ভূরাজনীতির খেল: পর্ব ৪
ফজলুল কবির

এ প্রশ্নে উত্তর খুঁজতে গেলে একটু পেছনে ফিরতে হবে। স্নায়ুযুদ্ধ‑পরবর্তী আড়াই দশকে আঞ্চলিকতাবাদ ও জাতীয়তাবাদকে হটিয়ে বিশ্বমঞ্চে বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজারের রাজত্ব চলেছে। এই রাজত্ব এখন ক্ষয়িষ্ণু। অনেকে এই রাজত্বের অন্যতম উপাদান হিসেবে হাজির হওয়া গণতন্ত্র, মানবাধিকার (চলমান সংজ্ঞামতে), বিশ্বায়ন বা বিশ্বগ্রাম ধারণা, নাগরিক ও মৌলিক অধিকারের গ্রাহ্য সংজ্ঞাগুলোর ক্ষয় দেখছেন। যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের জয় ঘোষিত হয়েছিল গেল শতকের বিশেষত শেষার্ধে, তারও সীমা টেনে দিতে চাইছেন কেউ কেউ। আর এই সবকিছুর বিলোপ ও নয়া কিন্তু অসংজ্ঞায়িত একটা ব্যবস্থার আগমনের ভবিষ্যদ্বানীও হাজির হচ্ছে এর সাথে। এ নিয়ে নানা জন নানা তৎপরতা চালাচ্ছেনও বটে। এ ক্ষেত্রে শীর্ষ তৎপরদের একজন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি তেমন কোনো লুকোছাপাও করছেন না। এ জন্য তাকে ধন্যবাদ।
স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে জাতীয়তাবাদী ধারণার জায়গাটি দখল করে বিশ্বায়ন ধারণা। খুব খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে–আন্তর্জাতিকতাবাদ নয়। এই একই সময়ে গণতন্ত্র, মুক্তবাজার ও ক্রমবিকাশমান প্রযুক্তির হাত ধরে বিকশিত হতে শুরু করে একের পর এক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আবার পরস্পরের সঙ্গে এক জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুক্ত। মার্কিন সাময়িকী দ্য ফরেইন অ্যাফেয়ার্সে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো ও তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্ক ২০১০ সালের পর থেকে পরবর্তী এক দশক ধরে ক্রমে ভেঙে পড়তে শুরু করে। তাদের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক বা নেটওয়ার্কটি ক্রমে দুর্বল হতে শুরু করে। একে দিকবদল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন নিবন্ধটির লেখক মাইকেল কিমেজ। উইলসন সেন্টারের কেনান ইনস্টিটিউটের এই পরিচালকের ভাষ্যমতে, এই ক্ষয় গোটা বিশ্বকে এক জটিল পরিস্থিতির মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে।
অবশ্য মার্কিন দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভেঙে পড়া বা ধ্বসে পড়াটা জটিল পরিস্থিতিই বটে। কারণ, এর ফলের ওপরই নির্ভর করছে কে বা কারা ভবিষ্যৎ বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে। একক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র টিকবে, নাকি একমেরু বিশ্বকাঠামোরই কবর রচিত হবে? যদি একমেরু টিকেও যায়, তবে সেই মেরুতে কে থাকবে?
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকাকে কেন্দ্রে রেখে যে একমেরু বিশ্বকাঠামো যাত্রা করে, তার ক্ষয় মানে যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষয়। আর এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি আমেরিকার ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্য বা মুকুটটি পুনরুদ্ধার করে তাকে আবার ‘গ্রেট’ বানানোর প্রতিশ্রুতি শুনিয়ে যাচ্ছেন গত দশক থেকে।
তবে এ ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধ‑পরবর্তী প্রেসিডেন্টদের চেয়ে অনেকটাই ব্যতিক্রম। কারণ, তিনি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মুক্তবাজার ইত্যাদি পরিচিত মার্কিন অস্ত্র দিয়ে এই লড়াই করতে চান না। তার দৃষ্টিতে, এই সব অস্ত্র এখন জংধরা, পুরোনো। এগুলো আর কাজ করবে না। এগুলোর নবায়ন দরকার। কী সেই নবায়ন?
ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন মুকুটের অন্যতম পালক ‘বিশ্বায়ন’‑কে ফের জাতীয়তাবাদ দিয়ে প্রতিস্থাপন করছেন। শুধু জাতীয়তাবাদ বললে ভুল হবে, তিনি একে উগ্র ধারা দিয়েই বরং প্রতিস্থাপন করতে চান, যা এখন উপনিবেশবাদী ধারণায় আশ্রয় খুঁজছে। মুক্তবাজারকে রক্ষণশীল অর্থনৈতিক কাঠামো দিয়ে প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি তিনি ‘মানবাধিকার’ বা ‘নাগরিক অধিকার’ ইত্যাদি বিষয়কে ‘বস্তাপচা’ এবং ‘ডেমোক্রেটিক দুর্বলতা’ হিসেবে আখ্যা দিতে চান।
এটা শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্প নন, বিশ্বের শীর্ষ আলোচিত সব নেতার মধ্যেই এ প্রবণতা এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফিরে আসছে পুরোনো ধাঁচের ‘শক্তিশালী নেতা’, ‘মহান জাতি’ ও ‘গর্বিত সভ্যতা’–কেন্দ্রিক ব্যবস্থাপত্র।
প্রশ্ন আসতে পারে যে, কবে থেকে এ ধরনের প্রবণতার শুরু। উত্তর খুঁজতে গেলে বলতে হয়, শুরুটা হয়েছিল ২০০৮ সালের মহামন্দা থেকেই। কারণ, অসুখটা যে সে সময়টাতেই দৃশ্যমান হয়েছিল। মাইকেল কিমেজ অবশ্য বলছেন, শুরুটা হয়েছিল ২০১২ সালে। প্রেসিডেন্সি ছেড়ে ভ্লাদিমির পুতিনের প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণের সংক্ষিপ্ত পরীক্ষা শেষ হয় সে বছর। ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন তারই অনুরক্ত দিমিত্রি মেদভেদেভ। তারপরই ফিরে আসেন পুতিন এবং সব বিরোধী মতকে দমন করে সর্বময় কর্তা হয়ে ওঠেন। লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের আধিপত্যকে হটিয়ে রাশিয়াকে ‘গ্রেট পাওয়ার’ হিসেবে পুনরায় বিশ্বমঞ্চে হাজির করার। এর দুই বছর পর চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংও ঠিক একই পথ নেন। তবে ভ্লাদিমির পুতিনের চেয়ে আরও ব্যাপকভাবে।
আর চীন তো ততদিনে সক্ষমতায় রাশিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে। একই বছর; অর্থাৎ, ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদি, যিনি হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদকে ভারতের প্রধান আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। একই বছর তুরস্কের মসনদে বসেন রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। কিছুদিনের মধ্যেই এই কট্টর ডানপন্থী শাসক তুরস্কের প্রশাসনকে ‘ওয়ান ম্যান শো’‑তে পরিণত করেন। আর ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইউরোপ যেভাবে নিজেকে একলা হিসেবে আবিষ্কার করেছে, তাতে বিগত জাত্যাভিমান মাথাচাড়া দিচ্ছে ক্রমশই। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে যে বৃহত্তর পশ্চিমের ধারণাকে তারা এতদিন যূথবদ্ধভাবে প্রচার করেছে, তা ক্রমেই আড়াল হারাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রেরও আর সেই আড়ালের প্রয়োজন নেই। জাতে ওঠা সম্পন্নের পর তার এখন আমেরিকা হওয়ার সাধ প্রবল।
কী ঘটেছিল ২০০৮ সালে? ২০০৮‑এর মহামন্দার পর গোটা বিশ্ব একটা বড় ধাক্কা খায় মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়ন ধারণা দ্বারা। মার্কিন ডলারের শক্তিমত্তা নিয়েও একটা সংশয় তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতিতেই উদীয়মান অর্থনীতির চার দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন মিলে ব্রিক গঠনের পথে হাঁটতে শুরু করে, যার সাথে পরে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেয়, যা এখন ব্রিকস নামে পরিচিত। তারা ২০০৯ সালে নতুন একটি বৈশ্বিক রিজার্ভ কারেন্সির প্রয়োজনীয়তার কথা ঘোষণা করে।
