অর্ণব সান্যাল

মব নিয়ে আমাদের বাংলাদেশ এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছে। মব নিয়ে অভিযোগের সুরে কথা বললে কেউ কেউ ক্ষেপে যান। তাদের কাছে এই মব আসল মব না, ওটি নাকি প্রেশার দেওয়ার জন্যই তৈরি হয়েছে। আবার সেটি নিজেদের বিপক্ষে হলে প্রেশার গ্রুপ আবার মব হয়ে যায়!
অর্থাৎ, মবের সংজ্ঞা সময়-সুযোগ বুঝে সর্বদা পরিবর্তনশীল। ঠিক যেমনটা মব ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারে আসা রাজনৈতিক দলটি এখন মবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বেশ আলসেমি করছে। কখনো কখনো মব তৈরির পেছনেও সরকারের নীরবতা প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তো মবের কথা বললেই বিপ্লব, অভ্যুত্থান, ফ্যাসিস্ট, দোসর–প্রভৃতি বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শর্ট কোর্স করানো হতো সবাইকে। তা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সরকার আসার পরও দেখা যাচ্ছে, মব আছে মবের মতোই, আয়েশে! তবে কি মবের শাসনই প্রকৃত শাসন?
চলুন, কিছু ঘটনা সম্পর্কে জানা যাক। এই যেমন, নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পরপরই বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের পদত্যাগ নিয়ে বেশ হুলুস্থূল হলো। এই প্রবীণ অর্থনীতিবিদ তাকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে গুঞ্জন শুনে নিজেই বাংলাদেশ ব্যাংকের ভবন ছেড়ে চলে গেলেন। তার এক উপদেষ্টাকেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের এক ধরনের সংঘবদ্ধ প্রতিবাদের মুখে পড়তে হলো এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ভবন ছাড়তে হলো। সংবাদমাধ্যমগুলোর অভিযোগ, এই ঘটনাটি ‘মব’। পরবর্তী সময়ে সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হলো, ওই সব পদে পরিবর্তন করা হবে এবং হলোও।
এখন এই পরপর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে পাশাপাশি সাজালে একটি পরিকল্পিত ‘মব’ সামনে চলে আসে। আবার ওই ঘটনাটি আদৌ মব ছিল কিনা, সেই বিতর্কও অনেকে তুলছেন। যদিও বাংলাদেশের বাস্তবতা মানলে মবের সর্বস্বীকৃত সংজ্ঞা নির্ধারণ করা একটু কঠিন।
মব মানসিকতা মানব ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। যুগে যুগেই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মব দানা বাঁধতে দেখা গেছে। কখনো ডাইনি মারতে, কখনো ধর্মীয় বিষয়ে তিলকে তাল বানিয়ে কিংবা রাজনৈতিক বিক্ষোভের রূপে মব মানসিকতার বিস্তার হয়েছে। সাধারণত এটি একটি বিশৃঙ্খল ও অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড। তবে বাংলাদেশে মব কেবলই অনিয়ন্ত্রিত রূপে থাকে না। এ দেশের মব প্রায় সময়ই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত ও উদ্দেশ্যমূলক হয়ে থাকে।
মবের মানসিকতা আসলে মানুষের একটি গোষ্ঠীবদ্ধ মানসিকতাই। তাই ক্রাউড মেন্টালিটি ও মব মেন্টালিটি অনেক বেশি অনুরূপ। এই গোষ্ঠীবদ্ধতার সুফল যেমন আছে, কুফলও আছে। যেমন: দাঙ্গাও একটি গোষ্ঠীবদ্ধ কর্মকাণ্ডই। কিন্তু এই দুনিয়ার ইতিহাসে আঁতিপাতি করে খুঁজেও কেউ কোনো শান্তিপূর্ণ দাঙ্গার উদাহরণ পাবে না। ঠিক তেমনই মবের মনও সহিংসতায় পূর্ণ, সেখানে শান্তি নিখোঁজ থাকে। গোষ্ঠীর আচরণ যদি সহিংস হয়, তবে গোষ্ঠীর আকার যত বড় হতে থাকে, সহিংসতার পরিমাণও তত বাড়তে থাকে। আর এর সাথে যখন সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা যুক্ত হয়, তখন তা হয়ে দাঁড়ায় একটি গোষ্ঠীবদ্ধ অপরাধ। আমাদের এখন এটিই হচ্ছে।
