পর্ব-১

হিন্দুত্ববাদী আরএসএস যেভাবে ভারতীয় রাজনীতির দখল নিল

ইয়াসির আরাফাত
ইয়াসির আরাফাত
হিন্দুত্ববাদী আরএসএস যেভাবে ভারতীয় রাজনীতির দখল নিল
২০১৫ সালে গুজরাটে আরএসএস-এর সম্মেলনে শরীরচর্চার একটি মুহূর্ত। ছবি: রয়টার্স

হিন্দুত্ববাদীদের কাছে হিন্দু-প্রধান ভারতের কল্পনা একদা দিবাস্বপ্নের মতো ছিল। কিন্তু ভারতে এখন বিভিন্ন ধর্মের ১৪০ কোটি মানুষ বাস করলেও সেই ধারণা অনেকটাই মূলধারায় চলে এসেছে। গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অধীনে ভারত রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় ব্যাপকভাবে রূপান্তরিত হয়েছে। এই রূপান্তরের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) নামে একটি বিশাল সংগঠন, যা ২০২৫ সালে তার শতবর্ষ উদ্‌যাপন করছে।

মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস তাদের ছাপা পত্রিকায় ও অনলাইনে আরএসএসের ১০০ বছরের কীর্তিকলাপ নিয়ে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। চার হাজার শব্দের এই দুটি প্রতিবেদন গত ২৯ ডিসেম্বর একই দিনে প্রকাশ করা হয়েছে। নাগপুর থেকে প্রতিবেদন দুটি লিখেছেন মুজীব মাশাল ও হরি কুমার।

২০২৫ সাল ছিল আরএসএসের প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ। তারপরেও বছরের একেবারে শেষ সময়ে এসে এ ধরনের দুটি বিশাল প্রতিবেদন প্রকাশ করায় নানা কথা উঠেছে। প্রতিবেদন দুটির মধ্যে একটির শিরোনাম, ‘ফ্রম শ্যাডো টু পাওয়ার: হাউ হিন্দু রাউট রিশেপড ইন্ডিয়া’ (ছায়া থেকে কায়া: যেভাবে হিন্দু দক্ষিণপন্থীরা পাল্টে দিল ভারতকে)। অন্যটির শিরোনাম, ‘ফাইভ কী মোমেনটস ইন দ্য রাইজ অব ইন্ডিয়া হিন্দু-ফাস্ট পাওয়ারহাউস’ (ভারতের হিন্দুত্ববাদী ক্ষমতাকেন্দ্রের উত্থানের পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত)।

নিউইয়র্ক টাইমস এমন সময় দুই প্রতিবদেন প্রকাশ করল, যখন আমেরিকা ও ভারতের সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। রাশিয়ার তেল কেনা, ইরানের সাথে সম্পর্কসহ নানা বিষয় নিয়ে টানাপড়েন চলছে দুই দেশের মধ্যে। আমেরিকা প্রবাসী বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, কোনো বিশেষ কারণ ছাড়া নিউইয়র্ক টাইমস এ সময়ে এমন দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। কারণ, এই দুটি প্রতিবেদনে এমন কিছু নেই যা অন্যরা জানে না। এক সময় আরএসএসের ঘনিষ্ঠ পার্থ চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, ভারতের মোদি সরকারকে চাপে রাখতে এবং পুরোপুরি আমেরিকার সমর্থনে সুর মেলানোর জন্য এই চাপ হতে পারে। বিশ্বব্যাপী যে পরিবর্তন চলছে, তাতে আমেরিকা চায় নিঃশর্ত সমর্থন।

এই আলোচনায় যাওয়ার আগে দেখা যাক নিউইয়র্ক টাইমস ঠিক কী লিখেছে। পত্রিকাটি লিখেছে, নিজস্ব সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং অসংখ্য সহযোগী সংগঠনের প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে আরএসএস রাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষা ও সংস্কৃতি পর্যন্ত জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে উপস্থিত। এভাবে তারা ভারতের ভবিষ্যতের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করছে।