বলে রাখা ভালো যে, এখনো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোট রিজার্ভের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ মার্কিন ডলারেই রক্ষিত হয়। ফলে ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে ওঠা চীনের পৌরহিত্বে এ ধরনের একটি উদ্যোগকে সহজভাবে নেওয়ার কোনো কারণই নেই যুক্তরাষ্ট্রের। বিশেষত যখন ব্রিকস (তখনকার ব্রিক) বলছিল যে, বৈচিত্র্যপূর্ণ, স্থিতিশীল ও অনুমানযোগ্য একটি অভিন্ন মুদ্রার কথা। এই আলোচনা এমনকি এত দূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল যে, ডলারের বদলে অন্য কোনো মুদ্রা বা একেবারে নতুন কোনো মুদ্রায় রিজার্ভ রাখার বিষয়ে একটি বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথে এই দেশগুলো এগিয়ে যায়। আর এই পথে তারা দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশকেও সাথে পায়। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলোর তৎকালীন নেতৃত্বের কেউ এখন আর মসনদে নেই। আরব বসন্তের হাওয়া তাদের উড়িয়ে নিয়ে গেছে। এই আরব বসন্ত সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বেশ খোলাখুলিই সেখানে মার্কিন স্বার্থ ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার কথা বলেছিলেন। ফলে চীনের ডাকে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা রাজনীতিতে ডলারের প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরিতে সায় দেওয়ার সাজা হোসনি মোবারক থেকে শুরু করে গাদ্দাফিরা পেয়ে গেছেন বলা যায়। আরব বসন্তের প্রেক্ষাপট এবং তারপর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে নয়া শাসনের ধর্ম ও ধরন এবং তা নিয়ে ওবামা‑হিলারিদের সন্তোষ অন্তত সে বার্তাই দেয়। খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে–সেই বসন্তে সব ওলট‑পালট হলেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্ররা কিন্তু রেহাই পেয়েছিল। যদিও জনতার অসন্তোষ সেই দেশগুলোর শাসকদের প্রতিও একই রকম ছিল।
দক্ষিণ আমেরিকায় তখন মার্কিন ঈগল যাদের বাধার মুখে পড়েছিল, তাদের একজন ফিদেল কাস্ত্রো, আর অন্যজন হুগো শাভেজ, যার মনোনীত এবং প্রভাব ও ক্যারিশমা বিচারে তুলনায় দুর্বল মাদুরো এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বন্দী।
তেলসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে শুধু নয়, ভনেজেুয়েলা সে সময় বৈশ্বিক নেতৃত্বের দিক থেকে অগ্রগণ্য না হলেও উল্লেখযোগ্য একটি নাম। আর তা সম্ভব হয়েছিল শাভেজের কারণেই। মাদুরো শাভেজের উত্তরসূরি হয়েছেন, কিন্তু কতটা যোগ্য, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। শাভেজ রাশিয়াসহ তাবৎ তেলসমৃদ্ধ দেশকে এক টেবিলে বসতে বাধ্য করেছিলেন। ওপেককে শক্তিশালী করা থেকে শুরু করে, রাশিয়া, ইরান, বেলারুশ, সিরিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অসংখ্য চুক্তি করেছেন, ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। ২০১৩ সালে শাভেজের মৃত্যুর পর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়ার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে ফেলে দেশটি। ক্রমাগত অজনপ্রিয় হয়েছেন মাদুরো। সাথে ছিল দুর্নীতি। দুর্বল হয়েছে শাভেজ প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ আমেরিকার আঞ্চলিক ফোরামগুলো।
ফলে মার্কিন ঈগলে শক্তি ক্রমশ বেড়েছে। বিপরীতে কমেছে বলিভারিয়ান বিপ্লবের শক্তি, যা লাতিন আমেরিকাকে দিনের পর দিন দম দিয়ে গেছে প্রবল শক্তির বিপরীতে লড়ে যাওয়ার। আর এই দুর্বল কাঠামোতেই আঘাত করছেন ট্রাম্প এখন। চোখে তার ‘গ্রেট আমেরিকার’ স্বপ্ন। তিনি তেল চান, বিরল খনিজ চান, ক্রিটিক্যাল মিনারেলস চান, নৌপথ চান, সম্পর্ক নয় আর্কটিকের বাস্তব বরফের গলে যাওয়া চান। আর এসব চাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মিলিত অধীশ্বর হতে চান। এমনকি গোটা পশ্চিম গোলার্ধই চান। তার এ চাওয়ার পথে বাধা এখন চীন, রাশিয়া। তবে দূরবর্তী মনে হলেও ইউরোপও কিন্তু প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। কারণ, ‘ডেথ অব ওয়েস্ট’ ধারণার আগমনধ্বনীর সঙ্গে সঙ্গে ‘ওয়েস্ট’ ধারণার মৃত্যুঘণ্টা যে বেজে গেছে।