তাই থানার সামনে কেউ ৭ মার্চের ভাষণ বাজালে, তাকেও ওই এজেন্ডাভিত্তিক মব এসে আক্রমণ করে। থানার ভেতরে মারে। পুলিশ তখন কিছু করে না। যদিও সংবাদমাধ্যমের লাইভ টেলিকাস্টে সবই দেখা যায়, মবের রূপও। পরে মারধরের শিকার ব্যক্তিদের আবার পুলিশ ধরে ফেলে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাও দিয়ে দেয়। কারণ মবরূপী জনতা বলেছে, তারা ছাত্রলীগ, তারা আওয়ামী লীগ ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন আর পুলিশের মনে থাকে না যে, এদেরই থানার ভেতরে কিছু জড়ো হওয়া মানুষ মেরেছে একটু আগে। মারধরকারী ব্যক্তিরা পুলিশকে কটু ভাষায় আক্রমণ করেছে। তবে পুলিশ যেভাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে হেঁটে যাওয়া একজন নাগরিককে শুধু প্রশ্ন করার স্পর্ধায় ক্ষেপে গিয়ে পেটাতে পারে, ঠিক সেভাবে আসলে জড়ো হওয়া মবকে ঠেকাতে পারে না কাউকে পেটানো থেকে।
এ কারণেই পুলিশ প্রথমে মবের মার থেকে রক্ষা করার নামে কাউকে হেফাজতে নেয়। এরপর হুট করে মনে পড়ে যায়–‘আরে, এরা তো সন্ত্রাসী!’ পরে স্মৃতি রক্ষার্থেই হয়তো দিয়ে দেওয়া হয় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা। আগের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এমন ঘটনা ঘটেছে। সাংবাদিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও স্রেফ আলোচনা সভা করার কারণে জেলে যেতে হয়েছিল। এবার বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোয় ‘সন্ত্রাসী’ বনে যেতে হচ্ছে পুলিশের খাতায়। বাংলাদেশের সংবিধানের কোন কোন ধারায় যে এসব কাজ ‘সন্ত্রাসমূলক’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত, কে জানে!
এখন মিলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, মব এবং সেই সংক্রান্ত পুলিশি প্রতিক্রিয়া কিন্তু একই আছে। তাহলে সরকারের বদল মানুষ অনুভব করবে কীভাবে? নাকি সরকার বলতেই ক্ষমতা যার, জবান তার?
এরই মধ্যে আবার খবর মিলেছে, একজন শিক্ষার্থীকে সেহরির সময় পিটিয়ে থানা প্রাঙ্গণে ফেলে রাখা হয়েছে। অপরাধ হিসেবে সেই ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের বহুচর্চিত ট্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে। ঠিক যেমনটা আওয়ামী লীগের বিগত সরকারের আমলে ছাত্রদল, বিএনপি বা জামায়াত-শিবিরের ট্যাগের যথেচ্ছ ব্যবহার হতো। পিটিয়ে ফেলে রাখা সেই পাভেলের বেশ কিছু ভিডিও ও স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়েও পড়েছে। সেই অসহায় পড়ে থাকার বিপরীতে শাহবাগ থানার ওসি অবশ্য বলেছেন যে, “এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” এখন সেটি আরেকটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলার উৎসস্থল হবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে।
অপরাধ করলে, তা প্রমাণিত হলে, অবশ্যই সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে আইনের আওতায় আনা উচিত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ওটিই সুবিচার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায়। তবে শুধু ট্যাগ দিয়ে, কোনো বিচার-আচার বা তদন্ত ছাড়াই মেরে ধরে বা প্রবল পিটিয়ে থানা প্রাঙ্গণে ফেলে রাখলে এবং পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই কথিত গোষ্ঠীর দাবি অনুযায়ী একটি মামলা দিয়ে দিলে, তা আর আইনের শাসন থাকে না। সেটি হয় মবের শাসন!