১৯২৫ সালে আরএসএস-এর সূচনা হয়েছিল একটি গুপ্ত সংগঠন হিসেবে, দীর্ঘ মুসলিম শাসন ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ‘হিন্দু গৌরব’ পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে। ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে এই সংগঠনের প্রথমদিকের নেতারা ইউরোপের ফ্যাসিস্ট দলগুলোর জাতীয়তাবাদী আদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। গান্ধী হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকাসহ বিভিন্ন অভিযোগে সংগঠনটিকে একাধিকবার নিষিদ্ধ করা হয়। তারপরও সংগঠনটি টিকে আছে এবং বর্তমান বিশ্বের বৃহত্তম ডানপন্থী শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

আরএসএস-এর সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও সক্রিয় সদস্যদের একজন নরেন্দ্র মোদি, যিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় ক্ষমতার শীর্ষে। সে কারণে সংগঠনটি এমন সাফল্য ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, যা তাদের অনেক নেতা কখনো কল্পনাও করেননি। যদিও প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে মাঝে মাঝে তাদের মতানৈক্য হয়েছে, তবু আরএসএস ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রকে একটি কট্টরপন্থী হিন্দুপ্রধান রাষ্ট্রে রূপান্তরের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

আরএসএস ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে যে, মোদি ক্ষমতা ছাড়ার পরও এটি একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে থেকে যাবে। তাদের সহযোগী সংগঠনের ছাতার নিচে সমাজ, সরকার, আদালত, পুলিশ, গণমাধ্যম এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবই আছে। এদের ভেতরে তারা নিজেদের মূল সদস্যদের ঢুকিয়ে দিয়েছে। তারা অনেকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে দেয়, আবার ধ্বংসও করে। হিন্দু জাতীয়তাবাদী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তরুণদের নিজ নিজ সমাজে প্রভাব ও গুরুত্ব অর্জনের একটি পথ দেখিয়ে তারা সমগ্র দেশে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে।

যদিও আরএসএস-এর আচরণে এখনো একটি গুপ্ত সংগঠনের ভাব বজায় আছে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের সদস্য ও প্রভাব সর্বত্র উপস্থিত।

বিভিন্ন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির আধিপত্য আসলে আরএসএস-এর রাজনৈতিক যন্ত্রকে সক্রিয়করণ, যেখানে কেন্দ্রীয় সংগঠনটি দলের প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণ করে। আর হিন্দু উগ্রবাদীদের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা দিয়ে মিছিল বা গির্জা ভাঙচুর করা প্রকৃতপক্ষে আরএসএস-এর সহযোগী সংগঠনগুলোর আধিপত্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব প্রয়োগ।

আরএসএস-এর সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও সক্রিয় সদস্যদের একজন নরেন্দ্র মোদি, যিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় ক্ষমতার শীর্ষে। ছবি: রয়টার্স
আরএসএস-এর সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও সক্রিয় সদস্যদের একজন নরেন্দ্র মোদি, যিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় ক্ষমতার শীর্ষে। ছবি: রয়টার্স

উত্থান

১০০ বছর আগে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন যখন গতি পাচ্ছে, তখন একদল হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদ আরও গভীর একটি বিষয়ে মনোযোগ দিচ্ছিলেন। আর তা হলো, আগের শতাব্দীগুলোতে মুসলিম শাসনের প্রভাবে সমাজে যে পরিবর্তন এসেছে, সেই অবস্থা থেকে হিন্দু জনগোষ্ঠীকে কীভাবে টেনে তোলা যায়।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম সারির অনেকের মধ্যে একটি রক্ষণশীল প্রবণতা ছিল। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মতো উদার নেতারা যে বহুত্ববাদী ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা নিয়ে তারা অস্বস্তি বোধ করতেন। হিন্দু সমাজকে তৃণমূল স্তর থেকে সংগঠিত করার জন্য একটি বাহিনী গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন একজন চিকিৎসক, নাম কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার। তিনি মহারাষ্ট্রের নাগপুর শহরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত সংগঠনটির মূল সাংগঠনিক নীতিতে তেমন পরিবর্তন আসেনি। ঘনিষ্ঠ সম্প্রদায় গড়ে তোলা-যারা সকালে শারীরিক অনুশীলন করে এবং হিন্দু ইতিহাস ও পুরাণ থেকে অনুপ্রেরণামূলক পাঠ নেয়। এইসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আজীবনের জন্য এক ধরনের ‘বয় স্কাউট’-সদৃশ বাহিনী তৈরি করা হয়। আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠাতা নেতারা তাদের লড়াইয়ের সংজ্ঞা স্পষ্ট ভাষায় নির্ধারণ করেছিলেন: ভারতের একমাত্র পরিচয় হবে হিন্দু রাষ্ট্র।