এ প্রশ্নে উত্তর খুঁজতে গেলে একটু পেছনে ফিরতে হবে। স্নায়ুযুদ্ধ‑পরবর্তী আড়াই দশকে আঞ্চলিকতাবাদ ও জাতীয়তাবাদকে হটিয়ে বিশ্বমঞ্চে বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজারের রাজত্ব চলেছে। এই রাজত্ব এখন ক্ষয়িষ্ণু। অনেকে এই রাজত্বের অন্যতম উপাদান হিসেবে হাজির হওয়া গণতন্ত্র, মানবাধিকার (চলমান সংজ্ঞামতে), বিশ্বায়ন বা বিশ্বগ্রাম ধারণা, নাগরিক ও মৌলিক অধিকারের গ্রাহ্য সংজ্ঞাগুলোর ক্ষয় দেখছেন। যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের জয় ঘোষিত হয়েছিল গেল শতকের বিশেষত শেষার্ধে, তারও সীমা টেনে দিতে চাইছেন কেউ কেউ। আর এই সবকিছুর বিলোপ ও নয়া কিন্তু অসংজ্ঞায়িত একটা ব্যবস্থার আগমনের ভবিষ্যদ্বানীও হাজির হচ্ছে এর সাথে। এ নিয়ে নানা জন নানা তৎপরতা চালাচ্ছেনও বটে। এ ক্ষেত্রে শীর্ষ তৎপরদের একজন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি তেমন কোনো লুকোছাপাও করছেন না। এ জন্য তাকে ধন্যবাদ।
স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে জাতীয়তাবাদী ধারণার জায়গাটি দখল করে বিশ্বায়ন ধারণা। খুব খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে–আন্তর্জাতিকতাবাদ নয়। এই একই সময়ে গণতন্ত্র, মুক্তবাজার ও ক্রমবিকাশমান প্রযুক্তির হাত ধরে বিকশিত হতে শুরু করে একের পর এক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আবার পরস্পরের সঙ্গে এক জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুক্ত। মার্কিন সাময়িকী দ্য ফরেইন অ্যাফেয়ার্সে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো ও তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্ক ২০১০ সালের পর থেকে পরবর্তী এক দশক ধরে ক্রমে ভেঙে পড়তে শুরু করে। তাদের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক বা নেটওয়ার্কটি ক্রমে দুর্বল হতে শুরু করে। একে দিকবদল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন নিবন্ধটির লেখক মাইকেল কিমেজ। উইলসন সেন্টারের কেনান ইনস্টিটিউটের এই পরিচালকের ভাষ্যমতে, এই ক্ষয় গোটা বিশ্বকে এক জটিল পরিস্থিতির মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে।
অবশ্য মার্কিন দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভেঙে পড়া বা ধ্বসে পড়াটা জটিল পরিস্থিতিই বটে। কারণ, এর ফলের ওপরই নির্ভর করছে কে বা কারা ভবিষ্যৎ বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে। একক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র টিকবে, নাকি একমেরু বিশ্বকাঠামোরই কবর রচিত হবে? যদি একমেরু টিকেও যায়, তবে সেই মেরুতে কে থাকবে?
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকাকে কেন্দ্রে রেখে যে একমেরু বিশ্বকাঠামো যাত্রা করে, তার ক্ষয় মানে যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষয়। আর এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি আমেরিকার ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্য বা মুকুটটি পুনরুদ্ধার করে তাকে আবার ‘গ্রেট’ বানানোর প্রতিশ্রুতি শুনিয়ে যাচ্ছেন গত দশক থেকে।
তবে এ ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধ‑পরবর্তী প্রেসিডেন্টদের চেয়ে অনেকটাই ব্যতিক্রম। কারণ, তিনি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মুক্তবাজার ইত্যাদি পরিচিত মার্কিন অস্ত্র দিয়ে এই লড়াই করতে চান না। তার দৃষ্টিতে, এই সব অস্ত্র এখন জংধরা, পুরোনো। এগুলো আর কাজ করবে না। এগুলোর নবায়ন দরকার। কী সেই নবায়ন?
ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন মুকুটের অন্যতম পালক ‘বিশ্বায়ন’‑কে ফের জাতীয়তাবাদ দিয়ে প্রতিস্থাপন করছেন। শুধু জাতীয়তাবাদ বললে ভুল হবে, তিনি একে উগ্র ধারা দিয়েই বরং প্রতিস্থাপন করতে চান, যা এখন উপনিবেশবাদী ধারণায় আশ্রয় খুঁজছে। মুক্তবাজারকে রক্ষণশীল অর্থনৈতিক কাঠামো দিয়ে প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি তিনি ‘মানবাধিকার’ বা ‘নাগরিক অধিকার’ ইত্যাদি বিষয়কে ‘বস্তাপচা’ এবং ‘ডেমোক্রেটিক দুর্বলতা’ হিসেবে আখ্যা দিতে চান।
এটা শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্প নন, বিশ্বের শীর্ষ আলোচিত সব নেতার মধ্যেই এ প্রবণতা এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফিরে আসছে পুরোনো ধাঁচের ‘শক্তিশালী নেতা’, ‘মহান জাতি’ ও ‘গর্বিত সভ্যতা’–কেন্দ্রিক ব্যবস্থাপত্র।
প্রশ্ন আসতে পারে যে, কবে থেকে এ ধরনের প্রবণতার শুরু। উত্তর খুঁজতে গেলে বলতে হয়, শুরুটা হয়েছিল ২০০৮ সালের মহামন্দা থেকেই। কারণ, অসুখটা যে সে সময়টাতেই দৃশ্যমান হয়েছিল। মাইকেল কিমেজ অবশ্য বলছেন, শুরুটা হয়েছিল ২০১২ সালে। প্রেসিডেন্সি ছেড়ে ভ্লাদিমির পুতিনের প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণের সংক্ষিপ্ত পরীক্ষা শেষ হয় সে বছর। ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন তারই অনুরক্ত দিমিত্রি মেদভেদেভ। তারপরই ফিরে আসেন পুতিন এবং সব বিরোধী মতকে দমন করে সর্বময় কর্তা হয়ে ওঠেন। লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের আধিপত্যকে হটিয়ে রাশিয়াকে ‘গ্রেট পাওয়ার’ হিসেবে পুনরায় বিশ্বমঞ্চে হাজির করার। এর দুই বছর পর চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংও ঠিক একই পথ নেন। তবে ভ্লাদিমির পুতিনের চেয়ে আরও ব্যাপকভাবে।
আর চীন তো ততদিনে সক্ষমতায় রাশিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে। একই বছর; অর্থাৎ, ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদি, যিনি হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদকে ভারতের প্রধান আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। একই বছর তুরস্কের মসনদে বসেন রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। কিছুদিনের মধ্যেই এই কট্টর ডানপন্থী শাসক তুরস্কের প্রশাসনকে ‘ওয়ান ম্যান শো’‑তে পরিণত করেন। আর ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইউরোপ যেভাবে নিজেকে একলা হিসেবে আবিষ্কার করেছে, তাতে বিগত জাত্যাভিমান মাথাচাড়া দিচ্ছে ক্রমশই। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে যে বৃহত্তর পশ্চিমের ধারণাকে তারা এতদিন যূথবদ্ধভাবে প্রচার করেছে, তা ক্রমেই আড়াল হারাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রেরও আর সেই আড়ালের প্রয়োজন নেই। জাতে ওঠা সম্পন্নের পর তার এখন আমেরিকা হওয়ার সাধ প্রবল।
কী ঘটেছিল ২০০৮ সালে? ২০০৮‑এর মহামন্দার পর গোটা বিশ্ব একটা বড় ধাক্কা খায় মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়ন ধারণা দ্বারা। মার্কিন ডলারের শক্তিমত্তা নিয়েও একটা সংশয় তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতিতেই উদীয়মান অর্থনীতির চার দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন মিলে ব্রিক গঠনের পথে হাঁটতে শুরু করে, যার সাথে পরে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেয়, যা এখন ব্রিকস নামে পরিচিত। তারা ২০০৯ সালে নতুন একটি বৈশ্বিক রিজার্ভ কারেন্সির প্রয়োজনীয়তার কথা ঘোষণা করে।