যদিও আমাদের নতুন নির্বাচিত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথম কর্মদিবসেই বলেছিলেন যে, “আমরা বাংলাদেশে মব কালচার পুরোপুরি বন্ধ করতে চাই। মব কালচার শেষ। দাবি আদায়ের নামে মব কালচার করা যাবে না।” তবে দেখা যাচ্ছে যে, কালচার হিসেবে মব টিকে আছে ভালোমতোই। তাতে প্রশাসনযন্ত্র তালও মেলাচ্ছে বেশ। তা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বদলাতেই হোক, বা ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোতেই হোক না কেন।
একটা হিসাব দিয়ে লেখার যবনিকা পতনের দিকে হাঁটা যাক। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পূর্ব সহিংসতার প্রতিবেদন’ প্রকাশ করেছিল মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। তাতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পরবর্তী ১৭ মাসে দেশে মব ভায়োলেন্সের অন্তত ৪১৩টি ঘটনায় ২৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছে। এইচআরএসএস-এর মতে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই ভয়াবহ প্রবণতা বর্তমানে জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
কথা হলো, সরকার বদল হয়ে নির্বাচিত রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলেও এই দেশের মানুষ এখনো ওই নিদারুণ বাস্তবতা থেকে উদ্ধার পায়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘শেষ’ বললেও এ দেশে মব কালচার এখনো ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। ভরসা এতটুকুই যে, আগের সরকার মুখ মুছে অস্বীকারের পথ ধরেছিল। নতুন সরকার মুখে অন্তত স্বীকার করেছে। এখন প্রতিকারের ব্যবস্থা নিলেই হয়।
আর যদি আগের মতোই ক্ষমতা সংশ্লিষ্টরা যে যার ক্ষণিকের সুবিধার কথাই শুধু ভাবে, তবে মনে রাখা ভালো যে–দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পুষলে, তার কামড় একদিন নিজেকেও খেতে হতে পারে। তখন কিন্তু বেদের মেয়ে জোসনাও বীন বাজিয়ে বিষ নামাতে পারবে না!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

মব নিয়ে আমাদের বাংলাদেশ এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছে। মব নিয়ে অভিযোগের সুরে কথা বললে কেউ কেউ ক্ষেপে যান। তাদের কাছে এই মব আসল মব না, ওটি নাকি প্রেশার দেওয়ার জন্যই তৈরি হয়েছে। আবার সেটি নিজেদের বিপক্ষে হলে প্রেশার গ্রুপ আবার মব হয়ে যায়!
অর্থাৎ, মবের সংজ্ঞা সময়-সুযোগ বুঝে সর্বদা পরিবর্তনশীল। ঠিক যেমনটা মব ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারে আসা রাজনৈতিক দলটি এখন মবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বেশ আলসেমি করছে। কখনো কখনো মব তৈরির পেছনেও সরকারের নীরবতা প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তো মবের কথা বললেই বিপ্লব, অভ্যুত্থান, ফ্যাসিস্ট, দোসর–প্রভৃতি বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শর্ট কোর্স করানো হতো সবাইকে। তা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সরকার আসার পরও দেখা যাচ্ছে, মব আছে মবের মতোই, আয়েশে! তবে কি মবের শাসনই প্রকৃত শাসন?