১৯৩৯ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে সংগঠনটির দ্বিতীয় প্রধান গোলওয়ালকর জার্মানিতে হিটলারের ইহুদি নিধনের উদাহরণ টেনে বলেন, বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতিকে একত্র করে একটি ঐক্যবদ্ধ রূপ দেওয়া সম্ভব নয়। গোলওয়ালকরের যুক্তি ছিল, অ-হিন্দুরা কেবল তখনই ভারতে থাকতে পারবে, যদি তারা সম্পূর্ণভাবে হিন্দু জাতির অধীনস্থ থাকে, কোনো দাবি না করে, কোনো বিশেষ অধিকার প্রত্যাশা না করে- এমনকি নাগরিক অধিকারও নয়।

তবে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভেতরে থাকা রক্ষণশীল ধারাটি প্রথমদিকে এক উদারপন্থী অভিজাত শ্রেণির কাছে পরাজিত হয়, যারা বহুত্ববাদী ভারতের স্বপ্ন আঁকড়ে ধরেছিল। এই ধারার নেতৃত্বে ছিলেন গান্ধী, যিনি ধর্মীয় সহিংসতার প্রতিবাদে অনশন করেছিলেন।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করার সময় মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যে দেশের একটি বড় অংশ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে যায়। হিন্দু ডানপন্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, কারণ নতুন ভারতীয় রাষ্ট্রকে কোনো স্পষ্ট ধর্মীয় পরিচয় দেওয়া হয়নি। তাদের ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হন গান্ধী। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী আজও ভারতের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী একজন ব্যক্তিত্ব এবং সারা বিশ্বে তার পরিচিতি আছে। তার উদারপন্থী রাজনীতির প্রতি হিন্দু ডানপন্থীরা সহিংসভাবে বিরোধিতা করে এসেছে। হিন্দু ডানপন্থীদের অনেকেই গান্ধীকে একজন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে দেখতেন। কারণ তিনি অসম্প্রদায়িক নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। নাথুরাম বিনায়ক গডসে নামে এক হিন্দু উগ্রবাদী ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি দিল্লিতে এক প্রার্থনাসভায় খুব কাছ থেকে গুলি করে গান্ধীকে হত্যা করেন। আরএসএস দাবি করে, গান্ধী হত্যাকাণ্ডের আগে গডসে সংগঠনটি ছেড়ে দিয়েছিল। এভাবে তারা গান্ধীহত্যার দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। তবুও এই ঘটনার পরে ভারত সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেয় এবং এক বছরেরও বেশি সময়ের জন্য আরএসএসকে নিষিদ্ধ করে।

আরএএস প্রধান মোহন ভগবত
আরএএস প্রধান মোহন ভগবত

রাজনীতিতে পোক্ত অবস্থান

১৯৭৫ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেস দলের নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী গণতন্ত্র স্থগিত করে ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করেন। তার সংসদীয় আসনে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর তিনি ক্ষমতা হারাতে যাচ্ছিলেন বলেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ইন্দিরা গান্ধী ব্যাপকভাবে বিরোধীদলীয় নেতা ও কর্মীদের গ্রেপ্তার করেন এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তার সরকার আরএসএস ও অন্যান্য বিরোধীদলের কর্মীদের ওপর নিপীড়ন শুরু করলে তাদের প্রতি জনগণের মধ্যে সহানুভূতির একটি ঢেউ সৃষ্টি হয়। বিপুল সংখ্যক আরএসএস নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তারা নিজেদের ভারতীয় গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনের স্তম্ভ হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করে।