বলে রাখা ভালো যে, এখনো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোট রিজার্ভের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ মার্কিন ডলারেই রক্ষিত হয়। ফলে ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে ওঠা চীনের পৌরহিত্বে এ ধরনের একটি উদ্যোগকে সহজভাবে নেওয়ার কোনো কারণই নেই যুক্তরাষ্ট্রের। বিশেষত যখন ব্রিকস (তখনকার ব্রিক) বলছিল যে, বৈচিত্র্যপূর্ণ, স্থিতিশীল ও অনুমানযোগ্য একটি অভিন্ন মুদ্রার কথা। এই আলোচনা এমনকি এত দূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল যে, ডলারের বদলে অন্য কোনো মুদ্রা বা একেবারে নতুন কোনো মুদ্রায় রিজার্ভ রাখার বিষয়ে একটি বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথে এই দেশগুলো এগিয়ে যায়। আর এই পথে তারা দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশকেও সাথে পায়। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলোর তৎকালীন নেতৃত্বের কেউ এখন আর মসনদে নেই। আরব বসন্তের হাওয়া তাদের উড়িয়ে নিয়ে গেছে। এই আরব বসন্ত সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বেশ খোলাখুলিই সেখানে মার্কিন স্বার্থ ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার কথা বলেছিলেন। ফলে চীনের ডাকে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা রাজনীতিতে ডলারের প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরিতে সায় দেওয়ার সাজা হোসনি মোবারক থেকে শুরু করে গাদ্দাফিরা পেয়ে গেছেন বলা যায়। আরব বসন্তের প্রেক্ষাপট এবং তারপর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে নয়া শাসনের ধর্ম ও ধরন এবং তা নিয়ে ওবামা‑হিলারিদের সন্তোষ অন্তত সে বার্তাই দেয়। খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে–সেই বসন্তে সব ওলট‑পালট হলেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্ররা কিন্তু রেহাই পেয়েছিল। যদিও জনতার অসন্তোষ সেই দেশগুলোর শাসকদের প্রতিও একই রকম ছিল।
দক্ষিণ আমেরিকায় তখন মার্কিন ঈগল যাদের বাধার মুখে পড়েছিল, তাদের একজন ফিদেল কাস্ত্রো, আর অন্যজন হুগো শাভেজ, যার মনোনীত এবং প্রভাব ও ক্যারিশমা বিচারে তুলনায় দুর্বল মাদুরো এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বন্দী।
তেলসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে শুধু নয়, ভনেজেুয়েলা সে সময় বৈশ্বিক নেতৃত্বের দিক থেকে অগ্রগণ্য না হলেও উল্লেখযোগ্য একটি নাম। আর তা সম্ভব হয়েছিল শাভেজের কারণেই। মাদুরো শাভেজের উত্তরসূরি হয়েছেন, কিন্তু কতটা যোগ্য, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। শাভেজ রাশিয়াসহ তাবৎ তেলসমৃদ্ধ দেশকে এক টেবিলে বসতে বাধ্য করেছিলেন। ওপেককে শক্তিশালী করা থেকে শুরু করে, রাশিয়া, ইরান, বেলারুশ, সিরিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অসংখ্য চুক্তি করেছেন, ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। ২০১৩ সালে শাভেজের মৃত্যুর পর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়ার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে ফেলে দেশটি। ক্রমাগত অজনপ্রিয় হয়েছেন মাদুরো। সাথে ছিল দুর্নীতি। দুর্বল হয়েছে শাভেজ প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ আমেরিকার আঞ্চলিক ফোরামগুলো।
ফলে মার্কিন ঈগলে শক্তি ক্রমশ বেড়েছে। বিপরীতে কমেছে বলিভারিয়ান বিপ্লবের শক্তি, যা লাতিন আমেরিকাকে দিনের পর দিন দম দিয়ে গেছে প্রবল শক্তির বিপরীতে লড়ে যাওয়ার। আর এই দুর্বল কাঠামোতেই আঘাত করছেন ট্রাম্প এখন। চোখে তার ‘গ্রেট আমেরিকার’ স্বপ্ন। তিনি তেল চান, বিরল খনিজ চান, ক্রিটিক্যাল মিনারেলস চান, নৌপথ চান, সম্পর্ক নয় আর্কটিকের বাস্তব বরফের গলে যাওয়া চান। আর এসব চাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মিলিত অধীশ্বর হতে চান। এমনকি গোটা পশ্চিম গোলার্ধই চান। তার এ চাওয়ার পথে বাধা এখন চীন, রাশিয়া। তবে দূরবর্তী মনে হলেও ইউরোপও কিন্তু প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। কারণ, ‘ডেথ অব ওয়েস্ট’ ধারণার আগমনধ্বনীর সঙ্গে সঙ্গে ‘ওয়েস্ট’ ধারণার মৃত্যুঘণ্টা যে বেজে গেছে।