকা। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে যাত্রাবাড়ী ও গুলিস্তান থেকে বিভিন্ন পরিবহন সিটের ভাড়া ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং দাঁড়ানো যাত্রীদের কাছ থেকে ২৫০-৩০০ টাকা আদায় করছে।
ঢাকা থেকে আসা যাত্রী আলাউদ্দিন আলাল বলেন, “পরিবারের তিনজনকে নিয়ে গুলিস্তান থেকে বাসে ওঠেছি। বাসে উঠার আগে বলছে, দাঁড়িয়ে গেলে ৩০০ টাকা ভাড়া এবং বসে গেলে ৫০০ টাকা ভাড়া লাগবে। পরে অনেক অনুরোধ করে ৪০০ টাকা দিয়ে পাঁচ্চরে এসেছি।” রুবাইত হোসেন নামের এক যাত্রী বলেন, “লম্বা ছুটি পাওয়ায় প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদ উদ্যাপনের লক্ষ্যে শিবচরে এসেছি। দুঃখের বিষয় হচ্ছে প্রত্যেকবারের মতো এবারও বাস মালিকরা ১৫০-২০০ টাকা বাড়তি আদায় করছে।”
এদিকে ঈদে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঈদযাত্রা ঘিরে ভাড়া বৃদ্ধির বিশৃঙ্খলা ও যাত্রী হয়রানির অভিযোগ তুলে ধরেন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরকারের কড়া হুঁশিয়ারির পরও বিভিন্ন শ্রেণির বাস ও মিনিবাসে ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার ঘটনা চলছে। তবে সরকার এ অভিযোগ সবসময়ই অস্বীকার করছে এবং মালিকদের নির্দেশনা অনুযায়ী গণমাধ্যমে বক্তব্য প্রকাশ করছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে অনুযায়ী, এবারের ঈদে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। ঢাকা থেকে পাবনা বাসের ভাড়া সাধারণত ৫৫০-৬০০ টাকা হলেও ঈদে ১২০০, নাটোর ৫৫০-৫৮০ থেকে ১২০০, রংপুর ৫০০ থেকে ১৫০০, নোয়াখালী ৫০০ থেকে ৮০০, লক্ষ্মীপুর ৫০০ থেকে ৭০০, রামগঞ্জ ৩৫০ থেকে ৮০০, ময়মনসিংহ লোকাল বাস ২৫০ থেকে ৬০০, খুলনা ৫০০ থেকে ৮০০, চট্টগ্রাম থেকে লক্ষ্মীপুর ৪০০ থেকে ৮০০, ভোলা ৪৫০ থেকে ৯০০ এবং ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ ট্রাক-পিকআপে যাত্রীর জন্য ৫০০ টাকা ভাড়া আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া ঈদের দিন যত কাছে আসছে, ভাড়া প্রতিদিনই বাড়ছে।
তাদের দাবি, ৫২ আসনের বাসও ৪০ আসনের বাসের ভাড়ার সঙ্গে মিলিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে অসাধু পরিবহন মালিকেরা। সিএনজি ও ডিজেলচালিত বাসের ভাড়ার পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ঈদযাত্রায় সব বাসে সমান হারে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। কিছু পরিচিত কোম্পানির বাসে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকিট নেই বলে যাত্রীকে সাতকানিয়া, চকরিয়া বা বান্দরবানের টিকিট কাটতে বাধ্য করা হচ্ছে। একইভাবে উত্তরবঙ্গের বগুড়া রুটে রংপুর বা নওগাঁ পর্যন্ত টিকিট নিতে হচ্ছে। অন্যান্য রুটেও যাত্রীদের তাদের কঙ্ক্ষিত গন্তব্য থেকে দূরের টিকিট কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতি পরিবহন কর্মীদের যে সমস্যাটি তুলে ধরেছেন, মন্ত্রীর কথায় তা পাওয়া গেল না। তিনি যাত্রীকল্যাণ সমিতির দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, এই সমিতির মহাসচিব মন্ত্রণালয়ে পরিবহন সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্য হওয়ার জন্য তদ্বির করেছেন। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব সেই তদ্বির করলেও পরিবহন কর্মীদের ন্যায্য পাওনার কথা বলেছেন, সেটি তো মিথ্যে নয়। ভাড়া নির্ধারনের সময় কর্মীদের বেতন ভাতা ও বোনাসের বিষয়টিও ধরা হয়। কিন্তু বেশির ভাগ বাস মালিক তাদের ন্যায্য পাওনা দেন না। সড়কে বেশির ভাগ বাস চলাচল করে লিজ পদ্ধতিতে। বাস মালিকেরা ট্রিপ হিসেবে টাকা নেন। কর্মীরা যত বেশি ট্রিপ দিতে পারবেন, মালিকদের তত লাভ। সড়কে বেপরোয়া বাস চালানো ও দুর্ঘটরারও বড় কারণ এটি।
মন্ত্রী যাত্রীদের সমস্যা ও ভোগান্তির দিকে মনোযোগ না দিয়ে কেন সমঝোতার চাঁদা ও নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম ভাড়ায় যেতে অভ্যস্ত যাত্রীদের নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন, বোধগম্য নয়।
আমাদের এক রসিক বন্ধু ঢাকা থেকে রংপুরের পাটগ্রাম যাওয়ার বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, গত রাতে (১৯ মার্চ) ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করেছি রাত ১০টায়। আজ এখন বিকেল তিনটা। এই মাত্র বগুড়া ক্রস করলাম। তবে কি মন্ত্রীকে রেহাই দিতে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রয়োগ করব? মানে প্রেমিকার ১০ ঘণ্টা মানে এক মিনিট। আর অগ্নিকুণ্ডের সামনে এক মিনিট মানে ১০ ঘণ্টা?
কেবল বাস নয়, ট্রেনেও বাড়তি ভাড়া নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ট্রেনের টিকিট অনলাইনে বিক্রি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি ১০ শতাংশের বেশি করা যায়নি। অনলাইনে সব টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করলেও টিকিট কালোবাজারিদের ব্যবসা থাকে না। আর এই ব্যবসার সঙ্গে যে রেলওয়ের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী জড়িত সেটি এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার। আপনি কমলাপুর রেলওয়ের কাউন্টারে গিয়ে টিকিট পাবেন না। কিন্তু আশপাশে কালোবাজারিরা টিকিট টিকিট বলে চিৎকার করবেন। ঈদের আগে ঢাকা–জামালপুরগামী ট্রেনের একযাত্রী খেদের সঙ্গে বলেছিলেন, “হাইরে, এক হাজার টাকায় বেলেকে (ব্লাকে) টিকেট কিইন্নাও ট্রেনে উঠতে পারতাছি না।” কালোবাজারে বেশি দামে টিকিট কিনেও অনেকে নির্ধারিত আসনে বসে যেতে পারেন না। আবার টিকিট না করেও অনেকে ছাদে-হাতলে ঝুলে অনেকে যাচ্ছেন। এই হলো, আমাদের ঈদযাত্রার ভোগান্তির খণ্ডিত চিত্র।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।