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর আন্দোলনে অংশ নিয়ে আরএসএস ধীরে ধীরে গান্ধী হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে তাদের দীর্ঘদিনের কলঙ্ক অনেকটাই ঝেড়ে ফেলতে সক্ষম হয়। ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতাচ্যুত হলে, আরএসএসের রাজনৈতিক শাখার সদস্যরা জনতা পার্টি নামে কথিত জোট সরকারে মন্ত্রিসভায় স্থান পান।

একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ও দীর্ঘদিনের আরএসএস সদস্য ৮৪ বছর বয়সী এস এম বাঘড়কা বলেন, “আমার মা কংগ্রেসকে ভোট দিতেন। কিন্তু আমার বাবা আরএসএসকে সমর্থন করতেন। ইন্দিরা আমার বাবাকে জেলে পাঠানোর পর, আমার মা-ও আরএসএস সমর্থন করা শুরু করেন।”

আরএসএসের রাজনৈতিক শাখা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং তাদের বহু সহযোগী সংগঠন ১৯৮০-এর দশক থেকে বাবরি মসজিদ-সংক্রান্ত বিতর্ককে কেন্দ্র করে হিন্দুদের ক্ষোভকে ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় স্তম্ভে পরিণত করে। উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের অযোধ্যা শহরে অবস্থিত বাবরি মসজিদ নির্মিত হয় ষোড়শ শতকে। কথিত আছে, মসজিদটি নির্মাণ করেন প্রথম মোগল সম্রাট জহির উদ্দীন মুহম্মদ বাবর। শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও ছিল। এই মসজিদটি আরএসএস-এর প্রতীকী লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তাদের দাবি ছিল, এটি যে জমিতে নির্মিত সেখানে একসময় হিন্দুদের দেবতা রামের জন্ম এবং সেখানে রামের মন্দির ছিল। এই বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিচারব্যবস্থায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু হিন্দু ডানপন্থীরা ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে থাকে।

আরএসএস এটিকে হিন্দুদের সংগঠিত করার এবং বিজেপির জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ ভোটব্যাংক গড়ে তোলার রাজনৈতিক মঞ্চে রূপ দেয়। দলের সভাপতি এল কে আদভানি প্রাচীন রথের আদলে সাজানো একটি ট্রাকে চড়ে সারা দেশ ঘুরে বেড়ান এবং মসজিদ ভেঙে সেখানে মন্দির নির্মাণের পক্ষে সমর্থন জোগাড় করতে থাকেন। তার বহর অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে প্রাণঘাতী উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল হিন্দুধর্মের বিপুল বৈচিত্র্যকে একটি ঐক্যের মধ্যে আনা। এই উত্তেজনার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর, যখন আরএসএস সদস্যদের উসকানিতে বিপুলসংখ্যক জনতা লোহার রড, কোদাল এবং প্রচণ্ড ক্রোধ নিয়ে মসজিদের গম্বুজে উঠে সেটি ভেঙে ফেলে। সেই থেকে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানটি আন্দোলনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এই ঘটনার মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছাই হয়ে ওঠে রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এরপর আরএসএসের রাজনৈতিক উত্থান অনেক দ্রুততর হয়। বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনার ফলশ্রুতিতে ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারায়।

আরএসএস-এর  শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপক্ষে এক অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
আরএসএস-এর শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপক্ষে এক অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

এরপর আরএসএস আবারও নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু আরএসএস তাদের লক্ষ্য অপরিবর্তিত রেখে অতীতের ক্ষোভকে কেন্দ্র করে হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং তৃণমূল স্তর থেকে এক ধরনের উগ্র প্রতিশোধপরায়ণ মানসিকতা ঢুকিয়ে দেওয়ার কাজ চলমান রাখে।

বর্তমান কার্যক্রম

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২৫ সারের আগস্টে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সম্মান জানান, যারা তার জীবন বদলে দিয়েছে এবং আজ ভারতের রূপান্তরে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখছে। মোদি তার ১১ বছরের শাসনকালে এই প্রথম প্রকাশ্যে এবং এত স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর প্রতি সমর্থন জানালেন। এই কট্টর ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনটি শৈশব থেকেই তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন গঠনে ভূমিকা রেখেছে। সংগঠনটি যখন গত বছর তাদের শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন করছে, তখন প্রধানমন্ত্রীর এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে ক্ষমতার লড়াইয়ে আরএসএস-এর প্রভাব কতটা শক্তিশালী।