চলুন, কিছু ঘটনা সম্পর্কে জানা যাক। এই যেমন, নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পরপরই বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের পদত্যাগ নিয়ে বেশ হুলুস্থূল হলো। এই প্রবীণ অর্থনীতিবিদ তাকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে গুঞ্জন শুনে নিজেই বাংলাদেশ ব্যাংকের ভবন ছেড়ে চলে গেলেন। তার এক উপদেষ্টাকেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের এক ধরনের সংঘবদ্ধ প্রতিবাদের মুখে পড়তে হলো এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ভবন ছাড়তে হলো। সংবাদমাধ্যমগুলোর অভিযোগ, এই ঘটনাটি ‘মব’। পরবর্তী সময়ে সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হলো, ওই সব পদে পরিবর্তন করা হবে এবং হলোও।
এখন এই পরপর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে পাশাপাশি সাজালে একটি পরিকল্পিত ‘মব’ সামনে চলে আসে। আবার ওই ঘটনাটি আদৌ মব ছিল কিনা, সেই বিতর্কও অনেকে তুলছেন। যদিও বাংলাদেশের বাস্তবতা মানলে মবের সর্বস্বীকৃত সংজ্ঞা নির্ধারণ করা একটু কঠিন।
মব মানসিকতা মানব ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। যুগে যুগেই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মব দানা বাঁধতে দেখা গেছে। কখনো ডাইনি মারতে, কখনো ধর্মীয় বিষয়ে তিলকে তাল বানিয়ে কিংবা রাজনৈতিক বিক্ষোভের রূপে মব মানসিকতার বিস্তার হয়েছে। সাধারণত এটি একটি বিশৃঙ্খল ও অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড। তবে বাংলাদেশে মব কেবলই অনিয়ন্ত্রিত রূপে থাকে না। এ দেশের মব প্রায় সময়ই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত ও উদ্দেশ্যমূলক হয়ে থাকে।
মবের মানসিকতা আসলে মানুষের একটি গোষ্ঠীবদ্ধ মানসিকতাই। তাই ক্রাউড মেন্টালিটি ও মব মেন্টালিটি অনেক বেশি অনুরূপ। এই গোষ্ঠীবদ্ধতার সুফল যেমন আছে, কুফলও আছে। যেমন: দাঙ্গাও একটি গোষ্ঠীবদ্ধ কর্মকাণ্ডই। কিন্তু এই দুনিয়ার ইতিহাসে আঁতিপাতি করে খুঁজেও কেউ কোনো শান্তিপূর্ণ দাঙ্গার উদাহরণ পাবে না। ঠিক তেমনই মবের মনও সহিংসতায় পূর্ণ, সেখানে শান্তি নিখোঁজ থাকে। গোষ্ঠীর আচরণ যদি সহিংস হয়, তবে গোষ্ঠীর আকার যত বড় হতে থাকে, সহিংসতার পরিমাণও তত বাড়তে থাকে। আর এর সাথে যখন সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা যুক্ত হয়, তখন তা হয়ে দাঁড়ায় একটি গোষ্ঠীবদ্ধ অপরাধ। আমাদের এখন এটিই হচ্ছে।
তাই থানার সামনে কেউ ৭ মার্চের ভাষণ বাজালে, তাকেও ওই এজেন্ডাভিত্তিক মব এসে আক্রমণ করে। থানার ভেতরে মারে। পুলিশ তখন কিছু করে না। যদিও সংবাদমাধ্যমের লাইভ টেলিকাস্টে সবই দেখা যায়, মবের রূপও। পরে মারধরের শিকার ব্যক্তিদের আবার পুলিশ ধরে ফেলে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাও দিয়ে দেয়। কারণ মবরূপী জনতা বলেছে, তারা ছাত্রলীগ, তারা আওয়ামী লীগ ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন আর পুলিশের মনে থাকে না যে, এদেরই থানার ভেতরে কিছু জড়ো হওয়া মানুষ মেরেছে একটু আগে। মারধরকারী ব্যক্তিরা পুলিশকে কটু ভাষায় আক্রমণ করেছে। তবে পুলিশ যেভাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে হেঁটে যাওয়া একজন নাগরিককে শুধু প্রশ্ন করার স্পর্ধায় ক্ষেপে গিয়ে পেটাতে পারে, ঠিক সেভাবে আসলে জড়ো হওয়া মবকে ঠেকাতে পারে না কাউকে পেটানো থেকে।
এ কারণেই পুলিশ প্রথমে মবের মার থেকে রক্ষা করার নামে কাউকে হেফাজতে নেয়। এরপর হুট করে মনে পড়ে যায়–‘আরে, এরা তো সন্ত্রাসী!’ পরে স্মৃতি রক্ষার্থেই হয়তো দিয়ে দেওয়া হয় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা। আগের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এমন ঘটনা ঘটেছে। সাংবাদিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও স্রেফ আলোচনা সভা করার কারণে জেলে যেতে হয়েছিল। এবার বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোয় ‘সন্ত্রাসী’ বনে যেতে হচ্ছে পুলিশের খাতায়। বাংলাদেশের সংবিধানের কোন কোন ধারায় যে এসব কাজ ‘সন্ত্রাসমূলক’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত, কে জানে!
