Advertisement Banner

বিদ্যুতের দাম কি বাড়ছেই?

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
বিদ্যুতের দাম কি বাড়ছেই?

বিদ্যুৎ খাতের গভীরতর সংকট, অব্যবস্থাপনা এবং কাঠামোগত অনিয়ম দূর করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে আবারও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। যখন দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই বাড়তি দাম জনজীবনকে আরও বিপন্ন করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানিয়েছে, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর আগামী ২০ ও ২১ মে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

বিইআরসি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিভাগের নীতিগত সায় পাওয়ার পর বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) পাইকারি মূল্যের কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করেছে। সেই পথ ধরে বিতরণ কোম্পানিগুলোও খুচরা পর্যায়ে দাম সমন্বয়ের আবেদন জমা দিয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোতে দেখা যাচ্ছে, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে ১ দশমিক ২০ থেকে ১ দশমিক ৫০ টাকা পর্যন্ত (প্রায় ১৭থেকে ২১%) দাম বাড়তে পারে।

খুচরা পর্যায়ে বাড়ছে যত

খুচরা পর্যায়ে ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ দশমিক ৩৮ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি পিজিসিবি সঞ্চালন চার্জ হিসেবে প্রতি ইউনিটে ১৬ পয়সা বাড়ানোর আবেদন করেছে। যদিও সরকার বলছে, লাইফলাইন গ্রাহকদের বা নিম্নবিত্তদের আপাতত চাপের বাইরে রাখা হবে, তবুও দেশের প্রায় ৫ কোটি গ্রাহকের মধ্যে অন্তত ৩৭ শতাংশ এই সরাসরি মূল্যবৃদ্ধির শিকার হবেন।

যে কারণে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

বিদ্যুৎ খাতের এই দাম বাড়ানোর পেছনে সরকার প্রধানত উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের বিশাল ব্যবধানকে দায়ী করছে। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে গড় ব্যয় হয়, তা বর্তমান বিক্রয়মূল্যের তুলনায় প্রায় ৫ টাকা ৫০ পয়সা বেশি। এর ফলে চলতি অর্থবছরে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ৫৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়াকেও নীতিনির্ধারকরা অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন।

যা বলছেন অর্থনীতিবিদরা

অর্থনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল ঘাটতির প্রধান কারণ সরকারের ভুল পরিকল্পনা এবং চুক্তির দায়বদ্ধতা। বিশেষ করে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার না করেও বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে যে বিশাল অংকের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়, তা এই খাতের ভর্তুকির বোঝাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার অভাব বিদ্যুৎ খাতকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, ঘাটতি দেখিয়ে বারবার দাম বাড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। যদি বিদ্যুৎ খাতের অদক্ষতা, অপচয় এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি কমানো যেত, তবে ভর্তুকির চাপ অনেকটাই কমে আসত।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তা কলকারখানার উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেবে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। ফলে সাধারণ মানুষের ওপর দ্বিমুখী অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতেও বিদ্যুতের দাম এক দফা বাড়ানো হয়েছিল। এখন যদি মে মাসের গণশুনানির পর প্রস্তাবগুলো অনুমোদিত হয়, তবে জুন মাস থেকেই গ্রাহকদের বাড়তি বিল গুনতে হবে। সাধারণ মানুষের স্থবির হয়ে যাওয়া আয় এবং আকাশচুম্বী খাদ্যমূল্যের এই সময়ে কাঠামোগত সংস্কার না করে কেবল দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি সামাল দেওয়ার সরকারি কৌশল জনমনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করছে।

সম্পর্কিত