আগস্টের এক ভোরে মুম্বাইয়ের একটি স্থানীয় পার্কে, অন্ধকারের মধ্যেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রায় এক ডজন পুরুষ জড়ো হন। তাদের মধ্যে ছিলেন জমি ব্যবসায়ী, বিজ্ঞাপন সংস্থার কর্মী এবং অবসরপ্রাপ্ত নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তা। আরএসএস-এর সঙ্গে তাদের কেউ পাঁচ বছর ধরে জড়িত, আবার কেউ ৫৫ বছর ধরে। প্রত্যেকে একটি ছোট গেরুয়া পতাকার সামনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তারপর দলের নেতার দিকে মাথা নেড়ে একটি বৃত্তাকার হয়ে ভক্তিমূলক গান গাইতে থাকেন। একজন প্রশিক্ষকের নির্দেশে তারা শরীরচর্চা শুরু করেন। বয়সের ছাপ থাকা সত্ত্বেও তারা সুসমন্বিত, প্রায় সামরিক তৎপরতায় অনুশীলন করেন। প্রতিদিনের মতোই সকালের কার্যক্রম শেষ হয় একইভাবে: সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে, ডান হাত বুকের সামনে বাড়িয়ে, তালু নিচের দিকে রেখে, গেরুয়া পতাকার দিকে মাথা নত করে। আরএসএস-এর এই ছোট ছোট শাখাগুলো প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে।

বর্তমানে দেশজুড়ে আরএসএস-এর ৮৩ হাজার শাখা রয়েছে, যেগুলো পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এই শাখাগুলোই তাদের কল্পিত ভারতের জন্য যেসব মানুষকে যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, তাদের তৈরি করার কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে। সহমর্মিতা ও সম্প্রদায়বোধের ওপর ভর করে, প্রতিদিন একই কথা বলতে বলতে তারা তাদের আদর্শ মানুষের মনে ঢুকিয়ে দেয়।

এই শাখাগুলির কাজের মাধ্যমে আরএসএস সম্ভাবনাময় ব্যক্তিদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং পরবর্তী নেতৃত্ব খুঁজে বের করে। (নরেন্দ্র মোদিও ছোটবেলায় এখানে যাতায়াত শুরু করেছিলেন, পরে যুবক বয়সে তিনি পূর্ণকালীন আরএসএস-কর্মী হন।)

সাম্প্রতিক এক বক্তৃতায় শাখাগুলোর কার্যক্রম প্রসঙ্গে আরএসএস-এর ষষ্ঠ ও বর্তমান প্রধান মোহন ভগবত বলেন, “গত ১০০ বছর ধরে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকেরা সব ধরনের পরিস্থিতির মধ্যেও এই ব্যবস্থাকে ধারাবাহিকভাবে টিকিয়ে রেখেছেন।” আরএসএসের প্রধানের কাজকে অনেক সময় রোমান ক্যাথলিক চার্চের পোপের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

প্যারিসের সায়েন্সেস পো-তে গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে আরএসএস নিয়ে গবেষণা করেছেন। সংগঠনটির কার্যপদ্ধতিকে তারা এভাবে বর্ণনা করেছেন, “নতুন নতুন সংগঠন সৃষ্টি করে নেটওয়ার্ক বিস্তার করা হয়, যেখানে সেগুলোকে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের অধীনে রাখা হয়।” গবেষকেরা এমন ২৫০০টি সংগঠন শনাক্ত করেছেন, যাদের মধ্যে বাস্তব, অনুসরণযোগ্য ও বস্তুগত সম্পর্ক রয়েছে।

আরএসএস-এর রাজনৈতিক আধিপত্যের কারণে ১৪০ কোটি মানুষের দেশ ভারত এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ধর্মীয় বিভাজনের রেখায় বিভক্ত। তাদের দর্শন অনুযায়ী, ভারতের ২০ কোটি মুসলমান ও খ্রিস্টান আসলে বিদেশি আক্রমণকারীদের বংশধর, এখন তাদের জায়গায় নিজেদের বসানো দরকার বলে তারা মনে করে।

চলবে…

সম্পর্কিত