এখন মিলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, মব এবং সেই সংক্রান্ত পুলিশি প্রতিক্রিয়া কিন্তু একই আছে। তাহলে সরকারের বদল মানুষ অনুভব করবে কীভাবে? নাকি সরকার বলতেই ক্ষমতা যার, জবান তার?
এরই মধ্যে আবার খবর মিলেছে, একজন শিক্ষার্থীকে সেহরির সময় পিটিয়ে থানা প্রাঙ্গণে ফেলে রাখা হয়েছে। অপরাধ হিসেবে সেই ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের বহুচর্চিত ট্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে। ঠিক যেমনটা আওয়ামী লীগের বিগত সরকারের আমলে ছাত্রদল, বিএনপি বা জামায়াত-শিবিরের ট্যাগের যথেচ্ছ ব্যবহার হতো। পিটিয়ে ফেলে রাখা সেই পাভেলের বেশ কিছু ভিডিও ও স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়েও পড়েছে। সেই অসহায় পড়ে থাকার বিপরীতে শাহবাগ থানার ওসি অবশ্য বলেছেন যে, “এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” এখন সেটি আরেকটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলার উৎসস্থল হবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে।
অপরাধ করলে, তা প্রমাণিত হলে, অবশ্যই সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে আইনের আওতায় আনা উচিত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ওটিই সুবিচার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায়। তবে শুধু ট্যাগ দিয়ে, কোনো বিচার-আচার বা তদন্ত ছাড়াই মেরে ধরে বা প্রবল পিটিয়ে থানা প্রাঙ্গণে ফেলে রাখলে এবং পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই কথিত গোষ্ঠীর দাবি অনুযায়ী একটি মামলা দিয়ে দিলে, তা আর আইনের শাসন থাকে না। সেটি হয় মবের শাসন!
যদিও আমাদের নতুন নির্বাচিত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথম কর্মদিবসেই বলেছিলেন যে, “আমরা বাংলাদেশে মব কালচার পুরোপুরি বন্ধ করতে চাই। মব কালচার শেষ। দাবি আদায়ের নামে মব কালচার করা যাবে না।” তবে দেখা যাচ্ছে যে, কালচার হিসেবে মব টিকে আছে ভালোমতোই। তাতে প্রশাসনযন্ত্র তালও মেলাচ্ছে বেশ। তা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বদলাতেই হোক, বা ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোতেই হোক না কেন।
একটা হিসাব দিয়ে লেখার যবনিকা পতনের দিকে হাঁটা যাক। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পূর্ব সহিংসতার প্রতিবেদন’ প্রকাশ করেছিল মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। তাতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পরবর্তী ১৭ মাসে দেশে মব ভায়োলেন্সের অন্তত ৪১৩টি ঘটনায় ২৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছে। এইচআরএসএস-এর মতে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই ভয়াবহ প্রবণতা বর্তমানে জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
কথা হলো, সরকার বদল হয়ে নির্বাচিত রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলেও এই দেশের মানুষ এখনো ওই নিদারুণ বাস্তবতা থেকে উদ্ধার পায়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘শেষ’ বললেও এ দেশে মব কালচার এখনো ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। ভরসা এতটুকুই যে, আগের সরকার মুখ মুছে অস্বীকারের পথ ধরেছিল। নতুন সরকার মুখে অন্তত স্বীকার করেছে। এখন প্রতিকারের ব্যবস্থা নিলেই হয়।
আর যদি আগের মতোই ক্ষমতা সংশ্লিষ্টরা যে যার ক্ষণিকের সুবিধার কথাই শুধু ভাবে, তবে মনে রাখা ভালো যে–দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পুষলে, তার কামড় একদিন নিজেকেও খেতে হতে পারে। তখন কিন্তু বেদের মেয়ে জোসনাও বীন বাজিয়ে বিষ নামাতে পারবে না!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা